2

#বর্ষণের সেই রাতে ❤

#লেখিকা: অনিমা কোতয়াল

#পর্ব: ৯+10+11+12

.

আমি আর কিছু বললাম না। অনেক্ষণ ধরে দুজনেই চুপচাপ বসে আছি। আমি একহাতে কফি মগ চেপে ধরে আছি আর আরেকহাতের নখ টেবিলের সাথে ঘষছি। অার মাঝে ওনার দিকে তাকিয়ে সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে নিচ্ছি কারণ উনি একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে কফি মগে চুমুক দিচ্ছেন। আমার খুব অসস্তি লাগছে, এভাবে তাকিয়ে থাকে কেউ, আর এভাবে মগে চুমুক দেবার মানে কী? আর বাকিরাও কোথায় আছে কে জানে? আরে কেউতো এসে বাঁচাও আমাকে, ভাল্লাগেনা। হঠাৎ করেই আমার টেবিলের ওপর রাখা হাতের ওপর উনি হাত রাখলেন। আমার সারা শরীরে যেনো বিদ্যুৎ খেলে গেলো। হার্ডবিট কয়েকটা মিস হবার পরেই তীব্র গতিতে ছুটতে লাগল। আমি অবাক হয়ে তাকালাম আদ্রিয়ানের দিকে। উনি আমার হাতটা আরেকটু ভালোভাবে ধরে বললেন

--- জানো তোমার এতো দেরী দেখে আদিব আর আশিস বলছিলো তুমি আসবেনা কিন্তু আমার কেনো জানিনা মনে হচ্ছিলো তুমি আসবে, তাইতো বসে বসে ওয়েট করছিলাম।

উনি হাত ধরে রাখায় কেমন একটা ফিল হচ্ছে কাপুনি শুরু হয়ে গেছে আমার, তারওপর ওনার এসব কথা। আমি হালকা কাপা কাপা গলায় নিচু কন্ঠে বললাম

--- য্ যদি না আসতাম।

উনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন

--- দুপুর পর্যন্ত ওয়েট করে তোমাকে কল দিতাম। যদি বলতে আসবেনা তো চলে যেতাম।

আমি কিছু না কফির মগের দিকে তাকিয়ে রইলাম, আদ্রিয়ান এখোনো আমার হাতের ওপর ওনার হাত রেখে দিয়েছেন, আমার কাপুনি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, শরীর ঘামছে হালকা। আমি চেয়েও হাতটা সরিয়ে নিতে পারছিনা। আমাকে চুপ থাকতে দেখে উনি নিজেই বললেন

--- বাই দা ওয়ে এতো লেইট করলে কেনো? সাজতে যে সময় নেও নি সেটা তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

--- না আসলে...

--- আসবে কী আসবে না সেটা নিয়ে দ্বিধাবোধ করছিলে, এম আই রাইট?

আমি এবারেরও নিচু কন্ঠে জবাব দিলাম

--- হুম

আমার কাপুনি থামছেই না আজকে। আদ্রিয়ান এবার হাতের ওপর একটু চাপ দিয়ে ধরে বললেন

--- আর ইউ ফিলিং নারভাস?

আমি মাথা তুলে ওনার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম। উনি হালকা হেসে বললেন

--- এভাবে কাপছো আর ঘামছো কেনো? দেখো তোমার হাতের ঘামে আমার হাতও ভিজে যাচ্ছে।

আমি হাতটা সরাতে চেয়েও পারলাম না কারণ উনি শক্ত হয়ে ধরে রাখলেন। আমি সংকোচবোধ খানিকটা কাটিয়ে উঠে নিচের দিকে তাকিয়েই ওনাকে প্রশ্ন করলাম

--- কেনো ডেকেছেন আমাকে?

--- সেটাই তো জানিনা।

ওনার এইরকম উত্তর শুনে আমি একটু অবাক হয়ে ওনার দিকে একপলক তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিলাম। আদ্রিয়ান এখনো পর্যন্ত আমার হাতের ওপর ওনার হাতটা দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে। আমার হাতের ঐ অংশটা ঘেমে গেছে বেশ বুঝতে পারছি, আমার এমন মনে হচ্ছে যেনো আমার হাতের ওপর কেউ বরফ রেখে দিয়েছে।

--- এসেছোতো কিন্তু একটু পরে আবার যাই যাই করবে না তো?

আমি ভ্রু কুচকে ওনার দিকে তাকালাম। উনি মুচকি হেসে বললেন

--- যেহেতু আজ তোমার আর কোনো কাজ নেই তো আজকে দিনটা তো আমাকে দেয়াই যায় তাই না?

আমি মাথা নিচু করে বললাম

--- সারাদিন কী কফিশপে বসে থাকব নাকি?

আদ্রিয়ান হালকা হেসে একহাতে কফির মগে চুমুক দিয়ে বললেন

--- তোমাকে সেটা নিয়ে ভাবতে হবেনা তুমি রাজি কী না বলো?

আমি ইতোস্তত করে বললাম

--- কিন্তু অরু আর তীব্র?

--- ওরাও থাকবে নো প্রবলেম।

--- হুম

আদ্রিয়ান কফিতে আরেকটা চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে বললেন

--- কফিটা খাচ্ছোনা কেনো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তো?

আমি এবার সংকোচ নিয়ে নিচু কন্ঠে বললাম

--- আমার হাতটা তো ছাড়ুন ।

উনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন

--- তোমার অসস্তি হচ্ছে?

--- না মানে..

--- না? তাহলে আর সমস্যা কী? তুমি কফি খাও।

কথাটা বলেই আবার কফি খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আমি পুরো বোকার মতো তাকিয়ে আছি ওনার দিকে। এতো ভালো শেয়ানা। বাট হাত ধরে রেখে কী লাভ কে জানে? আদ্রিয়ানের দিকে তাকাতেই উনি চোখ দিয়ে ইশারা করে আমাকে কফি খেতে বললেন। আমি অসহায়ের মতো একহাত দিয়েই কফি খেতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই দুজনে একেবারেই চুপ ছিলাম। হঠাৎ করেই উনি বললেন

--- অনিমা?

ওনার এই হঠাৎ ডাক শুনে চমকে গেলাম। আমি হকচকিয়ে বলে উঠলাম

--- জ্ জ্বী?

--- আই ওন্না টেইল ইউ সামথিং..

ভ্রু অটোমেটিক্যালি কুচকে গেলো আমার, কী এমন বলতে চান উনি যে এভাবে জিজ্ঞেস করে নিচ্ছেন? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকিয়ে বললাম

--- বলুন?

এরমধ্যেই অরু লম্বা লম্বা পা ফেলে এসে আমার পাশে মুখ ফুলিয়ে বসে পরল। আমি অার আদ্রিয়ান অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে একে ওপরের দিকে তাকিয়ে আবারো ওর দিকে তাকালাম। আমরা কিছু বলার আগেই প্রায় ছুটতে ছুটতে আশিস ভাইয়া এসে আদ্রিয়ানের পাশে বসে জোরে জোরে শ্বাস নিলো। আমি আর আদ্রিয়ান কিছুই বুঝতে পারছিনা তাই বোকার মতো ওদের দিকে তাকিয়ে আছি। আদ্রিয়ান ভ্রু কুচকে আশিস ভাইয়াকে বলল

--- কী ব্যাপার বলতো দুইজন দুই মুডে দুই স্টাইলে একই জায়গা থেকে এলি?

আশিস ভাইয়া হাফাতে হাফাতে বললেন

--- বাপরে বাপরে জীবণে এতো মেয়ে সামলেছি কিন্তু এরকম জিনিস প্রথমবার দেখলাম।

আদ্রিয়ান আশিসের মাথায় একটা চাটা মেরে বললেন

--- ওই জিনিস কী হ্যা? ডু রেসপেক্ট।

আশিস ভাইয়া মাথায় হাত ঘষতে ঘষতে মুখ ফুলিয়ে বসে রইলেন। আদ্রিয়ান অরুর দিকে তাকিয়ে বললেন

--- এই গাধাটা কী করেছে তোমার সাথে?

অরু মাথা নিচু করে বলল

--- নাহ ভাইয়া কিছু করেনি।

--- ওকে আমি খুব ভালোকরে চিনি। নিশ্চয়ই অনেক জালিয়েছে তোমাকে?

অরু আশিস ভাইয়ার দিকে বিরক্তিকর দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। আদ্রিয়ান কিছু বলবে তার আগেই তীব্র আর আদিব ভাইয়া এসে পরলেন। আদিব ভাইয়া বসতে বসতে বললেন

--- সরি গাইস লেট হয়ে গেলো আস..

টেবিলের দিকে তাকিয়ে ওনার কথা থেমে গেলো। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন টেবিলের দিকে। ওনার এইরকম দৃষ্টির মানে কেউ বুঝতে পারলোনা তাই সবাই ওনার দৃষ্টি অনুসরণ করে টেবিলে তাকালেন। সকলেই তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলো অরু তো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। আমিও ওদের এইরকম দৃষ্টি দেখে ভ্রু কুচকে টেবিলের দিকে তাকাতেই এদের এইরকম চাহনীর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলাম। আসলে আদ্রিয়ান এখনো আমার হাতের ওপর ওনার হাত দিয়ে রেখেছেন। আদ্রিয়ান দিকে তাকিয়ে বুঝলাম উনি এতোক্ষণে খেয়াল করলেন ব্যাপারটা। আর খেয়াল করতেই হাত সরিয়ে নিলো। আমিও টেবিল থেকে হাত নামিয়ে মাথা নিচু করে ফেললাম। আমাদের কান্ড দেখে সবাই মিটমিটিয়ে হাসছে। আদিব ভাইয়া হাসি থামিয়ে বলল

--- আরে আরে হাত সরালি কেনো? আমরা কেউ কিচ্ছু মনে করিনি এম আই রাইট গাইস?

সবগুলোতেই আমাদের পিঞ্চ করে একসাথে বলল

--- ইয়াহ।

আমার বেশ লজ্জা লাগছে এই মুহূর্তে। সাথে খানিকটা রাগও লাগছে আদ্রিয়ানের ওপর, তখন বললাম হাতটা ছাড়তে কিন্তু ছাড়লেননা। তখন ছাড়লে এমন পরিস্হিতে পরতে হতো? আদ্রিয়ান এবার বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন

--- মজা নেওয়া শেষ? নাকি আরো চলবে?

সকলেই এবার চুপ হয়ে রইলো। আমি এবার সকলের দিকে তাকিয়ে বললাম

--- বাট আপনারা কোথায় গিয়েছিলেন বলুনতো আমাদের একা রেখে?

আশিস ভাইয়া কফি মগ ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন

--- একা না রেখে গেলে একান্তে কথা হতো কীকরে?

এটা শুনে আমি অবাক হয়ে বললাম

--- মানে?

আদ্রিয়ান কফির মগটা রেখে রাগী চোখে তাকালো আশিস ভাইয়ার দিকে। আদিব ভাইয়া বলল

--- ওকে গাইস অনেক্ষণতো হলো কফিশপে এবার অন্যকোথাও যাই?

আশিস ভাইয়া ভ্রু কুচকে বললেন

--- যাবো তো ভালো কথা কিন্তু এই রকস্টারকে নিয়ে পাবলিক প্লেসে বের হবো কীকরে?

এটা শুনে আদিব ভাইয়া একটা বাকা হাসি দিয়ে আদ্রিয়ান এর দিকে তাকালেন। আদ্রিয়ান মুচকি হেসে টিশার্ট থেকে সানগ্লাসটা চোখে পড়লেন আর কালো রং এর একটা ক্যাপ মাথায় পরে নিলেন। আমিতো হা করে তাকিয়ে আছি একেতো এখন চেনাই যাচ্ছেনা। এক্কেবারে গভীরভাবে লক্ষ্য না করলে কেউ বুঝতেই পারবেনা যে এটাই আদ্রিয়ান। আদিব ভাইয়া মুচকি হেসে আমাদের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালেন অর্থাৎ 'কেমন দিলাম'? তীব্র আর অরু ইশারাতেই বললো 'ওয়াহ ভাই ওয়াহ'। এরপর সবাই মিলে বেরিয়ে একটা লেকপার্কে ঢুকলাম। বিশাল বড় পার্ক এটা। বিশাল লেকের পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে আমরা বিভিন্ন কথা বলতে বলতে হাটছি। হঠাৎ করেই আদ্রিয়ান আমার হাত ধরে আমাকে থামিয়ে দিলেন। আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই আমার ইশারা করে চুপ থাকতে বললেন। আর হাত ধরে টেনে অন্যদিকে নিয়ে গেলেন। একটা নিড়িবিলি সাইডে এনে আমাকে দাড় করাতেই আমি বেশ অবাক হয়ে ভ্রু কুচকে বললাম

--- এটা কী হলো?

আদ্রিয়ান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে ক্যাপ ঠিক করতে করতে বললেন

--- কী হলো?

আমি হাত ভাজ করে বললাম

--- ওদেরকে ছেড়ে আমরা এখানে কেনো এলাম?

--- ওরা ওদের মতো গল্প করে করুকনা আমরা আমাদের মতো করে সময় কাটাই।

--- মানে?

--- আরেহ চলো তো।

বলে আমার হাত ধরে হাটা দিলো, আমার হাত ধরে লেকের পাশ দিয়ে চুপচাপ হেটে যাচ্ছেন উনি। উনার দৃষ্টি চারপাশের পরিবেশে আর আমার দৃষ্টি ওনার দিকে আর আমার সেই হাতটার দিকে যেটা উনি ধরে রেখেছেন। হালকা ফুরফুরে বাতাস বইছে চারপাশ দিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ হাটার পর লেকের একপাশে সুন্দর করে বসার জায়গা বানানো হয়েছে সেদিকে ইশারা করে আদ্রিয়ান বললেন

--- চলো ওখানে গিয়ে বসি।

আমি কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়লাম। উনি আমার হাত ধরেই আমাকে নিয়ে লেকের পাশে বসলেন। দুজনের দৃষ্টিই লেকের পানির দিকে। বেশ কিছুক্ষণ সময় চুপচাপ বসে থাকার পর। হঠাৎ পেছন দিয়ে একটা লোক বুটভাজা বিক্রি করতে করতে যাচ্ছে। আদ্রিয়ান একবার পেছনে ঘুরে তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন

--- বুটভাজা খাবে?

আমি বেশ অবাক হয়ে বললাম

--- আপনি খান এসব?

--- কেনো? এগুলো কী মানুষ খায়না?

--- না মানে...

আমাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বললেন

--- চাচা?

লোকটা আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন

--- জ্বে সাহেব?

--- কী সাহেব, বাবু বলে ডাকো বলোতো? একটু বাবা, মানিক বলেও তো ডাকতে পারো?

আমি বেশ অবাক হয়ে তাকালাম আদ্রিয়ানের দিকে লোকটাও যে বেশ অবাক হয়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আদ্রিয়ান সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বললেন

--- এক প্যাকেট বুড ভাজা দাওতো!

লোকটা বুড ভাজা রেডি করে কাগজে নিয়ে আদ্রিয়ানের হাতে দিতেই আদ্রিয়ান প্যাকেট টা আমার হাতে দিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করলেন

--- কতো হয়েছে চাচা?

--- দশ টেহা।

আদ্রিয়ান মানিব্যাগ বের করে সেটা থেকে পাচশ টাকার একটা নোট বের করে লোকটাকে দিলেন, লোকটা নোটটা দেখে বললেন

--- এতো টেহা তো ভাঙতি নাই আমার কাছে।

--- ভাঙতি তো আমার কাছেও নেই চাচা। কী আর করার তুমি পুরোটাই রেখে দাও।

--- না বাবা এতো টেহা কেমনে নেই?

--- দেখো আমি ফ্রিতে কিছু খাইনা। আর আমার কাছেও চেন্জ আই মিন ভাঙতি

নেই তাই ওটাই নিয়ে যাও।

আমি অবাক হয়েই আদ্রিয়ানকে দেখছি। অসাধারণের মধ্যেও যে এমন অনন্য সাধারণ সত্তা লুকিয়ে থাকতে পারে সেটা ওকে না দেখলে বুঝতাম না। আদ্রিয়ান লোকটাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে টাকাটা দিয়ে পাঠিয়ে দিলো। আমি ততোক্ষণে প্যাকেট খুলে খাওয়া শুরু করে দিয়েছি। আদ্রিয়ানও প্যাকেট থেকে নিয়ে খাওয়া শুরু করলো। দুজনেই চুপচাপ বুটভাজা খাচ্ছি, এক অদ্ভুত নিরবতা কাজ করছে দুজনের মধ্যে। বেশ কিছুক্ষণ পর আমি নিজেই বললাম

--- আপনি কিন্তু এখোনো বললেননা কেনো ডেকেছেন।

আদ্রিয়ান সামনের দিকে তাকিয়েই বুট চিবোতে চিবোতে বললেন

--- বললাম তো নিজেও জানিনা। এক অদ্ভুত মায়া আছে তোমার মধ্যে। একরাতেই সেই মায়ায় জরিয়ে গেছি জানো? ঐরাতের পর থেকে শুধু তোমার কথাই মনে পরে। সেদিন রাত তিনটে বাজে তোমাকে শুধু ধন্যবাদ দিতে ফোন করিনি তোমার গলার আওয়াজ শোনার জন্যে ফোন করেছিলাম।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে উনি এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন

--- জানিনা কেনো তোমার ঐ ভীতু চেহারা, হটাৎ করেই হেসে দেওয়া, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা সব কিছুই খুব মনে পরছিলো। কিছু তো একটা আছে তোমার মধ্যে যেটা আমি ভূলতে পারছিনা। আই্ আই এম সার্টিং টু মিস ইউ ইয়ার।

আমি পুরো থ হয়ে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে উনি আমাকে মিস করছিলেন? কিন্তু কেনো? কী চলছে ওনার মনে? উনি মুচকি হেসে ভ্রু নাচিয়ে বললেন

--- কী ভাবছো?

আমি কোনোরকমে মাথা নাড়লাম অর্থাৎ কিছু না। কিন্তু ওনার বলা কথাগুলো শুনে যে আমার হার্টবিট কতোটা বেড়ে গেছে সেটা আমিই জানি, এখন ওনার পাশে বসতেও আনইজি লাগছে আমার। উনি হয়তো আমার অবস্হাটা বুঝতে পারলেন তাই বললেন

--- যাওয়া যাক ওরা খুজছে নিশ্চই?

