বর্ষণের সেই রাতে (S.1)
বর্ষণের সেই রাতে (S.2)
স্নিগ্ধবিষ
■■■■■■■■■■■■■■
• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR
• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR• Every character, which is portrayed in this story, is fictional. None of the pictures are mine, credit goes to the respective real owners.
• Do not take any character or incident seriously. Everything is imaginative. Every story is created just for entertainment. Everything shown in the story is not related to the world.
• Story is 20+, be careful. Some pictures might not be suitable for kids.
• If you don't like the story, skip it but don't spread negativity.
"A reader lives a thousand lives before he dies, but a writer can create a thousand lives before he dies."
...AUTHOR
𝐓𝐇𝐄 𝐈𝐍𝐃𝐄𝐗 🖤
🩶 পর্ব_১
#বর্ষণের সেই রাতে ❤
#লেখিকা: অনিমা
#পর্ব 1+2
লোকটা আমার কোমর ছাড়তেই আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দৌড়ে সোফার রুমে এসে মেইন ডোর খুলতে যাবো তার আগেই লোকটা আমার হাত ধরে হ্যাচকা টানে তার দিকে ঘুরিয়ে আমার গা থেকে একটানে ওরনাটা নিয়ে নিলো। তারপর টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে রাগী কন্ঠে বলল
--- বলেছিলাম না উল্টোপাল্টা কিছু করোনা খুব খারাপ হয়ে যাবে?
--- ক্ কে আপনি? আর ক্ কেন অ্ আমার সাথে এমন করছেন?
বলতে বলতে কেদেই দিয়েছি আমি। লোকটি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে জোর করে আমার ওই ওরনাটা দিয়েই আমার হাত বেধে দিলো আর কিছু একটা পকেট থেকে বের করে মুখও বেধে দিলো, অন্ধকার তাই শুধু অবয়ব দেখা যাচ্ছে লোকটার। হঠাৎ আমার সাথে ঘটা এই আকষ্মিক ঘটনায় বেশ ঘাবড়ে গেছি। কাজ সেরে বাসায় ফেরার পর এমন কিছু হবে আশা করিনি আমি।
বর্ষার রাত। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বিরতিহীনভাবে ঝরেই চলেছে, সে আজ থামতে একেবারেই নারাজ। একটা ইম্পর্টেন্ট আর্টিকেল নিয়ে কাজ করতে করতে বাড়িতে ফিরতে রাত হয়ে গেলো। নিজের স্কুটিতে এসেছি তাই ভিজেও গেছি। তিন রুমের একটা ফ্লাটে একাই থাকি আমি। ফ্লাটে ঢুকে শরীরের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে বেডরুমে ঢুকেই চমকে গেলাম। বিদ্যুৎ নেই রুমটা অন্ধকার। সেটা বড় কথা না কারণ এইরকম বিদ্যুৎ চমকানো বর্ষণের দিনে এইসব এলাকার নিচের বিদ্যুৎও ওপরের বিদ্যুতের সাথে সাক্ষাৎ করতে চলে যায়, যেনো এই সাক্ষাৎ অনিবার্জ। কিন্তু আমার চমকানোর কারণ হলো আমারি বেডরুমে আমারি বেডে কেউ বসে আছে। অন্ধকারে তাকে দেখা না গেলেও তার অবয়ব স্পষ্ট, অবয়ব অনুসারে একটা ছেলে। আমি একবার চোখ ঝাপটা দিয়ে নিলাম। হেলুসিনেট করছি নাতো? কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারলাম যে এটা সত্যিই। ভয় পেয়ে গেলাম আমি। লোকটি এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। আগেই বলেছি ফ্লাটে আমি একা থাকি, এইমুহূর্তে এখানে আসার মতো কোনো আত্মীয় বা পরিচিত কেউ আমার নেই। আর তাছাড়া দরজাতো লক করা ছিলো। তাই কেউ কীকরে আসবে ভেতরে? চোর নাকি? যদি চোর হয় তো লোকটার জন্যে একড্রাম আফসোস কারণ সে টেকোর কাছে চিরুনী খুজতে এসছে। কিন্তু চোর হলে চুরি না করে এভাবে খাটে বসে আছে কেনো? আমি কী করবো বুঝতে পারছিনা। ডাকবো লোকটাকে নাকি চেঁচাবো? না বাইরে গিয়ে পাশের ফ্লাটের লোকেদের ডেকে আনি সেটাই ভালো। এসব ভাবতে ভাবতেই লোকটির আমার দিকে ঘুরলো, আমাকে দেখেই দ্রুত দাঁড়িয়ে গেলো আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলাম। লোকটি আমার দিকে এগোতে লাগল। অন্ধকারে আবছাভাবে লোকটিকে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে জোরে চিৎকার দিতে যাবো তার আগেই লোকটি আমার মুখ চেপে ধরল। এতে আরো অবাক হলাম। আমি ছাড়া পাওয়ার জন্যে নড়তে গেলেই লোকটি আরেক হাতে আমার কোমর চেপে ধরল যাতে নড়াচড়া করতে না পারি। আমার সাথে ঘটে যাওয়া আকষ্মিক এই ঘটনায় আমি পুরো হতভম্ব হয়ে গেছি। একা একটা ফ্লাটে একটা মেয়ের সাথে এরকম কিছু হলে সেই মেয়েটার মনের পরিস্হিতি আন্দাজ করা কঠিন। চির পরিচিত আশঙ্কায় বুক কেপে উঠলো আমার। লোকটা উত্তেজিত কন্ঠে বলল
--- হেই মিস। প্লিজ ডোন্ট শাউট। আমি কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি। একটু থামুন লেট মি এক্সপ্লেইন।
কিন্তু লোকটার কথা যেনো আমার কানে গিয়েও গেলোনা। আমি নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আর ভাবছি লোকটা চাইছে টা কী? চোর? নাকি অন্যকিছু? লোকটার এইভাবে আমাকে ধরে রাখাতে আমার আরো ভয় করছে। উল্টোপাল্টা কিছু হবেনা তো আমার সাথে? রোজ এরকম কতো ঘটনার আর্টিকেল নিজের হাতে লিখি। লেখার সময় বেশ আক্ষেপ ও হয় মেয়েগুলোর জন্যে। আজ কী আমার সাথেও এমন কিছু হবে? কালকে কেউ আমারও আর্টিকেল বানাবে? সেইসাথে মন থেকে বেড়িয়ে আসবে আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাস। এসব ভেবে আরো মোচড়াতে মোচড়াতে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে শুরু করলাম। লোকটার এবার বিরক্তি মিশ্রিত কন্ঠে বলল
--- আরে এমনভাবে লাফাচ্ছেন কেনো? আমাকে বলতে তো দিন? আসলে নিচে..
কিন্তু আমি এবারেও কথাটা শেষ করতে না দিয়ে উমম শব্দ করতে করতে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছি। একে বলতে দিলেই বিপদ আগে এর থেকে ছাড়া পেয়ে আমায় লোক জরো করতে হবে। কিন্তু যদি পালিয়ে যায়? অন্ধকারেতো লোকটার মুখও দেখতে পারছিনা। লোকটা এবার একটু রাগী গলাতে বলল,
-- শ্যাল আই ফিনিস? একটু বলি? তারপর না হয় আপনি আপনার পেংগুইন ডান্স দেখাবেন? সারারাতই আছি,এখানে নিরবিলি বসে দেখবো।
সারারাত থাকবে শুনেই বুকটা ধক করে উঠলো। তবেকি যা ভাবছি তাই হতে চলেছে। এবার আমার ছটফটানি আরো বেড়ে গেলো। রীতিমতো লাফানোর চেষ্টা করছি আমি। আর মুখ দিয়ে উমম টাইপ শব্দতো আছেই। যেটা আমার নিজেরই বিরক্ত লাগছে লোকটার কেমন লাগছে কে জানে? লোকটা এবার ভীষণ জোরে ধমক দিলো আমাকে। ধমকটা এতোই জোরে ছিলো যে আমি একেবারে খরগোশ ছানার মতো করে শান্ত হয়ে রইলাম। লোকটা এবার একটা শ্বাস নিয়ে বলল
--- এটলাস্ট। মুখ ছাড়ছি আমি। ছাড়ার পর যদি একটুও চিৎকার চেচামিচি বা উল্টোপাল্টা কিছু করেন। তাহলে খুব খারাপ হবে। মনে থাকবে?
আমি ভদ্রমেয়ের মতো হ্যা বোধক মাথা নাড়লাম কারণ ভয় পেয়ে গেছি লোকটার ধমকে। কিন্তু মনে মনে বলছি একবার শুধু ছেড়ে দেখনা তোকে যদি গনধোলাই না খাওয়াই তাহলে আমি এক সপ্তাহ চকলেট খাবোনা হুহ। এরপর লোকটা আমার কোমর আর মুখ ছেড়ে দিতেই এই ঘটনা ঘটল।
বাইরে ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি হচ্ছে। আমি হাত মুখ বাধা অবস্হায় গুটিশুটি মেরে সোফায় বসে আছি। আর লোকটা সামনের সিঙ্গেল সোফায় বসল। অন্ধকার হলেও বাইরে থেকে আসা আলোয় সবকিছুই দেখা যাচ্ছে কিন্তু পরিস্কার না অবয়ব আকারে। লোকটার ঠান্ডা গলায় বলল,
--- আই এম সরি ফর মাই বিহেভিয়ার, তুমি করে বলার জন্যেও সরি। কিন্তু আমার কাছে কোনো সেকেন্ড অপশন ছিলো না। আপনি তৈরী ছিলেননা কিছু শোনার জন্যে,নিজের মতো করে লাফিয়ে যাচ্ছিলেন। অযথাই ভয় পাচ্ছেন আপনি আমাকে।
আমি কিছু বলতে পারছিনা কারণ আমার মুখ বাধা কিন্তু লোকটার ওপর রাগ হচ্ছে। এভাবে একটা মেয়ের ঘরে ঢুকে বসে থাকলে মেয়েটা চেঁচাবে না তো নাকি মৌনব্রত পালন করবে? আর বলে কী না অযথাই ভয় পাচ্ছি। ডিসগাসটিং। কিন্তু এই ব্যাটার মতলব টা কী? লোকটা বলল
--- টেবিল লাইট বা মোমবাতি নেই?
আমার এবার নিজের চুল নিজেরই ছিড়তে ইচ্ছে করছে। মুখ বেঁধে রেখে প্রশ্ন করছে। লোকটা নিজে জোকার নাকি আমাকে দেখে তার জোকার মনে হচ্ছে সেটা নিয়ে আমি যথেষ্ঠ সন্দিহান। লোকটি নিজেই বলল,
--- সরি আই ফরগট। বাট প্লিজ চেঁচাবেন না। বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে আর ফ্লাটের দরজাও বন্ধ আপনার চিৎকার কেউ শুনবেনা। আমি জাস্ট আমার নিজের কানের প্রটেক্শনের জন্য বলছি।
একথা বলতে বলতে আমার মুখের বাধন খুলল। আমি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছি। কী চাই কী এর? খারাপ কোনো উদ্দেশ্য থাকলে এতোক্ষণে তো করার কথা ছিলো, তবুও এদের বিশ্বাস নেই। না জানি কী ফন্দি আটছে। অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে বললাম,
--- আপনাকে না দেখতে খুব ইচ্ছে করছে আমার।
--- কেনো?
--- এক্চুয়ালি আমার এলিয়েন দেখা হয়নি এখোনো অবধি। সুযোগ যখন পেয়েছি মিস করবো কেনো?
লোকটি হেসে দিলো। অন্ধকার তাই হাসিটা দেখতে না পেলেও হাসির আওয়াজ টা শুনেই বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো। লোকটা হাসিমিশ্রিত কন্ঠেই বলল,
--- ক্যান্ডেল বা টেবিল লাইট কোথায় আছে বলুন? আমি নিয়ে আসছি।
--- হাত খুলুন আমি এনে দিচ্ছি।
--- সরি ম্যাম আই কান্ট ট্রাস্ট ইউ। আপনি আবারো যে অলিম্পিক এর রেস লাগাবেন না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
আমি এবার বেশ বিরক্ত হলাম। রাগ লাগছে ভীষণ। কী পেয়েছে কী লোকটা? কাঠের পুতুলের মতো নাচিয়ে যাচ্ছে আমাকে। তাই রাগে গজগজ করে বললাম,
--- লিসেন ইউ আর ক্রসিং ইউর লিমিট।
--- আই নো! বাট আমি হেল্পলেস। আপনাকে আগে সবটা বলি। তারপর আপনি যা খুশি করুন। কিন্তু আপনাকে সবটা ক্লিয়ার করে বলার জন্যে আমার মুখটা দেখতে হবে সো আই নিড লাইট।
--- কেনো আপনার মুখ হোয়াইট বোর্ড নাকি? যে ওখানে না তাকালে অংক মাথায় ঢুকবেনা?
--- উফফ দিস গার্ল..সেটা আমার মুখ দেখলেই বুঝতে পারবেন। এবার বলুন।
--- টেবিল লাইট আপনি খুজে পাবেন না। ঐ ওয়ার্ডড্রপ এর ওপর ক্যান্ডেলস আর লাইটার আছে।
লোকটা উঠে কিছুক্ষণ খুজে একটা ক্যান্ডেল আর লাইটার নিয়ে এলো। টি- টেবিলের ওপর মোমবাতি রেখে লাইটার দিয়ে জালানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো রুম আবছা হলদে আলোয় আলোকিত হয়ে গেলো। আমি এতোক্ষণ বিরক্তি নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু রুম আলোকিত হবায় লোকটির দিকে তাকিয়ে আমিতো বড়সর ঝটকা খেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। এও সম্ভব? এটা হতে পারে? আমি কি সপ্ন দেখছি? তাই দুবার চোখ ঝাপটাও দিলাম। কিন্তু সেই একি দৃশ্য। আরো অবাক করা বিষয় লোকটা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে যেনো তার দৃষ্টি আমার ওপরেই স্হির হয়ে গেছে। কিন্তু আমার অবাক দৃষ্টি দেখে নিজেকে সামলে নিয়ে মুচকি হেসে ভ্রু নাচালো। আমি অবাক হয়ে লোকটির দিকে তাকিয়ে বললাম
--- অ্ আদ্রিয়ান?
লোকটি বাকা হেসে বলল "হ্যা"। আমি এবারেও অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাসের সুরে বললাম
--- আদ্রিয়ান আবরার জুহায়ের?
--- এস পার আই নো।
বলেই ওনার সেই ভূবন ভোলানো হাসিটা দিলো। আমার এখন চোখের সাথে নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছে না। আবারো অবাক হয়ে বললাম
--- ইউ মিন দ্যা গ্রেট সিঙ্গার? রকস্টার এডি?
এবারেও সেই হাসি দিয়ে বলল
--- লোকেতো তাই বলে। বাট থ্যাংক গড যে আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন।
আমি নিজের হাতেই নিজে একটা চিমটি দিলাম যে এটা সপ্ন কী না? কিন্তু চিমটি টায় ব্যথাও পেলাম। সেটা এডি এর চোখে পড়ল, আর চোখে পরতেই উনি আবারো হেসে দিলো। এতোক্ষণে মোটামুটি সিউর হলাম যে এটা স্বপ্ন নয় সত্যিই। উনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। আমি দাড়িয়ে আটকে যাওয়া কন্ঠে বললাম
--- আপনি? এখানে? আমার ফ্লাটে? কীভাবে ম্ মানে?
--- আই নিড ইউর হেল্প। আজ রাতটা আমি থাকবো আপনার ফ্লাটে।
আমিতো অবাকের চরম পর্যায়ে পৌছে গেছি থাকবে মানে কী? আর কেনো? বিষ্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম
--- মানে?
--- মানে আজ রাতটা আমার এখানেই কাটাতে হবে।
আজব? এমনভাবে বলছে যেনো নিজেরই ফ্লাট। ইচ্ছে হলেই থাকবে। মামা বাড়ির আবদার। আমি ভ্রু কুচকে বললাম,
--- যদি থাকতে না দেই?
উনি মুচকি হেসে পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললেন,
--- আপনি বাধ্য। কারণ যদি আবারো ভূলভাল কিছু করেন তো ওভাবেই হাত মুখ বেধে রেখে দেবো। আপনি চান সেটা?
আমি ভয়ে মাথা নাড়লাম। কারণ যদি সত্যিই আবার ওভাবে বেধে রেখে দেয়? উনি বাকা হেসে বলল
--- গুড গার্ল।
--- কিন্তু আমার ফ্লাটেই কেনো?
--- একটু বিপদে পরে গেছি। তাই এখানে এসে আশ্রয় নিতে হলো।
আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম,
--- বিপদ?
উনি এবারেও হেসে দিয়ে বলল
--- আরেহ কুল। পালিয়ে যাচ্ছিনা আমি। বলবো সব। আগে আপনি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন পুরো ভিজে আছেন তো।
আমি নিজের দিকে তাকালাম। এসবের চক্করে ভূলেই গেছিলাম যে আমি ভিজে আছি। এবার ইতোস্তত করে ওনার দিকে তাকালাম। উনিও হালকা ভিজে আছেন। মোমবাতির আবছা হলদেটে আলোয় চম্যৎকার সুন্দর লাগছে তাকে। হালকা ভিজে চুল যা এলোমেলো হয়ে কপাল ভর্তি হয়ে আছে। ছয় ফুটের ওপরে লম্বা, ফর্সা গায়ের রং, একেবারে হালকা গোলাপি ঠোট, এক অসম্ভব সুন্দর দুটো চোখ। যেনো ওই চোখ দিয়েই সবাইকে হিপনোটাইজ করার ক্ষমতা সে রাখে। একটা ব্লাক টিশার্ট, নেভিব্লু জ্যাকেট, ব্লু জিন্স, হাতে ব্রান্ডের ঘড়ি, পায়ে কেডস্। একজন স্টার বলে কথা। এখোনো আমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে এতো বড় একজন রকস্টার আমার ফ্লাটে এসছে। আমি এখোনো অবাক হয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। আদ্রিয়ান আমার সামনে তুরি বাজিয়ে বললেন,
--- হ্যালো মিস?
ওনার আওয়াজে আমার ধ্যান ভাঙতেই নিজেকে কোনোরকমে সামলে বললাম,
--- জ্বী?
উনি ভ্রু কুচকে তাকালেন আমার দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন
--- গিয়ে চেন্জ করে নিন। আর পারলে আমাকেও মোছার জন্যে একটা টাওয়াল জাতীয় কিছু একটা দিয়ে যান। মুছে নিতাম আরকি।
আমি কিছু না বলে একটা টাওয়াল এনে ওনার হাতে দিলাম। এরপর তাড়তাড়ি ওয়াসরুমে ঢুকে কুর্তি আর জিন্স চেন্জ করে একটা টপস আর প্লাজো পরে নিলাম। বুক কেমন যেনো ধুকপুক ধুকপুক করছে। আমিকি হেলুসিনেট করছি? কিন্তু এটা কীকরে হলো? এসব ভাবতে ভাবতে বাইরে এলাম। বাইরে বেরিয়ে দেখি উনি বেডরুমে মোমবাতি নিয়ে এসছে আর খাটে বসে আছে গায়ে শুধু জিন্স আর একটা কালো চিকন স্লিভস এর গেন্জি। ভীষণ রকমে কাঁপছি আমি। উনি উঠে আমার সামনে এসে আমাকে এভাবে কাঁপতে দেখে বলল
--- এখোনো ভয় পাচ্ছেন আমাকে?
--- নাহ ম্ মানে সেরকম ক্ কিছু না।
প্রচুর নার্ভাস আর আনইজি লাগছে। আদ্রিয়ান বাকা হেসে বলল
--- কেনো? এতোক্ষণ তো ভয় পাচ্ছিলেন? পরিচয় জানার পর ভয় লাগছেনা?
আমি কী বলবো কী করবো কিছুই বুঝতে পারছিনা। সবকিছুই সপ্নের মতো লাগছে। কী বলা উচিত আমার এখন?
-- পাবলিক ফিগার আমি। দ্যাট নট মিনস কী আমার ক্যারেক্টার ভালো হবে তাইনা?
