আকাশটা যেন হঠাৎই ভেঙে পড়লো। কালো মেঘে ঢেকে গেলো চারদিক। বৃষ্টির ফোঁটা প্রথমে ছোট ছোট কণার মতো পড়ছিলো, তারপর হঠাৎ করেই ঝমঝম শব্দে পুরো শহর ঢেকে দিলো।রাত তখন প্রায় দশটা।লিজা দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিলো হোস্টেলের দিকে। নতুন শহর, নতুন রাস্তা সবকিছুই তার কাছে অচেনা। হাতে একটা ছাতা থাকলেও ঝোড়ো হাওয়ায় সেটা ভেঙে যাচ্ছিলো বারবার। বুকের ভেতর অজানা ভয় খেলা করছিলো, কারণ রাস্তা তখন প্রায় জনশূন্য।ঠিক সেই সময়েই..
টানা তিন-চারটা গুলির শব্দ কানে আসতেই লিজার শরীর কেঁপে উঠলো।সে তড়িঘড়ি করে রাস্তাটার মোড়ে একটা ভাঙা দেওয়ালের আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়ালো।চোখ মুছতে মুছতে তাকাতেই যা দেখলো, তার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেলো।
একজন কালো কোর্ট পরা লোক দাঁড়ানো অবস্থাতেই গুলি ছুঁড়ছে। তার হাতে কালো বন্দুক, আর সামনে একটা লোক মাটিতে পড়ে গেছে রক্তে ভিজে। আশেপাশে অন্তত ছয়-সাতজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, সবাই যেন তারই লোক।তাদের চোখে ভয় নেই।লিজার বুক ধড়ফড় করছে। এ কী জায়গায় এসে পড়লাম আমি?
সে আস্তে আস্তে পিছিয়ে সরে দৌড় দিতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই তার পা পিছলে একটা ভাঙা বোতলের টুকরোতে ঠেকলো।টুকরোটা চূর্ণ হয়ে ভাঙার শব্দ হলো আর সঙ্গে সঙ্গেই কালো কোর্ট পড়া লোকটা মাথা ঘুরিয়ে তাকালো সরাসরি লিজার দিকে।তার চোখ অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলজ্বল করছিলো। তীক্ষ্ণ, ঠান্ডা….যেন কারও বুক চিরে ভেতরটা পড়ে নিতে পারে।
সঙ্গে সঙ্গেই পিছনে থাকা একজন চেঁচিয়ে উঠলো,“বস! মেয়েটা দেখে ফেলেছে!”
আরেকজন বন্দুক তাক করে এগিয়ে এলো, “বলুন বস, এক্ষুনি শেষ করে দিই।”
লিজার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়েপড়ছিলো। তার ঠোঁট কাঁপছিলো, গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হচ্ছিলো না।সে শুধু বারবার মাথা নাড়তে লাগলো.. “আমাকে ছেড়ে দিন,আমি কিছু বলবো না.. প্লিজ…”
কালো কোর্ট পড়া লোকটা কিন্তু কিছু বললো না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো লিজার দিকে।
তার সেই দৃষ্টিটা যেন ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছিলো মেয়েটাকে।
একজন লোক বিদ্রূপ করে হেসে বললো,
“বস, মেয়েটা কাঁদছে। এক মিনিটে কাজ শেষ করা যায়। কাউকেই জানাতে হবে না।”
কিন্তু বস তখনও চুপ।তার দৃষ্টি সরেনি এক মুহূর্তও।
যেন এই মেয়েটার চোখের ভেতর সে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছে, যেটার খোঁজে ছিলো বহুদিন ধরে।
হঠাৎ সে নিচু গলায় বললো: “থামো। ছেড়ে দাও।”
লোকগুলো অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো।একজন আবার বললো, “কিন্তু বস… এই মেয়ে সব দেখে ফেলেছে…”
কালো কোর্ট পড়া লোকটা এবার গম্ভীর গলায় বললো: “আমি বলেছি ছেড়ে দাও।”
তার গলায় কোনো চিৎকার নেই, কিন্তু সেই ঠান্ডা গলাতেই এত ক্ষমতা যে আশেপাশের সবাই থম মেরে গেলো।
একজন সামনে এসে লিজার চোখের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললো, “আজ যা দেখেছো ভুলে যেও। যদি কারও কাছে বলো..তুমি শেষ।”
লিজা কাঁদতে কাঁদতে বারবার মাথা নাড়লো।
পা যেন জমে গিয়েছিলো, কিন্তু শরীরের ভেতরের ভয় তাকে হঠাৎ শক্তি দিলো। সে ছুটে পালালো অন্ধকার রাস্তা ধরে, বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে হোস্টেলের দিকে।হোস্টেলের ফটকে পৌঁছে শ্বাসকষ্ট নিয়ে দাঁড়াল লিজা। ভেজা চুল মুখে লেগে আছে, জামা পুরো ভিজে গিয়েছে, ঠোঁট কাঁপছে।
তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, আমি কী করে ফেললাম?
এই নতুন শহরে সে পড়াশোনা করতে এসেছে। বাবা-মা নেই।ছোটবেলা থেকে মামা-মামির কাছে মানুষ। মামা তাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রেখেছে, কোনো অভাব হয়নি জীবনে। সদ্য স্কুল শেষ করে বড় স্বপ্ন নিয়ে লিজা এসেছে শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে।কিন্তু এই শহর?