--- হুম।

বলে দুজনেই ওদের কাছে চলে গেলাম। আমাদের দেখে ওরা পিঞ্চ মেরে কিছু কথাও বলল কিন্তু আমার মন নেই সেদিকে আমিতো শুধু আদ্রিয়ানের বলা কথাগুলো ভাবছি। এরপর ওখানেই সবাই মিলে দুপুরের লাঞ্চ সেরে ফিরে এলাম। আসার সময় আদ্রিয়ান শুধু কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন

--- রাতে ফোন করব ঘুমিয়ে পরো না ঠিকাছে?

সেটা শুনে আমি শুধু একপলক তাকিয়েছিলাম ওনার দিকে কিন্তু কিছু বলিনি। তবে বুকের ধুকপুকানি আরো তীব্র হয়েছিলো।

কলমে লাস্ট মার্ক টেনে ডাইরিটা বন্ধ করে একটা শ্বাস নিলো অনিমা। তিনদিন ধরে ডাইরী লেখা হয়নি কারণ আগের ডাইরিটা শেষ হয়ে গেছে নতুন ডাইরী আজকে কিনে এনেছে আদ্রিয়ানের সাথে দেখা করে আসার সময়। গত তিনদিনে ঘটা বিশেষ ঘটনাগুলো লিখে রাখল ডাইরীতে। এটা ওর অভ্যাস প্রতিদিনকার বিশেষ ঘটনাগুলো ও ডাইরীর পাতায় আটকে রাখে, এতেই এক অদ্ভুত শান্তি পায়, হালকা লাগে নিজেকে। ডাইরীটা টেবিলে রেখে মুচকি হেসে আদ্রিয়ানের ফোনের ওয়েট করতে লাগল অনিমা। কেনো করছে সেটা ও জানেনা তবে করছে, এক মধুর অপেক্ষা। যেই অপেক্ষায় বিরক্তি নেই, ক্লান্তি আছে শুধু শান্তি আর একরাশ ভালোলাগা।

প্রচুর নেশা করে রুমের সবকিছু ভেঙ্গে তচনছ করে ফেলছে রিক। তার মাথায় আগুন জ্বলছে। তীব্রতর আগুন। কিছুতেই সেই আগুনকে নেভাতে পারছেনা সে। তার ইশারায় এতো এতো বড় বড় মাথা চলে আর সেখানে একটা সামান্য মেয়েকে হাতের মুঠোয় আনতে পারছেনা সে? এটা মানার মতো নয় মানা যায় না এটা। ঐ মেয়েকে হাতে পেলে ও এমন শিক্ষা দেবে যে ওর কাছ থেকে পালানোর চিন্তা করলেও রুহু কেপে উঠবে মেয়েটার। এসব ভেবেই বিছানার সাথে হেলান দিয়ে বসে কাচের বোতলটা হাতের মুঠোয় নিয়ে চাপ দিয়ে ধরল রিক। গরগর করে পরতে থাকা রক্তের দিকে তাকিয়ে বলল

-- যতো খুশি উড়ে নাও বেইবি। কারণ আবারও খাচায় বন্দি হবার সময় এসে গেছে তোমার। আমি খুব শিঘ্রই তোমাকে বলব 'ওয়েলকাম ব্যাক টু মাই হেল সুইটহার্ট'। এতো বড় বুকের পাটা এখনো কারো হয়নি যে আমার হাত থেকে তোমাকে বাচাবে। কারো হয়নি ! কারোর না।

#চলবে...

#পর্ব- ১০

.

--- "যতো খুশি উড়ে নাও বেইবি। কারণ আবারও খাচায় বন্দি হবার সময় এসে গেছে তোমার। আমি খুব শিঘ্রই তোমাকে বলব 'ওয়েলকাম ব্যাক টু মাই হেল সুইটহার্ট'। এতো বড় বুকের পাটা এখনো কারো হয়নি যে আমার হাত থেকে তোমাকে বাচাবে। কারো হয়নি ! কারোর না।"

রিক এসব বলতে বলতেই হনহন করে রিকের রুমে ঢুকলেন রঞ্জিত চৌধুরী। ওনার মুখে বিরক্তির ছাপ পরিষ্কার। ভ্রু কুচকেই সারারুমে চোখ বুলালেন উনি, এটা নতুন না প্রায় ড্রিংক করে বাড়ি ফিরে এইধরণের পাগলামী করে রিক। কিন্তু এই মুহূর্তে মিস্টার রঞ্জিত একটু বেশিই বিরক্ত হচ্ছেন, ছেলের এইরকম ছেলেমানুষি মোটেও সহ্য হচ্ছেনা তার তাই রাগী গলাতেই বললেন

--- "কী শুরু করেছো তুমি রিক। এভরিথিং হ্যাস আ লিমিট।"

রিক হাতে ধরে রাখা ভাঙা বোতলটা মেঝেতে আছাড় মেরে কোনো মতে টলতে টলতে উঠে দাড়িয়ে চেচিয়ে বলল

--- "লিমিট মাই ফুট। এন্ড ইউ প্লিজ ডোন্ট টক টু মি ড্যাড। তুমি একজন মিনিস্টার, তোমার তো এত্তো পাওয়ার। কিন্তু তোমার এইসব পাওয়ার আমার কোন কাজে লাগছে হ্যা? জাস্ট টেল মি? "

মিস্টার রঞ্জিত রাগান্বিত গলায় বললেন

--- "কী বলতে চাইছো তুমি?"

--- "তোমার এত্তো পাওয়ার এত্তো লোক দিয়েও একটা সামান্য জার্নালিস্টের মেয়েকে খুজে বের করতে পারছোনা।"

--- "ওর বাবা কোনো সামান্য জার্নালিস্ট ছিলোনা। একটা গোটা নিউস কম্পানি চলতো ওর বাবার কথায়, আর যাকে তুমি সামন্য জার্নালিস্ট বলছো সেই সামান্য জার্নালিস্টই তোমার বাবাকে শেষ করে দেবার ক্ষমতা রেখেছিলো। এই যে মন্ত্রীর ছেলে বলে এতো গর্ব করো সেটাও থাকতোনা। আজীবণ জেলের ঘানি টানতে হতো আমাকে। সেই জন্যেই ওকে শেষ করতে হয়েছিলো আমার। বুঝলে?"

রিক টি-টেবিলে একটা লাথি মেরে বলল

--- "না না আমি কিচ্ছু বুঝিনি আর আমি এতো কিছু বুঝতে চাইও না। আই জাস্ট ওয়ান্ট হার। আমার শুধু ওকে চাই ড্যাড। এট এনি কস্ট ওকে এনে দাও আমার কাছে। হোয়াই ডোন্ট ইউ আন্ডারস্টান্ড? হোয়াই?"

এটুকু বলেই খাটে বসে পরল রিক, মিস্টার রঞ্জিত এবার একটু বিরক্তি নিয়ে বললেন

--- "একটা সামন্য মেয়ের জন্যে এতোটা হাইপার হওয়ার কী আছে আমিতো সেটাই বুঝতে পারছিনা? তুমি একটা ইশারা করলে তোমার জন্যে মেয়েদের লাইন পরে যাবে কেনো ঐ মেয়ের পেছনে পরে আছো?"

রিক ঝাড়া দিয়ে দাড়িয়ে চিৎকার করে বললো

--- "কারণ আমার ওকেই চাই। আর আমি কোনো কিছু চেয়ে পাইনি এটা কখোনো হয়নি আর না হতে দেবো। তুমিতো ওকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলে তাইনা? কাউকে লাগবেনা আমার। তোমাকেও না আমি একাই ওকে খুজে বার করতে পারবো। কাউকে লাগবে না।"

মিস্টার রঞ্জিত এবার একটু নরম গলায় বললেন

--- "দেখো বেটা।"

--- "লিভ মি এলোন।"

--- "আমার কথাটা..."

রিক এবার চিৎকার করে বলল

--- "আই সেইড লিভ মি এলোন"

মিস্টার রঞ্জিত বুঝে গেছেন এই ছেলে এখন আর তার কোনো কথাই শুনবে না। এই ছেলেকে তিনবছর ধরে বুঝিয়ে আসছে কিন্তু ছেলের মন কিছুতেই ঘোরাতে পারছেনা। যা করার ভেবে চিন্তে ঠান্ডা মাথায় করতে হবে। এসব ভেবে রুম থেকে চলে গেলেন উনি। রিক উঠে ধরাম করে দরজাটা লাগিয়ে দিলো তারপর দেয়ালে টানানো বিশাল এক ছবির দিকে তাকিয়ে বলল

--- "আমার কাছ থেকে পালিয়ে তুমি একদমি ঠিক করোনি। তোমাকে এর অনেক বড় মূল্য দিতে হবে, অনেক বড়। আমার হিংস্রতার কিছুই তুমি দেখোনি তবে এবার দেখবে। এবার আর ড্যাডের আশায় বসে থাকবোনা আমি নিজে খুজবো তোমাকে নিজে। আই এম কামিং সুইটহার্ট।"

ছবিটার দিকে তাকিয়ে বাকা হেসে বিয়ারের বোতলে চুমুক দিলো রিক।

রাত ১২ টা ১৭, অনিমা ফোনটা সাইডে রেখে খাটে হেলান দিয়ে বসে কোলের ওপর ল্যাপটপ রেখে নিজের আর্টিকেল রেডি করছে। তবে বারবার আড়চোখে ফোনের দিকেও তাকাচ্ছে। নিজের অজান্তেই সে আদ্রিয়ানের ফোনের জন্যে অপেক্ষা করছে। কিন্তু এখনও ফোন আসছেনা বলে অনিমার মনটাও বেশ অনেকটাই খারাপ হয়ে আছে। বললোতো ফোন করবে সারে বারোটা বেজে গেছে এখোনো ফোন করলো না? হয়তো ভূলে গেছে, ওরতো আর কাজের অভাব নেই হয়তো কাজের চাপে মনে নেই ওর কথা এসব ভাবতে ভাবতে ফোনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলো অনি, তারপর আবারো কাজে মন দিলো। কিছুক্ষণ পরেই রিংটোনের আওয়াজে চমকে উঠল অনি। আদ্রিয়ানের চিন্তা বাদ দিয়ে কাজে মন দিয়েছিলো সে, তাই এই হঠাৎ আওয়াজে একটু কেপে উঠেছে। পাশের বালিশে মোবাইলের স্ক্রিণে চোখ পরতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল ওর কারণ সেভ করা না থাকলেও নাম্বারটা চিনতে একটুও দেরী হয়নি। মুচকি হেসে ল্যাপটপটা অফ করে সাইডে রেখে ফোনটা রিসিভ করে বলল

--- "হ্যালো"

--- "এখোনো জেগে আছো? আমিতো ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে পরেছো।"

--- " আপনার ফোনের জন্যেই জেগে ছিলাম।"

কথাটা বলার সাথে সাথেই জিবে কামড় দিলো অনিমা। আনমনে কী বলে ফেলল সেটা নিয়েই অফসোস হচ্ছে এখন ওর। আদ্রিয়ান নিশ্চই ওকে হ্যাংলা একটা মেয়ে ভাবছে। আসলে অনেক সময় এরকম হয় মানুষ যখন তার অনুভূতির চরম সীমায় পৌছে যায় তখন শব্দের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, উত্তেজনা এতো তীব্র পর্যায়ে চলে যায় যে নিজের বাক্যগুলোও তখন বড্ড অবাধ্য হয়ে যায়। এমনি অবস্হা হয়েছে অনিমার। আদ্রিয়ানও অনিমার কথা শুনে একটু অবাক হলো, পরোক্ষণেই ঠোটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। আর অনিমা যে আনমনেই কথাটা বলে ফেলেছে সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে ও। অনিমাকে আরেকটু অসস্থিতে ফেলার জন্যে আদ্রিয়ান মুচকি হাসি দিয়ে বলল

---- "আমার ফোনের ওয়েট করছিলে?"

আদ্রিয়ান যে ওকে লজ্জায় ফেলতেই ঘুরিয়ে প্রশ্নটা করেছে সেটা অনিমা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে। মনে মনে আদ্রিয়ানের ওপর একটু রাগও হচ্ছে, কিন্তু সেই রাগটা প্রকাশ করার কোনো উপায় নেই। এটা মানুষজাতির আরেকটা বিরম্বনা হঠাৎ পরিচিত, অল্প পরিচিত, সম্মানীয় এসব ব্যাক্তির ওপর বিরক্তি বা রাগের অনুভব হলেও সেটা প্রকাশ করা যায় না, যদি করা হয় তাহলে তাকে অশোভনীয় ব্যবহার বলা হয়। তাই অনি রেই রাগটা নিজের মধ্যে চেপে রেখে একটু ইতস্তত করে বলল

--- " আপনি বলেছিলেন তাই আরকি..."

--- " হুমম..ডিনার করেছো?"

--- " হ্যা অনেক আগেই। আপনি করেছেন?"

--- "ডিনার করেই তোমাকে কল করলাম।"

--- "এতো দেরীতে ডিনার করলেন?"

--- "তোমাদের বাড়ি পাঠানোর পরেই স্টুডিওতে গিয়েছিলাম একটু আগে ফিরলিম।"

--- "ওহ"

--- "শুধুই কী আমার ফোনের জন্যে অপেক্ষা করছিলে নাকি অন্যকিছুও?"

--- "নাহ মানে সময় কাটানোর জন্যে আর্টিকেল টাইপ করছিলাম।"

এরপর ওরা দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, কেউ কিছুই বলছেনা কিন্তু একে ওপরের নিশ্বাসের শব্দ মন দিয়ে শুনছে, আর সেটাও দুজন দুজনের অজান্তেই। এই নিরবতায়ও এক অদ্ভুত শান্তি আছে, যেই শান্তিটা দুজনেই অনুভব করতে পারছে। নিরবতা ভেঙ্গে আদ্রিয়ান নিজেই বললো

--- "আজকের দিনটা কেমন লাগল?"

অনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো

--- "সত্যি বলবো?"

--- "আই হেইট লাইং।"

--- "অনেকদিন পর মন খুলে হেসেছিলাম"

অনিমার উত্তরটা শুনে আদ্রিয়ান কেনো জানি মনের ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলো। তাই ও হেসে দিয়ে বলল

--- "যাক কারো হাসির কারণ তো হতে পারলাম।"

অনি কিছু না বলে কানে ফোন নিয়েই ধীরপায়ে হেটে ব্যালকনিতে চলে গেলো। অনিকে চুপ থাকতে দেখে আদ্রিয়ান বলল

--- "কখন থেকে আমিই বকরবকর করে যাচ্ছি। কিছুতো বলো?"

--- "কি বলবো?"

--- "আচ্ছা তুমি এতো শান্ত কেনো বলোতো? একদম চুপচাপ। কিন্তু তোমাকে দেখে কিন্তু মনে হয়না যে তুমি এতো শান্ত। মনে হয় একটা চাঞ্চল্য আছে তোমার মধ্যে যেটা কোনো কিছুর নিচে চাপা পরে গেছে।"

খানিক চমকে উঠলো অনিমা। এটাতো সত্যিই যে ও এতো শান্ত ছিলোনা। পরিস্হিতি ওকে চুপ করিয়ে দিয়েছে। একসময় ওর চাঞ্চল্য আর দুষ্টুমী আশেপাশের মানুষকে অতিষ্ট করে তুলতো আর আজ? একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো অনিমার ভেতর থেকে। তারপর নিজেকে কোনোরকমে সামলে বলল

--- "নাহ সেরকম কিছু না"

--- " আচ্ছা বাট অ..নি..মা.. কতো বড়ো নাম তোমার? আমি এতো বড় নামে ডাকতে পারবোনা তোমাকে।"

অনিমা তো চূড়ান্ত পর্যায়ে অবাক হলো। 'অনিমা' নামটা ওনার কাছে এতো বড় মনে হলো? অনিমা নিজের বিষ্ময় কাটিয়ে ওঠার আগেই আদ্রিয়ান বলল

--- " তাই তোমাকে আমি ইন শর্ট অনি বলে ডাকবো ওকে?"

অনিমা অবাক হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল

--- "তীব্র অরু আমাকে এই নামেই ডাকে আপনিও ডাকতে পারেন সমস্যা নেই।"

--- "সমস্যা থাকলেও আমার কিছু করার নেই।"

অনিমা হাসলো। আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বললো

--- "তোমার ব্যাগ খুলেছিলে এসে?"

ভ্রু কুচকে গেলো অনিমার। অবাক হয়ে বললো

--- "নাহ কেনো?"

--- "এখোনো খোলনি? আচ্ছা ঠিকাছে এখন গিয়ে ব্যাগের মাঝের জিপটা খোলো।"

--- "বাট হোয়াই?"

--- "আরে খুলেই দেখো।"

--- " ওকেহ"

অনিমা রুমে ঢুকে ব্যাগ হাতে নিয়ে মাঝের জিপটা খুলল। তারপর আদ্রিয়ানকে জিজ্ঞেস করলো

--- "এরপর?"

--- "ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেখোতো কিছু পাও কী না?"

অনিমা প্রচন্ড কৌতুহল নিয়ে ব্যাগের ভেতরে হাত দিয়েই একটা প্যাকেট পেলো, সেটা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো

--- " এটা কী?"

--- "খুলে দেখো।"

অনিমা প্যাকেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা পেলো সেটা বের করে এনে দেখলো একটা কিরিং তাও বিরবিকিউসহ। প্রচন্ড কিউট লাগছে দেখতে। বারবিকিউটা নীল রঙয়ের ড্রেস পরা আর পায়ের দিকের অংশটা নীল রং এর পালক দিয়ে ঘেরা। চুলগুলোও এক সুন্দর স্টাইলে ঝুটি করা। অনিমাতো নিজের ওপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে চুমু দিয়ে দিলো ওটার ওপর। তারপর এক্সাইটেড হয়ে আদ্রিয়ানকে জিজ্ঞেস করলো

--- "এটা আমার?"

আদ্রিয়ান অনিমার কন্ঠে খুশির আমেজ স্পষ্ট অনুভব করলো তাই মুচকি হেসে বলল

--- "তোমার ব্যাগে যখন পেয়েছো অবশ্যই তোমার। ব্যাগে আরো কিছু আছে দেখো?"

