🧑🎓 নায়ক: ফারহান
বয়স:২৩
শৈশব ও বেড়ে ওঠা
ফারহানের জন্ম ধানমন্ডিতে, মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় সন্তান সে। ছোটবেলায় ছিল দুষ্টু, খেলাধুলায় ব্যস্ত আর সবসময় হইচই করে বেড়াতো। স্কুলে পড়াশোনায় মাঝারি মানের হলেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সে সবসময় সবার আগে থাকতো। গান গাওয়ার প্রতি তার ঝোঁক শুরু হয় আট-নয় বছর বয়স থেকেই। বাবার পুরোনো হারমোনিয়ামটা ছিল তার প্রথম বন্ধু।
ব্যক্তিত্ব
ফারহান বাইরে থেকে বেশ প্রাণবন্ত। বন্ধুদের মাঝে হাসি-ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে বেশ সংবেদনশীল আর চিন্তাশীল। জীবনের ছোট ছোট ব্যাপার নিয়ে গভীরভাবে ভাবে। সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় দ্বিধায় পড়ে যায়, কারণ সে সবসময় চায় কাউকে আঘাত না দিতে।
পড়াশোনা ও স্বপ্ন
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ বিভাগে পড়ছে। যদিও পরিবার চায় সে ভবিষ্যতে বাবার ব্যবসা সামলাক, কিন্তু তার স্বপ্ন আসলে অন্য কিছু—সে একজন সংগীতশিল্পী হতে চায়। গিটার বাজাতে আর গান গাইতে সে নিজেকে সবচেয়ে বেশি খুঁজে পায়। তার বন্ধুদের কাছে সে “সিঙ্গার ভাই” নামে পরিচিত।
অভ্যাস ও স্বভাব
প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে গিটার বাজায়।
ছোটখাটো বিষয়েও সহজে মন খারাপ হয়ে যায়, আবার সামান্য ভালো কিছু হলে খুশিতে ভরে ওঠে।
বই পড়তে পছন্দ করে না, তবে কবিতা শুনতে খুব ভালোবাসে।
বন্ধুদের প্রতি অতিরিক্ত বিশ্বস্ত, একবার বিশ্বাস করলে প্রাণপাত করে দেয়।
নীলার সাথে সম্পর্ক
শৈশবে নীলার সাথে অনেক খুনসুটি ছিল। সে সময় ফারহান নীলাকে খুব বিরক্ত করতো—চুল টেনে ধরা, খেলায় হারালে খ্যাপানো। তারপর দীর্ঘ দশ বছর তাদের দেখা হয়নি। বড় হয়ে যখন আবার নীলাকে দেখে, তখন বুঝতে পারে—ছোটবেলার সেই সম্পর্ক একেবারেই বদলে গেছে। নীলা যেন তার চোখে এক নতুন মানুষ হয়ে দাঁড়ায়।
---
👩🎓 নায়িকা: নীলা
বয়স:২০
শৈশব ও বেড়ে ওঠা
নীলার জন্ম সিলেটে। বাবা সরকারি চাকরিজীবী, মা গৃহিণী। পরিবারে সে একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলায় ছিল শান্ত আর ভদ্র, তবে খুব মেধাবী। পড়াশোনায় সবসময় ভালো ফলাফল করতো। বই, গল্প আর কবিতার ভেতরেই তার শৈশব কেটেছে।
ব্যক্তিত্ব
নীলা শান্ত স্বভাবের হলেও ভেতরে ভেতরে তার মধ্যে আছে এক অদ্ভুত শক্তি। বাইরের মানুষ তাকে লাজুক মনে করে, কিন্তু যাকে আপন মনে করে তার কাছে খুলে যায় পুরো পৃথিবী। সে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে—মানুষের মুখ, চোখ, অভ্যাস। তার ডায়েরিতে লেখা থাকে চারপাশের ছোট ছোট ঘটনা আর নিজের লুকানো অনুভূতি।
পড়াশোনা ও স্বপ্ন
সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে চায়। তার স্বপ্ন লেখক হওয়া, কিংবা শিক্ষক হয়ে নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যের আলো ছড়িয়ে দেওয়া। সে কবিতা মুখস্থ করে, আর রাতে একা বসে লিখে যায় নিজের কল্পনা।