#চলবে..
[ গল্পটাতে অল্প কিছু কিছু জায়গায় সামান্য সিনেমাটিকভাবে ঘটনা দেখানো হয়েছে। কিছু অংশে অবাস্তবতাও আছে। যদিও সেটার পেছনের উপযুক্ত যুক্তিও দেওয়া আছে, তবুও। তাই যারা সিনেমাটিক ঘটনা পছন্দ করেন না বা উপন্যাসে সবসময় A-Z বাস্তবতা খোঁজেন তারা এটা পড়বেন না। তাদের ভালো লাগবে না।]
#বর্ষণের_সেই_রাতে ❤
#লেখিকা: অনিমা
#পর্ব- ২
.
আমি একটা বড়সর ঢোক গিললাম। উনি একটু একটু করে এগিয়ে আসছেন আমার দিকে, আর আমি নিজের অজান্তেই পিছিয়ে যাচ্ছি। পেছাতে পেছাতে দেয়ালে লেগে গেলাম। মনে মনে প্রচুর ভয় হচ্ছে। শুনেছি এইসব সেলিব্রিটিদের ক্যারেকটার একেবারেই খারাপ হয়। যদি সত্যিই উল্টোপাল্টা কিছু করে? কেউ তো আমার কথা বিশ্বাস ও করবেনা যে দ্যা রকস্টার এডি আমার বাড়িতে এসে আমার সাথে এসব করেছেন। এমন কী কারণ থাকতে পারে ওনার এখানে আসার? এসব ভাবতে ভাবতে উনি একদম আমার কাছে এসে দেয়ালে হাত রাখল। ভয়ে আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে আমার। উনি একটু ঝুকতেই আমি খিচে চোখ বন্ধ করে নিলাম। লোকটার নিশ্বাস আমার মুখে পড়তেই আমি নিজেকে আরো গুটিয়ে নিলাম। হৃদস্পন্দন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। হঠাৎ করেই ফিক করে হেসে দেবার শব্দ পেলাম। আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি হাসছেন উনি। উনি হাসতে হাসতে খাটে গিয়ে বসলেন। আমি ভ্রু কুচকে তাকালাম ওনার দিকে। উনি হাসি থামিয়ে বলল
--- সরি! সরি! আই ওয়াজ জাস্ট কিডিং। বাট আপনিতো ভয়ে পুরো জমে গেছেন।
বলেই আবারো হেসে দিলেন। আমি চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে। এরকম মজার কোনো মানে হয়? আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসি থামিয়ে বললেন
--- আচ্ছা সরি বললাম তো! মজা টা একটু বেশি হয়ে গেছে বুঝতে পারছি।
আমি এবার হাত দুটো ভাজ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে বললাম
--- রকস্টার এডির এখানে এসে টপকানোর কারণটা কী?
এটা শুনে আদ্রিয়ান এক ভ্রু উচু করে তাকালো আমার দিকে। তারপর বাকা হেসে বলল
--- আরেহ বাহ। ভয়েজ টোনে এতো পরিবর্তন? একটু আগে তো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারছিলেন না। কেনো বলতে গিয়ে ক তেই আটকে যাচ্ছিলেন। কী এমন হলো যে ভয়েজে এতো জোর?
--- ভোকাল কর্ডের চার্জ শেষ হয়ে গেছিলো রিচার্জ করে নিয়েছি, এখানে কেনো এসছেন সেটা আগে বলুন।
আদ্রিয়ান একটা মেকি হাসি দিয়ে বলল
--- খিদে পেয়েছে।
আমি ভ্রু কুচকে তাকালাম ওনার দিকে। ইয়ারকি পেয়েছে নাকি? মানে কী এসবের? বিরক্তিকর কন্ঠে বললাম
--- আপনি আমার ফ্লাটে খেতে এসছেন?
--- হ্যা বাড়িতে আজ খাবার ছিলোনা তাই আরকি।
বলেই মিটমিটিয়ে হাসতে লাগল। আমি কিছু না বলে মুখ ফুলিয়ে খাটে গিয়ে বসে ওনার দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। ওনার সব ইন্টারভিউ তে দেখেছি যে উনি ভীষণ মজার মানুষ। রিপোর্টারদের সাথেও বেশ মজা করে। পাবলিক ইনফরমেশন অনুযায়ী উনি যতটা ফানি, মাঝে মাঝে ততোটাই এগ্রেসিভ। বেশ কয়েকটা ইন্টারভিউতে ক্যামেরার সামনেই রিপোর্টারের ওপর রেগে যেতে দেখা গেছে তাকে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করার জন্যে। বাট পার্সোনালিও যে উনি ঠিক একইরকম সেটা বেশ বুঝতে পারছি। কিন্তু এই মুহূর্তে এতো কৌতুহল আর উত্তেজনার মধ্যে ওনার এই রসিকতা আমার বেশ বিরক্ত লাগছে। আমার এই হতাশ দৃষ্টি দেখে উনি হাসি মুখেই বললেন
--- ওকে ফাইন। বলছি সব। বাট তার আগে আপনার সেল ফোনটা দিন তো একটু আমাকে।
--- কেনো আমারটা দিয়ে কী কাজ? আপনার টা নেই নাকি?
উনি এবার রাগান্বিত কন্ঠে বললেন
--- আপনার কী মনে হয়? আমার ফোন আমার সাথে থাকলে আমি এখানে অন্ধকারে বসে বসে মশা মারতাম এতোক্ষণ?
আমি এবার বিরক্তির চরম পর্যায়ে গিয়ে বললাম।
--- আপনার কী মনে হয়? আমার সেলফোনে চার্জ থাকলে আমি একটা অপরিচিত লোককে রুমে দেখে ফোন করে লোক জরো না করে ওখানে ঠ্যাটার মতো দাড়িয়ে থাকতাম? চার্জ নেই ফোনে।
উনি বেডের ওপর একটা ঘুষি মেরে বললেন
--- সিট! এখনতো কারেন্ট ও নেই।
--- আমার ফোনে না হয় চার্জ নেই। আপনার ফোনটা কী হাওয়া খেতে গেছে?
উনি রেগে তাকালো আমার দিকে। আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম। তাই হালকা গলা ঝেড়ে ওনার থেকে একটু দূরে সরে বসলাম। দুজনেই কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করার পর আমিই বললাম
--- বললেন না তো কী এমন হলো যে এতোবড় একজন সেলিব্রিটি, যার সাথে একটা সেলফি তোলার জন্যে ফ্যানসরা হুমরি খেয়ে পরে সে একটা সাধারণ মেয়ের ফ্লাটে চোরের মতো ঢুকলো?
আদ্রিয়ান অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল
--- হোয়াট আমি চোর?
আমিও অবাক হওয়ার ভান করে বললাম
--- সেটা কখন বললাম?
--- দেন হোয়াট ডু ইউ মিন বাই চোরের মতো ঢুকলেন?
--- নাহ মানে আপনি যেভাবে ঢুকেছেন পুরো চোরের মতোই লাগছিলো আরকি।
বলেই মিটমিটিয়ে হাসছি। উনি এবার চোখ ছোট ছোট করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
--- তাই না?
আমি হাসি থামিয়ে সিরিয়াস মুখ করে বললাম
--- হুম তাই তো!
উনি রাগান্বিত হয়ে আমার দিকে একটু ঝুকতেই আমি মাথাটা একটু পিছিয়ে নিলাম, উনি শান্ত কন্ঠে বললেন
--- কী যেনো বলছিলেন? কীসের মতো লেগেছে আমাকে?
আমিও একটা ঢোক গিলে বললাম
--- অব্ আমিতো মজা করছিলাম, আপনি এতো সিরিয়াসি কেনো নিচ্ছেন? আপনাকে একটুও চোরের লাগছিলো না বিশ্বাস করুন আপনাকে ড্ ডা হ্যা ডাকাতের মতো লাগছিলো।
--- হোয়াট?
নিজেই চমকে গেলাম। কী সব বলছি? দিলামতো আগুনে ঘি ঢেলে। আমার এই এক সমস্যা ভয় পেয়ে গেলে কি বলি না বলি নিজেই বুঝতে পারিনা। উনি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, সেটা দেখে আমি একটু মেকি হেসে বললাম
--- ন্ না মানে আপনাকে আপনাকেতো হ্যা মনে পড়েছে, আপনাকে পুরো..
কিন্তু কথাটা শেষ করার আগেই উনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন
--- থাক। আপনাকে আর কিছু মনে করতে হবেনা। চোর ডাকাত অবধি হজম করে নিয়েছি, এরপর কিছু হজম করতে গেলে বদহজম হয়ে যাবে ম্যাডাম।
এটুকু বলেই সোজা হয়ে বসলেন। আর সাথে আমি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে নিজেকে ঠিকঠাক করে নিলাম। উনি এবার ভ্রু কুচকে নিজের ঘরির দিকে তাকালো। সেটা দেখে আমিও টেবিল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি 11.30 বাজে। আমি একটু ইতোস্তত করে বললাম
--- আপনি কিন্তু এখোনো বললেন না এখানে কেনো এসছেন?
উনি হালকা হেসে বললেন
--- আরেহ বলছি বলছি এতো অধৈর্য কেনো আপনি?
আমি একবস্তা বিরক্তি নিয়ে তাকালাম লোকটার দিকে। আমার এখন প্রচুর রাগ লাগছে এরকম সাসপেন্স ক্রিয়েট করার কোনো মানে হয়? উনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে দিলেন। আমি ভ্রু কুচকে তাকালাম ওনার দিকে। উনি হাসি থামিয়ে বললেন
- আচ্ছা বলছি, রেগে যাচ্ছেন কেনো? আসলে দুপুরে একটা কাজ ছিলো সেটা সারতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়, কাজটা সারার পর লংড্রাইভ এ যেতে ইচ্ছে করছিলো। এটা আমার অভ্যাস, স্ট্রেস দূর করতে মাঝে মাঝেই লং ড্রাইভে বেড়িয়ে যাই। আর সেটাও কমপ্লিটলি একা এবং নিড়িবিলি। তাই ড্রাইভার গার্ডস সবাইকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেই ড্রাইভ করছিলাম। প্রায় ঘন্টা তিন ড্রাইভ করার পর এখানকার একটা রোডে এসে পৌছাই। কারণ এলাকাটা নিড়িবিলি ভালো লেগেছে আমার। আর তখনি খেয়াল করি যে কিছু লোক ফলো করছে আমাকে, কারণ অনেকক্ষণ ধরেই তাদের আমার পেছনে আসতে দেখছিলাম।
আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল ব্যাপারটা তাই গালে হাত দিয়ে বললাম
--- তারপর?
--- তারপর আমি গাড়িটা সাইডে রেখে আমার ম্যানেজারকে কল দিতে যাবো তার আগেই আমার গাড়ির কাচ ভেদ করে একটা গুলি আসে। আমি ঝুকে গেছিলাম তাই গুলিটা একটুর জন্যে আমার মাথায় লাগেনি। আমার হাত থেকে ফোনটা পরে যায়, আর তারপর চার্জ শেষ হয়েছে না কী হয়েছে জানিনা ফোনটাও আর অন হয়নি।
--- এরপরে কী করলেন?
--- যেহেতু ফোনটা অন হচ্ছিলো না। আর আমি কম্প্লিটলি একাই বেড়িয়েছি তাই আমি গাড়ি স্টার্ট করে বিভিন্ন ভাবে গাড়ি চালিয়ে ওদেরকে ডিসট্রাক করি, তার
ওপর এই বৃষ্টি। আমি ওদের কে একটু পিছে ফেলে ওদের আড়াল হয়ে গাড়ি থেকেই নেমে যাই কারণ ওদের কাছে গান ছিলো, আর গাড়ির সংখ্যা দেখে বুঝলাম লোক ও অনেক ছিলো, তাই আমি একা নিজেকে সেভ করতে পারতাম না। তাই ওখানে গাড়িটা রেখেই ওখান থেকে বেশ অনেকটা দূরে চলে যাই। এসবের মধ্যে ফোনটা আনতেই ভুলে গেছি, ফোনটা বন্ধ ছিলো তাই এনেও আহামরি কোনো লাভ লাভ হতোনা। কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না আর না কাউকে ডাকতে, সো এইরকম বৃষ্টি তারপর ওরা যেকোনো সময় এসে যাবে, রাস্তায় থাকা রিস্কি হয়ে যেতো। তাই কারো বাড়িতে আশ্রয় নিতেই হতো।
--- বাট আপনি ঢুকলেন কীকরে ভেতরে?
--- ব্যালকনি দিয়ে।
--- হোয়াট?
--- হুম। বাইরের আলোতে যেটুকু দেখেছি তাতে এই ফ্লাটেরই ব্যালকনির দরজা খোলা ছিলো। তাই এই ফ্লাটেই উঠলাম।
--- আমি ব্যালকনির দরজা খোলা রেখে গেছিলাম?
--- আমিও সেটাই ভাবছিলাম। যখন ভেতরে ঢুকে বাড়িটা ফাকা পেলাম। যে এতোটা ইরেস্পন্সিবল কেউ কীকরে হয়। এখন আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি কীকরে হয়। বুঝতে পারছি কীকরে হয়।
আমি ওনার দিকে তাকিয়ে একটু মুখ ভেংচি দিলাম। উনি হেসে দিলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি বললাম
--- কিন্তু আপনাকে কারা মারতে চায়? আর কেনো?
--- মারতে তো অনেকেই চায়, আর কারণেরও অভাব নেই। কিন্তু এট্যাক টা কারা করেছে সেটা কালকের মধ্যেই জানতে পারবো, একবার বেরোই। এগুলো খুব ক্রিটিকাল ব্যাপার তুমি এসব বুঝবেনা।
ওনার শেষ কথাটায় হালকা হাসলাম তবে সেটা ওনার দৃষ্টির আড়ালে।
--- সো এইজন্যেই আজ এখানে থাকতে হবে আমাকে। আর আপনি আমাকে চোর ডাকাত কী সব বানিয়ে দিলেন।
বলেই উনি হেসে দিলেন আর আমিও হেসে দিলাম। উনি হাসি মুখেই বললেন
--- আপনি আমার বেশ ছোট দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আর এমনিও আমি বেশিক্ষণ কাউকে আপনি বলতে পারিনা। সো অামি তোমাকে তুমি করেই বলছি। ওকেহ?
--- আপনি পারমিশন চাইলেন নাকি জানিয়ে দিলেন?
--- যেটা মনে করো।
আমি মুচকি হাসলাম।
--- কারেন্ট কখন আসবে?
আমি শব্দ করে হেসে দিয়ে বললাম
--- আজ কারেন্টের কথা ভূলে যান। সকালের আগে আসবেনা।
--- ড্যাম!
আমি হেসে দিলাম। বাইরে এখোনো অবিরাম ধারায় বৃষ্টি পরে চলেছে। সেইসাথে চারপাশটা আরো সিগ্ধ লাগছে। বাতাসে কেপে কেপে ওঠা মোমের হলদে আলোয় আড় চোখে দেখছি ওনাকে। উনি খাটে দুইহাটু গুটিয়ে হাটুর ওপর দুই হাত রেখে বসে আছে। কিন্তু উনি অাড়চোখে না সরাসরিই তাকিয়ে আছে আমার দিকে একদৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। সেটা দেখে আমি ভ্রু নাচালাম। এতে ওনার ধ্যান ভাঙলো বোধ হয়। উনি মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন। তারপর সামনে তাকিয়ে বললেন
--- ভয় ছিলাম এখানে ঢোকার সময় কার না কার বাড়িতে গিয়ে পরি আমাদের তিল কে তাল বানিয়ে প্রচার করতে তো মিডিয়া দুবার ভাবেনা। এই জার্নালিস্টরাও না, এদের খালি মাসলাদার খবর তৈরী করতে হবে যাতে বেশি ইনকাম হয়। কিন্তু ওনাদের এসব ভূলভাল খবরের জন্যে যে আমরা যে বিপদে পরি সেটা তাদের দেখার বিষয় না।
--- সব জার্নালিস্ট কিন্তু এক না? আই মিন সবাই টাকার জন্যে এসব করে না, কেউ কেউ প্যাশন হিসেবেও নেয় পেশাটাকে।
--- হয়তো। কিন্তু আমি এখোনো এমন কাউকে পাইনি। ইমোশন বোঝেনা যা খুশি প্রশ্ন করে দেয়। আরে ভাই আমরাও তো মানুষ নাকি? যতোগুলো জার্নালিস্ট দেখেছি আমার ক্যারিয়ারে সেই মোতাবেক আই জাস্ট হেইট দেম।
আমি এবারেও মুচকি হাসলাম। হঠাৎ উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
- খিদে পেয়েছে। খাওয়ার কিছু আছে নাকি? আসলে দুপুরে বেরিয়েছি এখোনো পেটে কিছু পরেনি, বাড়ি ফিরবো তার আগেই এই ঘটনা।
আমি বেশ অবাক হলাম, আদ্রিয়ান আবরার জুহায়ের আমার ফ্লাটে এসে আমার কাছে ডিনার করতে চাইছে? সিরিয়াসলি? এই দিনটাও দেখার ছিলো আমার? কিন্তু ওনাকে কীকরে বলবো যে আমিতো ম্যাক্সিমাম রাত কফি আর বিস্কুট খেয়েই কাটিয়ে দেই। এতো রাত করে ফিরে রান্না করার এনার্জি থাকে না। ব্রেকফাস্ট ও নুডুলস বা পাস্তা করে খেয়ে নি। লান্চটা সবসময় বাইরেই করি। তাই ঘরে রান্না করার মতো নডুলস, পাস্তা ছাড়া কিছুই নেই। কিন্তু ওনাকে এসব কীকরে দেবো? তাই একটু ইতোস্তত করে তাকালাম ওনার দিকে। উনি আমার তাকানো দেখে কী বুঝলেন জানিনা শুধু মুচকি হেসে বললেন
--- খেতে চেয়েছি বলে পোলাও বিরিয়ানী আনতে হবে তার কোনো মানে নেই। জাস্ট খেয়ে পানি খাওয়ার মতো কিছু দিলেই হবে।
আমি মুখ ছোট করে ওনার দিকে তাকিয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বললাম
--- লডুলস, পাস্তা আর বিস্কুট ছাড়া কিছুই নেই।
উনি এবারেও হেসে দিয়ে বললেন
--- আর কী চাই? নুডুলস রান্না করে নিয়ে এসো তাতেই হবে।
--- ওকেহ
বলে উঠতে নিলেই উনি বললেন
--- কফি আছে তো?
আমি হেসে দিয়ে বললাম
--- হ্যা সেটা আছে ওটাও করছি ওয়েট।
উত্তরে উনি শুধু মুচকি হাসলেন। আমি গুটিগুটি পায়ে কিচেনে ঢুকে গিয়ে দাড়ালাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাড়িয়ে থেকে আমি মুচকি হেসে পেছন ঝুকে উকি দিয়ে দেখলাম উনি আসছে নাকি। কিন্তু যখন দেখলাম আসছে না তখনি খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম। এতোক্ষণ বহু কষ্টে নিজের ইমোশনটা চেপে রেখেছিলাম
--- ইইইইই। আই কান্ট বিলিভ। আমার আদ্রিয়ান আমার ফ্লাটে এসছে? আমার সাথে আজ রাত থাকবে? আমার ক্রাশ? আমার জান? যাকে নিয়ে শুধু কল্পনাই করতাম। সে আজ এই বর্ষণের রাতে আমার কাছে আছে? ওর সাথে কথা বলেছি আমি? ওর জন্যে ডিনার বানাচ্ছি? ওয়াও! আমি জাস্ট ভাবতে পারছিনা।
■■■■■■■■■■■■■■#বর্ষণের সেই রাতে ❤
#লেখিকা: অনিমা কোতয়াল
#পর্ব- 3+4
.