অনিমা আবারো ভ্রু কুচকে বলল

--- "আবার কী?"

--- "নিজেই দেখ নারে পাগলী।"

অনিমা কেপে উঠলো আদ্রিয়ানের এরকম আদুরে শব্দে। বুকের ভেতরের ধুকপুক শব্দটা বাইরে থেকেও জেনো শুনতে পাচ্ছে। একটা আজব অনুভূতি যেটা ব্যাখ্যা করার মতো শব্দ অনিমার ছানা নেই। বহু কষ্টে নিজের অনুভূতিকে দমিয়ে প্যাকেটে দ্বিতীয়বার হাত দিলো আর এবার বের হয়ে এলো একটা চকলেট বক্স। অনিমার খুশি দেখে কে। চকলেট ওর অন্যতম প্রিয় খাবার। ও এবার খুশিতে বাচ্চাদের মতো বলে উঠল

--- "চকলেট?"

আদ্রিয়ান অনিমার এই উচ্ছাসিত বাচ্চা কন্ঠ শুনে হেসে দিলো, এই মেয়ে নিজেকে যতোই ম্যাচিউর দেখানোর চেষ্টা করুকনা কেনো মনের দিক থেকে এখোনো একটা বাচ্চা। এসব ভেবেই মুচকি হেসে বলল

--- "হ্যা আর পুরোটাই তোমার।"

অনিমা কিছু একটা ভেবে নিজের খুশিটা দমিয়ে নিচু কন্ঠে বলল

--- "এগুলো কখন করলেন?"

--- "গল্প করার মাঝখানে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছি।"

--- "তখন সামনাসামনি দিলে কী হতো?"

--- "এখন হঠাৎ করে পাওয়ায যেই খুশিটা পেলে, তখন দালে এটা পেতে?"

অনিমা কিছু না বলে চুপ করে রইলো। আদ্রিয়ান নিজেই বলল

--- "আচ্ছা ঘুমিয়ে পরো এখন অনেক রাত হয়েছে। গুড নাইট।"

অনিমা মুচকি হেসে নিচু কন্ঠে বলল

--- "গুড নাইট।"

ফোনটা রেখে ক্রিনে তাকিয়ে মুচকি হাসলো অনিমা তারপর কিরিং আর চকলেট বক্সটার দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই হেসে দিলো। তিনদিন আগে অবধি যেই মানুষটাকে শুধু টিভিতে আর ইউটিউব এই দেখে এসছে, যার সাথে দেখা হওয়াও ওর কাছে সপ্ন মনে হতো, তার সাথে একটা রাত কাটানো, একটা দিন ঘোরা, ফোনে কথা বলা, তারওপর তার কাছ থেকে গিফট পাওয়া ভাবতেই কেমন যেনো লাগছে অনিমার। সবকিছু সপ্নের মতো লাগছে। কিরিং এর বার্বিকিউ টাকে হাতে নিয়ে কয়েকবার চুমু খেলো অনিমা। দুহাত ছড়িয়ে রুম জুরে ঘুরতে ঘুরতে মুহুর্তটা উপভোগ করছে ও, আজ খুব বেশি ফুরফুরে লাগছে ওর নিজেকে যার কারণ ওর অজানা। কিছুসময়ের জন্যে ও ভূলেই গেছে ওর সেই লোমহর্ষক ভয়ংকর অতীতকে।

রিক চৌধুরী দেয়ালে টানানো অনিমার ছবিটির দিকে তাকিয়ে একটার পর একটা চুমুক দিয়ে যাচ্ছে বোতলে। বাজ পাখির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে। একটা হিংস্র পশু তার শিকারকে ধরার প্রস্তুতির সময় শিকারের দিকে যেভাবে তাকায় সেভাবেই তাকিয়ে আছে যেনো এক্ষুনি ঝাপিয়ে পরবে নিজের শিকারের ওপর। হাত দিয়ে ঝরতে থাকা রক্তের দিকে নজর নেই তার। সে শুধু একটা কথাই বলছে

--- "গেট রেডি ফর ব্যাক টু দ্যা হেল বেইবি।"

ফোন রাখার পর থেকেই মোবাইল স্ক্রিনে অনিমার ছবির দিকে তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ান। অনিমার অগোচরেই তুলেছে ছবিটা যেটাতে অনিমা মুচকি হেসে কপালের চুলগুলো সরাচ্ছে। ছবিটার দিকে তাকিয়েই আদ্রিয়ান বলল

--- "জানিনা কী এমন দেখেছি তোমার মধ্যে যেটা অন্য কারোর মধ্যে দেখিনি। তোমাকে ভালোবাসি কি না এখোনো জানিনা। জানতে চাইও না। কিন্তু আমার অস্তিত্বে মিশে গেছো তুমি, তাই তুমি আমার। যদি তোমার মনে জায়গা করতে পারি তো ধুমধাম করে আনন্দের সাথে নিজের কাছে আনবো তোমাকে আর যদি সেটা না পারি তো..."

বলেই হালকা হাসলো আদ্রিয়ান তারপর ছবিতে হাত বুলিয়ে বলল

--- "তবে যাই হোক। তোমার অতীত যে খুব একটা সুখকর না সেটা আমি সেদিন রাতেই বুঝেছি। কিন্তু তোমার অতীত যাই হোক আর যতো খারাপই হোক আমি তোমাকে দূরে ঠেলে দেবোনা। বরং আজ এই মুহুর্ত থেকে তোমার জীবণ থেকে তোমার অতীতের কালো ছায়াগুলো সরানোর দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিলাম। আমি জানি তোমার মধ্যে এক চঞ্চল হাসিখুশি অনি চাপা পরে আছে, তাকে অামি বের করে আনবো আই প্রমিস।"

#চলবে...

.

#পর্ব- ১১

.

--- "তবে যাই হোক। তোমার অতীত যে খুব একটা সুখকর না সেটা আমি সেদিন রাতেই বুঝেছি। কিন্তু তোমার অতীত যাই হোক আর যতো খারাপই হোক আমি তোমাকে দূরে ঠেলে দেবোনা। বরং আজ এই মুহুর্ত থেকে তোমার জীবণ থেকে তোমার অতীতের কালো ছায়াগুলো সরানোর দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিলাম। আমি জানি তোমার মধ্যে এক চঞ্চল হাসিখুশি অনি চাপা পরে আছে, তাকে অামি বের করে আনবো আই প্রমিস।"

সকালে ফুরফুরে এক মেজাজ নিয়ে ঘুম থেকে উঠল অনিমা। ও নিজেও জানেনা আজকে কেনো এতো হালকা লাগছে ওর। আজ একটু বেশিই তাড়তাড়ি উঠেছে ঘুম থেকে। লম্বা এক সাওয়ার নিয়ে। কিচেনে গেলো কফি করতে। আজ সবকিছুই কেনো জানি ভালো লাগছে ওর। আদ্রিয়ানের বলা প্রতিটা কথা ওর মনে এক অন্য অনুভূতির সৃষ্টি করেছে। সেই শব্দগুলো যেনো ওর কানে বাজছে। কিছু কিছু কথা মনে পরতেই মনে এক শীতল শিহরণ বয়ে যাচ্ছে ওর। এক অদ্ভুত ভালোলাগা। আর মজার ব্যাপার হলো এই ভালোলাগার কারণ ওর নিজেরও অজানা। কফি করে ব্যালকনিতে দাড়িয়ে মিষ্টি এই সকালটা দেখছে ও। আজকের সকালটা একটু বেশিই সুন্দর লাগছে ওর কাছে। আজকের সকালটাই এতো সুন্দর নাকি ওর কাছেই এতো সুন্দর লাগছে সেই প্রশ্ন অনিমার মনে উঠলেও সে পাত্তা দেয়নি নিজের মতো করে উপভোগ করছে কোমল রোদমিশ্রিত এই মিষ্টি সকালের মিষ্টতা। অফিসে বেরোনোর আগে আদ্রিয়ানের দেয়া কীরিং টায় চাবি সেট করে বারবিকিউটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তারপর ওটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল

--- " আমি একজন মেয়ে তাই এটুকু বুঝতে পারছি যে আপনি আমার জন্যে কিছুতো ফিল করেন। কিন্তু সেটা কী? টান? মোহ? নাকি ভালোবাসা? ভালোবাসা? আপনার মতো একজন আমার মতো একটা মেয়েকে কেনো ভালোবাসবে? আপনার মনে কী আছে সেটাতো আমার জানা নেই কিন্তু আমার মনে কী চলছে আমিতো নিজেই বুঝতে পারছিনা। আপনি আমার ক্রাশ, আপনার গান আমার ভালো লাগে, সেটাতো শুধুই একটা ভালোলাগা। কিন্তু আপনার সংস্পর্শে এলেই আমার এমন কেনো ফিল হয়? আপনি যখন আমার হাত ধরেছিলেন তখন হার্টবিট প্রচুর বেড়ে গেছিলো, শরীর কাপছিলো, আপনার কথা শুনে একটা আজব অনুভূতি হচ্ছিলতো। এগুলো কী শুধুই ভালোলাগে বলে? "

আপন মনেই কথাগুলো বলে একটা শ্বাস নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরল অনিমা।

অফিসে এসেই অরু একটা কথাও না বলে মুখ ফুলিয়ে ডেস্কে বসে একমনে কাজে লেখে গেলো। তীব্র অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো অরুর দিকে কিন্তু কিছু বলতে গিয়েও বললোনা। অরু কিছু না বলে চুপচাপ কাজ করছে তীব্র কয়েকবার আড়চোখে দেখেছে ওকে কিন্তু কিছুই বলেনি, আসলে অনিমার আসার জন্যে অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অনিমা এসে হাজির হলো ডেস্কে বসে কম্পিউটার অন করে প্রথমে তীব্রর দিকে তাকালো তারপর অরুর দিকে তাকাতেই অনিমার ভ্রুজোরা কুচকে গেলো। তীব্রর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে। তীব্র ঠোঁট উল্টে ঘার সংকোচিত করে বোঝালো যে ও নিজেও জানেনা। অনিমা আরেক দফা অরুর দিকে তাকালো অরু বেশ বিরক্ত সেটা বোঝাই যাচ্ছে। অনিমা তীব্রকে ইশারা করে বলল এখন চুপ থাকতে।

লাঞ্চ টাইমে ওরা তিনজনেই ক্যান্টিনে খেতে বসলো। অনিমা এবার অরুকে জিজ্ঞেস করল

--- "কী ব্যাপার বলতো সকাল থেকে দেখছি মুখ ভার করে বসে আছিস? কেনো?"

এটা শুনে অরু মুখের থেকে চামচ নামিয়ে অনিমার দিকে তাকালো। তীব্রও উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অরু আবার খাওয়ায় মনোযোগ দিয়ে বলল

--- "কিছু না তো।"

অনিমা এবার বিরক্ত হয়ে বলল

--- "এই ড্রামাকুইন। তোর পেটে কোনো কথা একদিনো ঠিকভাবে বসে থাকেনা আমরা সেটা ভালোকরেই জানি। একটু পর নিজেই সুরসুর করে বলতে শুরু করবি।"

তীব্রও অনিমার কথায় সায় দিয়ে বলল

- "কিন্তু তখন আমরা কাজে ব্যস্ত থাকবো আর তুই পকরপকর করে আমাদের ডিস্টার্ব করবি। তাই টাইম ওয়েস্ট না করে এখনি বলে ফেল "

অরুমিতা এবার শব্দ করে চামচটা টেবিলে রেখে বলল

--- " ঐ আশিস না ফাসিস পেয়েছেটা কী হ্যা। যা খুশি করছে। কালকে জোর করে নাম্বার নিয়েছে। কাল সারারাত ফোন করে জ্বালিয়েছে জানিস? প্রথমে ভদ্রতার খাতির ভালো করে কথা বললেও পরে বিরক্ত হয়ে কটা শুনিয়ে দিয়েছি তবুও জ্বালিয়েছে ইডিয়েটটা। খালি ফ্লির্টি মার্কা কথা বলে। মাথা ব্যাথা বানিয়ে দিয়েছে।"

একনিশ্বাসে কথাটা শেষ করে অরু অনিমা আর তীব্রর দিকে তাকালো, দুজনেই হা করে তাকিয়ে আছে অরুর দিকে। সেটা দেখে অরু ভ্রু কুচকে ওদের দুজনের সামনে তুরি বাজিয়ে বলল

--- "হ্যালো? কোথায় হারিয়ে গেলি?"

অনিমা কোনরকমে নিজেকে সামলে বলল

--- "তুই কী আদ্রিয়ান এর বন্ধু আশিস ভাইয়ার কথা বলছিস?"

অরু বিরক্তিকর দৃষ্টিতে অনিমার দিকে তাকিয়ে বলল

--- "না আমি আমার জামাইর কথা বলছি। অবশ্যই ওই বান্দরের কথাই বলছি।"

অনিমা কিছু বলবে তার আগেই তীব্র বলল

--- "কিন্তু আশিস ভাই তোকে বিরক্ত কেনো করছে?"

অরুমিতা মুখ ফুলিয়ে বলল

--- "আমি কি জানি? আমার হাসিতে নাকি সে খুন হয়ে গেছে, মুখ ভেংচি দেখে নাকি ওনার হার্টে ধাক্কা লেগেছে। এইসব রিডিউকিলাস কথাবার্তা বলে কান ঝালাপালা করে দিলো।"

অনিমা আর তীব্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একসাথে শব্দ করে হেসে দিলো আর অরুমিতা মুখ ফুলিয়ে খেতে শুরু করল। অনিমা হাসি থামিয়ে বলল

--- "আদ্রিয়ান তো বলেছে আশিস ভাইয়া একটু অন্যরকম তাই হয়তো.."

তীব্র অনিমাকে থামিয়ে দিয়ে এক ভ্রু উচু করে অনিমাকে উদ্দেশ্য করে বলল

--- "এস পার আই নো আদ্রিয়ান,আদিব আর আশিস ভাইয়ের সেইম এজ। কিন্তু আদিব আর আশিস ভাইদের বেলায় ভাইয়া আর আদ্রিয়ান ভাই এর বেলায় শুধুই আদ্রিয়ান? কেস কী বলতো?

তীব্রর কথা শুনে অরুমিতাও খাওয়া ছেড়ে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো অনিমার দিকে। অনিমাতো পরলো মহা অসস্তিতে। ঠিকই তো ও কেনো আদ্রিয়ানকে ভাই বলতে পারেনা? কেনো জানি আদ্রিয়ানের প্রতি ওর ভাই শব্দটা আসেইনা। তাই কোনো উত্তর দিতে না পেরে মাথা নিচু করে প্লেটে স্পুন ঘসতে লাগলো। অরুমিতা ঠেস মেরে বলল

-- "শুধু কী তাই? রাত তিনটে বাজে ফোন করা, কফিশপে হাতের ওপর হাত রেখে বসা, লেকপার্কে আমাদের চোখে ফাকি দিয়ে আলাদা সময় কাটাতে চলে যাওয়া। আহা !আহা!"

তীব্রও ওর কথায় সায় দিয়ে বলল

--- "হ্যা ইয়ার। একদিনের আলাপেই দেখা করতে ডেকে নিলো? তারপরে আসার সময়ও কানে ফিসফিস করে কী জেনো বলছিলো উনি। এদের কিচ্ছা দেখে আমার তো ঐ গানটা মনে পরছে।"

অরুমিতা কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইলো

--- "কোনটা রে?"

তীব্র খানিকা সুর দিয়ে বলল

--- " দো দিল মিল রাহে হ্যা, মাগার চুপকে চুপকে"

অনি বিরক্তিকর দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল

--- "থামবি তোরা? কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?"

অরুমিতা আর তীব্র হাসতে হাসতে একসাথেই বলল

--- "হ্যা এখনতো আমরাই থামবো। চালিয়ে তো তোরা যাবি।"

অনিমা কিছু না বলে খাওয়ায় মন দিলো কারণ ও জানে এদের এখন যতোই বলুক ওরা থামবেনা। আর ওদের কথায় অনিমা অনেকটা লজ্জাও পাচ্ছে কিন্তু সেটা বহিপ্রকাশ করা যাবেনা তাহলে ওরা আরো পেয়ে বসবে।

আদ্রিয়ান আদিব আর আশিসের সাথে রেস্টুরেন্টে ঢুকছে। আদ্রিয়ানকে দেখেই হৈ হুল্লোর পরে গেছ সবার মধ্যে। সেলফি অটোগ্রাফ এর জন্যে হুমরি খেয়ে পরছে অনেকেই। আশিস বিরক্ত হয়ে বলল

--- "এসে গেছে তিতি মুরগীর দল"

আদ্রিয়ান চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই আশিস চুপ হয়ে গেলো। আদ্রিয়ান যতটা সম্ভব সামাল দিয়ে তারপর গার্ডসদের ইশারা করতেই তারা সবাইকে সরিয়ে জায়গা করে দিলো। এরপর ওরা সোজা ওদের বুক করা আলাদা রুমে গিয়ে বসল। আদ্রিয়ান বসেই আশিসকে উদ্দেশ্য করে বলল

--- " ওরা কোনো তিতি মুরগী না। ওরা আছে বলেই আজ আমি সেলিব্রিটি। সো এসব আর বলিসনা আমার পছন্দ না।"

আশিস বেচারা ভদ্র ছেলের মতো মাথা নাড়ল কারণ আদ্রিয়ান এইসব বিষয়ে খুব সেনসেটিভ। খাবার আসার পর ওরা খেতে শুরু করল। হঠাৎ আদিব বলল

--- " অনিমাকে নিয়ে কী ভাবলি?"

আদ্রিয়ান ভ্রু কুচকে বলল

--- "মানে?"