অভ্যাস ও স্বভাব
প্রতিদিন ডায়েরিতে কিছু না কিছু লেখে।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসে, কিন্তু কাউকে সহজে জানায় না।
গোপনে গান শুনতে ভালোবাসে, বিশেষ করে ফারহানের গাওয়া গান।
সহজে রাগ করে না, তবে একবার কষ্ট পেলে সেটা মনে অনেকদিন ধরে রাখে।
ফারহানের সাথে সম্পর্ক
শৈশবে ফারহানকে একেবারেই সহ্য করতে পারতো না। সবসময় দুষ্টুমি করে তাকে রাগাতো। তাই ছোটবেলার স্মৃতিতে ফারহান তার কাছে ছিল এক ধরনের বিরক্তির নাম। কিন্তু বড় হয়ে আবার দেখা হতেই সে নতুন এক ফারহানকে খুঁজে পেল—যে শুধু বন্ধু নয়, বরং তার ভেতরের নিঃসঙ্গতাকে পড়তে পারে। ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে, ফারহানের উপস্থিতি তার জীবনে অন্য রকম এক শান্তি এনে দেয়।
---
🌸 তাদের মিল ও অমিল
মিল: দুজনেই ভেতরে ভেতরে সংবেদনশীল, দুজনেই শিল্প-সংগীত-সাহিত্যের সাথে জড়িত। একে অপরকে বোঝে, ছোটখাটো বিষয় শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
অমিল: ফারহান বাইরে প্রাণবন্ত, নীলা শান্ত। ফারহান দ্রুত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, নীলা বেশি ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়।
ঢাকা শহর—আলো আর শব্দে মোড়া এক ব্যস্ত নগরী।
দিন-রাতের পার্থক্য এখানে অনেক সময় বোঝাই যায় না,
কারণ রাতেও সড়কে ভিড় থাকে, দোকানের সাইনবোর্ডে ঝলমল করে নীল-লাল বাতি,
রাস্তায় শোনা যায় গাড়ির হর্নের শব্দ আর মানুষের হাঁকডাক।
এই ভিড়ের শহরের ভেতরেই বাস করতো ফারহান।
ধানমন্ডির এক পুরোনো কিন্তু আরামদায়ক ফ্ল্যাটে তার পরিবার বহু বছর ধরে বসবাস করছে।
তাদের ফ্ল্যাটের ছাদটা ছিল ফারহানের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।
ওখানেই সে গিটার বাজায়, গান গায়, আর আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের স্বপ্নগুলোকে উড়িয়ে দেয়।
সেদিনও ছিলো শীতকালের বিকেল।
ঢাকার শীত খুব বেশি কড়া না হলেও, জানুয়ারির হাওয়ায় একধরনের নরম শীতলতা লেগে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে ফারহান বাড়ি ফিরলো ক্লান্ত গলায়,
কিন্তু চোখেমুখে ছিল একটা অদৃশ্য উজ্জ্বলতা।
কারণ গান শেখার নতুন একটা আইডিয়া মাথায় ঘুরছিল।
দরজার বেল চাপতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো মায়ের কণ্ঠস্বর,
“এসো বাবা, আজকে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
ফারহান একটু অবাক হলো।
তার মা হঠাৎ সারপ্রাইজের কথা বলবে—এটা বিরল।
জুতো খোলার আগেই ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে এলো অপরিচিত হাসির শব্দ।
সে থমকে গেলো।
ঘরের ভেতরে ঢুকতেই মায়ের ডাকে আরেকটা কণ্ঠ জড়িয়ে গেল,
“এই নীলা, এসো তো, ফারহানের সাথে দেখা করো।”
“নীলা?”