এসব বলেই এলোপাথাড়ি নাচতে শুরু করলাম। পাগলের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে নাচছি। যেনো হাতে চাদ পেয়েছি। আশেপাশে কোনোকিছুর খেয়াল নেই আমার, নাচতে নাচতে পেছন ঘুরে আমি পুরো চমকে গেলাম, নাচ অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেলো আমার। কারণ আদ্রিয়ান হাত ভাজ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। শুনে ফেলল না তো কিছু? যদি শুনে থাকে যে উনি আমার ক্রাশ, আর ওনাকে আমি এতো পছন্দ করি, তাহলেতো ভাব একশগুন বেড়ে যাবে। বহুত কষ্টে নিজের ইমোশনকে চেপে রেখে একটা ইমেজ ক্রিয়েট করেছি সেটা নষ্ট হয়ে যাবে?
--- বাহ। ডান্সটাতো খুব ভালো করো তুমি।
ওনার কন্ঠস্বর শুনে আমার ধ্যান ভাঙলো। তাকিয়ে দেখি আদ্রিয়ান ডানহাত থুতনিতে রেখে মুচকি মুচকি হাসছে। ও কতোটা শুনেছেন বা কতোটা দেখেছেন সেটাইতো জানিনা। তাই ইতোস্তত করে বললাম
--- না মানে আমি আসলে..
আদ্রিয়ান ওনার জিন্সের পকেটে হাত ঢুকিয়ে আমার সামনে এসে দাড়িয়ে বললেন
--- নাচছিলে ভালো কথা। কিন্তু কিচেনে ঢুকে এমন কী হলো যে ঘর কাপিয়ে নাচতে শুরু করলে?
আমি মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম যাক কিছু শুনতে পায় নি। নিজেকে সামলে কপালের সামনের চুলগুলো কানে গুজতে গুজতে বললাম
--- না মানে...
--- না, মানে, আসলে এইগুলো শুনে নিয়েছি। এরপরতো কিছু বলো?
আমি কিছু একটা ভেবে, নিজেকে সামলে ওনার দিকে বিরক্তিকর চাহনী দিয়ে বললাম
--- আমার ফ্লাট, আমার কিচেন আমি যা খুশি তাই করবো। নাচবো,লাফাবো,গাইবো, আপনাকে তার কৈফিয়ত কেনো দেবো?
আদ্রিয়ান মুচকি হেসে মাথা দুলিয়ে বলল
--- কারেক্ট আছে। তুমি নাচতে নাচতে ফ্লোর ভেঙ্গে ফেলো ইস মে মেরা কুছ নেহি যাতা। যেটা বলতে এসছিলাম। নুডুলসে ঝালটা একটু বেশি করে দিও।
এটুকু বলে যেতে নিয়েও আবার পেছনে ফিরে মুচকি হেসে বললেন
--- আর হ্যা নাচার জন্যে সারারাত পরে আছে। আপাদত আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে তাই খাবারটা আগে আনলে ধন্য হতাম আরকি।
এটা বলে উনি সিটি বাজাতে বাজাতে চলে গেলেন। আর আমি অাহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছি ওনার যাওয়ার দিকে। এমন বিহেভ করছে যেনো আমি ওনার খুব পরিচিত কেউ। একটা অপরিচিত মেয়ের ফ্লাটে এসেছে, তাও এভাবে হুট করে সঙ্কোচ তো অনেক দূরের কথা এ তো এমন বিহেভ করছে যাতে ও আমার ফ্যামেলি মেমবার হুহ। বাট যাই হোক আজ রাতটা ও এখানে থাকবে এটাই আমার কাছে অনেক। এসব ভেবে গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে নুডুলস রান্না শুরু করলাম। রান্নার ফাকে ফাকে উকি দিয়ে ওনাকে দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। নুডুলস রান্না কম্প্লিট করে দুটো প্লেটে সার্ভ করে নিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি সাহেব খাটের এক কোণে আসাম করে বসে চারপাশ দেখছে। আমাকে দেখেই উনি একটা হাসি দিলেন, উত্তরে আমিও একটা হাসি দিলাম। আমি প্লেটটা ওনার দিকে বাড়িয়ে দিতেই উনি প্লেটটা হতে নিয়ে বললেন?
--- ওয়াও? স্মেলটাই এতো ভালো আসছে। খেতে না জানি কতো ভালো হবে।
আমি হেসে দিয়ে বললাম
--- টেষ্ট করে দেখুন।
উনি হেসে খানিকটা খেয়ে বললেন
--- হুমমম। টু গুড।
--- খারাপ হলেও কী বলবেন নাকি?
--- নাহ সত্যি ভালো হয়েছে, তুমি টেস্ট করে দেখো।
ওনায় কথায় হেসে দিয়ে নিজের প্লেট থেকে খেতে শুরু করলাম। আমার কাছে বিশেষ কোনো টেষ্ট লাগেনি কারণ রোজকার স্বাদ এটা। উনি খেতে খেতেই বললেন
--- তুমি এই ফ্লাটে একাই থাকো?
--- হুমম। আমি শুনেছি আপনিও নাকি আলাদা থাকেন?
--- হ্যা।
--- কারণ?
উনি একটু অন্যরকমভাবে তাকালেন আমার দিকে। তারপর প্লেটটা নামিয়ে রেখে বলল
--- বাহবাহ এতো ইন্টারেস্ট?
আমি হকচকিয়ে গিয়ে বললাম
--- নাহ মানে আমি এমনিই জিজ্ঞেস করলাম পারসোনাল ইসু হলে বলতে হবে না।
উনি হেসে দিয়ে বললেন
--- ওতোটাও পার্সোনাল না যে তোমাকে বলা যাবেনা।
আমি ভ্রু কুচকে তাকালাম উনি মুখে হাসি রেখেই বললেন
--- আই মিন একটা রাত তোমার হেল্প নিয়েছি। সো এটুকু বলতেই পারি তোমাকে।
--- ওহ।
--- তবে আগে খেয়ে নি? তারপর কফি খেতে খেতে বলবো ওকে?
--- হুমম।
উনি একমনে খাচ্ছেন আর আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে আর খাচ্ছি। সত্যিই আমরা মনে করি মিডিয়া জগতের এসব লোকেদের লাইফস্টাইল কতোইনা ভিন্ন। তবে তাদের ওই চাকচিক্যপূর্ণ জীবণযাপনের মধ্যেও কিছু ছোট ছোট সাধারণ বৈশিষ্ঠ্য থাকে যেটা ক্যামেরায় ধরা পরেনা। ওনাদের এই অসাধরণ সত্তার মধ্যেই কোথাও না কোথাও একটা অতি সাধারণ সত্তাও লুকিয়ে থাকে যেটা শুধুমাত্র ওনার সংস্পর্শে আসা মানুষগুলোই বুঝতে পারে। সেটা আজ ওনাকে দেখে বেশ বুঝতে পারছি। হঠাৎ উনি খাওয়া ছেড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
--- হ্যালো মিস? ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আগে ওটা খাও। তারপর আমায় নিয়ে গবেষণা করো।
ওনার কথায় ধ্যান ভাঙলো আমার। আমি তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে খাওয়ায় মন দিলাম ভেতরে ভেতরে লজ্জা পেলেও সেটা বাইরে প্রকাশ করিনি। উনিও হালকা হেসে খাওয়ায় মন দিলেন। নুডুলস খাওয়ার পর বললেন
--- ক্যান্ডেলটা শেষ হয়ে যাচ্ছে আরেকটা জ্বালাবো?
আমি ভ্রু কুচকে মুচকি হেসে বললাম
--- যে ফ্লাটে ঢোকার আগে পারমিশন নেয়নি সে মোম জ্বালাতে পারমিশন চাইছে?
--- পিঞ্চ মারছো?
--- যেটা মনে করেন।
আদ্রিয়ান হেসে দিয়ে বললেন
--- বাহ আমার ডায়লগ আমাকেই শোনাচ্ছো?
আমি ভ্রু কুচকে বললাম
--- ডায়লগের ওপর কী নাম লেখা ছিলো?
--- নাহ তা ছিলোনা।
--- দেন?
--- ওকে ফাইন.. ইউ ওউন আই লুজ। এবার কী ক্যান্ডেল জ্বালাতে পারি ম্যাডাম ?
--- আমিই জ্বালাচ্ছি আপনি বসুন।
--- না তুমি বরং কফিটা করে আনো আমি ক্যান্ডেল জ্বালাচ্ছি।
আমি মুচকি হেসে টেবিল লাইট নিয়ে চলে গেলাম কিচেনে কফি করতে। কফি করে নিয়ে গিয়ে দেখি উনি রুমে নেই। বুঝলাম ব্যালকনিতে আছে। বৃষ্টি এখন আর তেমন নেই, হালকা ছিটে ছিটে ফোটা পরছে। তবে আকাশটা পরিষ্কার না। খানিক পরে আবারো ঝরঝর করে বৃষ্টি পরবে বোঝাই যাচ্ছে। চারপাশে একরকম নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। তবে তার মধ্যে তাই ব্যালকনিতে গিয়ে দেখি উনি নিচে বসে আছেন। আমি অবাক হয়ে বললাম
--- নিচে বসে আছেন কেনো?
উনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন
--- নিচেই ভালোলাগছে। এই ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশ হালকা বৃষ্টির ছিটে।
আমি কিছু না বলে কফি মগটা ওনার দিকে এগিয়ে দিলাম। উনি মুখে সেই কিউট হাসিটা রেখেই মগটা হাতে নিয়ে আরেক হাতে ওনার পাশে ইশারা করে বললেন
--- বসো।
আমি বেশ অবাক হলাম ওনার কথায় ইতোস্তত করে বললাম
--- আমি বসবো? আপনার পাশে?
উনি ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
--- সমস্যা হবে তোমার ?
--- নাহ তা না কিন্তু...
উনি আমার হাত ধরে বসিয়ে দিলেন ওনার ঠিক পাশে। আমি বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে। আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে উনি মুচকি হেসে বললেন
--- তুমি বাস জার্নি করেছো?
আমি হেসে দিয়ে বললাম
--- আমাদের মতো মানুষদের কাছে একটু দূরের জার্নি মানেই বাস জার্নি।
--- তার মানে অনেকের পাশে বসে জার্নি করেছো?
--- হ্যা তাতো করেছি।
আদ্রিয়ান এবার আমার দিকে হালকা ঘুরে বলল
--- তাহলে আমি কী দোষ করলাম ম্যাডাম?
--- ওটা আলাদা ব্যাপার। বাসে যাদের পাশে বসি তাড়াতো আমাদেরই ক্লাসের মানুষ। আর আপনিতো...
আদ্রিয়ান এবার শব্দ করেই হেসে দিলো। ওর হাসি দেখে আমি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলাম। এমন মনে হচ্ছে যেনো মিরাক্কেলে অপূর্ব রয় জোক বলছে। আজব? আমি কিছু বলবো তার আগেই আদ্রিয়ান হাসি থামিয়ে বললেন
--- মানুষের আবার ক্লাস? আচ্ছা সেটা কোথায় লেখা আছে?
আমি বুঝতে পারলাম উনি কী মিন করতে চাইছেন তাই মুচকি হেসে বললাম
--- ব্যাংক ব্যালেন্সে, বড় বড় গাড়িতে, বিশাল বাংলোতে, ফেমে আরো অনেক কিছুতে।
আদ্রিয়ান মুচকি হসে কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন
--- হুমমম। কিন্তু সেই ক্লাস সেট কে করেছে?
--- আমরা মানে মানুষেরা।
--- এক্সাক্টলি। সব তো আমাদের মধ্যেই তাইনা? যদি তুমি নিজেই পারফরমার হও আর নিজেই জজ হও তাহলে জাজমেন্ট কী কেউ মেনে নেবে?
--- উমহুম।
---- তাহলে তোমরা কেনো মানো? দেখো ব্যাংক ব্যালেন্স, গাড়ি, বাড়ি, ফেম এগুলো দিয়ে একটা মানুষ কতোটা ধনী বা কতোটা সাকসেসফুল সেটা বলা যায় কিন্তু কোনো মানুষের ক্লাস শুধুমাত্র তার পারসোনালিটি আর ক্যারেক্টার এর ওপর ডিপেন্ট করে। আমি গান করে টাকা ইনকাম করি, আমার গান সকলের ভালোলাগে তাই সবাই আমাকে ভালোবাসে, আর তাই গানের ওফার বেশি আসে আর টাকাও। কিন্তু এতে শুধুমাত্র আমার সফলতা প্রকাশ পাচ্ছে আমি কোন লেভেলের মানুষ সেটা না। মানুষের ক্লাস শুধুমাত্র মানবিকতা দিয়েই বিচার করা যায় টাকা দিয়ে নয়।
আমি এতোক্ষণ ওর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম তারপর কফিতে চুমুক দিয়ে বললাম
--- কিন্তু সেটা মানে কজন?
--- রাজা যদি নিজেই নিজেকে রাজা না মানে তাহলে অন্যকেউ কেনো মানবে?
ওর কথার মানে বুঝতে পারলাম। সত্যিই ঠিকিতো বলেছে। আমরা নিজেরাই যদি নিজেদের মিডেলক্লাস ভাবি তাহলে বাকিদের কী দোষ? তবে আদ্রিয়ানের চিন্তাধারা খুব ভালো লাগলো। পুরো মন ছুয়ে গেছে ওর কথাগুলো। সত্যিই সেলিব্রিটি মানেই যে খারাপ, মুডি, অহংকারী হবে তা নয়। তার প্রমাণ আজ আদ্রিয়ানকে দেখেই পেলাম। যদিও বিভিন্ন ইন্টারভিউ তে দেখেছি ওর পজিটিভিটি কিন্তু সেগুলো শো অফ মনে হয়েছিলো আমার। এসব ভেবেই ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। একটুপর কিছু একটা ভেবে ওকে বললাম
--- বললেন না তো ফুল ফ্যামিলি থাকতেও আপনি কেনো একা থাকেন?
উনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে সামনের দিকে তাকিয়ে কফি মগে চুমুক দিয়ে বললেন
--- প্রবলেমটা হলো ড্যাড। উনি কোনোদিনি এসব গান মিডিয়া জগৎ পছন্দ করতেন না। তার ইচ্ছে আমি তার কম্পানির দায়িত্ব নেই। কিন্তু আমি কোনোকালেই এইসব পছন্দ করতাম না। এসব বিজনেস ক্লাইন্ট এগুলো আমার মাথায় ঢুকতোই না। ছোট বেলা থেকেই গানের প্রতি একটা আসক্তি ছিলো আর সময়ের সাথে সেই আসক্তি আরো তীব্রতর হয়েছে। স্কুল কলেজের বিভিন্ন ফাংশনে গান গাইতাম। তবে আমার এই খাপছাড়া ভাবটাই ড্যাডের সহ্য হচ্ছিলো না। কলেজের এক ফাংশনেই এক মিউসিক ডিরেক্টরের আমার গলা ভালো লাগে আর সেখান থেকেই এই জগতে জার্নি শুরু। ড্যাডের যদিও পছন্দ ছিলোনা কিন্তু কিছু বলেনি। কিন্তু পড়াশোনা শেষ হবার পরেও যখন ওনার কম্পানির দায়িত্ব নিতে চাইনি তখন আমার ওপর প্রেশার ক্রিয়েট করা শুরু করলেন। কিন্তু আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না তখন একপ্রকার জোর করা শুরু করল। মমও ড্যাডের মুখের ওপর কিছু বলতে পারছিলোনা। একদিন এই নিয়ে ড্যাডের সাথে তর্ক হয় আর সেই তর্কাতর্কির মধ্যেই ড্যাড আমার গায়ে হাত তোলে। যেটা আমি মানতে পারছিলাম না তাই সেইদিন সেইমুহূর্তেই চলে এসছিলাম ঐ বাড়ি থেকে।
এতোক্ষণ চুপচাপ শুনছিলাম ওর কথা। ওর কথা শেষ হতেই আমি বললাম
--- হ্যা কিন্তু আপনি আপনার বাবার একমাত্র ছেলে। উনিতো এটাই চাইবে যে ওনার কম্পানির দায়িত্ব আপনি নিন?
আদ্রিয়ান সামনের দিকে তাকিয়েই বলল
--- আই নো বাট বাবা হিসেবে ওনার আমার স্বপ্নটাকেও গুরত্ব দেওয়া উচিত ছিলো তাইনা? যদি উনি বলতেন যে আমি গান করে সময় পেলে অফিসে বসতে পারি তাহলে আমি রাজি হয়ে যেতাম। কিন্তু উনিতো আমাকে আমার গানটাই ছাড়তে বলছিলেন।
আমি কিছু না বলে কফির মগে চুমুক দিলাম। বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় হঠাৎ করে আলোকিত হওয়া আকাশটা দেখছি আর মেঘের হালকা শব্দে গুরুম গরুম আওয়াজ শুনছি। ভেতরটা ভার ভার লাগছে খুব। বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত বিষাদ গ্রাস করছে। খুব মনে পরছে আব্বুর কথা। কী অবাক করা ব্যাপার তাইনা। কারো স্বপ্ন পূরণের জন্যে তার বাবাই বাধা হয়ে দাড়ায়। আর কেউ নিজের বাবার দেখা সপ্নকেই আকড়ে ধরে এখোনো শ্বাস নিচ্ছে। সত্যিই জীবণটা খুব অদ্ভুত। এখানে যেমন আলাদা আলাদা মানুষ আছে, সেই সাথে তাদের আলাদা আলাদা সমস্যা, কষ্ট, যন্ত্রণা আছে। কারো কিছু থাকার যন্ত্রণা কারো কিছু না থাকার যন্ত্রণা। কিছু আছে বলে কেউ কষ্ট পাচ্ছে, আবার কিছু হারিয়ে ফেলেছে বলে অন্যকেউ কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু ব্যাস্ততম এই শহরে আমরা সবাই শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যাস্ত। কারো দুঃখে একটু আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাস দেওয়ার সময় থাকলেও পাশে থেকে সান্তনা দেবার মতো সময়ের বড্ড অভাব আমাদের। হঠাৎ করে অাদ্রিয়ান আমার সামনে তুরি বাজিয়ে বললেন
--- কী ভাবছো?
ওনার ডাকে ধ্যান ভাঙলো। নিজেকে সামলে বললাম
--- অবব্ কিছু না।
--- অামার সম্পর্কেতো অনেক কিছু জানো। আর অনেকটা এখন জানলে বাট তোমার সম্পর্কে কিছু জানা হলো না। এতক্ষণ হয়ে গেলো নামটা পর্যন্ত জানা হয়নি।
--- অনিমা। অনিমা কোতয়াল।
--- ওয়াও কিউট নেইম। বাই দা ওয়ে এতো লেইট করে ফিরলে? দেখে মনে হলো অফিস থেকে এসছো? কী করো তুমি? আই মিন প্রফেশন কী?
এ যদি এখন আমার প্রফেশন জানে, না জানি হার্টএট্যাক করে বসে। বলবো? কিন্তু মিথ্যে বলাটাও তো ঠিক হবেনা। তবে আমার জব জানলে এ সিউর কয়েকশ ভোল্টের ঝটকা খাবে। ভূল ভাববে না তো আমায়? এটা মনে করবেনা তো আমি নিজের স্বার্থে ওকে এখানে থাকতে দিয়েছি? এতো ভালো ব্যবহার করছি শুধুমাত্র নিজেরই ফায়দার জন্যে? চলে যাবেনা তো এখান থেকে? বাট যা খুশিই হোক আমি মিথ্যে বলতে পারবোনা। এসব ভাবতে ভাবতেই উনি আবার আমার সামনে তুরি বাজিয়ে বললেন
--- এই যে ম্যাডাম? কোথায় হারিয়ে যান বলুনতো?
--- নাহ মানেহ।
উনি মুচকি হেসে বললেন
--- কীসে জব করো তুমি?
আমি চুপ করে আছি। সেটা দেখে উনি ভ্রু কুচকে ফেললেন তারপর বললেন
--- হোয়াট হ্যাপেন? বলো?
আমি এবার সাহস জুগিয়ে বলেই ফেললাম
--- আমি একজন জার্নালিস্ট।
বেচারা সবে কফিতে চুমুক দিয়েছিলো। এটা শুনে সাথে সাথে বিষম খেয়ে গেলো। কাশতে কাশতেই খারাপ অবস্হা আমি ধরতে গিয়েও থেমে গেলাম। উনি নিজেকে সামলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
--- সিরিয়াসলি?