--- " দেখ এখন এটা বলিসনা যে ওর প্রতি তোর কোনো ফিলিংস নেই। যেই ছেলে হুট করে অপরিচিত কোনো মেয়ের সাথে কফি খেতে বসতেও পছন্দ করে না সে ছেলে একটা অপরিচিত মেয়েকে নিজে ডেকে এনে তারসাথে সারাদিন কাটালো সেটা এমনি এমনি হতে পারেনা বস।"

আশিস তাল মিলিয়ে বলল

--- " তাও আবার আলাদা নিয়ে গিয়ে ঘোরা।"

আদ্রিয়ান কিছু বললোনা। আদিব এবার আস্তে করে জিজ্ঞেস করল

--- "ভালোবাসিস ওকে? "

আদ্রিয়ান প্লেটের দিকে তাকিয়েই বলল

--- " আই ডোন্ট নো ইয়ার। বাট ওর প্রতি একটা আলাদা টান তৈরী হয়ে গেছে। এরকম মনে হয় ওকে সবসময় আমার সামনেই রাখি। এতো অল্প সময়ে কারো প্রতি এতোটা টান তৈরী হতে পারে আগে জানতাম না। আমার ওকে চাই ইয়ার সারাজীবনের জন্যে, এনি হাউ।"

আদিব হালকা হেসে জিজ্ঞেস করল

--- " যদি ও তোর হতে না চায়?"

উত্তরে আদ্রিয়ান বাকা একটা হাসি দিলো আর আদিব আশিস দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট নিশ্বাস নিলো। তারপর আশিস বলল

--- "বুঝলাম"

আদ্রিয়ান ভ্রু কুচকে বলল

--- "কী বুঝলি?"

আদিব আর ইশরাক একসাথে জোরে চেচিয়ে বলে উঠল

--- "ইউ আর ইন লাভ"

আদ্রিয়ান তাড়াতাড়ি কানে আঙ্গুল দিয়ে বলল

--- "আরেহ ইয়ার।"

চৌধুরীর মেনশনে ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন মিস্টার রঞ্জিত ওনার স্ত্রী আর শালক কবির শেখ। মানে রিকের মামা, শকুনী মামাও বলা যেতে পারে কারণ ভাগ্নের সব কুকর্মে শুধুযে তার সমর্থন থাকে তাই না ভাগ্নেকে কুমন্ত্রণা দিতেও সে সমান পারদর্শী। মহাভারত সিরিয়ালের ডিরেক্টর রবি চোপড়া যদি রিক আর কবির শেখ কে আগে দেখতেন তাহলে নিশ্চই দুর্যোধন আর মামা শকুনীর ক্যারেক্টার এর অফার ওদেরকেই করতেন। মিস্টার রঞ্জিত ডায়নিং টেবিলে লাঞ্চ করতে বসে ছেলেকে দেখতে না পেয়ে ভ্রু কুচকে মিসেস লিমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন

--- "তোমার ছেলে কোথায়?"

মিসেস লিমা ইতোস্তত করে বললেন

--- " ডাকতে গেছিলাম কিন্তু দরজা খোলেনি এখনো ঘুমোচ্ছে মনে হয়।"

রঞ্জিত চৌধুরী ভ্রু কুচকে বললেন

--- "হ্যা সেই। সারারাত মদ গিলবে তারপর সারাদিন মরার মতো বিছানায় পরে থাকবে।"

মিসেস লিমাও এবার বিরক্তি নিয়ে বললেন

--- "মেয়েটাকে এনে দিচ্ছোনা কেনো বলোতো, তাহলে হয়তো.."

মিস্টার রঞ্জিত ধমকি দিয়ে বললেন

--- "তাহলে কী? বলো? ঐ মেয়ে থাকতে তোমার ছেলে নেশা করতোনা? মাঝে মাঝেই নেশা করে গিয়ে অকারণেই কতো মারধোর করতো মেয়েটাকে ভূলে গেছো?"

মিসেস লিমা কান্নাজরিত কন্ঠে বললেন

--- " আমি কিছু জানিনা। আমার ছেলের এই অবস্হা আমি আর মানবোনা তুমি যেভাবেই হোক ঐ মেয়েকে খুজে আনো।"

--- " আচ্ছা দেখছি তুমি ভেতরে যাও।"

--- " কিন্তু?"

মিস্টার রঞ্জিত ধমক দিয়ে বললেন

--- "যাও।"

মিসেস লিমা ভেতরে চলে গেলেন। এবার কবির শেখ মুখ খুললেন। একটা হাসি দিয়ে বললেন

--- " ঐ মেয়েটা যখন ছিলো তখন কিন্তু বাবাই এমন ছন্নছাড়াভাবে চলতো না তাইনা?"

রঞ্জিত চৌধুরী জুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন

--- " আমি জানি আর আমি ইচ্ছে করেই ঐ মেয়েকে খুজিনি এতোদিন। কারণ আমি চাইনা ও আমার বাড়িতে উঠুক। কারণ বিষধর সাপের বাচ্চা বিষধরই হয়। তোমার কী মনে হয় যার বাপ এতো ভয়ংকর সাহসী ছিলো তার মেয়ে এতো ভীতু?"

কবির খান অবাক হয়ে বললেন

--- "মানে?"

--- "মানে ওর বাবার অসম্পূর্ণ কাজটাকে সম্পূর্ণ করার জন্যে উঠে পরে লেগেছে ও। ওর জীবণের একটাই লক্ষ্য আমাকে এক্সপোস করে শেষ করে দেওয়া। আর সেই কাজটাই দিনরাত খেটে করছে ও। হ্যা ও ভয় পায় ঠিকি, কিন্তু সেটা শুধু এবং শুধুই রিক কে। কারণ রিক ওর ওপর যেই টর্চারগুলো করতো, সেটা কোনো শক্ত হৃদয়ের মানুষেরও গা হিম করে দেবে। কিন্তু ঐ মেয়ের কাছ থেকে বাচতে হলে ওর বাপের মতো ওকেও সরিয়ে দিতে হবে। এতোদিন আমি শুধু আমি রিক এর ওকে ভূলে যাওয়ার অপেক্ষা করছিলাম কিন্তু এই ছেলেতো যতো দিন যাচ্ছে ততই পাগল হচ্ছে ঐ মেয়ের জন্যে। কী দেখেছে ঐ মেয়ের মধ্যে কে জানে।"

কবির শেখ কিছুক্ষণ চুপ করে কিছু একটা ভেবে বললেন।

--- "আমার কাছে একটা প্লান আছে জিজু। যাতে সাপও মরবে আর লাঠিও ভাঙবেনা।"

মিস্টার রঞ্জিত ভ্রু কুচকে বললেন

--- " কী প্লান?"

--- " দেখুন খুনাখুনি করে বাবাইর মনে ক্ষোভ তৈরীর দরকারটা কী? যেহেতু মেয়েটা বাবাইকে ভয় পায় আর বাবাইকে আমি যতদূর চিনি ও ঐ মেয়েকে খোলা রাখবেনা বন্দি করেই রাখবে। তাই ওই মেয়েও আপনাকে এক্সপোস করার প্রমাণ খুজতে বাইরেও যেতে পারবেনা। এতে দেখুন আপনিও নিরাপদ থাকবেন আর আমার বাবাইও খুশি হবে। তাই বলছি মেয়েটাকে খুজে বাবাই এর হাতে তুলে দিন বাকিটা বাবাই সামলে নেবে"

মিস্টার রঞ্জিত কোনো উত্তর দিলেন না। তবে বুদ্ধিটা মন্দ লাগেনি তার। উনি জুস খেতে খেতে ভাবলেন,ঠিকি তো বিষধর সাপকে পিটিয়ে মেরে ফেললে মজা আছে নাকি? বিষধর সাপের বিষদাঁত ভেঙ্গে তাকে নিজের মতো করে নাচানোতেই তো আসল মজা। কথাটা ভেবেই আপন মনে শয়তানী হাসি দিলেন মিস্টার রঞ্জিত।

#চলবে...

#পর্ব: ১২

.

মিস্টার রঞ্জিত কোনো উত্তর দিলেন না। তবে বুদ্ধিটা মন্দ লাগেনি তার। উনি জুস খেতে খেতে ভাবলেন,ঠিকি তো বিষধর সাপকে পিটিয়ে মেরে ফেললে মজা আছে নাকি? বিষধর সাপের বিষদাঁত ভেঙ্গে তাকে নিজের মতো করে নাচানোতেই তো আসল মজধা। কথাটা ভেবেই আপন মনে শয়তানী হাসি দিলেন মিস্টার রঞ্জিত।

_______

আজকে রাতে আবারো বর্ষণ শুরু হয়েছে, তবে ভারী বর্ষণ না, গুড়ি গুড়ি এর চেয়ে একটুখানি বেশি আর মধ্যমের চেয়ে একটুখানি কম । বাজ পরছে না এখোনো। । রাতের বৃষ্টির টুপুর টুপুর শব্দ, তারওপর বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা বাতাসের সাথে হালকা হালকা বৃষ্টির ঝাপটা, বর্ষার রাতে এই মনমুগ্ধকর পরিবেশের প্রায়ই দেখা মেলে। এমন সময় কেউ পছন্দ করে কম্বল মুরি দিয়ে ঘুমাতে, আর কেউ পছন্দ করে জানালা সামনে বা ব্যালকনিতে দাড়িয়ে বর্ষণের সেই রাতকে উপভোগ করতে। অনিমা এই দুই কাতারের মধ্যেই পরে, যখনি বাজ পরে তখন সে কম্বল মুরি দিয়ে ঘুমাতেই ভালোবাসে আর যখন কমগতির হালকা বৃষ্টি থাকে তখন সে দ্বিতীয় কাজটাই করে। তাই এখন ব্যালকনিতে চেয়ার নিয়ে বসে কফি খেতে খেতে বৃষ্টি দেখছে আর নানা জল্পনা কল্পনা করে চলেছে।

আর অপরদিকে আদ্রিয়ানও ব্যালকনির রেলিং ধরে দাড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। আদ্রিয়ান কিন্তু দ্বিতীয় কাতারেই পরে, বাইরে বৃষ্টি হলে ঘুমিয়ে থাকার কথা ভাবতেই পারেনা সে। অনিমার চেহারাটা বারবার মনে পরছে তার। ভাগ্যিস সেদিন ঐ লোকগুলো এট্যাক করেছিলো আর ও কিছু না ভেবে ঐ ফ্লাটেই ঢুকেছিলো, তাইতো ও ওর প্রাণভোমরাটাকে পেয়েছে। ওর বাচার তো দুটোই কারণ ছিলো এক ওর গান দুই হলো... কিন্তু এই মেয়েটা এসে সবকিছু বদলে দিলো, ওকে বাচার নতুন এবং প্রধান একটা কারণ দিয়ে দিলো। আচ্ছা কী করছে এখন ওর জানপাখি? ঘুমিয়ে গেছে নাকি বৃষ্টি দেখছে? ফোন করবে একটা? এতক্ষণ যাবত নিজের মনে এসব আওরে নিয়ে ফোনটা হাতে নিলো আদ্রিয়ান। কিছুক্ষণ ভেবে কল করেই দিলো।

নিজের ভাবনায় মগ্ন অনিমা ফোনের আওয়াজ পেয়ে ব্যালকনি থেকে উঠে তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে দেখে আদ্রিয়ানের কল। একটু অবাক হলো ওও, তারপর ব্যালকনির চেয়ারে বসে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল

--- "হ্যালো?" --- "কেমন আছো?"

--- " ভালো, আপনি?"

--- " বেশ ভালো, কী করছো?"

--- "এইতো ব্যালকনিতে বসে আছি।"

আদ্রিয়ান ছোট্ট করে বলল

--- "ওহ।"

অনিমা কিছু না বলে চুপ করে রইলো। অাদ্রিয়ান নিজেই বলল

--- " আচ্ছা তুমি এতো রুড কেনো বলোতো? নিজে থেকেও তো মাঝে মাঝে একটা ফোন করতে পারো?"

অনিমা কী বলবে বুঝতে পারছেনা। এইরকম প্রশ্নের কী উত্তর দেওয়া যায় সেটাই ভেবে পাচ্ছেনা ও। তাই কিছু না বলে চুপ করে রইলো। আদ্রিয়ান হালকা হেসে দিয়ে বলল

--- "উত্তর না থাকলে চুপ করে থাকাটা কী তোমাকে অভ্যাস?"

--- "তো উত্তর না থাকলে আর কী করা যায়?"

--- "ওই টপিকেই অন্য কিছু বলতেই পারতে।"

অনিমা একটু অবাক হলো, অন্য কী বলবে? তাই কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো

--- " লাইক?"

--- " লাইক আমার ঐ প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারতে 'ঠিকাছে এর পর থেকে ফোন করব'।"

অনিমা হেসে দিলো, সত্যিই ছেলেটা অদ্ভুত আর তার চেয়েও অদ্ভূত ওর কথাবার্তা। অনিমা কথার টপিক পালটে বলল

--- "আপনি কী করছেন?"

--- "আমিও ব্যালকনিতেই আছি তবে বসে না দাড়িয়ে।"

--- " ওহ"

--- "তোমার সাথে আবার মিট করতে ইচ্ছে করছে।"

অনিমা চমকে গেলো সাথে একটু অবাক ও হলো। কী চাইছে টা কী এই ছেলে? কী চলছে আদ্রিয়ানের মনে? অনিমা যেটা ভাবছে সেটা কী সম্ভব আদোও? অনিমা এসব কথা ভাবতে ভাবতেই আদ্রিয়ান বলল

--- "কীহলো? কী ভাবছো?"

অনিমা হকচকিয়ে বলল

--- "নাহ ক্ কিছু না।"

আদ্রিয়ান অনিমার এমন কান্ডে হেসে দিলো। হাসতে হাসতেই বলল

--- " আচ্ছা ঠিকাছে, অফিস টাইম শেষ কখন তোমাদের?"

--- " এমনিতে রাত আট টায় শেষ হয় তবে কাজ থাকলে আরো রাত হয়। "

কথাটা শুনে আদ্রিয়ানের মুড একটু অফ হয়ে গেলো, ও মনে মনে ভেবে রেখেছিলো কালকে দেখা করবে অনির সাথে কিন্তু রাত আটটায় পর অফিস শেষ হলেতো সেটা সম্ভব নয়। তাই একটু মন খারাপ নিয়ে নিচু কন্ঠে বলল

--- "ওহ"

অনিমা একটু ইতস্তত করে বলল

--- " কিন্তু কালকে দুপুরের পরে আর কাজ নেই। সকালে শুধু একটা কলেজের যেতে হবে ছাত্ররা মানববন্ধন করেছে সেই নিউস এর জন্যে। ওটা করতে করতে দুপুর হয়ে যাবে তারপর ফ্রি আছি।"

কথাটা শুনে আদ্রিয়ানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। যাক তাহলে কালকে তার প্রেয়সীকে কাছ থেকে দেখতে পাবে সে। তাই খুশি খুশি কন্ঠেই বলল

--- " অবব্ দেন ঐ কলেজের নাম আর এড্রেসটা মেজেস করে দাও। আমি ওখান থেকে তোমাকে পিক করে নেবো?"

অনিমা অবাক হয়ে বলল

--- "পিক করবেন?"

আদ্রিয়ান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিলো

--- " হ্যা। "

--- " বাট.."

অনিমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে আদ্রিয়ান বলল

--- "নো বাট নো কিন্তু। আমি কাল আসছি সো স্কুটি নিয়ে বেরিয়ো না তীব্রকে বলো তোমায় নিয়ে যেতে।"

অনিমা নিজেও চায় যে আদ্রিয়ান আসুক কিন্তু তবুও আদ্রিয়ানকে জ্বালানোর জন্যে একটু দুষ্টুমি করে বলল

--- "আরে আপনি আসলেই তো হবেনা আমি যেতে চাই কী না সেটা শুনবেন না?"

আদ্রিয়ান এবার একটু ধমকের সুরে বলল

--- "আমার যেটুকু শোনার দরকার শুনে নিয়েছি। আমি পারমিশন চাইনি তোমার, কালকে আমি আসছি। আর রইলো তুমি যেতে চাওয়া কী না সেই প্রশ্ন? যেতে না চাইলে তুলে নিয়ে আসবো গট ইট?"

বলেই ফোনটা কেটে দিলো আদ্রিয়ান। অনিমা বেশ অবাক হলো হঠাৎ এভাবে রেগে গেলো কেনো? আর কী বলছিলো যেতে না চাইলে তুলে নিয়ে যাবে? পাগল টাগল হয়ে গেলো নাকি? যা খুশি করুক, শুধুই ধমকালো ব্যাটা খবিশ। বলেই মুখ ফুলিয়ে এড্রেস মেসেজ করে গিয়ে শুয়ে পরল অনিমা।

এদিকে আদ্রিয়ান ফোন কাটার পর বড় বড় কয়েকটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে বিড়বিড় করে নিজেই নিজেকে বলল

--- "কুল আদ্রিয়ান কুল। কী করছিস কী তুই? কন্ট্রল ইউর সেলফ, কন্ট্রল। তোর এই রূপ ওর জন্যে না একদমি না।"

লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে ঠান্ডা করলো আদ্রিয়ান তারপর বলল

--- "ও কী রাগ করেছে? সরি বলতে হবে।"

ফোনটা হাতে নিয়ে কল করতে গিয়েও থেমে গেলো তারপর আপন মনেই বলল

--- " থাক এখন আর ফোনটা করার দরকার নেই কালকে সরাসরি সরি বলে দেবো।"

ফোনটা রেখে রেলিং ধরে দাড়িয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে ভাবল কদিন আগে অবধি মেয়েটাকে চিনতো না সে, কিন্তু এখন ওর সবটা জুরেই অনিমার বসবাস। সত্যিই নিয়তি খুব জটিল একটা ছোট্ট ঘটনা মুহূর্তেই সবকিছু বদলে দেয়। গিটার হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে বসে টুংটাং সুর তুলতে তুলতে চোখ বন্ধ করে অনিমার কথা ভাবতে লাগল ও।

________

তীব্র গাড়ি নিয়ে অনিমার ফ্লাটের সামনে ওয়েট করছে। পাঁচ মিনিটের মাথায় অনিমা দ্রুতপদে এসে গাড়িতে উঠে বসে পরল। তীব্র গাড়ি স্টার্ড দিতে দিতে বলল

--- "কী ব্যাপার বলতো? আজ আমাকে নিতে আসতে বললি?"

অনিমা সিটবেল্ট বাধতে বাধতে বলল

--- " আদ্রিয়ান আসবে আজকে।"

এটা শুনে তীব্র প্রথমে একটু অবাক হলো তারপর মুচকি হেসে বলল

--- " ওয়াহ ভাই। ভালোই তো চলছে তোদের। তা ভাইয়া থেকে জিজু কবে হচ্ছে?"