নামটা শুনেই ফারহানের মনে যেন একটা পুরোনো অ্যালবামের পাতা উল্টে গেল।
ছোটবেলায় দেখা সেই মেয়েটা, খালাতো বোন, যে সবসময় তার সাথে ঝগড়া করতো।
কিন্তু তারপর কত বছর কেটে গেছে—
সম্ভবত দশ বছর?
সে কি আদৌ চিনতে পারবে?
মুহূর্তের মধ্যেই ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক তরুণী।
নীলা।
ফারহান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো।
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একেবারে ভিন্ন রূপে বদলে যাওয়া মানুষ।
নীলা পরেছে গাঢ় নীল শাড়ি, চুল খোলা, চোখে সাদামাটা গোল ফ্রেমের চশমা।
তার মুখে লাজুক অথচ দৃঢ় এক হাসি—
যেন পুরোনো দিনের সাথে নতুন দিনের ফারাকটা মিলিয়ে দিচ্ছে।
“চিনতে পারছো না, তাই না?” — নীলা মৃদু হেসে বললো।
ফারহান একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
“চিনেছি তো… তবে পুরোপুরি নতুন হয়ে গেছো তুমি।”
নীলার ঠোঁটের কোণে ঝিলিক খেলে গেলো।
সে শান্ত স্বরে বললো,
“অনেকদিন পর দেখা হলো, ফারহান ভাই।”
এই “ভাই” শব্দটা ফারহানের কানে কেমন অদ্ভুত লাগলো।
হৃদয়ের গভীরে একটা হালকা ধাক্কা খেলো—
কেন যেন শব্দটা তার ভালো লাগলো না।
কাজিন—হ্যাঁ, সেটা ঠিক।
কিন্তু চোখে চোখ রাখতেই বুঝলো,
এই মেয়ে আর আগের ছোট্ট নীলা নেই।
ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
তার মনে হচ্ছিল, যেন সময় হঠাৎ থেমে গেছে।
দশ বছরের ব্যবধান এক মুহূর্তে ভেঙে গিয়ে দুজনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে একই জায়গায়।
মা হাসিমুখে বললেন,
“নীলার বাবা অফিসের কাজে কয়েক মাস ঢাকায় থাকবে। তাই ওরা আমাদের কাছেই থাকবে এই সময়টা।”
ফারহান শুনে অবাক হলো।
মানে কয়েক মাস ধরে নীলা থাকবে এই বাড়িতেই?
হৃদয়ের ভেতরে অচেনা এক কাঁপুনি বয়ে গেলো।
নীলা তখন সোফায় বসে মায়ের সাথে গল্প করছে।
তার ভঙ্গিতে এক ধরনের পরিণত ভাব আছে, কিন্তু চোখে লেগে আছে পুরোনো দিনের চঞ্চলতা।
ফারহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে রইলো।
নীলা হঠাৎ চোখ তুলে তার দিকে তাকালো।
চোখাচোখি হতেই সে মুচকি হেসে বললো,
“কি ব্যাপার? এতক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছো কেন?”