আমি হ্যা বোধক মাথা নাড়তেই, উনি ফ্লোরে একটা পাঞ্চ করে হতাশ দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে বললেন
--- একেই বলে আকাশ থেকে পরে খেজুর গাছে আটকে যাওয়া।
#চলবে...
.
( গল্পটা কেমন লাগছে অবশ্যই জানাবেন। আর কমেন্টে যত নাইস নেক্সট দেখি লাইফে এতো চকলেটস ও খাইনি ভাই।😑 নাইস নেক্সট এসব কমেন্ট না করে গল্পের বিষয়বস্তু সম্পর্কিত কমেন্ট করুন, যাতে নিজেকে ইমপ্রুভ করতে পারি। ধন্যবাদ)
#বর্ষণের_সেই_রাতে ❤
#লেখিকা: #অনিমা_কোতয়াল
#পর্ব- ৪
.
--- একেই বলে আকাশ থেকে পরে খেজুর গাছে আটকে যাওয়া।
ওনার এই কথাটা শুনে আমার বড্ড হাসি পাচ্ছে। কিন্তু এই মুহুর্তে হাসাটা একদমি ঠিক হবেনা। কারণ আমার ক্রাশের রিয়াকশনটা যখন এরকম হতাশ হতাশ তখন আমার রিয়াকশনে হাসি থাকাটা মোটেই শোভনীয় নয়। তাই নিজের এই হাসিটাকে দাবিয়ে রেখে চেহারায় একটুখানি সিরিয়াস ভাব আনার চেষ্টা করে ওনার দিকে তাকালাম। উনি চুপ করে বসে আছেন, এতোক্ষণ কতো কথা বলছিলেন আর এখন একেবারেই চুপ। কিছুক্ষণ নিরবতার পর আমি কিছু বলবো তার আগেই উনি বলে উঠলেন
--- সো কালকের হেডলাইন কী হবে?
আমি ভ্রু কুচকে তাকালাম ওনার দিকে। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বললেন
--- কী হলো বলো? কালকের হেডলাইন কী হবে? 'দেখে নিন আদ্রিয়ান আবরার জুহায়েরের রাতের চেহারা' 'বর্ষণের রাতে এক মেয়ে জার্নালিস্টের ফ্লাটে রকস্টার আদ্রিয়ান আবরার জুহায়ের ' নাকি অন্য কিছু?
আমি এখোনো ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছি আদ্রিয়ানের দিকে। আজব! আমি একজন জার্নালিস্ট ব্যাস এটুকু শুনেই যা খুশি বলে যাচ্ছে? আমার কোনো কথা শোনার কোনো দরকারই মনে করছেনা? ডিসগাসটিং। খুব রাগ লাগছে। ইচ্ছে করছে আচ্ছা মতো কয়েকটা শুনিয়ে দেই। কিন্তু পরে মাথাটা ঠান্ডা করে ভাবলাম যে ওদের সাথে রিগুলারলি যা হয় স্পেশিয়াশি ওর সাথে তাতে ওর এই মুহূর্তে জার্নালিস্ট দেখলে এভাবে রিয়াক্ট করাটাই স্বাভাবিক। তাই মাথা গরম না করে ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করতে হবে। আমাকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে উনি একটু জোরেই বললেন
--- কী হলো বলো? হেডলাইন কী দেবে? মানে কী লিখলে তোমাদের খবরটা বেশি বিক্রি হবে?
কথাটা আমার গায়ে লাগলো। কারণ এই প্রফেশনটা আমার জন্যে কী সেটা আমিই জানি। কিন্তু ওনার দিক দিয়েও উনি ঠিক তাই সেটাকে গুরত্ব না দিয়ে আমি ওনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম
--- 'খাদ্যসংকোটে অবশেষে এক জার্নালিস্টের ফ্লাটে নৈশভোজের আশায় গ্রেট রকস্টার আদ্রিয়ান আবরার জুহায়ের'
এটা শুনে উনি ভ্রু কুচকে তাকালেন আমার দিকে। আমি একটা মেকি হাসি দিয়ে বললাম
--- এই হেডলাইনটা কিন্তু দাড়ুন হবে তাইনা? বেশ চলবে।
আদ্রিয়ান আমার দিকে অদ্ভুতভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফিক করে হেসে দিলেন আর ওনার হাসি দেখে আমিও হেসে দিলাম। উনি হাসতে হাসতেই বললেন
--- তুমি সবসময় এমন চিল মুডে কীকরে থাকো বলোতো?
--- আপনার মতো শর্ট টেমপার হলে এই প্রফেশনে টিকতে পারতাম না স্যার।
--- আমি শর্ট টেমপার?
--- এনি ডাউট? ম্যাক্সিমাম ইন্টারভিউতে তো আপনি রিপোর্টারদের ওপর রেগে বোম হয়ে যান।
--- তো? তোমরা প্রশ্নগুলোই এমন করো যে মাথা ঠিক রাখাটা মুসকিল হয়ে যায়। প্রশ্ন করার নাম করে এট্যাক করে কথা বলো। দরকারী প্রশ্নের চেয়ে অদরকারী আর অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নই বেশি করো।
আমি একটা ছোট্ট শ্বাস নিয়ে বললাম
--- আচ্ছা কফিটা খেতে খেতে কথা বলি ঠান্ডা হয়ে যাবে।
উনি ভ্রু কুচকে কফির মগে চুমুক দিলেন, বুঝতে পারছি উনি আমার ওপর খুব বিরক্ত হয়ে আছেন। আমিও কিছু না বলে কফির মগে চুমুক দিয়ে বাইরে তাকালাম। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পরা শুরু হয়ে গেছে। হালকা হালকা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সবকিছু একদম শান্ত। আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখি উনি ভ্রু কুচকে কফি খাচ্ছে, আমি বললাম
--- আচ্ছা সব রিপোর্টারই কী একিরকম আজেবাজে প্রশ্ন করে?
আদ্রিয়ান মাথা বাকা করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
--- নাহ ঠিক তা না? কেউ কেউ ভালো এবং কাজের প্রশ্নও করে।
--- তাহলে? সবাইকে ব্লেম করা কী ঠিক হচ্ছে?
উনি ভ্রুটা কিঞ্চিত কুচকে বাইরে তাকিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন
--- জানিনা। কিন্তু তোমাদের আই মিন জার্নালিস্ট দের সহ্য হয়না আমার। এরা পারেনা এমন কোনো কাজ আছে নাকি?
আমি মুচকি হেসে কফির মগটা পাশে রেখে ওনার দিকে তাকিয়ে বললাম
--- হুমম। তো আপনার আর কী কী অভিযোগ আছে আমাদের মানে জার্নালিস্টদের নিয়ে।
উনিও কফির মগটা আওয়াজ করে পাশে রেখে বললেন
--- ইরিটেটিং পিপল। কাজের কাজতো কিছু হয়না এদের দ্বারা সবি অকাজ। একট্রেস স্মৃতির সাথে একদিন একটা রেস্টুরেন্টে দেখা হয়েছে তাই একসাথে লাঞ্চ করেছি। সেটা নিয়ে পরেরদিন হেডলাইন হয়েছে উই আর ডেটিং ইচ আদার। ওয়াও! মানে কিছু বলার নেই।
আমি হেসে দিলাম। উনি বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
--- তুমি হাসছো? হাসবেই তো তুমিওতো সেই দলেরি তাই না?
আমি কোনোরকমি হাসি থামিয়ে বললাম
--- আচ্ছা হাসছিনা এরপর বলুন?
--- এদের কীর্তি বলে শেষ করে যাবেনা। এমনকি টাকার জন্যে কাউকে যেমন উচুতে ওঠাতে পারে ঠিক সেইরকমভাবেই এক ধাক্কায় নিচে ফেলে দিতে পারে। রিডিউকিলাস। সেলিব্রেটিদের মধ্যে কার বাচ্চা কতোবার টয়লেটে যায় সেটাও তাদের প্রচার করতে হবে কিন্তু সত্যিই যেই নিউসটা সবাইকে জানানো দরকার সেটার দিকে তাদের কোনো পাত্তাই নেই?
আমি হাটুর ওপর দুই হাত রেখে বললাম
--- ইউ আর রাইট। কিন্তু একটা কয়েন এর যেমন এপিঠ ওপিঠ আছে তেমনি সবকিছুরই এপিঠ ওপিঠ আছে।
--- মানে?
--- সাত বছর আগের কথা। একজন জার্নালিস্ট একজন মন্ত্রীর এগেইনস্টে খুব স্ট্রং একটা আর্টিকেল তৈরী করছিলো উইথ প্রুভ। কিন্তু ওই মিনিস্টার যখন জানতে পারে ওই জার্নালিস্টের কথা তখন উনি ওই জার্নালিস্টকে টাকার লোভ দেখায়, কিন্তু তাতেও যখন ওই জার্নালিস্ট মানতে চায়নি তখন তাকে হুমকি দিতে শুরু করে। তার একমাত্র মেয়েকে রেইপ করার, তাকে খুন করার আরো বিভিন্ন হুমকি দেয়া শুরু করে, কিন্তু উনি মানেননি। উনি অনেক কষ্টে ওনার মেয়ের সম্মান আর জীবণতো বাচিয়ে নিয়েছিলো কিন্তু নিজেকে বাচাতে পারেননি। প্রাণ দিতে হয়েছিলো তাকে।
এটুকু বলে আমি ওনার দৃষ্টির আড়ালেই নিজের চোখের পানিটা মুছে নিলাম আদ্রিয়ান অবাক হয়ে বলল
--- উনি মারা যাবার পর ওনার মেয়ের কী হয়েছিলো?
--- কারো জন্যে তো জীবণ থেমে থাকে না। তাই ওনার মেয়েও মরে যায়নি শ্বাস নিচ্ছে এখোনো।
আদ্রিয়ান কিছু না বলে চুপ করে রইলো। পরিবেশটা আবারো নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। শুধু বৃষ্টির হালকা হালকা ফোটার আওয়াজ আর মেঘের হালকা গর্জন শোনা যাচ্ছে। বেশ অনেকক্ষণ পর আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললাম
--- এখোনো মনে হয় সব জার্নালিস্ট এক?
--- সেটা কখনোই মনে হয়নি আমার তবে ম্যাক্সিমাম তো একই তাইনা?
--- হ্যা সেটা ঠিক। আর আমি জানি আপনি আমার বিশ্বাস করে উঠতে পারছেননা। তবে আপনি একরাত বিপদে পরে আমার ফ্লাটে হেল্পের জন্যে এসছেন। এটাকে নিউস করার মতো বিশেষ কিছু আমার মনে হচ্ছেনা। আর আমি ওতোটাও চিপ রিপোর্টার না যে এসব বিষয় নিয়ে নিউস বানাবো। আপনি আমার হিস্ট্রি চেক করে দেখতে পারেন। আমি ঐ লেভের রিপোর্টার নই।
আদ্রিয়ান ইতোস্তত করে বলল
--- অব্ আমি আসলে...
--- আমার কাছে এটা শুধুমাত্র একটা প্রফেশন নয় আদ্রিয়ান, আমার জীবণের বিরাট একটা অংশ আমার বেচে থাকার একমাত্র ভিত্তি বলতে পারেন।
আদ্রিয়ান আমার হাতটা ধরে ওর দুই হাতের মধ্যে নিয়ে নিলো। আমি ওর দিকে অবাক হয়ে তাকালাম, ও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
--- আই এম সরি। আমার ওভাবে বলাটা ঠিক হয়নি। হঠাৎ করেই যখন জানলাম যে তুমি একজন জার্নালিস্ট তখন
--- ইটস ওকেহ.. আপনার দিক দিয়ে আপনি একদমি ঠিক ছিলেন। সত্যি বলতে আজকাল বেশিরভাগ জার্নালিস্ট তো এটাই করে তাইনা?
--- হুম বাট তবুও...
--- বাদ দিন তো এসব। মগটা দিন সিনে রেখে আসি।
--- হুম।
এরপর সিনে মগদুটো রেখে, চোখে মুখে পানির ছিটে দিয়ে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করলাম। অন্যের সামনে কেদে আর নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করতে চাইনা। এরপর মুখটা মুছে গিয়ে ওনার পাশে বসলাম উনি মুচকি হেসে সামনে তাকিয়েই বললেন
--- তো আজকালকার দিনে একা একটা ফ্লাটে থাকার কারণ?
--- কেউ না থাকলে তো একাই থাকতে হয় তাইনা?
আদ্রিয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল
--- তোমার বাবা মা?
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বললাম
-- মা জন্মের পরেই মারা গেছেন আর বাবা ও কয়েকবছর আগে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন।
--- আ'ম... আ'ম সরি আমি জানতাম না।
আমি ওনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম
--- জানার কথাও না। সো ডোন্ট বি..
--- তোমার আর কোনো রিলেটিভ নেই?
--- বাবা মা না থাকলে দুনিয়াতে আর কেউ থাকেনা। মামুর বাসাতেই ছিলাম চার বছর কিন্তু...
--- কিন্তু?
আমি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললাম
--- বাদ দিন এসব।
--- ওকে। আমি হয়তো একটু বেশিই পার্সোনাল ইসুতে ঢুকে যাচ্ছি।
আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম আর মনে মনে বললাম; আ'ম সরি আদ্রিয়ান। আপনি আমার মাত্র এক রাতের অতিথি। তাই আপনাকে আমার জীবণের ভয়ংকর কালো সত্যগুলো বলতে চাইনা। বলতে চাইনা আপনি যার কাছে একরাতের জন্যে আশ্রয় চেয়েছেন সে নিজেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে নিজেরই খুব কাছের মানুষদের কাছ থেকে। প্রতিটা মুহূর্তে ভয়ে থাকি ধরা পরে যাবার ভয়। এসব ভাবতে ভাবতেই উনি বললেন
--- তোমার বয়ফ্রেন্ড নেই?
আমি ভ্রু কুচকে তাকালাম ওনার দিকে তারপর বললাম
--- সেটা দিয়ে অাপনি কী করবেন?
উনি একটু রাগী গলায় বললেন
--- আছে কী না বলো?
ওনার রাগী কন্ঠে একটু দমে গেলাম, কারণ ওনার রাগের সাথে খানিকটা পরিচিত আমি। তাই নিচু গলায় বললাম
--- না নেই
উনি একটা শ্বাস নিয়ে বললেন
--- যাক।
সেটা শুনে আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবো তার আগেই উনি বললেন
--- বাই দা ওয়ে তুমি রান্নাটা খুব ভালো করো। ভালোই হলো বিয়ের পর আর ওই স্টুপিড সেফদের ডিসগাস্টিং রান্না খেতে হবেনা
আমি বাইরে তাকিয়ে আনমনে বললাম
--- হুমম।
পরক্ষণেই খেয়াল হলো কী বললেন উনি চমকে গিয়ে ভ্রু কুচকে ওনার দিকে তাকিয়ে বললাম
--- বিয়ের পর মানে?
আদ্রিয়ান হকচকিয়ে গিয়ে বলল
--- অব্ ব আই মিন। আমার বিয়ের পর আমার বউ যদি তোমার মতো রান্না জানে তাহলে আরকি।
কথাটা আমার কেমন যেনো লাগল তবুও ছোট করে বললাম
--- ওহ।
উনি কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর আমি বললাম
--- ঘুম পাচ্ছে নিশ্চই। আপনি আমার বেডে শুয়ে পরুন আমি সোফার রুমে চলে যাচ্ছি।
বলে উঠে দাড়াতেই উনি আমার হাত ধরে ফেললেন। আমি একটু না অনেকটা অবাক হয়ে তাকালাম ওনার দিকে। উনার চোখে এক অদ্ভুত চাহনী আর ঠোটে ঝুলে আছে মুচকি এক হাসি। আমার কেমন একটা লাগছে, হার্টবিট দ্রুত গতিতে ছুটছে, নিশ্বাস না চাইতেও ভারী হচ্ছে। এই অনুভূতির কারণ আমার জানা নেই। বাইরে বৃষ্টির গতি হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেলো। যেনো বৃষ্টিও আজ কিছু জানাতে চাইছে। উনি স্লো ভয়েজে বললেন
--- আজ একটা রাত না ঘুমোলে আমার বিশেষ কোনো সমস্যা হবে না? তোমার কী খুব সমস্যা হবে?
#চলবে...
.
দেরীতে দেবার জন্যে সত্যিই দুঃখিত। ভূলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন আর নিজেদের মতামত জানাবেন। ধন্যবাদ😊
■■■■■■■■■■■■■■#বর্ষণের সেই রাতে ❤
#লেখিকা: অনিমা কোতয়াল
#পর্ব- 5 +6+7+8
.
--- আজ একটা রাত না ঘুমোলে আমার বিশেষ কোনো সমস্যা হবে না? তোমার কী খুব সমস্যা হবে?
আমি কিছু না বলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে। সেটা দেখে উনি মুচকি হেসে বললেন
--- কী হলো? বসো?
আমি অবাক হয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে থেকেই ওনার পাশে বসে বললাম
--- ঘুমোবেন না?
--- আজ জেগে থাকি না? সমস্যা কী?
রাত জেগে থাকার অভ্যেস আমার নেই। কিন্তু কেনো জানি ওনাকে না করতে ইচ্ছে করছেনা। তাই চুপ করে রইলাম। উনিও চুপ করেই আছেন। বৃষ্টির বেগ আবারো বৃদ্ধি পেয়েছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে বাজ পরাও শুরু হবে। আর সেই সাথে আমার ভেতরের ভয়টাও বাড়ছে, কারণ বাজ পরা বৃষ্টির রাতগুলো বারবার আমাকে সেই ভয়ংকর অতীতগুলো মনে করিয়ে দেয় কিছুতেই স্বাভাবিক থাকতে পারিনা আমি। অন্যান্য দিন তো সিলিপিং পিল খেয়ে কম্বলে মুরি দিয়ে কাদতে কাদতে ঘুমিয়ে পরি, আজ কী করবো? আদ্রিয়ানের সামনে নিজেকে শক্ত কীকরে রাখব? চুপচাপ বসে এগুলোই ভাবছিলাম। দীর্ঘসময়ের নিরবতা ভেঙ্গে আদ্রিয়ান বললেন
--- জানো বৃষ্টির দিনগুলো আমার খুব পছন্দের। বাইরে পরতে থাকা বৃষ্টি দেখতে দেখতে ধোয়া ওঠানো কফির মগে চুমুক দেওয়া। আবার বৃষ্টি দেখতে দেখতে গিটার বাজানোটাও আমার খুব পছন্দের কাজ। এনিওয়ে তোমার বৃষ্টি ভালোলাগে?
আমি এতোক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওনার কথা শুনে আকাশের দিকে তাকিয়েই মুচকি হেসে বললাম
--- একসময় খুব ভালোলাগতো। কিন্তু এখন ভয় লাগে, তবে আগের মতো ওতোটা ভয় না পেলেও ভয়টা পুরোপুরি কাটাতে পারিনি।
আদ্রিয়ান ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
--- বৃষ্টিকে ভয় পাও? স্ট্রেন্জ!
আমি ওনার দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বললাম
--- আই নো।
--- বাট বৃষ্টি কে ভয় পায়? ভয় পাওয়ার মতো কী আছে।
আমি কথাটা ঘোরানোর জন্যে হালকা হেসে বললাম
--- আচ্ছা বাদ দিন এসব। আর কিছু লাগবে আপনার?
উনি হয়তো বুঝতে পারলেন আমি কথাটা এরিয়ে যেতে চাইছি। তাই কথা না বাড়িয়ে বললেন
--- নাহ আপাদত অার কিছু চাইনা। তুমি আমাকে নিয়ে ব্যাস্ত না হয়ে একটু শান্ত হয়ে বসোতো। লিসেন! আমার আজ ঘুমোতে একদমি ইচ্ছে করছে না আর তুমিও যে আজ ঘুমোতে পারবেনা আমি জানি। কজ একা একটা ফ্লাটে একটা ছেলেকে রেখে ঘুম আসবেনা আনইজি লাগবে তোমার। যেহেতু দুজনেরই ঘুম আসবেনা সো গল্প করে রাতটা পার করে দেই সেটা ভালো হবে না?
--- অাপনি দেখছি অাজ খুব গল্প করার মুডে আছেন?