অনিমা বিরক্ত হয়ে তাকালো তীব্রর দিকে তারপর বিরক্তি নিয়ে বলল

--- "তোরা কেনো এসব ফালতু মজা নিস বলতো?"

তীব্র হেসে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল

--- " ফালতু না কী সেটাতো পরেই দেখা যাবে।"

অনিমা কিছু বললোনা কিছুক্ষণ পর কিছু একটা ভেবে বলল

--- " বাই দা ওয়ে অরু কোথায়?"

--- " ওর বাড়িতে পূজো আছে আজ তাই ছুটি নিয়েছে।"

অনিমা খানিকটা অবাক হয়ে বলল

--- "প্রতিবারতো আমাদের নিয়ে যায়, এবার কী হলো?"

তীব্র হেসে দিয়ে বলল

--- "কারণ এবার ওর দিদা এসছে।"

--- " হ্যা তো? "

--- " আমরা মুসলিম এতে অরুর বাবা মায়ের প্রবলেম না থাকলেও ওর দিদার ব্যাপক প্রবলেম। এবার বুঝলি নাকি আরো কিছু বলতে হবে?"

--- " হুম বুঝলাম। আমরা গেলে বুড়ি ক্যাটক্যাট করবে তাই ডাকেনি, তাইতো?"

--- "হুমম"।

এরপর দুজনেই হেসে দিলো।

________

সারারাত ক্লাবে বন্ধুদের সাথে পার্টি করে সকাল আটটায় বাড়িতে এলো রিক। মিস্টার রঞ্জিত সোফায় বসে কফি খেতে খেতে পেপার দেখছিলেন আর তার পাশেই কবির শেখ বসে কফি খাচ্ছেন। ছেলেকে দেখে মিস্টার রঞ্জিত একটা ছোট্ট শ্বাস নিলেন প্রায়ই সারারাত বাইরে কাটিয়ে আসে ওও। এসব দেখতে দেখতে এখন অভ্যস্ত উনি। রিক ভেতরে যেতে নিলেই মিস্টার রঞ্জিত গম্ভীর কন্ঠে বললেন

--- "শুনে যাও।"

রিক ভ্রু কুচকে তাকালো, এখন ও পুরো মাতাল না হলেও নেশাটা পুরোপুরি কাটেনি। তাই চোখ ঝাপটা দিয়ে ভাঙা গলায় বলল

--- "বলো।"

মিস্টার রঞ্জিত চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন

--- " ঐ মেয়েটার একটা ছবি দিয়ে যেও।"

রিকে একটু অবাক হয়ে বলল

--- " ওর ছবি দিয়ে কী করবে?"

--- " ওকে খুজতে লোক লাগাবো।"

রিক একটু চুপ থেকে রাগী গলায় বলল

--- " তারমানে এতোদিন খোজো নি তুমি ওকে?"

মিস্টার রঞ্জিত হকচকিয়ে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন

--- " অব্ আসলে "

রিক তার বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলল

--- " স্টপ ড্যাড, কোনো এক্সকিউস এর দরকার নেই। আমার ধারণাটাই সত্যি ছিলো, খোজইনি তুমি ওকে?

--- " এখন খুজবো তো।"

--- "আর খোজার দরকার নেই তোমার আমি লোক লাগিয়ে দিয়েছি ওলরেডি। তুমি তোমার কাজ নিয়েই থাকো।"

এটুকু বলে ভেতরে যেতে নিয়েও থেমে গেলো তারপর চেচিয়ে বলল

--- " মম আমি এখন ঘুমোবো আমার খিদে পেলে নিজেই খাবার চাইবো। সো ডাকাডাকি করে কেউ যেনো আমাকে ডিসটার্ব না করে।"

বলেই হনহন করে চলে গেলো রিক। আর মিস্টার রঞ্জিত রাগান্বিত গলায় বলল

--- "ছেলেটা দিন দিন বেশি বেপোরোয়া হয়ে যাচ্ছে। "

মিসেস লিমা হাত মুছতে মুছতে এসে বললেন

--- " ছেলেতো তোমারই তাইনা? তুমি ওর চেয়ে কোন অংশে ভালো? ডক্টর বলেছে বলে মদ খাওয়াটা কমিয়ে দিয়েছো, এছাড়া আর পার্থক্য কী?"

মিস্টার রঞ্জিত দাতে দাত চেপে বললেন

--- "বেশি কথা না বলে চুপচাপ ব্রেকফাস্ট সার্ভ করো।"

মিসেস লিমা চলে গেলেও মিস্টার রঞ্জিত গভীরভাবে ভাবছেন। সত্যিই ছেলের লাগামটা আরো আগেই ধরা উচিত ছিলো ওনার এখন আর কিছু করার নেই ছেলে যে টোটালি তার হাতের বাইরে চলে গেছে সেটা বুঝেছেন উনি।

________

নিউস সুট শেষ করে অনিমা কলেজ গেইটের সামনে দাড়িয়ে আছে। তীব্রর কাজ ছিলো তাই চলে গেছে। এরমধ্যেই আদ্রিয়ানের গাড়ি এসে থামলো ওর সামনে। প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পরে বুঝতে পারলো এটা আদ্রিয়ান। আদ্রিয়ান দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলো, আজকেও ক্যাপ আর সানগ্লাস এর জন্যে সহজে ওকে কেউ চিনবেনা। আদ্রিয়ান দ্রুতপদে এসে অনিমার হাত ধরে বলল

--- "তাড়াতাড়ি চলো কেউ চিনে ফেললে ফেসে যাবো। গার্ড আনিনি আমি"

বলেই অনিমার হাত ধরে গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। দুজনেই চুপ করে আছে, তবে আড়চোখে দুজন দুজনকে দেখে চলেছে। আধ ঘন্টা পর একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়িটা থামালো আদ্রিয়ান, ওখানে ওর বুক করা প্রাইভেট রুমে নিয়ে গেলো অনিমাকে। তবে এই দীর্ঘ সময় দুজনেই চুপ ছিলো। আদ্রিয়ান অনিমার দিকে তাকিয়ে বলল

--- " কী খাবে?"

অনিমা নিচু কন্ঠে বললে

--- " আপনি যা ওর্ডার করেন।"

--- "সিউর?"

--- "ইয়াহ।"

আদ্রিয়ান খাবার ওর্ডার করে দিলো। অনিমা একধ্যানে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে কেনো জানি খুব আনইজি লাগছে তার, আর আদ্রিয়ান গালে হাত দিয়ে একধ্যানে দেখে চলেছে অনিমাকে, ঐ মুখের দিকে সারাজীবণ তাকিয়ে থাকলেও যেনো ক্লান্ত হবেনা সে।

________

রিক খাটে উপোর হয়ে এলোমেলোভাবে শুয়ে আছে তবে ঘুমোচ্ছেনা ঘুম ভেঙ্গে গেছে একটু আগেই এখন শুধু শুয়ে আছে। গভীরভাবে ভাবছে কিছু কী আছে ঐ একটা মেয়ের মধ্যে যে ওর না থাকা ওকে এতো পোড়াচ্ছে? পিঠে কেউ হাত রাখতেই পেছন ঘুরে তাকালো রিক। তাকিয়ে কবির শেখ কে দেখে উঠে বসে চোখ ডলে বলল

--- "বসো।"

কবির শেখ টি- টেবিল থেকে খাবার রিকের দিকে বাড়িয়ে বলল

--- "আগে এটা খেয়ে নাও।"

রিক বিরক্ত হয়ে বলল

--- " খিদে নেই আমার মামা।"

কবির শেখ রিকের কাধে হাত রেখে বললেন

--- "লোক লাগিয়েছো তো পেয়ে যাবে ওকে। নিজের এমন অযত্ন করলে হবে?"

রিক এবার রাগী গলায় বলল

--- "ড্যাড এটা কেনো করল মামা? কেনো খোজেনি ওকে? এটা জেনেও যে আই ডেসপারেটলি ওয়ান্ট হার।"

--- " আচ্ছা বাবাই এসব বাদ দাও আগে খেয়ে নাও। "

রিক খাবারটা ঠেলে সরিয়ে বলল

--- " পারছিনা মামা পারছিনা বাদ দিতে। ওও কতোদিন ধরে নেই আমার কাছে। এতোদিনে ওকে যদি কেউ বিয়ে নেয়? কিংবা ও যদি কাউকে ভালোবেসে ফেলে?"

--- " তাতে কী যার কাছেই থাক তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে ওকে নিয়ে আসবে? সিম্পল!"

--- " নাহ মামা তুমি বুঝছোনা। আমি বারণ করার পরেও কলেজের অনুষ্ঠানে একদিন ও হালকা সেজে গেছিলো, আর ছেলেরাও ওকে দেখে ফিদা হচ্ছিল। তার শাস্তি হিসেবে আমি ওর মুখে গরম পানি ঢেলে দিয়েছিলাম, আমায় পায়ে ধরে অবধি ক্ষমা চেয়েছিলো তবুও মাফ করিনি আমি, দুই দিন অবধি মুখ লাল হয়ে ছিলো ওর জানো? আর সেই জায়গায় ওকে অন্যকেউ টাচ করবে মানতে পারবোনা আমি সেটা। কিছুতেই না। যদি কেউ সেটা করে তাহলে তার শেষ দিন ঘনিয়ে এসছে, আর ওই মেয়েকে কী করবো সেটা ভাবতেও পারবেনা কেউ।"

বলেই উঠে হনহন করে চলে গেলো ওয়াসরুমে আর কবির শেখ ওর যাবার দিকে তাকিয়ে খানিক হেসে বললেন

--- " কী আছে ঐ মেয়ের কপালে কে জানে? আর যদি প্রেমে পরে থাকে তাহলে সেই ছেলের অবস্হা তো...তবে যাই হোক তাতে আমার কী?

________

খাবার সামনে নিয়ে বসে আছে আদ্রিয়ান আর অনিমা। আদ্রিয়ান এবার অনিমার দিকে ইশারা করে বলল

--- " শুরু করো।"

অনিমা শুরু করার পর আদ্রিয়ানও শুরু করল। খাওয়ার সময়ও দুজন কোনো কথা বলেনি। খাওয়া শেষে আদ্রিয়ান টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলল

--- " চলো "

--- " এখন কোথায়? "

--- " ছাদে।"

অনিমা ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো আদ্রিয়ান এর দিকে আদ্রিয়ান সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ওর হাত ধরে ওকে ছাদে নিয়ে গেলো। ছাদে গিয়ে অনিমা অবাক হয়ে গেলো সত্যিই খুব সুন্দর পরিবেশটা, এই ছাদ থেকে আশপাশটা দেখতে অসাধারণ লাগছে। আদ্রিয়ান পকেটে হাত ঢুকিয়ে সাইডে দাড়িয়ে বলল

--- " পছন্দ হয়েছে?"

অনিমা চারপাশটা দেখতে দেখতে বলল

--- " ভীষণ"

--- " চলো সাইডে গিয়ে বসি?"

--- " চলুন"

আদ্রিয়ান আর অনিমা ছাদের পাশে গিয়ে বসলো তবে পা ঝুলিয়ে বসে নি হাটু ভেঙ্গে বসেছে দুজন। বেশ কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ থেকে পরিবেশটা ফিল করছে, হালকা বাতাসে অনিমার চুলগুলো হালকা উড়ছে। নিরবতা ভেঙ্গে আদ্রিয়ান বলল

--- " অনি? "

অনিমা অন্য ধ্যানে মগ্ন ছিলো আদ্রিয়ানের ডাকে হুস আসায় হকচকিয়ে বলে

--- " হুম? "

--- " কালকের জন্যে সরি, আসলে জানিনা কেনো একটু রেগে গেছিলাম। সো সরি ফর মাই বিহেভিয়ার।"

অনিমা দাত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে অবাক হয়ে বলল

--- " আপনি কীসের কথা বলছেন?"

আদ্রিয়ান পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো, এরমধ্যেই ভূলে গেছে? যাক ভালোই হলো ব্যাপারটা ও ততোটাও মনে নেয়নি।

--- " কী হলো বলুন? "

অনিমার ডাকে আদ্রিয়ানের হুস এলো নিজেকে সামলে বলল

--- " ন্ নাথিং "

--- " ওহ"

বলে অনিমা আবারো চারপাশটা দেখায় ব্যাস্ত হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর আদ্রিয়ান বলল

--- "একটা কথা বলবো?"

অনিমা আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল

--- " বলুন?"

--- " তুমি সাজোনা কেনো?"

নিমেষেই অনির মুখটা কালো হয়ে গেলো মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু গলায় বলল

--- "এমনি।"

অনিমা ছলছলে চোখে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, পুরোনো কথা মনে খুব আঘাত করছে। আদ্রিয়ান খানিকক্ষণ চুপ থাকলো তারপর অনিমার হাত ধরে নিজর দুই হাতের মুঠোয় আনলো। অনিমা একটু অবাক হলেও তাকালো না । আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল

--- " অনি? লুক এট মি?"

অনিমা তবুও মাথা নিচু করে আছে। আদ্রিয়ান অনিমার গালে হাত রেখে বলল

--- " তাকাও।"

অনিমা এবার আদ্রিয়ানের দিকে তাকালো সাথে সাথেই ওর চোখে জমে থাকা পানি গড়িয়ে পরল। আদ্রিয়ান অনিমার চোখের পানি আলতো হাতে মুছতে মুছতে বলল

--- " একজন মানুষের জীবনে খারাপ কিছুদিন আসতেই পারে তাই বলে সেটা ধরে সারাজীবণ বসে থাকাটা বোকামী। কারো জন্যে তুমি নিজের জীবণ কেনো বদলাবে? জীবণটা তোমার আর সেটাকে সুন্দর করে তোলার দায়িত্ব ও শুধুই তোমার। বুঝলে? "

অনিমার চোখ দিয়ে আবারো অশ্রু গড়িয়ে পরল। আদ্রিয়ানের কথাগুলো আজ ওর আব্বুর কথা মনে করিয়ে দিলো। ওর আব্বুও ওকে এভাবেই বোঝাতো। আদ্রিয়ান আবারো বলল

--- বেশি না চোখে হালকা কাজল পরে দেখো চোখগুলো আরো মায়াবী লাগবে।

অনিমা কিছু না বলে আদ্রিয়ানের কাধে মাথা রেখে দিলো। আজ সে তার আবেগকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা, খুব কান্না পাচ্ছে, তাই আদ্রিয়ানের কাধে মাথা রেখে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে সে। এই কান্না সুখের নাকি কষ্টের সেটা বলা মুসকিল, তবে কেদে নিজেকে হালকা করছে। অনিমা ওর কাধে মাথা রাখায় আদ্রিয়ান অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করছে, তবে কাদতে বারণ করছেনা কিছু সময় কাঁদা উচিত তাই নিজেও এক হাতে জরিয়ে নিলো ওর প্রাণভোমরাকে।

#চলবে...

.

■■■■■■■■■■■■■■

#পর্ব- ১৩+14+15+16

.

অনিমা কিছু না বলে আদ্রিয়ানের কাধে মাথা রেখে দিলো। আজ সে তার আবেগকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা, খুব কান্না পাচ্ছে, তাই আদ্রিয়ানের কাধে মাথা রেখে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে সে। এই কান্না সুখের নাকি কষ্টের আ বলা মুসকিল, তবে কেদে নিজেকে হালকা করছে। অনিমা ওর কাধে মাথা রাখায় আদ্রিয়ান অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করছে, তবে কাদতে বারণ করছেনা কিছু সময় কাঁদা উচিত তাই নিজেও এক হাতে জরিয়ে নিলো ওর প্রাণভোমরাকে।

অনিমা অনেক্ষণ যাবত কেদেই চলেছে তবে নিঃশব্দে। আদ্রিয়ান এতোক্ষণ কিছু না বললেও এবার আর অনিমার কান্না সহ্য হচ্ছেনা ওর। অনেকক্ষণ ধরে কাদছে মেয়েটা নিরবে কাদলেও কেপে কেপে উঠছে বারবার। আদ্রিয়ান এবার অনিমার মাথাটা ওর কাধ থেকে সরিয়ে দিয়ে সোজা করিয়ে বসিয়ে ওর দিকে ঘুরিয়ে চোখের পানি ভালোভাবে মুছে দিয়ে বলল

--- "ব্যাস অনেক হয়েছে নাও স্টপ ক্রাইং।"

অনিমা নাক টেনে একবার আদ্রিয়ানের দিকে একবার তাকালো। তারপরই ওর মনে পরলো ও এতোক্ষণ কী করছিলো, বুঝতে পেরেই তাড়তাড়ি আদ্রিয়ানের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসে চোখ নামিয়ে নিলো, আর মনে মনে নিজেই নিজেকে বকতে লাগল। কীভাবে আদ্রিয়ানের এতো কাছে গেলো ওও? আদ্রিয়ান নিশ্চই ওকে একটা গায়ে পরা মেয়ে ভাবছে। এসব ভাবতে ভাবতে নিচের দিকে তাকিয়ে হাত কচলাচ্ছে অনিমা। অনিমাকে অবাক করে দিয়ে আদ্রিয়ান নিজেই একটু এগিয়ে এসে অনিমার সাথে লেগে বসল। অনিমা একপলক আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে আবারো চোখ নামিয়ে নিলো। আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল

--- "তুমি আমার দিকে তাকাতে এতো লজ্জা পাও কেনো বলোতো?"

আদ্রিয়ানের এই কথাটায় অনিমা আরো বেশি লজ্জা পেলো। অনিমা যখনি আদ্রিয়ানের দিকে তাকায় তখনি আদ্রিয়ানকে ওর দিকে এমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে, আর সেই দৃষ্টি দেখে ও ভীষণ অসস্তিতে পরে যায়, সাথে লজ্জাও পায়। কিন্তু সে কথা মুখ ফুটে কীকরে বলবে আদ্রিয়ানকে। তাই মাথা নিচু করে আছে। আদ্রিয়ান অনিমার ব্যাপারটা বুঝতে পারলো তাই অনিমার দিকে সুক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ তারপর আবারো অনিমার হাত ধরল। এই স্পর্শটা অনিমাকে অনেকটা নাড়িয়ে দিলো, এরআগেও আদ্রিয়ান ওকে ছুয়েছে কিন্তু এই স্পর্শটায় অন্যকিছু ছিলো, এক অদ্ভুত অনুভূতি মিশ্রিত আছে যেটা অনিমার সারা শরীরে শিহরণ বইয়ে দিচ্ছে। আদ্রিয়ান অনিমার হাতের দিকে তাকিয়েই বলল

---- "প্রত্যেকটা সম্পর্ক মুজবুত হবার জন্যে সেই সম্পর্কের সাথে আরেকটা সম্পর্ক জুড়ে রাখতে হয় সেটা কী জানো?"