ফারহান একটু লজ্জা পেয়ে উত্তর দিলো,
“না, আসলে… অনেকদিন পর তোমাকে দেখলাম, তাই।”
নীলা হেসে মাথা নেড়ে বললো,
“তুমি মোটেও বদলাওনি। সেই একইভাবে হকচকানো ফারহান।”
সন্ধ্যার পর ছাদে গিয়ে দাঁড়ালো ফারহান।
ঢাকার আকাশে তখন হালকা শীতের কুয়াশা।
দূরে লাইটপোস্টের আলো ঝাপসা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই ছাদই ছিল তার নির্জন জায়গা—
কিন্তু আজ সে জানে, হয়তো আর নির্জন থাকবে না।
“ছাদে এলে গিটার ছাড়া মানায় না তোমার।” — পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর।
ফারহান ঘুরে তাকালো।
নীলা দাঁড়িয়ে আছে, পরনে হালকা সোয়েটার, হাতে গরম চায়ের কাপ।
তার চোখে খেলে যাচ্ছে দুষ্টু ঝিলিক।
“তুমি এখানে?” — ফারহান অবাক হলো।
“হ্যাঁ, ভাবলাম শহরের ছাদটা একসাথে দেখা যাক। সিলেটে তো এমন ছাদে দাঁড়ানো যায় না।”
দুজনেই রেলিংয়ের পাশে দাঁড়ালো।
নীলা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো,
“শহরটা আমার কাছে অচেনা। সবাই ব্যস্ত, সবাই ছুটছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি এখানে একা।”
ফারহান হেসে বললো,
“তাহলে ঠিক হলো, শহরের একাকীত্ব ভাঙার দায়িত্ব আমার।”
নীলা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে দিলো।
হাসিটা যেন শীতের আকাশে হঠাৎ উড়ে যাওয়া একটা উল্কা—
ছোট্ট, কিন্তু মন কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো।
দুজন অনেকক্ষণ গল্প করলো।
বই, সিনেমা, গান—সব বিষয় নিয়েই কথা হলো।
কথার ফাঁকে ফাঁকে ফারহান বুঝতে পারলো,
নীলার ভেতরে এক ধরনের গভীরতা আছে।
যেটা সে ছোটবেলায় কখনো দেখেনি।
নীলাও অবাক হলো।
ছোটবেলার সেই দুষ্টু ফারহান এখন অনেক শান্ত, অনেক ভেবেচিন্তে কথা বলে।
তবে তার চোখে আজও সেই একই উজ্জ্বলতা,
যেটা একসময় তাকে বিরক্ত করতো,
এখন অজান্তেই টেনে নিচ্ছে।
রাত যত গভীর হলো, আকাশে তারা তত জ্বলজ্বল করতে লাগলো।
কিন্তু তাদের দুজনের চোখে যে আলো জ্বলছিল,
তা যেন আকাশকেও ম্লান করে দিচ্ছিল।
ঢাকার সকালগুলো অদ্ভুত রকমের শব্দে ভরা।
কোথাও ভ্যাপসা গরম চা বিক্রি হচ্ছে,
কোথাও বাসের হর্নে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে,
আবার কোথাও হকারের ডাকে জেগে উঠছে ভিড়ভাট্টার রাস্তা।
ফারহান এই শব্দের ভেতরেই বড় হয়েছে।
কিন্তু আজকাল সকালগুলো তার কাছে অন্য রকম।
কারণ ঘুম ভাঙতেই সে জানে,
এই বাড়ির ভেতরে এখন একজন নতুন মানুষ এসেছে—
নীলা।
---
সকালের অপ্রস্তুত মুহূর্ত
এক সকালে ফারহান রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ ভেতর থেকে ভেসে এলো হাসির শব্দ।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনলো।
মায়ের সাথে নীলা গল্প করছে।
নীলার কণ্ঠে এক ধরনের মিষ্টি সুর আছে—
যেটা ফারহানকে অদ্ভুতভাবে টানে।
মা হেসে বলছিলেন,
“তুমি তো একদম ঢাকা শহরের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছো, নীলা।”
নীলা উত্তর দিলো,
“না খালা, আমি তো আসলে ভয়ই পাচ্ছি।
এখানে সবাই এত ব্যস্ত, এত দ্রুত চলে…
আমার মনে হয় আমি হারিয়ে যাবো।”
ফারহান তখন ভেতরে ঢুকতে পারলো না।
কেন জানি হঠাৎ অপ্রস্তুত লাগছিল।
সে চলে গেলো বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলো।
নিজের মনে বললো,
“আমি কেন ওর কণ্ঠ শুনলেই এভাবে চুপ হয়ে যাই?”