আদ্রিয়ান এবার আমার দিকে তাকিয়ে বাকা হেসে হালকা ঝুকে বললেন
--- এরকম সুন্দরী একটা মেয়ে পাশে থাকলে তো অনেক কিছুরই মুড হয় তাইনা?
আমি একটু দূরে সরে গিয়ে গলা ঝেরে বসলাম। সেটা দেখে উনি শব্দ করে হেসে দিয়ে বললেন
--- এতো ভীতু কেনো তুমি? তোমার এখনো মনে হচ্ছে আমি তোমার সাথে উল্টোপাল্টা কিছু করবো?
আমি কানের পিঠে চুল গুজতে গুজতে ইতোস্তত করে বললাম
--- নাহ বাট এভাবে বলে কেউ?
উনি ফ্লোরে একহাতের ভর নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললেন
--- তাহলে কীভাবে বলে?
অামি এবার ভ্রু কুচকে বিরক্তি নিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে বললাম
--- লোকে ঠিকি বলে আপনারা সেলিব্রিটিরা সত্যিই অসভ্য।
--- তাই?
--- এনি ডাউট?
উনি এবার একটা বাকা হাসি দিলেন। তারপর ওনার এক হাত আমার উপর দিয়ে নিয়ে ফ্লোরে রেখে আমার দিকে বেশ অনেকটা ঝুকে গেলো। আমি একটা ঢোক গিলে কাপাকাপা গলায় বললাম
--- ক্ কী করছেন?
--- ভেবেতো ছিলাম কিছু করবোনা। কিন্তু কিছু না করে অসভ্য হবার চেয়ে কিছু করে অসভ্য হওয়াটা বেটার না?
বলেই মুখটা আরেকটু এগিয়ে আনতেই আমার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। উনি কিছুই করবেনা সেটা জানি আমি কিন্তু ওনার এতো কাছে আসাতে তো আমার অবস্হা খারাপ হচ্ছে, কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে একটা মেকি হাসি দিয়ে বললাম
--- এই দেখুন অাপনি আবার আমার কথাগুলোকে সিরিয়াসলি নিয়ে নিচ্ছেন আমি তো মজা করছিলাম।
আদ্রিয়ান মুচকি হেসে সরে গেলো। আমিও সোজা হয়ে বসে একটা শান্তির নিশ্বাস নিলাম আরেকটু হলেই দম অাটকে যেতো আমার বাপরে বাপ। আমি হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে ওনার দিকে তাকালাম। উনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। সেটা দেখে আমি ভ্রু কুচকে বললাম
--- হোয়াট?
--- ইউ নো তুমি...
এটুকু বলতে না বলতেই প্রচন্ড জোরে চারপাশ কাপিয়ে বজ্রপাত হলো। অামি সাথে সাথেই দুই হাতে কান চেপে ধরে চোখ খিচে বন্ধ করে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম
--- আব্বু...
চোখ খিচে বন্ধ করে কানে হাত দিয়ে কাপছি আমি। চোখ বন্ধ রাখা অবস্হাতেই বুঝতে পারলাম আদ্রিয়ান আমার দুই হাতের বাহু ধরে হালকা ঝাকিয়ে বললেন
--- কী হয়েছে? অনিমা? জাস্ট বাজ পরেছে কিছু হয়নি তাকাও? এভরিথিং ইজ নরমাল। তাকাও?
ওনার কথাগুলো আমার কানে গেলেও আমি চোখ খোলার সাহস পাচ্ছিনা। ভয়ে হাত পা কাপছে আমার। বার বার সেই রাতগুলোর কথা মনে পরছে। সারা শরীর অসম্ভবরকম কাপছে। হঠাৎ গালে অাদ্রিয়ানের হাতের ছোয়া পেলাম। ও গাল হাত দিয়ে ঝাকিয়ে বললেন
--- লুক এট মি? কিচ্ছু হয়নি দেখো।
অামি অাস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকালাম ওনার দিকে ওনার চেহারায় চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। আমি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছি। উনি আমাকে একহাতে জরিয়ে নিয়ে বললেন
--- বাজ পরেছিলো কিচ্ছু হয়নি দেখো?
কিন্তু আমার চোখের সামনে শুধু সেই নৃশংস ঘটনাগুলো ভাসছে আর কিছুই না। তাই শুধু বললাম
--- আব্বু আহ্ আব্বু..
আদ্রিয়ান কিছু বলবে তার আগেই আবারো আওয়াজ করে বজ্রপাত হলো আর আমি সামনের ব্যাক্তিটিকে জরিয়ে ধরলাম। এইমুহুর্তে আমি কী করছি না করছি আমার কোনো খেয়াল নেই। এই মুহুর্তে আমার শুধু একটা অবলম্বন চাই যার দ্বারা আমি নিজেকে শান্ত করতে পারবো। উনিও শক্ত করে জরিয়ে ধরলেন আমাকে এই ঠান্ডা পরিবেশেও ঘামে ভিজে যাচ্ছি আমি দম বন্ধ হয়ে আসছে, ধীরে ধীরে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কোনো অতল সাগরে তলিয়ে যাচ্ছি আমি যেখান থেকে চেয়েও বেড়োতে পারছিনা।
।
আস্তে আস্তে চোখ খুললাম মাথাটা বেশ ভারী লাগছে। ভালোভাবে তাকিয়ে মোমের আবছা আলোতে বুঝতে পারলাম রুমের বেডে শুয়ে আছি। ধীরে ধীরে সবটা মনে পরলো। এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম আমি। আমি জানতাম আমি নিজেকে সামলাতে পারবোনা। পাশে তাকিয়ে আদ্রিয়ানকে বসে থাকতে দেখে হুরমুরিয়ে উঠে বসলাম। আদ্রিয়ান শান্ত গলায় বললেন
--- আস্তে এতো তাড়াহুড়োর কিছু হয়নি।
আমার বেশ লজ্জা লাগছে বেচারা আমার বাসায় অতিথি হয়ে এসে আমারি সেবা করছে। তারওপর জরিয়ে ধরেছি আমি ওকে। ও কী ভাবলো? আর আমি ভেতরে কীকরে এলাম? নিশ্চই আদ্রিয়ান এনেছে? ওহ আল্লাহ আমি আসলেই একটা প্যানিক। আমার কাছে যে আসে সেই ঝামেলায় পরে। আমি ওনার দিকে তাকিয়ে ইতোস্তত করে বললাম
--- আ'ম সরি আসলে...
--- ডোন্ট বি সরি। এখন কেমন লাগছে?
--- বেটার।
--- বাট বাজ পরলে এতো ভয় পাও তুমি?
কিছু না বলে মাথা নিচু করে আছি কারণ এই মুহুর্তে কিছু বলার নেই আমার। কী বলবো? এই বাজ পরা বৃষ্টির রাতগুলোই তো আমার জীবণের কাল ছিলো। আমাকে চুপ থাকতে দেখে আদ্রিয়ান বলল
--- ওকেহ ব্যালকনিতে চলো একটু ফ্রেশ লাগবে।
আমি একটু গুটিয়ে বসলাম। তারপর মাথা নাড়লাম। উনি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বললেন
--- বাইরে এখন অার বাজ পরছেনা। সি বিদ্যুৎ ও চমকাচ্ছে না। আমরা গিয়ে বসতে পারি।
ভালোভাবে খেয়াল করে দেখলাম সত্যিই সব থেমে গেছে এখন শুধু গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আছে বাইরে। টেবিল ঘরির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত সাড়ে তিনটে বাজে। আদ্রিয়ান আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন
--- চলো?
আমি আদ্রিয়ানের দিকে খানিক্ষণ তাকিয়ে থেকে ইতোস্তত করে ওনার হাতটা ধরলাম। উনি হাত ধরে ব্যালকনিতে নিয়ে গেলেন। এরপর দুজনেই ফ্লোরে বসলাম। তবে কেউ কোনো কথা বলিনি দুজনেই বেশ অনেক্ষণ নিরব ছিলাম। নিরবতা ভেঙ্গে আমিই বললাম
--- একটু বিরক্ত করে ফেললাম আপনাকে তাইনা?
উনি ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
--- কোন ব্যাপারে?
বুঝতে পারলাম বুঝেও না বোঝার ভান করছেন। তাই মুচকি হেসে বললাম
--- নাহ মানে এতোক্ষণ সেন্সলেস ছিলাম আপনাকে এভাবে টেনশনে ফেলে দিলাম।
--- সে দিক দিয়ে বলতে গেলে তো আমিও তোমাকে বিরক্ত করেছি।
আমি অার কিছু বললাম না আবারো কিছুক্ষণ পরিবেশটা নিরব রইলো। দুজনেই তাকিয়ে বাইরের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি দেখছি। হঠাৎ উনি বললেন
--- তোমার আব্বুকে খুব ভালোবাসো তাইনা?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম
--- আমি যতোটা ভালোবাসি আব্বু আমাকে তার থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসতেন।
--- হুমম অজ্ঞান অবস্হাতেও আব্বু আব্বু করছিলে। বাই দা ওয়ে ওসব কী বলছিলে তুমি?
--- কী বলছিলাম?
--- জানিনা কোনো তালমিল পাচ্ছিলামনা তোমার কথার। তোমাকে কোলে নিয়ে রুমে এনে শুইয়ে দেবার পরেই কীসব বলছিলে। আব্বু বলে চেচাচ্ছিলে, 'প্লিজ ছেড়ে দিন আমাকে, প্লিজ এটা করবেন না' এসব বলছিলে আবার কখনো বলছিলে 'ভাইয়া প্লিজ আমার কাছে এসোনা, যেতে দাও আমায়' এই ভাইয়া কে? আর কী করেছিলো তোমার সাথে?
আমি কিছু না বলে মাথা নিচু করে রইলাম। অতীত গুলো খুব বেশি যন্ত্রণা দেয়। যেখানে নিজের লোকেরাই এমন করতে পারে তখন অন্যের কী দোষ? টাকা আর লোভ মানুষকে দিয়ে কী না করায়? বিশ্বাস করে যাদের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম তাড়াই আমার সাথে..না চাইতেও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরল। সেটা দেখে আদ্রিয়ান আমার কাধে হাত রেখে বললেন
--- আরেহ হোয়াই আর ইউ ক্রাইং? আচ্ছা আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করবোনা চিল।
আমি আর কিছু বললাম না চুপ করে রইলাম। আদ্রিয়ান নিজেই আমার মাথাটা ওর কাধে নিয়ে গেলো। আমি বেশ অবাক হলাম, কিন্তু কিছু বললাম না হয়তো আমাকে কাদতে দেখেই এমন করছে, সান্তনা দিতে। আর আমারও এই মুহুর্তে এরকম একটা কাধের খুব দরকার ছিলো। তাই কিছু চিন্তা না করেই চোখ বন্ধ করে নিলাম।
।
রোদের আলো চোখে পরতেই জেগে গেলাম। চোখে হাত দিয়ে আলতো করে চোখ খুলে দেখি বেডে শুয়ে আছি। সিট! ঘুমিয়ে পরেছিলাম আর এবারেও নিশ্চিত আদ্রিয়ান ই রুমে এনেছে। চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসে দেখি আদ্রিয়ান রুমে কোথাও নেই। তবেকী চলে গেছে ওও? আস্তে করে উঠে ব্যালকনিতে গেলাম। সারারাত বৃষ্টির পর আকাশ একেবারেই পরিস্কার হয়ে গেছে। ভেজা সিগ্ধ সকালের এই নরম রোদের আলোয় চারপাশটা ঝকঝক করছে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বলে উঠল
--- গুড মর্নিং ম্যাডাম।
আমি চমকে পেছনে তাকালাম। আদ্রিয়ান দুই হাতে দুটো কফির মগ নিয়ে দাড়িয়ে আছে। আমিতো অবাকের শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌছেছি। হা করে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে। উনি এসে আমার সামনে দাড়িয়ে বললেন
--- কী হলো হা করে আছো কেনো?
আমি অবাক হয়েই তাকিয়ে থেকে বললাম
--- আপনি কফি বানিয়ে এনেছেন?
--- হ্যা এনি প্রবলেম? ( ভ্রু কুচকে )
--- বাট কীভাবে?
উনি মুচকি হেসে বললেন
--- একটু কষ্ট হয়েছে সব খুজে পেতে বাট পেরেছি। টেষ্ট ইট?
--- কষ্ট করার কী দরকার ছিলো আমায় ডাকতেন?
--- তুমি ঘুমোচ্ছিলে তাই জাগাতে ইচ্ছে করছিলোনা। আর তাছাড়া দুই মগ কফিই তো বানিয়েছি। এ আর এমন কী?
আমি মুচকি হেসে মগটা নিলাম। উনি মুখ ছোট করে বললেন
--- খারাপ হলেও কিন্তু বলবেনা খারাপ হয়েছে ওকে?
আমি হেসে দিলাম ওনার কথায় সাথে উনিও হেসে দিলেন। এরপর দুজনেই রেলিং ধরে দাড়িয়ে কফি খেতে খেতে বাইরের সিগ্ধ পরিবেশটা। যেনো সারারাত কান্না আর গর্জনের পর এখন পরিবেশটা মন খুলে হাসছে। সেই হাসিতে চারপাশ ঝকঝক করছে। কিন্তু মানুষের জীবনটা তো এতো সহজ না। ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম। একটু পরেই কারেন্ট চলে এলো। সেটা দেখে অাদ্রিয়ান বলল
--- থ্যাংক গড। তুমি তোমার ফোনটা একটু চার্জে দাও প্লিজ।
--- হুম। চার্জ হতে হতে আমি ব্রেকফাস্ট করছি।
--- ওকেহ।
আমি ফোন চার্জে দিয়ে কিচেনে চলে গেলাম পাস্তা বানাতে। পাস্তা বানিয়ে নিয়ে এসে দেখি আদ্রিয়ান আমার ফোন ঘাটছে। আমাকে দেখে উনি বললেন
--- সামনের মেইন রোডে আমার ম্যানেজার গাড়ি নিয়ে ওয়েট করবে। ওই পর্যন্ত কীকরে যাবো? কেউ দেখে নিলে তো জেকে ধরবে।
আমি কিছু একটা ভেবে বললাম
--- আমার স্কুটিতে করে আপনাকে ঐ জায়গায় নামিয়ে দিয়ে আমি অফিস যাবো।
--- ওকেহ থ্যাংকস।
এরপর দুজনেই খেতে বসলাম। একটুপর উনি চলে যাবে আর হয়তো এভাবে দেখা হবেনা। মনটা খারাপ লাগছে কিন্তু ওনার মধ্যে মন খারাপের কোনো ছাপ নেই। থাকবেই বা কেনো? থাকার তো কোনো কারণ নেই।
খেয়ে আমি রেডি হয়ে নিলাম আর উনিও টিশার্ট জ্যাকেট পরে নিলেন। এরপর দুজনেই বেড়িয়ে পরলাম। হেলমেট পরে থাকায় ওনাকে কেউ চিনতে পারেনি। স্কুটি করে ওনাকে ওনার গাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে নিজেও নামলাম। উনি বললেন
--- বাই।
আমিও মুচকি হেসে বললাম
--- বাই
উনি চলে যেতে নিয়েও পেছনে ফিরে বললেন
--- ধরো আবার যদি কখনো বিপদে পরি আর তোমার হেল্পের দরকার হয়? সো?
আমি বুঝতে পারলাম উনি কী চাইছেন আমি একটু অবাক হলেও আমার কার্ডটা নিয়ে ওনাকে দিলাম। উনি সেটা নিয়ে মুচকি হেসে গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি স্টার্ট করতেই উনি হাত নাড়লেন আর আমিও হাত নেড়ে বিদায় দিলাম ওনাকে।
যতোক্ষণ গাড়িটা দেখা গেছে তাকিয়ে ছিলাম আমি। জানিনা আর দেখা হবে কী না। আকষ্মিক ভাবেই একটা গোটা একরাত একসাথে ছিলাম বর্ষণের সেই রাতে। যেই রাতটা আমার কাছে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। নিজের একা জীবণে একরাতের জন্যে হলেও একজন সঙ্গী পেয়েছিলাম। কিন্তু উনি কী মনে রাখবেন আমাকে? হয়তো হ্যা আবার হয়তো না। হয়তো অনেক মানুষের ভীরে আমি পরে থাকবো ওনার স্মৃতির কোনো এক তুচ্ছ কোণে।
#চলবে...
( গল্পটা এই পার্টেই শেষ করবো ভেবেছিলাম। কিন্তু অধিকাংশে পাঠক পাঠিকা রাই অনিমার অতীত বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। অনেকে অাদ্রিয়ান অনিমার প্রেম ও দেখতে চেয়েছেন। তাই শেষ করলাম না। আপনারা চাইলেই পার্ট বাড়াবো নয়তো শেষ করে দেবো।তাই মতামত জানাবেন। ধন্যবাদ।)
#বর্ষণের সেই রাতে ❤
#লেখিকা: অনিমা কোতয়াল
#পর্ব: ৬
.
আমি বুঝতে পারলাম উনি কী চাইছেন আমি একটু অবাক হলেও আমার কার্ডটা নিয়ে ওনাকে দিলাম। উনি সেটা নিয়ে মুচকি হেসে গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি স্টার্ট করতেই উনি হাত নাড়লেন আর আমিও হাত নেড়ে বিদায় দিলাম ওনাকে।
যতোক্ষণ গাড়িটা দেখা গেছে তাকিয়ে ছিলাম আমি। জানিনা আর দেখা হবে কী না। আকষ্মিক ভাবেই একটা গোটা একরাত একসাথে ছিলাম বর্ষণের সেই রাতে। যেই রাতটা আমার কাছে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। নিজের একা জীবণে একরাতের জন্যে হলেও একজন সঙ্গী পেয়েছিলাম। কিন্তু উনি কী মনে রাখবেন আমাকে? হয়তো হ্যা আবার হয়তো না। হয়তো অনেক মানুষের ভীরে আমি পরে থাকবো ওনার স্মৃতির কোনো এক তুচ্ছ কোণে। গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। আমার মতো কারো জীবণে কেউ চিরস্হায়ীভাবে আসবে এটা ভাবাও বোকামী। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে স্কুটিতে উঠে স্টার্ট দিয়ে চলে গেলাম অফিসে।
।
অফিসে গিয়ে গলায় আইডি কার্ড পরতে পরতে তাকিয়ে দেখি বান্দর আর বান্দরনী বসে আছে। মানে আমার দুজন বেস্ট ফ্রেন্ড অরুমিতা আর তীব্র। নিজের বলতে এরা দুজনই আছে আমার। ওরা না থাকলে হয়তো আমি বেচেই থাকতে পারতাম না। তবে সবসময় বিভিন্ন কথা বলে আমাকে ইরিটেড করার জন্যে উঠে পরে লাগে। আমি গিয়ে বসতেই ডান পাশের ডেস্ক অরু বলল
--- কী ব্যাপার ম্যাডাম? আজ একটু লেট করলেন যে?
আমি কম্পিউটার অন করতে করতে মুচকি হাসি দিলাম কিন্তু কিছু বললাম না। সেটা দেখে পেছনের ডেস্ট থেকে চেয়ার ঘুরিয়ে তীব্র বলল
--- মৌসম বহোত সুহানি সি লাগ রাহি হ্যা? ব্যাপার কী?
আমি এবারেও কিছু না তীব্রর দিকে তাকিয়ে হাসির রেখাটা বড় করে আবারও কম্পিউটারে চোখ দিলাম। সেটা দেখে দুজনেই ভ্রু কুচকে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। দুজনেই আহাম্মকের মতো বসে আছে। আর আমি মিটমিটিয়ে হাসছি। আমি ইচ্ছ করেই ওদের কনফিউসড করছি। কারণ আমার মতে বন্ধুদেরকে কনফিউসড করে ইরিটেড করায় যে মজা আছে সেটা অন্য কিছুতে নেই। বন্ধুদের জ্বালানোর পর তাদের ওই কাচুমাচু মুখটা দেখলে কেমন যেনো শান্তি শান্তি লাগে। ওরা দুজনেই ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে আর আমি একমনে কম্পিউটারে কাজ করছি। অরু এবার বিরক্ত হয়ে বলল
--- ওই তুই কিছু বলবি? এভাবে হাসছিস কেনো?