অনিমা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো আদ্রিয়ানের দিকে, আদ্রিয়ান অনিমার হাত আরেকটু শক্ত করে ধরে বলল

--- "বন্ধুত্বের সম্পর্ক, যেকোনো সম্পর্কে যদি বন্ধুত্বের সম্পর্কটাও মিশে থাকেনা তাহলে সেই সম্পর্কটা খুব বেশিই দৃঢ় হয় সেটা বাবা-মা আর সন্তানের হোক, শিক্ষক ছাত্রের হোক, ভাই বোনের হোক, বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডের হোক কিংবা স্বামী স্ত্রীর। এতে করে একে ওপরকে বোঝা যায়, একজন আরেকজনের সাথে সব শেয়ার করতে পারে, একে ওপরকে আগলে রাখতে পারে। তবে হ্যা বন্ধত্বের সম্পর্ক থাকলেও আসল সম্পর্কটা মাথায় রাখতে হবে যেমন বাবা মা বাবা মাই হয়, ভাই-বোন ভাই বোনই হয়, স্বামী স্ত্রী স্বামী স্ত্রীই হয়, এই সব সম্পর্কের কিছু আলাদা আলাদা সীমাবদ্ধতা থাকে তাই বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী করে সেই সীমা পেরোনো উচিত না, সেই সীমার মধ্যে থেকেই বন্ধু হওয়া উচিত। শুধু বন্ধু শুধু বন্ধুই হয় তারা সব সীমার উর্ধ্বে।"

অনিমা মুচকি হেসে বললো

--- " যে সম্পর্কের এতো ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারে সব সম্পর্ককে এতো ভালো মূল্য জানে সে নিজেরই পরিবারের থেকে আলাদা আছে?"

আদ্রিয়ান মলিন হেসে বলল

--- " আমিতো ড্যাডের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কই করত চেয়েছিলাম কিন্তু ড্যাড হয়তো শুধু বাবা হয়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করছিলেন।"

অনিমা কিছু বললো না। আদ্রিয়ানেও চুপ করে রইলো। অনিমা বুঝতে পরলো হয়তো আদ্রিয়ানের মন খারাপ হয়ে গেছে, হয়তো পরিবারের সবার কথা মনে পরেছে। আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল

--- " অনি ভবিষ্যতে আমাদের সম্পর্কটা কোন দিকে যাবে আমি জানিনা কিন্তু আমাদের মধ্যে যেকোনো সম্পর্ক শুরু হোক তার আগে আমি চাই আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী হোক। তবে শুধু বন্ধু না আমাদের বন্ধুত্বেও কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে, কেনো সেটা আপাদত জিজ্ঞেস করোনা, সময় এলে নিজেই বলব। সো হবে আমার বন্ধু?"

অনিমা পুরো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আদ্রিয়ান আবরার জুহায়ের ওকে বন্ধু হতে বলছে? আর কোন সম্পর্ক শুরুর কথা বলছে আদ্রিয়ান? বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছাড়া আর কোন সম্পর্ক শুরু করতে চায় ও? অনিমা ওর অবাকের রেশ কাটিয়ে ওঠার আগেই আদ্রিয়ান বলল

--- " কী হলো হবেনা? "

অনিমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজেকে সামলে আদ্রিয়ানের ওর যেই হাত ধরে আছে তার ওপর দিকে হাত রেখে মুচকি হেসে চোখ দিয়ে ইশারা করলো হ্যা হবে। আদ্রিয়ান হেসে দিয়ে হুট করেই জরিয়ে ধরল অনিমাকে, অনিমা তো পুরো জমে গেছে, হার্টবিট থেমে গেছে মনে হয়, নিশ্বাস ও ভারী হয়ে আসছে। আদ্রিয়ান শক্ত করে জরিয়ে ধরে আছে ওকে, কিছুক্ষণ অবাক হয়ে থাকার পর অনিমার মধ্যেও এক অনুভূতি কাজ করতে শুরু করলো, আদ্রিয়ান ওকে জরিয়ে ধরাতে বেশ শান্তি লাগতে শুরু করলো ওর, ভালোলাগতে শুরু করলো। ওও নিজের অজান্তেই মুচকি হেসে আদ্রিয়ানের পিঠে আলতো করে হাত রাখল।

________

আরো দুটো দিন কেটে গেছে এভাবেই, ঐ দিনের পর আদ্রিয়ানের সাথে অনেকটা নরমাল হয়ে গেছে অনিমা। এইদুইদিন আর দেখা করেনি ওরা তবে ফোনে কথা হয়েছে যদিও অনিমা এখনো নিজে থেকে ফোন করেনি, আদ্রিয়ানই করে। অনিমা অফিস থেকে ফিরেই তাড়াহুড়ো করে রেডি হচ্ছে, আদ্রিয়ান পাঁচ মিনিট যাবত নিচে ওয়েট করছে। অফিসে কাজ করছিলো হঠাৎ করেই আদ্রিয়ান মেসেজ করেছে অফিস থেকে ফিরে রেডি হয়ে থাকার জন্যে, কিন্তু কেনো? সেটা এতোবার জিজ্ঞেস করার পরেও বলেনি। বারণ করবে তার‍ও উপায় নেই, কারণ না গেলে তুলে নিয়ে যাবার হুমকি দেয়া হয়েছে তাকে, বেচারি আর কী করব? নীল কুর্তি আর কালো জিন্স পরে চুলটা সাইড সিথি করে আচড়ে নিলো। আয়নার সামনের থেকে সরে যেতে নিয়েও আদ্রিয়ান এর বলা কথাগুলো মনে পরতেই আরেকবার আয়নার দিকে তাকিয়ে ভাবলো সত্যিই কী একটু সাজলে ভালো লাগবে ওকে? কিছুক্ষণ ভেবে অরুমিতার গিফ্ট করা মেকাপ সেট থেকে কাজল টা নিতেই ওর রিকের করা টর্চার গুলোর কথা মনে পরলো, কী নির্মমভাবে মুখে গরম পানি ঢেলে দিয়েছিলো, সেই যন্ত্রণার কথা মনে পরলেও রুহ কেপে ওঠে ওর। নিজেকে সামলে কাজলটা রেখে চলে যেতে নিয়েও থেমে গেলো। আদ্রিয়ানতো ঠিকি বলেছে খারাপ কিছু অতীতের জন্যে নিজের বর্তমান কেনো নষ্ট করবে ও? জীবনটা ওর আর ওর জীবনটা ও নিজের মতো করেই বাচবে। এসব ভেবে নিজেকে সামলে কাজলটা নিয়ে ভাবতে লাগল। হঠাৎ পেছন থেকে আদ্রিয়ান বলে উঠলো

--- "কী ভাবছো?"

অনিমা একটু চমকে পেছনে তাকিয়ে বলল

--- " আপনি? "

--- " তোমার আসতে লেট হচ্ছিলো তাই দেখতে আসলাম কী করছো।"

--- " ওহ।"

আদ্রিয়ান অনিমাকে একবার স্কান করে বলল

--- " তুমিতো রেডিই আছো তাহলে চলো?"

--- " হুম।"

অনিমা কাজলটা রাখতেই আদ্রিয়ানের চোখ পড়ল সেদিকে, অনিমা ব্যাগটা কাধে নিয়ে বেড়তে গেলেই আদ্রিয়ান বলল

--- "ওয়েট।"

অনিমা থেমে গিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো আদ্রিয়ানের দিকে। আদ্রিয়ান কাজলটা হাতে নিয়ে ক্যাপ খুলে অনিমার সামনে গিয়ে দাড়ালো তারপর অনিমার গালে এক হাত রাখল, অনিমা তো পুরো শকড হয়ে তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ানের দিকে আদ্রিয়ান আলতো হাতে অনিমার দু চোখেই হালকা করে কাজল পরিয়ে দিলো। অনিমা এখোনো অবাক হয়েই তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ানের দিকে। আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বক্স থেকে নুড কালার একটা লিপস্টিক নিয়ে অনিমার ঠোটে হালকা ছুইয়ে দিয়ে নিজের আঙ্গুল দিয়েই সুন্দরভাবে পুরো ঠোটে মিশিয়ে দিলো। অনিমার শরীরে জেনো কয়েকশ ভোল্টের শক লাগল আদ্রিয়ান ওর ঠোট স্পর্শ করাতে। আদ্রিয়ান অনিমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হেসে ভ্রু নাচালো, এতে অনিমার ধ্যান ভাঙলো, সাথে সাথেই নিজেকে সামলে চোখ নামিয়ে নিলো, আদ্রিয়ান অনিমাকে ধরে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে বলল

---- " নিজেই নিজেকে দেখো এবার। "

অনিমা আয়নার দিকে তাকালো আদ্রিয়ান ওর দুই বাহুতে হাত রেখে ওর পিঠ ঘেসে দাড়িয়ে আছে, অনিমা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ানের দিকে, আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল

--- " আমাকে দেখতে মিরোর লাগবেনা এমনিই দেখতে পাবে পালিয়ে যাচ্ছিনা, আপাদত নিজেকে দেখো।"

আদ্রিয়ানের কথায় অনিমা বেশ লজ্জা পেলো। লোকটা এমন কেনো? শুধু শুধুই একটা অসস্তিকর অবস্হায় ফেলে দেয় ওকে। অনিমা মাথা নিচু করে আছে আদ্রিয়ান অনিমার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল

--- "দেখো নিজেকে।"

অনিমা আস্তে আস্তে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালো। সত্যিই এটুকু সাজেই একটু অন্যরকম লাগছে ওকে, কিছুক্ষণ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো ওও। আদ্রিয়ান আয়নায় তাকিয়েই বলল

--- "তুমি এতো শর্ট কেনো?"

অনিমা চোখ ছোট ছোট করে আদ্রিয়ানের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল

---- "আমি ৫'৩" ওকে?"

আদ্রিয়ান অনিমার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়েই বলল

--- "তাতে কী? দেখো তোমার মাথাটা আমার কাধের নিচে এসে পরে। তো তুমিতো শর্টই তাইনা?"

অনিমা একটা মুখ ভেংচি দিয়ে বলল

--- " হুহ আমার হাইট ঠিকিই আছে এভারেজের চেয়ে এক ইঞ্চি বেশি, বাট আপনার টাই ঠিক নেই এভারেজের চেয়ে অনেক বেশি।"

আদ্রিয়ান অনির বাহু ছেড়ে বলল

--- "হ্যা এখন তো এসবই বলবে লিলিপুট একটা।"

অনিমা দুই কোমরে হাত দিয়ে বলল

--- " আম লিলিপুট?"

আদ্রিয়ান হাত ভাজ করে মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে বলল

--- "লিলিপুটই তো।"

অনিমা রেগেমেগে বলল

--- "অাপনি কী হ্যা? তালগাছ একটা।"

অাদ্রিয়ান অবাক হয়ে বলল

--- " তালগাছ?"

--- "জ্বী। আমি যদি লিলিপুট হই তো আপনি তালগাছই।"

আদ্রিয়ান একটু অবাক হলো,এইকয়দিনে অনিমাকে কখন এতো চঞ্চলভাবে কথা বলতে দেখেনি। অনিমার এইরূপ দেখে ও খুশিও হলো যাক ও ওর কথা রাখতে পারছে, অনিমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা চঞ্চল মেয়েটাকে বের করতে পারছে আসতে আসতে, এসব ভেবে আদ্রিয়ান হেসে দিয়ে বলল

--- " আচ্ছা মহারাণী চলুন এবার।"

--- " হুম।"

অনিমা নিজেও অবাক, কতোদিন পর কারো সাথে এভাবে কথা বলল ও নিজেই জানেনা। এরপর দুজনে মিলেই বেড়িয়ে পরলো। গাড়িতে উঠে আদ্রিয়ান গাড়ি স্টার্ট দিতেই অনিমা বলল

--- " যাচ্ছি কোথায়?"

আদ্রিয়ান সামনের দিকে তাকিয়েই গাড়ি চালাতে চালাতে বলল

--- "জানিনা।"

অনিমা আবাক হয়ে বলল

--- "মানে?"

আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল

--- " লং ড্রাইভে যাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি জানা নেই। যেদিকে যেতে ইচ্ছে করবে সেদিকেই যাবো।"

আদ্রিয়ানের কথা শুনে অনিমা হেসে দিয়ে বলল

--- " আপনি সত্যিই একটা পাগল।"

--- " আই নো।"

অনিমা মনে মনে ভাবছে একসময় এমন পাগলামী তো ওও করতো। মাঝরাতে আব্বুকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে লং ড্রাইভে যাওয়া আইসক্রিম খাওয়া। কিন্তু এখন নিজেকেও কেমন হারিয়ে ফেলেছে, ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস নিলো। বেশ দুই ঘন্টা ড্রাইভ করার পর আদ্রিয়ান বলল

--- " আইসক্রীম খাবে?"

অনিমা ভাবছে লং ড্রাইভে এসে আইসক্রীম খাওয়াতো ওর অভ্যাস ছিলো, কিন্তু আদ্রিয়ানের মাথায় কীকরে এটা আসলো? শুধুই কাকতলীয়? অনিমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই আদ্রিয়ান গাড়ি থামালো এক আইসক্রীম পার্লারের সামনে তারপর অনিমার হাত ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলো। অবাক করা বিষয় গোটা পার্লারে ওরা ছাড়া আর কোনো কাস্টোমার নেই। আদ্রিয়ান যেতেই একটা লোক উঠে এসে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল

--- " আরে স্যার আপনি? এসে গেছেন? আপনার কথামতো সব রেডি করে রেখেছি।"

আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল

--- "গুড। একটা চকলেট আইসক্রীম, আর একটা ভ্যানিলা।"

--- " ওকে স্যার।"

আদ্রিয়ান অনিমার হাত ধরেই ওকে নিয়ে একটা টেবিলে বসল। অনিমাতো কখন থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ানের দিকে দিকে। অনিমাকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হেসে বলল

--- " এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো?"

--- " এখানে আর কোনো কাস্টোমার নেই কেনো?"

আদ্রিয়ান দুইহাত এককরে এক হাতের আঙ্গুলের মধ্যে আরেক হাতের আঙ্গুল ঢুকিয়ে বলল

--- " আজ রাতের জন্যে পুরোটা বুক করেছি।"

অনিমা তো আরেকদফা অবাক হলো, এইটুকু সময়ের জন্যে গোটা রাত? তবুও নিজেকে সামলে বলল

--- " আপনি কীকরে জানলেন আমি চকলেট আইসক্রীম পছন্দ করি?"

আদ্রিয়ান হেসে দিয়ে বলল

--- " সিম্পল! তুমি চকলেট পছন্দ করো, আর যে চকলেট এতো পছন্দ করে সে চকলেট আইসক্রীম তো পছন্দ করবেই।"

অনিমা কিছু বলবে তার আগেই একজন লোক এসে আইসক্রীম দিলো টেবিলে তারপর আদ্রিয়ান এর দিকে তাকিয়ে বলল

--- " স্যার আমি আপনার সব গান শুনি, খুব বড় ভক্ত আমি আপনার, একটা সেলফি নিতে পারি প্লিজ?"

আদ্রিয়ান উঠে দাড়িয়ে হেসে বলল

--- " সিউর। "

ছেলেটার সাথে সেলফি তুলার পর, দুজনে আইসক্রীম খেয়ে কিছুক্ষণ গাড়ি করে ঘুরলাম। ফ্লাটের সামনে গাড়ি থামানোর পর আমি নামতে গেলেই আদ্রিয়ান হাত ধরে বলল

--- " এইযে ম্যাডাম সাজতে বলেছি বলে যে সেজেগুজে স্টাইল করে ঘুরে বেরাবেন সেটা কিন্তু হবে না। আজ ঘুরতে যাচ্ছি তাই একটু লিপস্টিক দিতে দিয়েছি। রেগুলার সাজবে না কিন্তু, তবে হ্যা কাজলটা রেগুলার দিও, এরবেশি সাজার পারমিশন দেই নি আমি।"

অনিমা এতোক্ষণ হেবলার মতো তাকিয়ে আদ্রিয়ানের কথা শুনছিলো লাস্ট কথাটা শুনে ভ্রু কুচকে বলল

--- " পারমিশন?"

আদ্রিয়ান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল

--- " ইয়েস পারমিশন।"

অনিমা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল

--- " যদি না মানি?"

আদ্রিয়ান এবারের খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো

--- " কীকরে মানাতে হয় সেটা আমি জানি। এখন বাই।"

বলে অনিমার হাত ছেড়ে দিলো অনিমা নামতেই ওকে হাত নেড়ে চলে গেলো আদ্রিয়ান। অনিমা একটু অবাক হলো সাথে ভালোও লাগলো আদ্রিয়ানের ওর প্রতি এই অধিকারবোধ দেখে। অন্য একজনও তো ওর ওপর অধিকার খাটাতো, আদ্রিয়ানও খাটাচ্ছে কিন্তু দুজনের অধিকার খাটানোর পদ্ধতিটা কতোটা ভিন্ন। একজন ওকে নিজের সম্পত্তি মনে করে আরেকজন... আরেকজন কী? কী মনে করে আদ্রিয়ান আমাকে? ওও কী রিকের মতো ওকে নিজের সম্পত্তি মনে করবে? যার সাথে যা খুশি করা যায়। এসব ভাবতে ভাবতেই ফ্লাটে ঢুকলো অনিমা।

________

বারে বসে নিজের মতো করে আলাদা এক জায়গায় ড্রিংক করে চলেছে রিক। ওর বন্ধুরা একটু দূরেই গার্লফ্রেন্ডস বা অন্য মেয়েদের সাথে ডান্স করছে। বেশ কয়েকজন স্টাইলিস্ট মেয়ে এসে ডান্স করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে কিন্তু রিক ইগনোর করে গেছে, এসবের প্রতি এইমুহূর্তে কোনো ইন্টারেস্ট নেই ওর। হঠাৎ একটা মেয়ে এসে রিকের কাধে হাত রেখে বলল

--- "হাই হানি? লেটস হ্যাভ আ ডান্স?"