---
বিশ্ববিদ্যালয় আর ছুটে আসা
সেদিন ফারহানের ক্লাসে মন বসলো না।
লেকচারার বোর্ডে সমীকরণ লিখছিলেন,
কিন্তু তার চোখ ভেসে যাচ্ছিল অন্য কোথাও।
হঠাৎ মনে হলো—
নীলা এখন হয়তো বই পড়ছে,
হয়তো মায়ের সাথে গল্প করছে,
অথবা হয়তো ছাদে উঠে আকাশ দেখছে।
ক্লাস শেষ হতেই সে তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে পড়লো।
বাসে ওঠার পর চারপাশে মানুষের কোলাহল শোনা গেলো,
কিন্তু তার ভেতরে শুধু একটা প্রশ্ন—
“আমি কি তাড়াহুড়ো করছি নীলাকে দেখার জন্য?”
---
ছাদে প্রথম বিকেল
ফারহান যখন বাড়ি ফিরলো,
নীলা তখন ছাদে দাঁড়িয়ে।
হালকা বাতাসে তার চুল উড়ছিল,
আকাশে ডুবতে থাকা সূর্যের আলোয়
তার চোখে যেন অন্য রকম ঝিলিক ফুটে উঠেছিল।
“তুমি এলেই যেন ছাদটা জমে ওঠে।” — নীলা হেসে বললো।
ফারহান একটু থমকালো, তারপর বললো,
“তুমি থাকলেই তো ছাদটা আলোয় ভরে যায়।”
নীলা চমকে তার দিকে তাকালো।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো।
তারপর দুজনেই হেসে ফেললো—
যেন কথাটা মজা করেই বলা হয়েছিল।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুজনেই জানতো—
কথাটার ভেতর লুকিয়ে আছে অন্য মানে।
---
বই আর গানের সেতুবন্ধন
নীলা সাথে করে এনেছিল একটা কবিতার বই।
“তুমি পড়বে?” — সে এগিয়ে দিলো।
ফারহান বই হাতে নিয়ে কয়েক লাইন পড়লো,
তারপর গিটার তুলে সেই লাইনগুলো দিয়ে সুর বানাতে লাগলো।
নীলা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো।
“তুমি কি সব শব্দকেই গানে পরিণত করতে পারো?”
ফারহান হেসে উত্তর দিলো,
“হয়তো পারি না, কিন্তু তোমার পড়া শব্দগুলোতে সুর লুকানো থাকে।”
নীলা আর কিছু বললো না।
শুধু চোখের দৃষ্টিতে একটা নীরব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
যেটার উত্তর ফারহানও দিতে পারলো না।
প্রথম বেড়ানো
শীতকাল।
শহরের ভিড় থেকে খানিকটা দূরে,
ঢাকার অদূরে এক পার্কে গেলো তারা দুজন—
মা আর খালার সাথে।
মা-খালা ব্যস্ত বাজারের জিনিসপত্র নিয়ে গল্প করছিলেন,
ফারহান আর নীলা ধীরে ধীরে হাঁটছিলো পাথরের পথ ধরে।
নীলা ছোট্ট গাছপালা দেখে খুশি হয়ে উঠলো।
“এগুলো দেখে মনে হচ্ছে গ্রামের উঠান।
কেমন শান্ত… শহরে তো এমন শান্তি পাওয়া যায় না।”
ফারহান তাকিয়ে বললো,
“তাহলে তুমি শহর পছন্দ করো না?”
নীলা একটু ভেবে উত্তর দিলো,
“শহর খারাপ না, কিন্তু কখনো কখনো একা করে দেয়।
মানুষ থাকে হাজারো, তবুও মনে হয়—
আমি একাই।”
ফারহান মৃদু হেসে বললো,
“কিন্তু তুমি তো একা নও।”
নীলা প্রশ্ন করলো,
“তাহলে আমি কী?”
ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তারপর হেসে এড়িয়ে গেলো।
---
হঠাৎ থেমে যাওয়া
ফেরার পথে তারা লেকের ধারে দাঁড়ালো।
নীলা পানির দিকে তাকিয়ে বললো,
“তুমি কি কখনো ভেবেছো,
আমাদের দুজনের জীবন যদি একদম ভিন্ন হতো?”
ফারহান উত্তর দিলো না।
শুধু নীলার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তার চোখে ডুবে থাকা আলো যেন বলছিল,
“হ্যাঁ, আমি ভেবেছি।”
কিন্তু মুখে সে বললো,
“আমাদের জীবন ভিন্ন হলেও,
কিছু মুহূর্ত একই হয়ে যায়।
যেমন আজ।”
নীলার ঠোঁটে এক ঝিলিক হাসি ফুটলো।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে অনুভব করলো—
এই কথার ভেতর লুকিয়ে আছে এক অঘোষিত গোপন।
---
পারিবারিক আড্ডা
সেদিন রাতে খাওয়ার টেবিলে সবাই একসাথে বসেছিল।
আড্ডা চলছিল, গল্পে হাসাহাসি।
মা বলছিলেন,
“ফারহান, তুমি নীলাকে ভালো করে শহরের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে।”
ফারহান হেসে উত্তর দিলো,
“ও তো এখনই শহরের মানুষ হয়ে গেছে।”
নীলা মুচকি হেসে বললো,
“না খালা, এখনো অনেক কিছু শিখতে হবে।”
টেবিল ভরে উঠলো হাসিতে।
কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও ফারহান টের পেলো—
তার দৃষ্টি বারবার নীলার দিকেই চলে যাচ্ছে।
---
ডায়েরির পাতা
রাত গভীর হলে নীলা নিজের ডায়েরি খুললো।
পাতার ওপর লিখলো—
> “আজকের দিনটা অদ্ভুত সুন্দর ছিল।
ফারহানের সাথে লেকের ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লেগেছিল।
কেন যেন মনে হলো,
ওর ভেতরেও কিছু লুকানো আছে।
আমি কি ভুল ভাবছি?
নাকি সত্যিই কোনো টান আছে আমাদের মধ্যে?”
অন্যদিকে,
ফারহান নিজের খাতায় লিখছিল গান—
> “কেউ কি জানে,
দুটো অচেনা পথ কখন একসাথে মিশে যায়?
কেউ কি জানে,
পরিচয়ের আড়ালে লুকানো টানকে কী বলে?”
---
হঠাৎ পাওয়া মুহূর্ত
একদিন সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে গেলো।
পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে গেল।
মোমবাতির আলোয় বসেছিল সবাই।
নীলা ভয় পেয়ে ফারহানের কাছাকাছি বসে গেল।
ফারহান মৃদু হেসে বললো,
“ভয় পেও না, আমি আছি।”
নীলার মনে হলো—
এই তিনটা শব্দ তার হৃদয়ের ভেতরে বাজতে লাগলো।
“আমি আছি…”
কেন যেন মনে হলো,
এই কথাটা শুধুই কাজিনের আশ্বাস না,
বরং ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গভীর প্রতিশ্রুতি।
---
রাতের নিস্তব্ধতা
ঘুমানোর আগে নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল।
শহরের আলো ঝলমল করছে,
দূরে গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে।
ফারহান পাশেই এসে দাঁড়ালো।
“ঢাকা তোমার কেমন লাগছে এখন?”
নীলা উত্তর দিলো,
“ভালো লাগছে।
কারণ শহরটা হঠাৎ অপরিচিত লাগছে না।”
ফারহান চমকে তাকালো।
“মানে?”
নীলা শুধু মুচকি হাসলো।
কোনো উত্তর দিলো না।
কিন্তু সেই মুচকি হাসিই যেন হাজারো উত্তর দিয়ে গেল।
Download NovelToon APP on App Store and Google Play