তীব্রও এবার বিরক্ত হয়ে বললেন
--- আরেহ ইয়ার কিছুতো বল? এভাবে হাসছিস কেনো? হয়েছেটা কী।
আমি কম্পিউটারে চোখ রেখেই মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে বললাম
--- হয়েছেতো অনেক কিছুই।
অরু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
--- অনেক কিছু মানে? কী কী হয়েছে?
আমি এবারেও চুপ করে মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে কম্পিউটারে কাজ করতে লাগলাম। হঠাৎ তীব্র কিছু একটা ভেবে ঝট করে চেয়ার থেকে উঠে এসে আমার কপালে গলায় হাত দিয়ে বলল
--- ওই কাল রাতেও তো বাজ পরেছিলো তুই ঠিক আছিস তো?
এটা শুনে অরু তাড়তাড়ি উঠে দাড়িয়ে বলল
--- ওহ সিট আমিতো ভুলেই গেছিলাম।
আমি এবার মুখটা সিরিয়াস করে একবার অরুর দিকে আরেকবার তীব্রর দিকে তাকালাম তারপর ভ্রু কুচকে বললাম
--- তোরা জানিসনা আমি কাজের সময় কোনো কথা বলিনা। যা বলার লাঞ্চ টাইমে বলবো এখন চুপচাপ কাজ কর।
অরু উত্তেজিত কন্ঠে বলল
--- প্লিজ ইয়ার এখন বলনা নইলে মনের ভেতর কেমন ধুকপুক ধুকপুক করবে।
আমি ওর দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললাম
--- তুই আর তোর ওই ধুকপুক। ইরিটেটিং ইয়ার।
তীব্র অরুর দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
--- ওকে তেল দিয়ে তেল খরচ করার চেয়ে কারখানায় দান করে দিয়ে আসা ভালো। ও যখন একবার বলেছে যে লাঞ্চ চাইমে বলবে তখন তখনি বলবে।
এরপর দুজনেই ছোট্ট করে একটা নিশ্বাস নিয়ে ডেস্কে বসে কাজে লেগে পরলো। আমি মুচকি মুচকি হাসছি আর আড়চোখে ওদেরকে দেখছি। আমি চাইলেই ওদের এখনি বলতে পারতাম কিন্তু ওদেরকে টেনশনে রাখতে কেনো জানিনা ভীষণ মজা লাগে। দুজনেই যে এখন কী হয়েছে সেটা শোনার জন্যে ছটফট ছটফট করছে সেটা বেশ বুঝতে পারছি। আর ওদের এই ছটফটানিতে আমি এক অসাধরণ তৃপ্তি পাচ্ছি। অরু বাকা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
--- হাসছে দেখ যেনো এভারেস্ট জয় করেছে।
তীব্র পেছন ঘুরে বলল
--- হাসতে দে হাসতে দে আমাদেরও দিন আসবে।
আমি মনিটরে চোখ রেখেই মুচকি হাসতে হাসতে বললাম
--- হ্যা সেই তোর দিন তো আসবেই। হিন্দিতে একটা প্রবাদ আছে না? "হার কুত্তেকা দিন আতা হ্যা"।
তীব্র ভ্রু কুচকে বলল
--- ওই কী বললি আমি কুকুর?
আমি অবাক হওয়ার ভান করে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম
--- আমি কখন বললাম? তুই তো নিজেই বললি তুই কুকুর।
--- তোকে আমি...
আমি এবার বিরক্ত হয়ে বললাম
--- এই তোরা দুজনে চুপচাপ কাজ করতো, বললাম তো লান্চ টাইমে বলব। বসের ঝাড়ি খাওয়ার আগে কাজে মন দে।
ওরা দুজনেই একসাথে 'হুহ' বলে নিজেদের ডেস্কে কাজ করতে বসে গেলো। আমিও একটা মুচকি হাসি দিলাম। কিন্তু কাজে কিছুতেই পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারছিনা বারবার শুধু কালকে রাতের কথাগুলো মনে পরছে। আদ্রিয়ানের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত। সব কেনো জানিনা চোখের সামনে ভাসছে। এতোদিন শুধু যাকে টিভিতে দেখেছি আর কন্ঠ শুনেছি, আমার সেই ফার্স্ট এন্ড এভার ক্রাশের সাথে এতোটা সময় কাটাবো সেটা কখনো সপ্নেও ভাবিনি। সত্যিই আমাদের মানুষদের জীবণটা খুব অদ্ভুত আচমকাই আমাদের জীবণে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যায় যা আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারিনা।
।
ক্যান্টিনে বসে বসে আমি মনের সুখে খেয়ে চলেছি আর ওরা দুজন ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। দুজনেই ভীষণ বিরক্ত আমার ওপর কারণ ওরা অনেক্ষণ ধরেই জানতে চাইছে কী হয়েছে কিন্তু আমি এটা ওটা বলে কথা ঘুরিয়ে ওদের এরিয়ে যাচ্ছি। তীব্র দাত কটমট করে বলল
--- তুই কী বলবি?
আমি মুখের খাবার চিবোতে চিবোতে ভ্রু কুচকে বললাম
--- দেখছিস না খাচ্ছি? বলতে বলতে যদি লান্চ টাইম ওভার হয়ে যায় তখন? আগে খেতে দে তো শান্তিতে।
অরু এবার বিরক্ত হয়ে বলল
- থাক মেরি মা। তোকে কিচ্ছু বলতে হবেনা তুই খা। জন্মের খাওয়া খা।
আমি এবার শব্দ করে হেসে দিলাম ওদের কথা শুনে। ওরা ভ্রু কুচকে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। আমার এবার একটু মায়া হলো ওদের চেহারা দেখে, ভাবলাম নাহ বেচারাদের আর জালানো ঠিক হবেনা তাই কোনো রকমে হাসি থামিয়ে বললাম
--- আচ্ছা বলছি বলছি রাগছিস কেনো?
দুজনে একসাথেই বিরক্ত হয়ে বলল
--- প্লিজ বলেন?
আমি নিচের দিকে তাকিয়ে চামচ দিয়ে খাবার নারতে নারতে বললাম
--- কাল রাতে আমার ফ্লাটে আদ্রিয়ান এসছিলো।
তীব্র ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
--- কোন আদ্রিয়ান? তোর কোনো রিলেটিভ?
আমি মাথা তুলে ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম
--- সিংগার আদ্রিয়ান আবরার জুহায়ের।
ওরা দুজনেই একসাথে বলল
--- ওহ আচ্ছা।
পরক্ষণেই দুজনে চমকে গিয়ে চেচিয়ে বলল
--- কীহ?
আমি চামচ রেখে কানে হাত দিয়ে বললাম
--- আরে আস্তে আস্তে কানের পর্দা ছিড়ে যাবেতো আমার।
অরু অবাক হয়ে বলল
--- এ.ডি তোর ফ্লাটে এসেছিলো?
তীব্র ভ্রু কুচকে বলল
--- তুই মজা করছিস তাইনা?
আমি চামচ থেকে খাবার টা খেতে খেতে বললাম
--- তোদের অামাকে দেখে মনে হচ্ছে আমি মজা করছি?
ওরা অবাক হয়েই তাকিয়ে আছে আমার দিকে কারণ ওরা জানে আমি মিথ্যে বলবোনা আর এই ব্যাপারে মজাও করবোনা। তাই ওরা বুঝতে পারছে আদ্রিয়ান সত্যিই এসছিলো। ওদের দুজনকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমি ভ্রু কুচকে ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম
--- মুখ বন্ধ কর মশা ঢুকবে।
ওরা দুজনেই সাথে সাথে মুখ বন্ধ করে ফেলল। তীব্র অবাক হয়ে বলল
--- কিন্তু কেমনে কী?
অরুও তীব্রর সাথে তাল মিলিয়ে বলল
-- সেইতো এটা কীভাবে সম্ভব।
এরপর ওদের কালকে রাতে ঘটনা ফাস্ট টু লাস্ট সব খুলে বললাম। সবটা শুনে ওরা কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলো। তারপর দুজনেই শব্দ করে হেসে দিলো। যেনো এই মুহুর্তে ওদের সামনে বিশাল মজার কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। আমি ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছি। তীব্র কোনোমতে হাসি থামিয়ে বলল
--- দা গ্রেট রকস্টার আদ্রিয়ান আবরার জুহায়েরের ও এরকম?
অরুও তীব্রর কথায় সায় দিয়ে বলল
--- হ্যা ইয়ার ভাবা যায়?
--- কেনো? সেলিব্রেটি বলে কী মানুষ না নাকি?
তীব্র এবার আমাকে একটু পিঞ্চ করে বললো
--- হুমমম। কালকে তোমার মনে লাড্ডু ফুটেছিলো নিশ্চই?
আমি একটা ভেংচি কাটলাম। অরু ঢং করে বলল
--- ইসস ইয়ার কী ভাগ্য তোর। রকস্টার এ.ডি তোকে কফি করে খাইয়েছে! কোলে নিয়েছে আর জরিয়েও ধরেছে ওয়াও?
--- থামবি তুই?
--- কেনো থামবো? আচ্ছা তুই নিজেকে কীকরে সামলেছিলি বলতো? আমি হলেতো অজ্ঞানই হয়ে যেতাম ইয়ার। হাউ ড্যাসিং হি ইজ।
আমি কিছু না বলে ওকে কুনুই দিয়ে খোচা মারলাম আর তীব্র হেসে দিলো। তিনজনে গল্প করতে করতে লাঞ্চ করে ডেস্কে বসে আছি হঠাৎ বসের পি এ সানন্দা দি এসে বলল
--- অনিমা তোমাকে স্যার ডাকছে।
--- ওকে আপনি যান আমি অাসছি।
তীব্র ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলল
--- আবার কার কাছে পাঠাবে তোকে?
অরুও বিরক্ত হয়ে বলল
--- লোকটা শান্তি দেয়না তোকে একটু।
আমি একটা ছোট্ট নিশ্বাস নিয়ে বললাম
--- দেখি কী বলে।
।
বসের ডেস্কে গিয়ে বললাম
--- মে আই কাম ইন স্যার?
--- কাম ইন।
--- স্যার ডেকেছিলেন?
--- হ্যা কাল তোমাকে একজনের ইন্টারভিউ নিতে যেতে হবে।
--- ওকে স্যার বাট কার?
--- মিনিস্টার রঞ্জিত চৌধুরীর একমাত্র ছেলে রিক চৌধুরীর। এবার ইলেকশনে করছেন উনি তাই একটা ইন্টারভিউ নেবো।
নামটা শোনার সাথে সাথেই আমার হাত পা কাপতে শুরু করেছে, ঘাম বেড়োনো শুরু হয়েছে অলরেডি। সেটা দেখে বস বললেন
--- এনি প্রবলেম অনিমা।
আমি কাপাকাপা গলায় বললাম
--- স্যার অ্ আমি ওখানে য্ যেতে পারবোনা।
বস রেগে গিয়ে বললন
--- তোমার কী মনে হয় আমি তোমাকে ওফার করছি? ওর্ডার করছি তোমাকে।
আমি কাদোকাদো গলায় বললাম
--- স্যার প্লিজ আপনি আমাকে যেখানে খুশি পাঠান আমি যাবো কিন্তু ওখানে না। প্লিজ স্যার।
বস এবার নরম গলায় বললেন
--- কী হয়েছে অনিমা? তুমিতো কোনোদিন না করোনা? ইনফ্যাক্ট অনেক রিস্ক নিয়েও কাজ করেছো তুমি। এবার কী হলো?
--- আই নো স্যার বাট আমি ওখানে যেতে পারবোনা, আমি হাত জোর করছি...
--- আরে আরে কী করছো? তুমি আমার মেয়ের মতো, আর এতো হাইপার হবার কী আছে। আচ্ছা তোমাকে যেতে হবেনা তুমি ডেস্কে যাও।
আমি চোখ মুছে ডেস্কে গিয়ে ধপ করে চেয়ারে বসে পরলাম। আমাকে কাদতে দেখে অরু আর তীব্র উঠে দাড়িয়ে বলল
--- কী হয়েছে কাদছিস কেনো?
আমি কিছু না বলে কেদেই যাচ্ছি। সেটা দেখে তীব্র উত্তেজিত হয়ে বলল
--- আরেহ বলবিতো কী হয়েছে বস কিছু বলেছে?
আমি ওদের সবটা বলতেই অরু জরিয়ে ধরলো আমাকে। তীব্র চেয়ারে বসে বলল
--- এটাতো সেই ছেলেটাই না? যে তোকে...
আমি অরুকে জরিয়ে ধরেই কাদতে কাদতে বললাম
-- এভাবে আর কতোদিন পালাবো আমি? মামুর কাছ থেকে পালিয়ে বাচতে পারলেও ওর কাছ থেকে পালাতে পারবোনা। আমি জানি ও আমাকে পাগলের মতো খুজছে আর ওর ক্ষমতা দিয়ে ঠিক পেয়ে যাবে আমাকে। আর ও যদি সত্যিই আমাকে খুজে পায় তো ওর হাতে পরার আগেই শেষ করে ফেলব আমি নিজেকে।
অরু রেগে বলল
--- এক থাপ্পড় মারব তোকে স্টুপিড। কী সব বলছিস?
--- আমি পারবোনা ওভাবে বাচতে। তুই জানিসনা ও কতোটা...
তীব্র এসে আমার সামনে বসে বলল
--- আচ্ছা হয়েছে বাদ দে এসব আজকে অফিস শেষে তিনজন মিলে ফুচকা পার্টি করবো ওকেহ?
এভাবেই ওরা দুজন বিভিন্ন কথা বলে আমাকে শান্ত করল। ওদের সামনে স্বাভাবিক থাকলেও ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
।
রাতে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছি কখনো নিজের সেই ভয়ংকর অতীত মনে পরছে কখনো আদ্রিয়ানকে। ওর পাশে বসে গল্প করা ওকে জরিয়ে ধরা, ওর হটাৎ করেই কাছে এসে যাওয়া সব। কিন্তু ও হয়তো এতোক্ষণে ভূলেও গেছে আমাকে, ভূলে যাওয়াই স্বাভাবিক। মনে রাখার বিশেষ কোনো কারণ নেই। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরলাম। মাঝরাতে হটাৎ ফোন বাজার আওয়াজে ঘুম ভাঙলো। তাকিয়ে দেখি আননোন নাম্বার। এতো রাতে কার মনে পরলো? চোখ ডলতে রিসিভ করে কিছু বলবো তার আগেই ওপর পাশের ব্যক্তির গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে গেলাম আমি। মনে শুধু একটা কথাই এলো এটাও সম্ভব?
#চলবে...
#বর্ষণের সেই রাতে ❤
#লেখিকা: অনিমা কোতয়াল
#পর্ব: ৭
.
রাতে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছি কখনো নিজের সেই ভয়ংকর অতীত মনে পরছে কখনো আদ্রিয়ানকে। ওর পাশে বসে গল্প করা ওকে জরিয়ে ধরা, ওর হটাৎ করেই কাছে এসে যাওয়া সব। কিন্তু ও হয়তো এতোক্ষণে ভূলেও গেছে আমাকে, ভূলে যাওয়াই স্বাভাবিক। মনে রাখার বিশেষ কোনো কারণ নেই। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরলাম। মাঝরাতে হটাৎ ফোন বাজার আওয়াজে ঘুম ভাঙলো। তাকিয়ে দেখি আননোন নাম্বার। এতো রাতে কার মনে পরলো? চোখ ডলতে রিসিভ করে কিছু বলবো তার আগেই ওপর পাশের ব্যক্তির গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে গেলাম আমি। মনে শুধু একটা কথাই এলো এটাও সম্ভব? কারণ রিসিভ করতেই ওপর পাশ থেকে কেউ বলল
--- হ্যালো ম্যাডাম? ডিসটার্ব করলাম?
আমিতো পুরো থ হয়ে আছি। ঘুম উড়ে গেছে। শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠলাম। কারণ গলার স্বর শুনেই খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছি যে এটা আদ্রিয়ান। নিজেও জানিনা কীকরে বুঝলাম কিন্তু কথার ধরণ শুনেই বুঝে গেছি। কিন্তু ও আমাকে ফোন করেছে? টেবিল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তিনটা বেজে গেছে? এতো রাতে ও আমায় কেনো ফোন করল? আবার কোনো বিপদে পরেছে নাকি? এসব ভাবতে ভাবতেই আবারও ওর গলার আওয়াজ পেলাম
--- কী হলো ঘুমিয়ে পরলে নাকি?
আমি বিস্মিত গলায় বললাম
--- আপনি এখন?
--- যাক গলার স্বরটা অন্তত মনে আছে তোমার,আমিতো ভেবেছি আমায় ভূলেই গেছো।
আমি তো ঝটকার ওপর ঝটকা খাচ্ছি কী বলছেন উনি এসব? ওনার কথা শুনেতো মনে হচ্ছেনা উনি কোনো বিপদে পরেছেন তারমানে এমনিই ফোন করেছে আমাকে? কিন্তু কেনো? আমি ইতস্তত গলায় বললাম
--- নাহ মানে আপনি...
--- ফোন করে একটা খবর তো নিতে পারতেন ম্যাডাম?
ওনার কথায় আবারও অবাক হলাম। আমি খোজ নেবো ফোন করে তাও ওনার? তবুও নিচু কন্ঠে বললাম
--- নাম্বার দিয়ে গেছিলেন নাকি যে ফোন করব?
--- কেনো? তুমি চেয়ে নিতে পারতে না?
আমি একহাতের নখ দেখতে দেখতে বললাম
--- নাম্বার চাইলেতো হ্যাংলা ভাবতেন আমাকে।
--- ওহ দ্যাট মিনস তুমিও আমাকে হ্যাংলা ভেবেছিলে?
আমি ভ্রু কুচকে বললাম
--- আমি কেনো আপনাকে হ্যাংলা ভাবতে যাবো?
--- কারণ আমিও তো তোমার কার্ডটা চেয়ে নিয়েছিলাম।
কি বলবো বলবো বুঝতে পারছি না তাই চুপ করে আছি। আদ্রিয়ান নিজেই বললেন
--- ডিসটার্ব করলাম?
--- না তা না কিন্তু...
--- আসলে কাজ সেরে একটু আগে বাড়ি ফিরলাম, ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই তোমার কথা মনে পড়লো। এটাও মনে পরলো যে তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি, তাই কার্ডটা বের করে ফোন করলাম।
আমি মনে মনে একটু হাসলাম। ও শুধু ধন্যবাদ দিতেই ফোন করেছে আমাকে আমিও বোকার মতো কী সব ভাবছিলাম।
--- যদিও অনেক রাত হয়ে গেছে ঘুমিয়ে পরেছিলে নিশ্চই? ডিসটার্বড হওনি তো?
--- নাহ তা হইনি কিন্তু আপনিকি শুধু আমাকে ধন্যবাদ দিতেই ফোন করেছেন?
ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল
--- রাত হয়েছে অনেক ঘুমিয়ে পরো। গুড নাইট।
বলেই ফোনটা কেটে দিলো। আমি একটু অবাক হলাম যা বাবা এভাবে কেটে দেবার কী হলো? শুধু ধন্যবাদ দিতে ফোন করেছিলো দেওয়া হয়ে গেছে তাই হয়তো কেটে দিয়েছে। গুড নাইট টাও বলতে দিলো না। খবিশ! তোর বউ মরবে। ধ্যাত!! কী সব বলছি। আসলেই পাগল হয়ে গেছি আমি। ও যে আমাকে ধন্যবাদ দিতে ফোন করেছে এটাই অনেক। কিন্তু আরেকটু কথা বললে কী হতো? আবার কী কোনোদিন কল করবে ও আমাকে? যা খুশি করুক আমার কী? এসব চিন্তা করেই গাল ফুলিয়ে শুয়ে পরলাম।
।
পরের দিন অফিসের ডেস্কে গিয়ে বসতেই তীব্র বলল
--- কী ব্যাপার মিস হিরোয়িন কাল আবার কোনো স্টার এসছিলো নাকি?
আমি ভ্রু কুচকে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম
--- মানে?