রিক একটু বিরক্তি নিয়ে হাতটা সরিয়ে বলল

--- " নট ইন্টারেস্টেড।"

মেয়েটি নাছোড়বান্দা। ও রিকে সামনে এসে এক হাত কাধে আর আরেক হাত গালে দিয়ে বলল

--- " হোয়াই বেবি? কাম অন? লেটস ইনজয়।"

রিক ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে রাগী গলায় বলল

--- " আই সেইড নো। এন্ড ডোন্ট ডেয়ার টু টাচ মি এগেইন।"

কিন্তু মেয়েটি বেহায়ার মতো এটেনশন পেতে রিকের গালে কিস করে দিলো রিক সাথে সাথেই মেয়েটাকে সর্বশক্তি দিয়ে একটা চড় মেরে দিলো। এতো জোরে মেরেছে যে মেয়েটা ফ্লোরে পরে গেলো। সাথে সাথেই সব মিউসিক থেমে গেলো চারপাশ ঠান্ডা হয়ে গেলো। রিকের বন্ধুরা ছুটে এসে বলল

--- " কী হয়েছে?"

রিক দাত করমর তাকিয়ে চিৎকার করে বলল

--- "এই ডাসবিনটাকে সরা আমার সামনে থেকে। এইসব চিপ মেয়েদের সাহস কীকরে হয় রিক চৌধুরীকে কিস করার?"

মেয়েটা উঠে জান বাচিয়ে পালালো। রিক এখোনো রাগে ফুসছে। একটা চেয়ারে বসে সরাসরি বোতলে চুমুক দিতে লাগল। ঐ মেয়েটার গলা কেটে দিতে ইচ্ছে করছিলো ওর। যেখানে দুই বছর অনিমাকে নিজের আয়ত্তে রেখেও ওকে ঐরকম উদ্দেশ্যে ছোয় পর্যন্ত নি সেখানে এই মেয়েটা এসব ভাবে কোন সাহসে। ওর বন্ধুরা ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। ওরাও অবাক যে ছেলের তিন বছর আগেও প্রতিদিন আলাদা আলাদা মেয়ে লাগত এখন সে কোনো মেয়েকে সহ্যই করতে পারেনা? এটাও সম্ভব।

________

অন্ধকার একটা রুমে বসে দাবা কোট সামনে নিয়ে দুইহাত থুতনির নিচে রেখে একদৃষ্টিতে প্রতিটা গুটি দেখছে, আর খুব গভীরভাবে কিছু ভেবে চলেছে আদ্রিয়ান। কিছুক্ষণ পর একটা ছেলে এসে বলল

--- "স্যার আসবো?"

আদ্রিয়ান দাবার গুটির দিকে তাকিয়েই বললেন

--- "এসো অভ্র"

অভ্র হলো আদ্রিয়ানের পার্সোনাল এসিস্টেন, আদ্রিয়ানের ব্যাক্তিগত প্রফেশনাল সব কাজেই সাহায্য করে ও। অভ্র ভেতরে এসে বলল

--- "স্যার ম্যামের সম্পর্কে যা যা ইনফরমেশন চেয়েছেন সব এনেছি।"

আদ্রিয়ান এবারেও গুটির দিকে তাকিয়ে বলল

---- "শুরু করো।"

---- " স্যার ম্যাম লালবাগ থাকতেন ওনার বাবার সাথে, ওনার মা জন্মের পরেই মারা যান। ওনি যখন এইচ এস সি এক্সাম শেষ করেন তার কিছুমাস পরেই কোনো এক কারণে ওনার বাবা সুইসাইড করেন কিন্তু কারণটা আজও কেউ জানেনা।"

এটুকু বলে অভ্র থেমে যায় আদ্রিয়ান বলল

--- "বলতে থাকো।"

--- " এরপর থেকে উনি ওনার মামা বাড়িতেই থাকতেন। কিন্তু চার বছর পর কোনো এক কারণে উনি ওখান থেকে পালিয়ে আসে। যদিও ওনার মামা মামি ছড়িয়েছেন যে উনি কারো সাথে পালিয়ে গেছেন।"

এটা শুনে আদ্রিয়ান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। যার অর্থ অভ্র বুঝলোনা। আদ্রিয়ান অভ্রর দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো

--- "ওর বাবার নাম কী?"

--- " হাসান কোতয়াল।"

আদ্রিয়ান চমকে গিয়ে তাকালো অভ্রর দিকে, অবাক হয়ে বলল

--- " চিফ রিপোর্টার হাসান কোতয়াল?

--- " জ্বী স্যার।"

আদ্রিয়ান আবারো জিজ্ঞেস করল

--- " আর ইউ সিউর?"

--- " ইয়েস স্যার।"

আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাপা গলায় বলল

--- " অব্ ইউ ক্যান গো।"

অভ্র চলে গেলো আর আদ্রিয়ান মাথা নিচু হাত মুঠো করে বসে আছে। চোখ দুটো ছলছল করছে, তবে মুখে হালকা হাসি আছে। কোনোরকমে নিজেকে সামলে একটা শ্বাস নিয়ে বলল

--- " ইয়েস। আই ওয়াজ রাইট। আমার কোনো ভূল হয়নি। এটলাস্ট আই হ্যাভ ফাউন্ড ইউ।"

#চলবে...

#পর্ব- ১৪

.

সারারাত বৃষ্টির পর সকালের নতুন সূর্যের সিদ্ধ,নরম,সোনালী আলোয় চারপাশ উজ্জ্বল হয়ে আছে। বৃষ্টিতে ভেজা সবুজ গাছপালা, ঘাস এর ওপর নতুন সেই রোদের আলো পরায় সবুজ প্রকৃতির সবুজভাব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যালকনিতে বসে কফির মগে চুমুক দিয়ে বর্ষার এই মুগ্ধকর সকালটাকে উপভোগ করছে অনিমা তবে বেশিক্ষণ এই পকৃতি বিলাশ করার সময় নেই তার অফিস যেতে হবে। কফিটা শেষ করে রেডি হয়ে নেয় অনিমা। তারপর আয়নায় তাকাতেই আদ্রিয়ানের ওকে সাজিয়ে দেবার দৃশ্যটা চোখে ভেসে ওঠে, নিজের অজান্তেই ঠোটে হাসি ফুটে ওঠে ওর। কাজল হাতে নিয়ে চোখে হালকা করে লাগিয়ে নেয়। তারপর বেড়িয়ে পরে অফিসের উদ্দেশ্য।

____________

তীব্র অফিসে ঢুকে কম্পিউটার অন করতে না করতেই অরুমিতা এসে বসল। অফিস টাইম শুরু হতে এখোনো পনেরো মিনিট বাকি আছে। তীব্র অরুমিতার দিকে তাকিয়ে বলল

---- " তুই অনিকে কিছুদিন যাবত লক্ষ করছিস?"

অরুমিতা কম্পিউটার থেকে চোখ সরিয়ে বলল

---- "হ্যা রে। ইদানিং কেমন বদলে যাচ্ছে। আগের মতো মনমরা হয়ে থাকেনা, মনের দিক থেকে খুশি লাগছে ওকে। আর এই খুশির কারণ কিন্তু এ.ডি।"

তীব্র মুচকি হেসে বলল

---- "হুম ওর লাইফে ম্যাজিশিয়ান মতো এসেছেন উনি, এসেই ম্যাজিক করে দিয়েছে। এখন শুধু এটাই চাওয়া উনি যাতে ওর এলোমেলো জীবনটাকে সুন্দরভাবে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারে।"

অরুমিতা মুখে চিন্তার ছাপ এনে বলল

---- " কিন্তু উনি এতো বড় একজন সেলিব্রিটি হয়ে হঠাৎ অনির পেছনে কেনো পরলো বলতো? আমরা যেটা ভাবছি সেটা যদি না হয়, যদি অনি এডির সাময়িক একটা মোহ হয় তো? মেয়েটা তো আবার কষ্ট পাবে। এমনিতেই জীবণে কম কষ্ট সহ্য করেনি ওও। যে বয়সে প্রতিটা মেয়ে মুক্ত পাখির মতো উড়ে জীবণটাকে উপভোগ করে সেই জায়গায় ওকে চার দেয়ালে বন্দি হয়ে এক জানোয়ারের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে ওকে। আর ওর মামা মামী তো আছেই, তারওপর ওর মামাতো ভাই তো ওকে..."

কথাটা শেষ করতে পারলোনা অরুমিতা, এসব ভাবলেও ওর হাড় হিম হয়ে আসে, ঐ মেয়েটা এসব কীভাবে সহ্য করে কে জানে? তীব্রও একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল

---- "সেটা ঠিক কিন্তু আমার এডি কে দেখে মনে হয়নি উনি অনির মোহে পরেছে। ওনার চোখে অন্যরকম অনুভূতি দেখেছি আমি।"

---- " সেটাই যেনো হয়। তবে..."

এরমধ্যেই অনিমা চলে এলো, অনিমাকে আসতে দেখে থেমে গেলো ওরা। অনিমা এসে বসতেই অরু অনির মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলো। আনিমা অরুর দিকে তাকিয়ে ওর দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুচকে বলল

---- " কী হলো? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?"

অনিমার এই কথা শুনে তীব্রও অরুর দিকে তাকালো অরুকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে, অরুর দৃষ্টি অনুসরণ করে অনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে তীব্রও থমকে গেলো। অনিমা ওদের দুজনের এই চাহনিতে বিরক্ত হয়ে বলল

---- "হোয়াট?"

অরু হা করে তাকিয়ে থেকেই বলল

---- "তুই চোখে কাজল দিয়েছিস?"

অনিমা এবার বুঝলো কেনো ওরা এভাবে তাকিয়ে আছে। ওদের রিয়াকশন দেখে এবার খুব হাসি পাচ্ছে অনিমার তবুও হাসিটা চেপে রেখে মুখে বিরক্তি নিয়ে বলল

---- " হ্যা তো?"

তীব্র নিজেকে সামলে নিয়ে বলল

---- " না মানে তোকেতো কখনো সাজতে দেখিনি?"

অনিমা ঠোঁট চেপে নিজের হাসিটাকে আটকে বলল

---- " দেখিসনি এখন দেখে নে? এই সামান্য কারণে এভাবে তাকিয়ে থাকতে হবে? আমি তো মনে করেছি আমার পেছনে ডানা গজিয়েছে আর তাই তোরা হা করে তাকিয়ে আছিস। হুহ"

অরুমিতা আর তীব্র হা করে তাকিয়ে আছে। এই তিন বছরের অনিমাকে এভাবে কথা বলতে দেখেনি ওরা। অনিমা এবারেও ওদের অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলল

---- " আবার কী হলো?"

অরুমিতা আর তীব্র পুরো শকে আছে। কিছুক্ষণ পর অরুমিতা উঠে গিয়ে অনিকে জরিয়ে ধরল, তীব্র পেছন থেকে দুজনকেই হাগ করলো। ওদের দুজেরই চোখের কোণেই পানি আছে, ওরাতো এভাবেই দেখতে চেয়েছিলো অনিমাকে। অনিমার নিজেরও চোখের কোণেও পানি চলে এসছে, কে বলেছে ওর কেউ নেই? এমন দুজন বন্ধু থাকতেও কেউ একা হতে পারে?

___________

আদ্রিয়ান ভেতরে গানের রেকর্ডিং করছে। আদিব আর আশিস বাইরে বসে কাচের গ্লাস এর ভেতর দিয়ে আদ্রিয়ানকে দেখছে আর ওর গান শুনছে। গান কম্প্লিট করে আদ্রিয়ান ডিরেক্টরের দিকে তাকিয়ে থামবস আপ দেখালো, সকলেই তালি দিলো ডিরেক্টর হেসে হেডফোন নামিয়ে আদ্রিয়ানকে বেরিয়ে আসতে ইশারা করল, আদ্রিয়ান বাইরে বেড়িয়ে আসতেই ডিরেক্টর আলতো করে হাগ করে বলল

---- "ফ্যানটাস্টিক ইয়ার।"

আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল

---- "থ্যাংক ইউ।"

এরপর আদ্রিয়ানকে ছেড়ে বলল

---- " লাঞ্চের ব্যবস্থা করেছি, খেয়ে যাবে কিন্তু।"

---- " আরেহ বাট এসবের কী দরকার ছিলো?"

---- " ছিলো ছিলো সবাই মিলে একসাথে লাঞ্চ করব সমস্যা কী?"

আদ্রিয়ান হেসে বলল

---- " আচ্ছা।"

এরপর সবাই মিলে আদ্রিয়ানকে কনগ্রাচুলেট করল। আদ্রিয়ান গিয়ে আদিব আর আশিসের সামনে গিয়ে বসল। আদিব হেসে বলল

---- " বাহ ভাই কী গাইলি? সিরিয়াসলি তোর গান শুনলে অন্য কোথায় হারিয়ে যাই।"

আশিস ও সায় দিয়ে বলল

---- " হ্যা জাদু আছে তোর গলায়।"

আদ্রিয়ান ওদের দিকে তাকিয়ে বলল

---- " হয়েছে, থাম এবার। "

অাশিস বিরক্ত হয়ে বলল

---- "তুই এমন কেনো বলতো? লোকে প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে আর তুই প্রশংসা শুনতেই চাসনা।"

---- " আমি এমনি।"

অাদিব ভাইয়া ঠেস মেরে বলল

---- " হুমম কিন্তু অনিমা প্রশংসা করলেতো ঠিকি ভালো লাগতো।"

আদ্রিয়ান ভ্রু কুচকে তাকালো। অাশিসও পিঞ্চ করে বলল

---- "হ্যা হ্যা সেই তো, অনিমার সামনে তুই তো পুরো একশো আশি ডিগ্রি এঙ্গেলে চেঞ্জ হয়ে যাস। জঙ্গলের শের শান্ত হয়ে যায়।"

আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল

---- "সিংহ হিংস্র হয় শুধু শিকার ধরার সময়, এসব ছাড় তুই তোর কথা বল অরুমিতাকে ফোন করে বিরক্ত কেনো করিস?"

এটা শুনে আদিব চমকে তাকালো আশিসের দিকে। আশিস হকচকিয়ে গিয়ে বলল

---- " ত্ তুই এসব জানলি কিকরে?"

আদিবও অবাক হয়ে বলল

---- "হ্যা আমি বুঝতে পারলাম না তুই বুঝলি কীকরে বলতো?"

আদ্রিয়ান বাকা হেসে বলল

---- " এইটুকু ইনফরমেশন জোগাড় করার জন্যে আদ্রিয়ান আবরার জুহায়ের বা হাতও লাগেনা চোখের ইশারাই যথেষ্ট।"

আদিব আর আশিস হতাশাজনক একটা চাহনী দিলো নিজেদের ভূলের জন্যে, কাকে কী জিজ্ঞেস করছে? ওরা ভূলেই গেছিলো দিস ইজ আদ্রিয়ান আবরার জুহায়ের। কী মনে করে আশিস বলল

---- "ভালো কথা মনে করেছিস। এখনি ফোন দিচ্ছি।"

বলেই একটা চোখ টিপ মারলো। আদিব ভাইয়া ওর পিঠে চাপড় দিয়ে বলল

---- " শালা মানুষ হলিনা তুই।"

আদ্রিয়ান এবার একটু সিরিয়াসুখ করে বলল

---- " দেখ অরুমিতা মেয়েটা কিন্তু ভালো তোর ওই গার্লফ্রেন্ডদের মতো একদমি না, তাই যা করবি ভেবে করিস।"

আশিস মুচকি হেসে বলল

---- " আরেহ ভাই ডোন্ট ওয়ারি। আমার বাকিসব গার্লফ্রেন্ডস আর ওও আমার কাছে আলাদা।"

---- " হুম শুধু আলাদা ভাবলেই হবেনা। আলাদা ভাবে মূল্যও দিতে জানতে হবে।"

---- " হুমম।"

বলে ওদের সামনেই অরুকে ফোন লাগালো।

হঠাৎই অরুমিতার ফোন বেজে উঠলো, অরুমিতা ফোনটা হাতে তুলেই ভ্রু কুচকে ফেলল, বিরক্ত হয়ে বলল

---- "উফফফ কোন ফাসিসের চক্করে ফাসলাম।"

এটা শুনে অনিমা আর তীব্র অবাক হয়ে একসাথে বলল

---- " হু ইজ ফাসিস?"

অরুমিতা থতমত খেয়ে বললো

----- "অব্ ওই অাশিস আরকি।"

এটা শুনে অনিমা আর তিব্র একে ওপরের দিকে বোকার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেই শব্দ করে হেসে দিলো। অরুমিতা বিরক্ত হয়ে বলল

---- "হাসিস না তো, জালিয়ে খেলো আমাকে।"

তীব্র হাসি থামিয়ে বলল

---- " তোকে এখনো ফোন করে?"

অরুমিতা ভ্রু কুচকে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। অনিমা হাসতে হাসতেই বলল

---- " ধর ফোনটা।"

অরুমিতা অসহায় চোখে একবার ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে অফিসের ব্যালকনিতে চলে গেলো। অনিমা মুচকি হেসে তীব্রর দিকে তাকিয়ে বলল

---- "কী বুঝলি? "

তীব্র আঙ্গুল কপালে স্লাইড করে বলল

---- " এটাই যে তোর আর এডির মধ্যে কিছু হবার আগে এদের মধ্যে কিছু একটা হয়ে যাবে।"

অনিমা চোখ ছোট ছোট করে তীব্রর দিকে তাকিয়ে বলল

---- " আচ্ছা?"

তীব্র মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে বলল

---- " হ্যা ঠিকি বললাম।"

অনিমা উঠে দাড়িয়ে স্লিভ হালকা গুটিয়ে বলল

---- " বলাচ্ছি তোকে ঠিক।"

বলেই তীব্রকে মারতে শুরু করলো। আর তীব্র বেচাড়া নিজের ব্যাগ দিয়ে ডিফেন করার চেষ্টায় আছে।

______

রিক শাওয়ার নিয়ে চুল মুছতে মুছতে বেড়িয়ে এসে দেখে কবির শেখ বসে আছে। ও তাওয়াল টা রেখে খাটে বসে বলল

---- "হঠাৎ এইসময় কিছু বলবে?"