এখানে রাস্তায় রক্ত ঝরে, গুলি চলে..
আর কালো কোর্ট পড়া লোকটার চোখ যে চোখ লিজার দিকে শেষ মুহূর্তে তাকিয়েছিলো.।এসব ভাবতে ভাবতে লিজা হোস্টেলের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো ।বাইরে বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু ভেতরে তার বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে সে কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় শুয়ে পড়লো।কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই আবার ভেসে উঠছে সেই মানুষটার চোখ।
রাতের ভয় আর অশান্তির পর ভোরবেলা যখন আলো জানালার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকলো, তখনও লিজার চোখ লাল হয়ে ছিলো। সারা রাতই সে ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনি।মাঝে মাঝে মনে হয়েছে বাইরে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে, কেউ তার ঘরে ঢুকে পড়বে আবার চোখ খুললেই দেখেছে সব খালি।সকালে হঠাৎ মোবাইলের রিং বেজে উঠলো।
লিজার আধো ঘুম ভাঙলো। ফোন স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠলো,“মামা”।
লিজা তাড়াহুড়ো করে ফোনটা কানে ধরলো.. “হ্যালো মামা…”
ওপাশ থেকে মামার চিন্তিত গলা: “কী রে মা, নতুন শহরে সব ঠিক আছে তো? কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো?”
লিজার বুক ধক করে উঠলো।কাল রাতের ঘটনাটা মাথায় হঠাৎ ভেসে উঠলো রক্ত, বন্দুক, সেই কালো কোর্ট পড়া লোকটার চোখ।এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সবকিছু বলে দেয়। কিন্তু তখনই মনে হলো, মামা শুনলে ভীষণ চিন্তা করবে, হয়তো জোর করে তাকে ফিরিয়ে নেবে গ্রামে।
তাই লিজা হেসে বললো: “না মামা, সব একদম ভালো আছে। চিন্তা কোরো না।”
ওপাশ থেকে মামার কণ্ঠ মমতায় ভরে উঠলো: “ভালো। দেখ, টাকার দরকার হলে চিন্তা করবি না। আমাকে বলবি, আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।”
লিজার চোখ ভিজে উঠলো। ছোটবেলা থেকেই মামা তাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছে। কিন্তু সে নিজের চোখের জল গোপন করে বললো: “হ্যাঁ মামা, বুঝেছি।”
ঠিক তখনই ফোনটা মামার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে অন্য প্রান্তে মামী বলে উঠলো: “লিজা মা, কেমন আছিস? সময় মতো খাওয়া-দাওয়া করিস, শরীর খারাপ করিস না। ভালো না লাগলে আবার গ্রামে চলে আসিস, আমরা তো আছি।”
লিজার বুকটা হালকা হয়ে এলো। গলাটা নরম হয়ে গেলো: “হ্যাঁ মামী, তোমরাও ভালো থেকো।”
এরপর মামা আবার ফোনটা হাতে নিলেন।
লিজা একটু ইতস্তত করলেও শেষমেশ বলেই ফেললো: “মামা, আমি ঠিক করেছি এখানে একটা পার্ট-টাইম কাজ করবো। তাহলে আমারও সুবিধা হবে।”
মামা সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় বললেন: “না! তুই শুধু মন দিয়ে পড়াশোনা করবি। টাকার চিন্তা করবি না, যত লাগে আমি পাঠাবো।”
লিজা হেসে নরম গলায় বললো: “কিন্তু মামা, এখানে তো অনেক মেয়েরা আছে যারা নিজের পড়ার খরচ চালানোর জন্য কাজ করে। আমারও তো অভিজ্ঞতা হবে, আর তোমার ওপর চাপ কমবে। চিন্তা কোরো না, পড়াশোনার ক্ষতি করবো না।”
ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ থেকে মামা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,“আচ্ছা… তুই যদি এতটাই জিদ করিস, তবে ঠিক আছে। তবে সাবধানে থাকিস। নিজের খেয়াল রাখবি।”
লিজার মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটলো, “হ্যাঁ মামা, আমি খেয়াল রাখবো।”
এরপর ফোনটা কেটে গেলো।কিন্তু ফোন কেটে দেওয়ার পরও লিজার বুক কেমন ভারী হয়ে রইলো।মামা-মামির স্নেহে সে একটু ঠিক থাকলেও হলেও হঠাৎই গত রাতের ছবিগুলো মনে ভেসে উঠলো,কালো কোর্ট পড়া সেই লোকটার চোখ, তার নীরব অথচ ভয়ংকর উপস্থিতি।
লিজা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। শহর তখন ভিজে, রাস্তায় জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে।
বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে, সে আয়নার সামনে দাঁড়ালো আজ তার প্রথম ইউনিভার্সিটি যাওয়া। সে ব্যাগ থেকে তার পছন্দ এর চুড়িদার টা পরে নিলো যেটা লিজা কে তার মামা তার জন্মদিন - এ দিয়েছিলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লিজা মুচকি হাসলো, তার জীবন এর আরও একটা ধাপ এখন থেকে শুরু। কিন্তু হটাৎই তার কাল রাতের ঘটনা মনে পড়ে গেলো।সে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো আর মনে মনে ভাবলো, " আমি কি সত্যিই এই শহরে টিকে থাকতে পারবো?"
চলবে.....
Download NovelToon APP on App Store and Google Play