তীব্র কিছু বলবে তার আগেই অরু বললো
--- নাহ মানে পরশু তো এ.ডি এসছিলো কালকে আবার কেউ এসছিলো কিনা সেটাই জিজ্ঞেস করছিলাম আমরা।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম
--- স্টারদের কী খেয়েদেয়ে আর কোনো কাজ নেই যে রোজ রাতে ওয়ান বাই ওয়ান আমার ফ্লাটে আসবে?
তীব্র এবার চেয়ার ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরে বলল
--- বাই দা ওয়ে? এ.ডি তো তোর কার্ড নিয়েছিলো তাইনা ফোনটোন করেছিলো?
এটা শুনে অরুও উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো মানে ওও শুনতে চায়। আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললাম
--- হ্যা কল করেছিলো কাল রাতে।
দুজনেই চমকে তাকালো আমার দিকে। কারণ ওরা এতোটাও আশা করেনি। ওদের আর কী বলবো আমি নিজেও তো ভাবতে পারিনি এমন যে আদ্রিয়ান নিজে আমাকে ফোন করবে। অরু এক্সাইটেড হয়ে বলল
--- এই কী কী বললো?
আমি অরুর দিকে তাকিয়ে মেকি হাসি দিয়ে বললাম
--- বললো যে বিয়ের জন্য মেয়ে খুজে পাচ্ছিনা তোমার কোনো বোন ঠোন বা বান্ধবী থাকলে বলো। আমি তোর কথা বললাম ছবি দেখালাম আর ও রাজী হয়ে গেলো।
অরু বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
--- মিথ্যুক।
আমি সিরিয়াস ভঙ্গিতেই বললাম
--- সত্যিই বলছি এটাই হয়েছে।
অরু হাত ভাজ করে ভ্রু কুচকে বলল
--- এ.ডি বিয়ের জন্যে মেয়ে খুজে পাচ্ছেনা, তোকে মেয়ে খুজতে বলেছে, তুই ছবি দেখিয়েছিস ও রাজীও হয়েছে ? আমার মাথায় কী সিল দেওয়া আছে যে আমি গাধা যা বলবি তাই গিলবো?
আমি অবাক হওয়ার ভান করে বললাম
--- আরে তোর কোথাও ভূল হচ্ছে।
অরু একটু অবাক হয়ে বলল
--- কী ভূল হচ্ছে?
--- আদ্রিয়ান মেয়ে খুজছে ঠিকই কিন্তু ওনার জন্যে না।
এবার তীব্রও কৌতুহলী কন্ঠে বলল
--- তাহলে?
আমি দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে বললাম
--- ওনার ড্রাইভারের জন্যে খুজছে বেচারা নাকি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বউ জুটছেনা কপালে।
অরু সাথে সাথেই মুখটা ছোট করে ফেলল। আমি আর তীব্র মুখ টিপে হাসছি। অরু কিছুক্ষণ বোকার মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল
--- তোরা দুজন এতোক্ষণ আমাকে নিয়ে মজা করছিলি?
এটা শোনার সাথেসাথেই তীব্র আর আমি শব্দ করে হেসে দিলাম। তীব্র হাসতে হাসতেই বলল
--- সেটা তুই এতোক্ষণে বুঝলি?
তীব্র কথাটা শেষ করতেই। আমি আর তীব্র হাসতে হাসতে হাইফাইভ করলাম। আর অরু মুখটা ফুলিয়ে বলল
--- থাক তোরা দুজন একসাথে আমি কথাই বলবোনা তোদের সাথে।
বলেই ডেস্কের দিকে ঘুরে কাজ করতে লাগল। আমি অার তীব্রও মুচকি হেসে কাজে মন দিলাম। কিন্তু অনেকটা সময় পার হয়ে যাবার পরেও যখন অরু কোনো কথা বলছে না। তাই আমি চেয়ার ঘুরিয়ে বললাম
--- এই পেত্নি মৌন ব্রত পালন করছিস নাকি?
কিন্তু ও চুপ করে আছে কোনো কথা বলছেনা। সেটা দেখে তীব্রও ওর দিকে ঘুরে বলল
--- এইযে ড্রামাকুইন মুখে গ্লু লাগিয়ে রেখেছিস?
কিন্তু মহারাণী এবারেও এক্কেবারে চুপ করে অাছে। এবার আমি আর তীব্র দুজনেই দুজনের মুখের দিকে তাকালাম। তীব্র চোখ দিয়ে ইশারা করল আর আমিও ওর ইশারা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে চোখ টিপ মারলাম। এরপর দুজনে একসাথেই ওকে সুরসুরি দিতে লাগলাম। এটা ওর রাগ ভাঙানোর নিঞ্জা টেকনিক, ওর যত রাগই থাক সুরসুরি দিলেই ও খিলখিলিয়ে হেসে দেয় আর ওর রাগও জল হয়ে যায়। আর এবারেও এর ব্যতিক্রম হলো না। কিছুক্ষণ হাসাহাসির পর অরুর অসহায় কন্ঠে বলল
--- প্লিজ বলনা কী বলেছে।
আমি ছোট একটা নিশ্বাস নিয়ে ওদের দুজনের দিকে তাকালাম, দুজনেই শুনতে ইচ্ছুক। এরপর ওদেরকে সবটা বলার পর তীব্র আমার মাথায় একটা চাটা মারল। আমি মাথায় হাত দিয়ে মুখ ফুলিয়ে বললাম
--- মারলি কেনো?
তীব্র ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
--- মারবো না তো কী করব? এতো মাথামোটা কেনোরে তুই?
অরুও বিরক্তিকর কন্ঠে বলল
--- সেই ইয়ার। তোর কী মনে হয় শুধুমাত্র ধন্যবাদ দিতে কেউ রাত তিনটে বাজে ফোন করে?
--- করতেই পারে কাজ ছিলো তাই সারাদিন সময় পায়নি তাই রাতে করেছে? ওর মতো একজন তো আর আমার সাথে প্রেমালাপ করতে ফোন করবেনা।
ওরা দুজনেই আমার দিকে এক হতাশ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ছোট নিশ্বাস ফেলে কাজে মন দিলো আমি কিছুই বুঝলাম না। তাই কিছুক্ষণ ওদের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থেকে নিজের কাজে মন দিলাম।
।
লাঞ্চ টাইমের পর স্যার মিটিং ডাকলেন। মিটিং এর মধ্যে কেউ বারবার কল দিচ্ছে ফোন ভাইবারেট হচ্ছে বারবার। বেশ বিরক্ত লাখছে আমার। মিটিং শেষ হতেই অরু অার তীব্রকে বললাম
--- তোরা ডেস্কে যা কেউ কল করছে বারবার অামি কথা বলে আসছি।
ওরা মাথা নেড়ে চলে গেলো, আমি অফিসের বিরাট ব্যালকনিতে গিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ দিতেই ভ্রু জোরা কুচকে গেলো। কারণ নাম্বারটা আননোন, একটা আননোন নাম্বার থেকে এতোবার কল এলো? আমি নাম্বারটায় ডায়াল করলাম রিং হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই ফোন রিসিভ করল। আমি জিজ্ঞাসু কন্ঠে বললাম
--- হ্যালো?
--- কী ম্যাডাম ব্যস্ত ছিলেন মনে হয়?
আমি চমকে কান থেকে ফোন সরিয়ে নাম্বারটা দেখলাম, তখন ঘুমের মধ্যে রিসিভ করেছিলাম তাই নাম্বারটা খেয়াল ছিলোনা, কিন্তু ধন্যবাদ দেওয়া তো হয়ে গেছে তাহলে আবার কল কেনো করলো? এসব ভেবে আবারো ফোনটা কানে নিয়ে বললাম
--- আপনি?
--- নাম্বারটাও সেভ করোনি? হাউ রুড?
--- নাহ মানে...
--- আচ্ছা ছাড়ো কতোক্ষণ যাবত কল করছি ফোন ধরছিলেনা কেনো?
--- আসলে মিটিং চলছিলো।
--- কীসের মিটিং? নতুন করে আবার কাকে বাস দেবে সেই ব্যাপারে?
--- আপনিও না..
ওপাশ থেকে ওনার হাসির শব্দ পেলাম সেই হাসির শব্দ শুনে আমিও হেসে দিলাম। উনি হাসি থামিয়ে বললেন
--- আচ্ছা যে কারণে কল করলাম। কালকেতো ফ্রাইডে ফ্রি আছো নাকি কোনো কাজ আছে?
আমি একটু অবাক হলাম। হঠাৎ এই প্রশ্ন কেনো? তাই অবাক কন্ঠেই বললাম
--- কেনো বলুনতো?
--- ফ্রি আছো?
--- হ্যা ফ্রি আছি বাট হোয়াই?
--- দেন কালকে মিট করি?
এটা শোনার সাথে সাথেই আমি যেনো ফ্রিজ হয়ে গেলাম। উনি দেখা করতে চাইছেন আমার সাথে? কিন্তু কেনো? আমার সাথে ওনার কী দরকার? আমি নিচু কন্ঠে বললাম
--- কিন্তু কেনো?
--- দেখা করতে যে বিশেষ কোনো কারণ থাকতেই হবে এটা কোথায় লেখা আছে? ওনার কথায় আমি অবাকের ওপর অবাক হচ্ছি উত্তেজনায় ঘাম বেরোচ্ছে আমার। নাকের নিচের ঘামটা মুছে বললাম
--- নাহ কিন্তু...
--- তোমাকে ফোর্স করছিনা। আমি স্টারপ্লেজ কফিশপে তোমার জন্যে অপেক্ষা করবো কাল সকাল দশটায়। তুমি চাইলে তোমার ফ্রেন্ডদেরকেও নিয়ে আসতে পারো আমার সমস্যা নেই। আসবে কী না ইটস আপ টু ইউ।
--- আমি আসলে..
কিন্তু আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে উনি ধীরকন্ঠে বললেন
--- বাই। এন্ড আই উইল ওয়েট পর ইউ।
বলেই আমায় কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিলেন। ছেলেটা এমন কেনো? নিজের কথা শেষ হলেই ফোন রেখে দেয়? ওপর পাশের মানুষটার কথাও তো শুনতে হয় নাকি? আমি কান থেকে ফোন নামিয়ে ঠোট কামড়ে ধরে দাড়িয়ে রইলাম। কী করব এখন? ওকেতো না ও করতে পারলাম না আর না আমি যেতে পারব। আমিতো অফিস আর ফ্লাট ছাড়া কোথাও বেড়োই নাহ। কিন্তু ও যদি সত্যিই ওয়েট করে? এসব ভাবতে ভাবতেই চিন্তিত মুখ নিয়ে ডেস্কে গিয়ে বসলাম। আমার এমন চেহারা দেখে অরু বলল
--- কী রে আবার কী হলো?
সেটা শুনে তীব্রও কম্পিউটার থেকে চোখ সরিয়ে বলল
--- কে ফোন করেছিলো যে তোর চেহারার রং বদলে গেলো?
আমি অসহায় ভাবে ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম
--- আদ্রিয়ান ফোন করেছিলো।
সেটা শুনে দুজনেই চমকে গেলো, যেনো বড়সর ঝটকা খেয়েছে, কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অরু প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে তীব্রকে বলল
--- দেখলি আই টোল্ড ইউ না এ.ডি এর মনে কিছু চলছে?
আমি ভ্রু কুচকে বললাম
--- মানে?
তীব্র আমার চেয়ারটা ওর দিকে ঘুরিয়ে বলল
--- তোকে মানে বুঝতে হবেনা এবার বলতো কী বলল?
--- কালকে মিট করতে চায় আমার সাথে।
অরু খুশি হয়ে বলল
--- ওয়াও ফার্স্ট ডেট...হাউ কিউট।
আমি অরুকে ধমক দিয়ে বললাম
--- তুই থামবি? ফার্স্ট ডেট! আকাশ কুসুম সপ্ন দেখা বন্ধ কর। আমি আছি আমার জ্বালায় আর তোরা...
তীব্র জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
--- সমস্যা কী?
--- আমি যেতে পারবোনা।
সেটা শুনে দুজনেই একসাথে বলল
--- কেনো?
--- তোরা জানিস না কেনো? মামুর আর ভাইয়ার ক্ষমতা থাকলেও এতোটাও নেই যে আমাকে খুজে বের করবে। কিন্তু ও? ও ওর ক্ষমতা দিয়ে পাতাল থেকে হলেও আমাকে খুজে নেবে। তাই আমাকে সাবধান থাকতেই হবে।
অরু এবার আমার কাধে হাত রেখে বলল
--- দেখ অনি এভাবে আর কতোদিন পালাবি তুই? আর তাছাড়া তুই তো জার্নালিস্ট, এমনিতেও তোকে খুজে পেয়ে যাবে। তাহলে এটাকে প্রফেশন কেনো করলি ছেড়ে দে এটা?
আমি ডেস্কে বারি মেরে বললাম
--- সেটাইতো পারবোনা। আমার আব্বুর স্বপ্ন, ত্যাগ সবকিছু মিশে আছে এই প্রফেশনে কীকরে ছাড়বো আমি?
তীব্র আমার মাথায় হাত রেখে বলল
--- এইজন্যেই বলছি এসব ভাবিস না। ঘরে মধ্যে লুকিয়ে কদিন থাকতে পারবি তুই?
অরুও তীব্রর কথায় সায় দিয়ে বলল
--- আর দেখ ছেলেটা ওয়েট করবে তো, না গেলে খারাপ লাগবে ওর।
তীব্র এবার আমার কাধে হাত রেখে বলল
--- আচ্ছা ভয় পাস না। আমরাও যাবো তোর সাথে ওকেহ?
আমি চোখ মুছে একটা শ্বাস নিয়ে বললাম
--- আমি ভেবে দেখছি। বাট আমাকে ফোর্স করিসনা প্লিজ।
অরু আমাকে একহাতে জরিয়ে নিয়ে বলল
--- যদি যাস তো আমাদের জানাস আমরা রেডি হয়ে থাকব ওকে?
তীব্রওু মুচকি হেসে বলল
--- হ্যা এক ঘন্টা আগে জানালেই হবে।
--- হুম।
ওরা দুজনেই একে ওপরের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ডেস্কে চলে গেলো।
।
বাইরে ভীষণ জোরে বৃষ্টি আর বজ্রপাত হচ্ছে। আমাকে টেনে হিচড়ে অন্ধকার একটা রুমে এনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। আমি উঠে দাড়িয়ে দরজার কাছে যাওয়ার আগেই দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলো। আমি দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে চিৎকার করে বললাম
--- মামু প্লিজ দরজাটা খোলো এমন করোনা আমার সাথে, প্লিজ খোলো দরজাটা আমার ভয় লাগছে এখানে। মামি প্লিজ তুমি অন্তত খুলে দাও, প্লিজ। যেতে দাও আমাকে।
কিন্তু কেউ আসছেনা, অন্ধকার রুমে বাইরের বজ্রপাতের প্রতিটা আওয়াজে কেপে উঠছি আমি।
--- প্লিজ খোলো দরজাটা প্লিজ।
ক্লান্ত অস্ফুট স্বরে কথাটা বলে কাদতে কাদতে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে পরলাম আমি। অনেক্ষণ পর হঠাৎ কেউ এসে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো তাকে দেখেই ভয়ে গুটিয়ে বসলাম আমি, লোকটা যতো এগিয়ে আসছে আমি ততোই গুটিয়ে যাচ্ছি, সে আমার সামনে এক হাটু ভেঙ্গে বসে বলল
--- আজ আবার পালাতে চাইছিলে?
আমি মাথা নিচু করে কাদছি। লোকটা আমার চুলের মুঠি ধরে মাথাটা উচু করে ধরল। ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলাম আমি, চোখ দিয়ে পানি পরছে অনবরত কিন্তু লোকটার সেদিকে পাত্তা নেই। সে আমার গাল চেপে ধরে দাতে দাত চেপে বলল
--- খুব সখ না পালানোর? সেদিনের চড়গুলোর কথা ভূলে গেছো বেবি? কোনো ব্যাপার না আজকের ডোজটা সিউর মনে থাকবে।
বলেই ঝাড়া দিয়ে আমার গাল ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে নিজের বেল্ট খুলতে শুরু করলো। আমি হালকা পিছিয়ে গিয়ে বললাম
--- প্লিজ। আমার ভূল হয়ে গেছে আমি আর পালানোর চেস্টা করবোনা।
--- পারবেও না। তোমার ঐ ইউসলেস মামা মামির ভরসায় তোমাকে আর ছেড়ে রাখব না আমি, আগে যেটা করেছো তার শাস্তি দিয়ে নি।
--- না প্লিজ আজকে মারবেন না।
লোকটা বেল্ট হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল
--- সেটা তোমার এসব করার আগে ভাবা উচিত ছিলো। আজকের পর পালানোর আগে দশবার ভাববে।
বলেই লোকটা নির্মমভাবে বেল্ট দিয়ে মারতে শুরু করলো আমাকে। আমার চিৎকার বন্ধ রুমের দেয়ালে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু সেই চিৎকারে মন একটুও গলছেনা লোকটার। সে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করে চলেছে আমাকে।
।
চিৎকার করে লাফ দিয়ে উঠে বসলাম আমি। সারাশরীর ঘামে ভিজে গেছে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছি। টি- টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে ঢকঢক করে পানি খেয়ে নিলাম। আজকে সন্ধ্যায় সিলিপিং পিল খেতে ভুলে গেছি তাই এই অবস্হা। কারণ এটা নতুন না প্রায় আমাকে তাড়া করে এই ভয়ংকর দুঃসপ্ন, যেটা আমার অতীত, নিষ্ঠুর অতীত। যেটা থেকে আমি পালিয়ে বাচতে চাইছি কিন্তু সেই অতীত আমার পেছন ছাড়ছেনা। ঘড়ি বলছে ৪ টা ২০ বাজে একটা নিশ্বাস নিয়ে উঠে সাওয়ার নিতে চলে গেলাম। কারণ এখন হাজার চাইলেও আর ঘুমোতে পারবোনা। একঘন্টার লম্বা সাওয়ার নিয়ে কফি বানিয়ে বেলকনিতে দাড়িয়ে আবছা অন্ধকার আকাশটা দেখতে দেখতে খোয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিলাম। আদ্রিয়ানের সাথে মিট করতে যাবো কি না ঠিক করিনি এখোনো। আপাদত ভোর হওয়া দেখছি। সূর্য কী সুন্দরভাবে পৃথিবীর বুক থেকে রাতের আধার দূর করে নতুন আলো নিয়ে আসে। আমার জীবনেও কী এমন কোনো সূর্য আসবে নতুন আলো নিয়ে নাকি এই অন্ধকারেই চিরস্থায়ীভাবে থেকে যাবে আমার জীবন।
#চলবে..
।
( অনিমার অতীত কী ছিলো সেটা জানাবো তবে ধীরে ধীরে ততোদিন ধৈর্য ধরে পরুন। ধন্যবাদ)
#বর্ষণের সেই রাতে ❤
#লেখিকা: অনিমা কোতয়াল
#পর্ব- ৮
.
একঘন্টার লম্বা সাওয়ার নিয়ে কফি বানিয়ে বেলকনিতে দাড়িয়ে আবছা অন্ধকার আকাশটা দেখতে দেখতে ধোয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিলাম। আদ্রিয়ানের সাথে মিট করতে যাবো কি না ঠিক করিনি এখোনো। আপাদত ভোর হওয়া দেখছি। সূর্য কী সুন্দরভাবে পৃথিবীর বুক থেকে রাতের আধার দূর করে নতুন আলো নিয়ে আসে। আমার জীবনেও কী এমন কোনো সূর্য আসবে নতুন আলো নিয়ে নাকি এই অন্ধকারেই চিরস্থায়ীভাবে থেকে যাবে আমার জীবন? মনে মনে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে মুচকি হেসে কফির মগে চুমুক দিলাম। জন্মের পর থেকেই একটু একটু করে যার জীবণ থেকে সব আলো ফুরিয়ে গেছে, তার জীবণে নতুন করে কেউ আলো নিয়ে আসবে সেটা ভাবাও বোকামি। একটু একটু করে সূর্য উঠে গোটা আকাশটাকে আলোকিত করছে সব অন্ধকার কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম
--- বাবা মা তো কখনো স্বার্থপর হয়না তাইনা? তাহলে তোমরা কেনো হলে? কেনো স্বার্থপরের মতো আমাকে ফেলে চলে গেলে এভাবে? এই স্বার্থপর পৃথিবীতে আমাকে একা ছেড়ে চলে যাবার আগে একবারো ভাবলে না যে আমার কী হবে? মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চলে যাই তোমাদের কাছে কিন্তু তোমার অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূরণ করার যে দায়িত্ব নিজের কাধে নিয়েছি সেই দায়িত্ব কীকরে এড়িয়ে যাই বলোতো?
এই মুহূর্তে চোখ দিয়ে জল বেড়োচ্ছেনা, বেড়োচ্ছে শুধু দীর্ঘশ্বাস, চোখের জল ও হয়তো ক্লান্ত হয়ে গেছে। কফিটা শেষ করে খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে রইলাম। কী করবো সেটাই ভাবছি। আদ্রিয়ান কী সত্যিই ওয়েট করবে আমার জন্যে? যদি সেটা হয় আমি না গেলে সত্যিই খারাপ হবে। কিন্তু যদি ওই লোকটা কোনোভাবে আমাকে খুজে পেয়ে যায়? কিচ্ছু ভাবতে পারছিনা। কেনো দেখা করতে চায় ও আমার সাথে? আমিই বা কী করবো? যাবো নাকি না? নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে জোরে জোরে কয়েটা শ্বাস নিলাম।
।
--- আব্বু আব্বু।
বলেই পেছন থেকে চেয়ারে বসে পেপার পড়তে থাকা আব্বুর গলা জরিয়ে ধরলাম।
--- কী ব্যাপার মামনী আজকে এতো সোহাগ? নিশ্চই কিছু চাই?
আমি মুখটা ফুলিয়ে আব্বুর গলা ছেড়ে সোফায় বসে বললাম
--- তুমি আমাকে এভাবে বলতে পারলে? আমি শুধু কিছু দরকার হলেই তোমাকে আদর করি? যাও কথাই বলবোনা তোমার সাথে।
আব্বু পেপারটা রেখে আমার পাশে বসে বলল
--- আরেহ আমিতো মজা করছিলাম মা। আমি হাত ভাজ করে উল্টো ঘুরে বসলাম। আব্বু মুচকি হেসে বলল
--- যাহ মেয়তো রাগ করেছে আমার ওপর, কিন্তু একজনের টিউশন থেকে ফিরে আসার অপেক্ষায় যে আমি এখোনো না খেয়ে আছি সেটাকি কেউ জানে?
আমি এবার ভ্রু কুচকে আব্বুর দিকে তাকিয়ে অনেকটা রেগে বললাম
--- তুমি এখোনো না খেয়ে আছো? আব্বু তুমি জানো তোমার সুগার ফল করে তবুও?
--- আমার মামনীকে না খাইয়ে আমি কীকরে খাই?
--- হয়েছে আর বলতে হবেনা।
আমি উঠে গিয়ে একপ্লেটেই আব্বু আর আমার খাবার আব্বুর হাতে এনে দিলাম। আব্বু ভ্রু কুচকে বলল
--- এক প্লেটে কেনো?
আমি আব্বুর সামনে ফ্লোরে হাটু ভেঙ্গে বসে বললাম
--- তুমি খাইয়ে দেবে আমাকে।
আব্বু হেসে দিয়ে রুটি ছিড়ে আমার মুখে দিয়ে বলল
--- তা এবার বলোতো কী চাই তোমার?
--- আমার এস এস সি তে প্লাস আসলে তোমার কিন্তু ট্রিট দেবার কথা ছিলো?
--- হুম মনে আছে পেয়েছো যখন দেবো তো!
--- কালকেতো ফ্রাইডে। কালকে আমরা বাইরে গিয়ে লাঞ্চ করবো।
আব্বু মুখটা ছোট্ট করে বলল
--- সরি মামনী। কালকেতো একজনের সাথে আমায় মিট করতে হবে। ঐসময় ব্যাস্ত থাকব আমি।
আমি মুখ ফুলিয়ে রুটি চিবোতে চিবোতে বললাম
--- ক্যান্সেল করে দাওনা? যেতে হবেনা কোথাও তুমি আমার সাথেই যাবে।
আব্বু আমার মুখে আরেক টুকরো রুটি দিতে দিতে বলল
--- আচ্ছা একটা কথা বলো কেউ যদি তোমার জন্যে ওয়েট করে আর তুমি যদি না যাও সেটাকি ভালো দেখায়? ইস ইট গুড ম্যানার্স?
আমি না বোধক মাথা নাড়লাম। আব্বু হেসে দিয়ে বলল
--- সেইজন্যেই আমার তো যাওয়া উচিত তাইতো?
--- হুম।
বলে মন খারাপ করে খাবার চিবোতে থাকলাম। আব্বু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল
--- লাঞ্চ না হোক ডিনার তো করতেই পারি? কাল আমরা দুজন একসাথে ডিনারে যাবো হ্যাপি?
এটা শোনার সাথে সাথেই আমার সব মন খারাপ দূর হয়ে গেলো, খুশিতে লাফিয়ে উঠে বললাম
--- সুপার হ্যাপি।
--- হয়েছে আর নাচতে হবেনা এবার চুপচাপ খাও।
আমি ভদ্র মেয়ের মতো বসে পরলাম, আর আব্বু আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে আর নিজে খাচ্ছে। হঠাৎ আব্বু বলল
--- এইযে আমার হাতের খাওয়ার একটা বদঅভ্যাস বানাচ্ছো, যখন আমি থাকবোনা কে খাইয়ে থেবে শুনি?
এটা শোনার সাথে সাথেই আমার মুখের হাসি উড়ে গেলো, আমি কদোকাদো মুখ করে আব্বুর কোলে মাথা রেখে বললাম
--- কেনো এসব বলো তুমি? তুমিতো জানো তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই তাও তুমি আমাকে ছেড়ে যাবার কথা বলো?
আব্বু একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল
--- সব কিছুতো আমাদের হাতে থাকেনারে মা। না চাইতেও অনেকসময় চলে যেতে হয়।
আমি কিছু না বলে চুপচাপ আব্বুর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে রইলাম। আর আব্বু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।
।
হটাৎ আব্বু বলে চোখ মেলে তাকালাম। চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম সপ্ন দেখছিলাম। ওসব ভাবতে ভাবতে কখন চোখ লেগে গেছে বুঝতেই পারিনি। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সাড়ে আটটা বেজে গেছে অলরেডি। দশটায় ওখানে থাকতে বলেছিলো আদ্রিয়ান। যাবো আমি? এসব রুমে পায়চারী করতে করতে এসবই ভাবছি। একবার মন বলছে যাই, আরেকবার মন বলছে যাওয়াটা ঠিক হবেনা। কিছুতেই স্হির কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিনা। আরো একবার ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি নয়টা বেজে গেছে। খাটে বসে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলাম। মাঝেমাঝে এমন কিছু পরিস্হিতি আসে যখন না এদিকে যাওয়া যায় না ওদিকে। কী করবো তা নিজেরাই বুঝতে পারিনা। সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই সময় পার হয়ে যায়। অনেকক্ষণ ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলাম। ফোনটা হাতে নিয়ে অরুকে কল করলাম। বাজার একটু পরেই অরু রিসিভ করে বলল
--- শরতান্নি, বান্দরনী, পেন্তী, শাকচুন্নি, রাক্ষুসী..
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম
--- আরে আরে একটু শ্বাস নিয়ে নে বইন। আমি পালিয়ে যাচ্ছিনা।
--- তোর এতোক্ষণে ফোন করার সময় হলো? আমি আর তীব্র কী পরিমাণে টেনশনে আছি জানিস? তীব্র আমাকে এই নিয়ে একশবার ফোন করে জিজ্ঞেস করেছে তুই কিছু জানিয়েছিস কী না।
আমি ভ্রু কুচকে বললাম
--- তোদের এতো ইন্টারেস্ট কেনো সেটাইতো বুঝতে পারছিনা ভাই।
--- তুই এসব বুঝবিনা এবার বলতো কী ঠিক করলি? অলরেডি নয়টা বিশ বাজে।
--- অব্ ব রেডি হয়ে বের হ। আমি ফ্লাটের নিচের রোডে ওয়েট করছি। তীব্রকে ওর গাড়ি নিয়ে আসতে বলিস।
--- ওকেহ ওকেহ তুই রাজি হয়েছিস এটাই অনেক। আমি আর তীব্র এক্ষুনি আসছি। থ্যাংকস ইয়ার।
ওর উত্তেজনা দেখে হেসে দিলাম আমি। হাসতে হাসতেই বললাম
--- আচ্ছা রাখ।
--- আর হ্যা শোন!
--- আবার কী?
--- আজকে অন্তত একটু সাজিস হ্যা?
--- তুই ফোন রাখবি।
--- আচ্ছা ঠিকাছে ঠিকাছে
ফোন কেটে আনমনেই হেসে দিলাম আমি। সত্যিই পাগলি। জীবনে সব না পাওয়ার আর হারানোর মধ্যে এই দুজনকে পেয়েছি। ওদের ভালোবাসা কেয়ারিং সবকিছুই আমাকে মুগ্ধ করে। সত্যিই এমন বন্ধু সবার ভাগ্যে জোটেনা এই দিক দিয়ে বলতে গেলে আমি খুব লাকি। আর এইজন্যে প্রত্যেকদিন আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায়ও করি।
একটা সাদা কুর্তি আর কালো জিন্স পরে নিলাম, চুলগুলোও ছেড়ে দিলাম সাইড সিথি করে। ব্যাগ নিয়ে বেড়নোর আগে আয়নার আরেকবার নিজেকে দেখলাম। সাজবো একটু? হটাৎ করেই মুখে গরম পানি ছুড়ে মারার দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই কেপে উঠলাম আমি। চোখের কোণের পানিটা মুছে নিলাম। সবকিছু সবার জন্যে না ভেবে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ ওয়েট করার পরেই তীব্র ওর গাড়ি নিয়ে চলে এলো। আমি গিয়ে ফ্রন্ট সিটে বসতেই পেছনের সিট থেকে অরু বলল
--- কী রে তুই? তোকে বললাম সাজতে আর তুই একটুও সাজলিনা? কাজল আর লিপসটিক তো দিতেই পারতি?
আমি সিটবেল্ট বাধতে বাধতে বললাম
--- কী দরকার বলতো?
অরু বিরক্ত হয়ে বলল
--- সেটা তুই যদি বুঝতি তাহলেতো হয়েই যেতো। সাজগোজের সাথে তোর কোন জন্মের শত্রুতা বলবি?
তীব্র গাড়ি স্টার্ট করতে করতে বলল
--- সাজার কী দরকার? ও এমনিতেই সুন্দর। এতই সুন্দর যে যে কেউ পাগল হয়ে যাবে ওর জন্যে..
এটুকু বলেই থেমে গেলো। অরু চোখ গরম করে তাকালো তীব্রর দিকে। তীব্র ইতোস্তত করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
--- সরি ইয়ার ভূলে গেছিলাম।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মুচকি হেসে বললাম
--- কোনো ব্যাপার না চল।
এরপর পোনে এগারোটায় আমরা পৌছে গেলাম আদ্রিয়ানের বলা কফিশপে। গাড়ি থেকে নামতেই বুকের ভেতর কেমন করতে লাগল। শহরের নামকরা কফিশপের মধ্যে একটা এটা। অরু আর তীব্র নেমে এলো। আমাকে দাড়িয়ে থাকতে তীব্র বলল
--- কীরে কী হলো? চল ভেতরে?
অরুও ভীত কন্ঠে বলল
--- দশটায় আসার কথা ছিলো পোনে এগারোটা বাজে। চলে গেছে কী না কে জানে?
আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম
--- গেলে যাক। এতো পেচাল পারিসনা তো।
তিনজনেই কফিশপের ভেতরে ঢুকলাম। এতোবড় যে কোন কোণায় ও আছে সেটা বুঝতে পারা মুসকিল। তীব্র এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে বলল
--- একটা ফোন কর ওনাকে কোথায় আছে জিজ্ঞেস কর।
আমি ফোনটা বের করে কললিস্টে ওনার নাম্বারটা খুজে বের করে ফোন দিলাম। রিসিভ করার পর আমি কিছু বলবো তার আগেই উনি বললেন
--- গেইটের কাছে দাড়িয়ে থাকো। আ'ম জাস্ট কামিং।
বলেই রেখে দিলো। আজব বুঝলো কীকরে যে এসছি? অরু আমাকে একটা খোচা মেরে বলল
--- কীরে কী বলল?
--- বলল গেইটের কাছে থাকতে উনি আসছেন।
তীব্র মুচকি হেসে বলল
--- মানতে হবে লোকটা এমনিতে খুব ভালো।
আমি কিছু বলবো তার আগেই আদ্রিয়ানকে চোখে পরল। উনি দূর থেকেই হাত নাড়লেন আমাদের দেখে আমি কিছু না বলে মুচকি হাসলাম। আদ্রিয়ান হাসি মুখেই এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। আজ একটা ব্লাকের মধ্যে হোয়াইট ডিজাইনের টিশার্ট, ব্লাক জিন্স পরেছে, হোয়াইট কেচ আর সানগ্লাসটা টিশার্টের গলায় ঝুলিয়ে রেখেছেন, সিল্কি চুলগুলো বেশ খানিকটা কপালে পরে আছে। অরু মিনমিনিয়ে বলল
--- ইয়ার সামনাসামনি তো আরো হ্যান্ডসাম লাগে ওকে।
আমি মুখে হাসি রেখেই অরুকে একটা খোচা মেরে দাতে দাতে চেপে বললাম
--- মুখটা বন্ধ কর নইলে থাপ্পড় খাবি।
আদ্রিয়ান আমাদের সামনে এসে মুচকি একটা হাসি দিয়ে বললেন
--- হাই। এটলাস্ট এলে তুমি?
আমি মুচকি হাসলাম। আদ্রিয়ান অরু আর তীব্রর দিকে তাকিয়ে বললেন
--- আমি জানতাম তুমি একা আসবেনা। পরিচয়তো করিয়ে দাও।
আমি হালকা হেসে অরুর দিকে ইশারা করে বললাম
--- ও আমার ফ্রেন্ড অরুমিতা।
আদ্রিয়ান অরুর দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে হাত বাড়িয়ে বলল
--- হায় অরুমিতা।
অরুতো অবাক তাকিয়ে আছে, আমি আদ্রিয়ানের আড়ালে ওকে চিমটি দিতেই ও তাড়াতাড়ি আদ্ররিয়ানের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল
--- হাই।
এরপর আমি তীব্রর দিকে ইশারা করে বললাম
--- আর ও আমার ফ্রেন্ড তীব্র।
তীব্র আদ্রিয়ানের দিকে হাত বাড়ালো কিন্তু আদ্রিয়ান হ্যান্ডশেক করলো না, উল্টে হাগ করলো ওর সাথে তীব্র প্রথমে একটু অবাক হলেও পরে হেসে দিলো। আদ্রিয়ান তীব্রকে ছেড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
--- তো ভেতরে যাওয়া যাক?
আমি হালকা হেসে মাথা নাড়লাম। ভেতরে গিয়ে একটা টেবিলে গিয়ে দেখি আরো দুইজন বসে আছে। আমরা যেতেই ঐ দুইজন দাড়িয়ে গেলো। আদ্রিয়ান রেড টিশার্ট পরা লোকটার দিকে ইশারা করে বললেন
--- ও হলো আমার ফ্রেন্ড আদিব।
আদিব নামের লোকটা আমাদের তিনজনের সাথে হ্যান্ডশেক করে হায় বলল।
এরপর ব্লু শার্ট পড়া একটা লোককে ইশারা করে বললেন
--- এ হলো আমার আরেক ফ্রেন্ড আশিস।
আমরা হাই বলতেই আদ্রিয়ান আমার আর অরুর দিকে তাকিয়ে বলল
--- গার্লস এর থেকে সামলে থেকো হ্যা? পাক্কা প্লে বয় আছে।
আমরা হেসে দিলাম। আশিস ভ্রু কুচকে বলল
--- এই আমার নামে সব জায়গায় কাটি না করলে তোর হয়না?
--- না হয়না।
আদিব ভাইয়া বলল
--- আচ্ছা হয়েছে ওদের দাড় করিয়ে রাখবি নাকি বসতে দে?
আদ্রিয়ান মুচকি হেসে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল
--- প্লিজ টেক ইউর সিট।
আমরা তিনজন একপাশে বসলাম ওনারা তিনজন ওপর পাশে বসলেন। এরপর মেনু কার্ড দেখে আদ্রিয়ান যার যার পছন্দ মতো কফি ওর্ডার করলেন। কফি খেতে খেতে সবাই বিভিন্ন কথা বলছে, আদ্রিয়ান অরু আর তীব্রর সাথে এমনভাবে কথা বলছে যেনো খুব পরিচিত ওরা। আর আদিব আর আশিস ভাইয়াও বেশ মজা করছে। তীব্র ওনাদের সবাইকে তুমি করে বলার পারমিশন পেয়ে গেছে অলরেডি। আশিস ভাইয়া আমার আর অরুর সাথে ওনার ফ্লির্টি মার্কা কথা বলে বলে সবাইকে হাসাচ্ছে। তবে আশিস ভাইয়া কেনো জানিনা অরুর সাথেই দুষ্টুমি বেশি করছে। অরু এতে বিরক্ত হলেও কিছু বলতে পারছেনা। কথার মধ্যে মধ্যে আমি আদ্রিয়ানকে আড়চোখে দেখছি। আর অবাক করা বিষয় বারবার আমাদের চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে, আর আমরা সাথেসাথেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছি।
হঠাৎ তীব্র আদিব ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলল
--- আমার সাথে একটু আসবে?
আদিব ভাইয়া কিছু একটা ভেবে সাথে সাথেই বললেন
--- হ্যা হ্যা সিউর চলো।
বলে দুজনে হুরমুরিয়ে চলে গেলো আমি আর অরু হা করে তাকিয়ে আছি কারণ আমরা কিছুই বুঝলাম না। এবার হঠাৎ করেই আশিস ভাইয়া অরুকে বললেন
--- এইযে মেডাম চলুন আমরা মিনি ডেট করে আসি?
অরু অবাক হয়ে ভ্রু কুচকে বলল
--- মানে?
--- মানে যেতে যেতে বোঝাচ্ছি চলো!
বলেই অরুর হাত ধরে একপ্রকার টেনে নিয়ে গেলো আশিস ভাইয়া। অরু বেচারি চেয়েও কিছু বলতে পারোনা। আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি। আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখলাম উনি মিটমিটিয়ে হাসছেন আমি ভ্রু কুচকেই বললাম
--- এটা কী হলো?
আদ্রিয়ান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন
--- আমি কী জানি? ওরা এলে জিজ্ঞেস।
আমি আর কিছু বললাম না। অনেক্ষণ ধরে দুজনেই চুপচাপ বসে আছি। আমি একহাতে কফি মগ চেপে ধরে আছি আর আরেকহাতের নখ টেবিলের সাথে ঘষছি। অার মাঝে ওনার দিকে তাকিয়ে সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে নিচ্ছি কারণ উনি একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে কফি মগে চুমুক দিচ্ছেন। আমার খুব অসস্তি লাগছে, এভাবে তাকিয়ে থাকে কেউ, আর এভাবে মগে চুমুক দেবার মানে কী? অার বাকিরাও কোথায় আছে কে জানে? আরে কেউতো এসে বাঁচাও আমাকে, ভাল্লাগেনা। হঠাৎ করেই আমার টেবিলের ওপর রাখা হাতের ওপর উনি হাত রাখলেন। আমার সারা শরীরে যেনো বিদ্যুৎ খেলে গেলো। হার্ডবিট কয়েকটা মিস হবার পরেই তীব্র গতিতে ছুটতে লাগল। আমি অবাক হয়ে তাকালাম আদ্রিয়ানের দিকে।
#চলবে…
■■■■■■■■■■■■■■
Download NovelToon APP on App Store and Google Play