---- " খোজ পেয়েছো মেয়েটার কোনো?"

রিক খাটে হেলান দিয়ে বলল

---- " সবেতো লোক লাগিয়েছি, কয়েকটা দিন লাগবে তো"

---- " হুমম। তো পেয়ে গেলে কী করবে ওর সাথে?"

---- " আগেতো পাই।"

কবির শেখ হেসে বললেন

---- " পাবেতো অবশ্যই পালিয়ে যাবে কোথায়?"

---- "এক্সাক্টলি। আমিও দেখতে চাই কতোদিন পালাতে পারে আমার হাত থেকে। আর এবার আমার হাতে পরলে ওর কপালে ভীষণ দুঃখ আছে।"

---- " তো লাঞ্চ করবেনা?"

---- " যাও আসছি।"

বলে রিক টিশার্ট পরতে পরতে ব্যালকনিতে চলে গেলো। সেদিকে তাকিয়ে বাকা হেসে কবির শেখ ভাবলেন, ছেলেটা ঠিক সেরোকমি তৈরী হয়েছে যেমন সে বানাতে চেয়েছিল। রিকই তো ওনার তুরুপের তাস। আর রিকের একমাত্র দুর্বলতা হচ্ছে ঐ মেয়ে আর সেইজন্যে ঐ মেয়েকে খুজে পাওয়াটা ওনারও খুব দরকার।

___________

অনিমার আজ কাজের প্রেশারটা একটু বেশিই ছিলো। ক্লান্ত হয়ে বেডে শুতে যাবে তখনি ফোন এলো। ভ্রু কুচকে নাম্বারটা দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত ওর মুখেও হাসি ফুটে উঠলো। মুচকি হেসে ফোনটা রিসিভ করে বলল

---- "হ্যালো।"

অনিমার ক্লান্ত কন্ঠ যেনো আদ্রিয়ানকে আরেকবার ঘায়েল করল। কারো ক্লান্ত কন্ঠও এতোটা সুন্দর হতে পারে জানা ছিলোনা ওর। তবুও নিজেকে সামলে মুচকি হেসে বলল

---- " কী ব্যাপার ম্যাডাম খুব টায়ার্ড মনে হচ্ছে?"

---- " হুমম আজ একটু প্রেশার ছিলো।"

---- " আচ্ছা তাহলে রেস্ট করো।"

---- " না না আপনার কিছু বলার থাকলে বলুন।"

---- " নাহ তেমন কিছু না। ডিনার করেছো?"

---- " হুম"

---- " কী খেলে? "

অনিমা পরলো মহা ফেসাদে। এখন কীকরে আদ্রিয়ানকে বলবে ওও কী খেয়েছে। অনিমার উত্তর না পেয়ে আদ্রিয়ান বলল

---- " কী হলো বলো?"

---- " অব্ কফি আর বিস্কিট।"

আদ্রিয়ান অবাক তো হলোই সাথে রেগেও গেলো। রাগী গলায় বলল

---- "সারারাত শুধু এগুলো খেয়ে থাকবে?"

অনিমা ইতোস্তত করে বলল

---- " ইয়ে আসলে রাতে রান্না করার মুড থাকেনা।"

---- " ইউ আর রিয়েলি ইমপসিবল। "

অনিমা কিছু বললোনা আদ্রিয়ান একটু থেমে বলল

--- "আচ্ছা দেখছি কী করা যায়।"

অনিমা অবাক হয়ে বলল

--- " কী করবেন?"

---- " সেটা তুমি না জানলেও হবে। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

অনিমা একটু অবাক হয়ে বলল

---- " হুম করুন?"

---- " আঙ্কেল মানে তোমার বাবার নাম কী ছিলো?"

হঠাৎ এইরকম প্রশ্ন শুনে অনিমা বেশ অবাক হলো তবুও বলল

---- " চিফ রিপোর্টার হাসান কোতয়াল।"

---- " ওহ তোমার বাবাও রিপোর্টার ছিলেন, ওনাকে তো প্রায় অনেকেই চেনে, কিন্তু উনি মারা গেলো কীকরে?

অনিমা নিচু কন্ঠে বলল

---- " খুন হয়েছে আমার আব্বু।"

---- " হোয়াট? কিন্তু পাবলিক ইনফরমেশন তো বলছে উনি সুইসাইড করেছেন?"

অনিমা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল

---- " সব শোনা কথা সত্যি হয়না।"

---- " হুমম। কিন্তু তুমি বলেছিলে তুমি তোমার মামার বাড়িতে থাকতে, তাহলে চলে এলে কেনো ওখান থেকে? কী এমন হয়েছিলো?"

কিন্তু অনিমার কোনো উত্তর না পেয়ে আদ্রিয়ান বলল

---- " অনি? অনি? "

কিন্তু ডেকেও অনিমার কোনো সারা না পেয়ে বুঝলো ও ঘুমিয়ে গেছে। অনিমার এই বাচ্চামোতে হেসে দিলো আদ্রিয়ান, তারপর মনে মনে বলল

---- " জানিনা কী এমন হয়েছিলো তোমার সাথে যে নিজের মামার বাড়ির চেয়েও ফুটপাত তোমার কাছে বেশি নিরাপদ মনে হয়েছিলো। আমি যদি আগেই তোমাকে পেয়ে যেতাম হয়তো তোমার সাথে এসব হতো না, তবে যাই হয়ে থাক, এখন যখন তোমাকে খুজে পেয়েছি আমি আমার দেয়া কথা রাখবো। নিজের সবটুকু দিয়ে তোমায় আগলে রাখবো।

একটু বলে ছলছল চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল

---- " আই প্রমিস।"

.

#চলবে...

#পর্ব- ১৫

.

ফোনটা আবারো কানে নিলো আদ্রিয়ান। অনিমার নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে আদ্রিয়ান, কেমন একটা ঘোর কাজ করছে ওর মধ্যে ফোনটা রাখতে ইচ্ছে করছেনা। ব্যালকনির দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলো ও, মন দিয়ে অনিমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের প্রতিটা প্রশ্বাসের শব্দ শুনছে, অদ্ভুত এক প্রশান্তি হচ্ছে ওর। আদ্রিয়ান ঠিক করেই নিয়েছে আজ অনিমার নিশ্বাসের শব্দ শুনেই রাতটা কাটিয়ে দেবে। তাই কানে ফোন নিয়ে চোখ বন্ধ একমনে শুনেই চলেছে, কিন্তু মাঝরাতে অনিমার গলার স্বর পেয়েই চমকে চোখ খুললো। ভালোভাবে শোনার চেষ্টা করেই বুঝতে পারলো ঘুমের ঘোরেই কথা বলছে অনিমা। মেয়েটা ঘুমের মধ্যেও কথা বলে? আবারো হেসে দিলো আদ্রিয়ান, ও আসলেই একটা বাচ্চা। কী বলছে সেটা একটু মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করলো, ভালোভাবে কান পেতে থাকার পর কিছু কিছু কথা কানে গেলো ওর। আর সেই কথাগুলো শুনে অাদ্রিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেলো। চোখ দুটো আবারো ছলছল করে উঠলো। হাত মুঠো করে ওয়ালে জোরে পাঞ্চ করলো। ও ভাবতেও পারছেনা মানুষ এতো নিচ কীকরে হয়? এতোটাই অত্যাচার করতো মেয়েটাকে যে ঘুমের মধ্যেও সেগুলো ওর পিছু ছাড়ে না। নিজের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে ওর ওকে খুজে পেতে এতো দেরী কেনো করলো ও? কেনো?

__________

সকালে ঘুম থেকে উঠে সময় দেখতে ফোনটা হাতে নিয়েই চমকে গেলো অনিমা। আদ্রিয়ান লাইনে? সিট! ও কালকে কথার মাঝেই ঘুমিয়ে পরেছিলো । তাড়াতাড়ি আধশোয়া হয়ে ফোনটা কানে দিয়ে বলল

---- " হ্যালো?"

অাদ্রিয়ান এখনো ব্যালকনির দেয়ালে হেলান দিয়েই বসে আছে। অনিমার গলার আওয়াজ পেয়েই খানিক চমকে উঠলো তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল

---- "ওহ। মহারানীর ঘুম ভাঙলো?"

অনিমা অবাক হয়ে উঠে বসে মুখের সামনে থেকে চুল সরিয়ে বলল

---- " আপনি সারারাত লাইনে ছিলেন?"

আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল

---- " কী করবো? তুমি কথা শেষ না করেই ঘুমিয়ে পরলে, আর কাউকে বাই না বলে ফোন কাটার মতো ব্যাড ম্যানার্স আমার নেই।"

---- "তাই বলে সারারাত জেগে থাকবেন?"

---- " কী করব বাই বলা হয়নি তো।"

অনিমা হেসে দিয়ে খাটে হেলান দিয়ে বলল

---- " পাগল আপনি? "

আদ্রিয়ান উঠে দাড়িয়ে রুমে যেতে যেতে বলো

---- "তেরে ইস্কমে পাগাল হোনা তো কেয়া মারভি লুঙগি। "

অনিমা ভ্রু কুচকে বললো

---- " মানে?"

---- " নাথিং। যাও ফ্রেশ হয়ে নাও। অফিস যাবে তো।"

অনিমা বাচ্চা কন্ঠে একটু টেনে বললো

---- " আজ ফ্রাইডে।"

আদ্রিয়ান মাথা চুলকে বলল

---- " ইয়ে আসলে ভূলে গেছিলাম।"

---- " তো রাখি?"

আদ্রিয়ান কিছু একটা ভেবে বলল

---- " আব্ বলছিলাম আজ বিকেলে বেড়োবে?"

অনিমা ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল

---- "কেনো?"

---- " এমনি, ফ্রি টাইমে ঘরে বসে বোর হওয়ার কী প্রয়োজন?"

অনিমাও আদ্রিয়ানের তালে তাল দিয়ে বলল

---- " না কোনো প্রয়োজন নেই।"

অনিমার কথায় আদ্রিয়ান হেসে দিয়ে বললো

---- "ওকে দেন বিকেলে পিক করতে আসছি আমি?"

---- "হুম।"

---- " ওকে নাও বাই, ব্যালেন্স যেকোনো মুহূর্তে শেষ হয়ে যাবে, সারারাত লাইনে ছিলাম।"

অনিমা মুচকি হেসে বলল

---- " বাই।"

আদ্রিয়ান ফোনটা রাখতেই অনিমা হেসে দিলো। লোকটা অদ্ভুত হঠাৎ করেই ওর জীবণে এসে ওর জীবণের একটা অভিন্ন অংশ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আদ্রিয়ানকে নিজের জীবণে ধরে রাখতে পারবেতো ওও? ওর সব কাছের মানুষগুলোই তো ওকে ছেড়ে চলে যায়, যদি আদ্রিয়ানও ওকে ছেড়ে চলে যায় তাহলে? আদ্রিয়ানের মায়ায় এভাবে নিজেকে জরিয়ে ঠিক করছে তো?

আর আদ্রিয়ান ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়েই মুচকি হেসে ভাবল। আমি জানি তোমার মনে কি চলছে, ভয় পেয়োনা অামি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবোনা, কোথাও না। ইন এভরি সিচিউশন, আই এম এন্ড আই উইল বি দেয়ার টু প্রটেক্ট ইউ জানপাখি।

আবারো ফোন বেজে উঠল আদ্রিয়ানের অভ্রর ফোন। রিসিভ করার পর অভ্র জানালো ওকে কয়েক মাসের জন্যে লন্ডন যেতে হবে এবং সেটা জরুরি। আদ্রিয়ান পারমিশন দিলেও ওর মুড অফ হয়ে গেলো, অভ্র ওর পিএ হলেও ওকে নিজের ভাইয়ের মতোই স্নেহ করে আদ্রিয়ান আর অভ্রও ওকে বড় ভাই হিসেবে শ্রদ্ধা করে।

____________

অরু সবে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়েছে। এরমধ্যেই ফোন বেজে উঠলো, ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে প্রতিবারের মতো এবার আর বিরক্ত হলো না অরু, কারণ এই ফোন ওর অভ্যেস হয়ে গেছে। তবুও ফোনটা রিসিভ করে বিরক্তির কন্ঠে বলল

---- "কী সমস্যা বলুনতো আপনার?"

আসিশ হেসে দিলো অরুমিতার কথা শুনে। মেয়েটাকে জ্বালিয়ে খুব বেশিই মজা পায় ও। হাসি থামিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল

---- " আমার আবার কী সমস্যা হবে? কোনো সমস্যা নেই তো। কিন্তু আমি কল করলে তোমার এতো সমস্যা কেনো হয় সেটাইতো বুঝতে পারছি না।"

---- " উফফ আপনাকে কিছু বলাই বেকার।"

---- " বলোনা। শুধু আমার কথাগুলো শুনতে থাকো তাহলেই হবে।"

অরুমিতা বেশ বিরক্ত হয়ে বললো

---- " অসহ্য।"

আশিস হেসে বলল

---- " যাক আমার জন্যে কিছুতো ফিল করো সেটা অসহ্যই হোক।"

অরুমিতার রাগে এখন নিজের চুল নিজেরই ছিড়তে ইচ্ছে করছে। তাই বিরক্ত হয়ে ফোনটা রেখে আশিসের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে লাগল। কিন্তু ছেলেটা যেমনই হোক কথা বেশ ভালোই বলে, ভেবেই মুচকি হাসলো ও। পরোক্ষণেই নিজেকেই নিজে বকতে লাগল। কী ভাবছে ও? পাগল টাগল হয়ে গেলো নাকি ও? এসব চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের কাজে মন দিলো ।

ওদিকে অরু ফোনটা কাটতেই হাসতে শুরু করো আশিস। হাসির মাঝেই ওর ফোন এলো ওর ফোনের স্ক্রিণে GF-32 লেখা। বুঝলো ওর বত্রিশ নম্বর গার্লফ্রেন্ড, কিন্তু ওর বত্রিশ নম্বর গার্লফ্রেন্ডের নামটাও তো ওর মনে নেই । কিছুক্ষণ ভেবে রিসিভ করলো ফোনটা। ওপাশ থেকে বলল

---- " হ্যালো বেবি এতো লেইট করলে কেনো?"

উফফ শুরু হয়ে গেছে নেকিরানীদের নেকমী এসব ভেবে আশিস কন্ঠটা নরম করে বলল

---- " সরি বেবি ওয়াসরুমে ছিলাম।"

মেয়েটা নেকা কন্ঠে বলল

---- " তাই বলে ফোন ধরতে এত্তো লেট করবে?"

আশিসের মেজাজ বেশ খারাপ হলো, এতো নেকামো শুধু মেয়েদের পক্ষেই করা সম্ভব। নিজেকে সামলে বলল

---- " আচ্ছা বেবি এরপর থেকে ওয়াসরুমেও ফোন নিয়ে যাবো ওকে?"

মেয়েটি খুশিতে গদগদ হয়ে বলল

---- " ওয়াও হাউ সুইট ইউ আর।"

---- "বাই দা ওয়ে তুমি কোন বেবি জেনো?"

---- " হোয়াট আশু? ভূলে গেলে আমি লোপা।"

লোপা? এটা আবার কে? উফফ এতোজনের নাম চেহারা মনে রাখা যায়? তবুও আশিস একটু হাসার চেষ্টা করে বলল

---- " না না ভূলবো কেনো? অাসলে তোমার রিয়াকশন কেমন হয় সেটা জানার জন্যে মজা করছিলাম।"

---- " অঅঅ হাউ কিউট।"

---- " ইয়াপ।"

এগুলো আশিসের কাছে বিশেষ কিছু না এটা ওর রেগুলার রুটিন। তাই প্রতিদিনের মতো নিজের সো কলড গার্লফ্রেন্ডেসদের সাথে কথা বলতে ব্যাস্ত হয়ে পরল ও।

____________

সন্ধ্যা হয়ে গেছ, সূর্যমামা বেশ কিছুক্ষণ আগেই নিজের মুখ লুকিয়ে ফেলেছে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসছে। তবে নিঃস্তব্দ নয় এই সন্ধ্যা। গ্রাম্য এলাকায় শান্ত, নিরব, আধারাস্ছন্ন মোহনীয় সন্ধ্যের দেখা পাওয়া গেলেও শহরের সন্ধ্যে হয় অন্যরকম, কোলাহল একটুও কমেনা, তবে শহরের অন্ধকারেও চারপাশের আলোকিত দোকানপাঠ আর অসংখ্য গাড়ির হেডলাইটের আলোতে চারপাশে আরেক রকমের সৌন্দর্য বিরাজ করে, সেটা যদি উচু কোনো বিল্ডিং এর ছাদ থেকে দেখা যায় তাহলেতো কোনো কথাই নেই, সেটা আজ অনিমা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে, কারণ আদ্রিয়ান ওকে নিয়ে পনেরো তলা একটা বিল্ডিং এর ছাদের কর্ণারে বসে রাতের শহরটা দেখছে। দুজনেই বেশ অনেকক্ষণ যাবত চুপ করে আছে। হঠাৎ করেই আদ্রিয়ান বলল

---- " কী ভাবছো?"

অনিমা চারপাশটা দেখতে দেখতে বললো

---- " কখনো রাতের শহরটা এভাবে দেখা হয়নি।"

আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বলল

---- " তোমার ভালো লেগেছে?"

---- " ভীষণ।"

---- " তাহলেই হবে।"

অনিমা আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল

---- " একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?"

আদ্রিয়ান মুখে হাসি রেখেই হালকা ভ্রু কুচকে বলল

---- "করে ফেলো।"

---- " আপনি তো সেইরাতের পর আমার সাথে যোগাযোগ না করলেও পারতেন, হঠাৎ কী মনে করে আমার সাথে যোগাযোগ রাখার ইচ্ছে হলো?"

আদ্রিয়ান হালকা হেসে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো আর অনিমা আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। আদ্রিয়ান একটা শ্বাস নিয়ে বলল

---- " ঐ যে বললাম তোমার মায়ায় জরিয়ে

গেছি, একটা অদ্ভুত মায়াজাল, যেই জাল থেকে বেড়োনো অসম্ভব, মিস করতে শুরু করেছিলাম তোমায়। নিজেকে চেয়েও আটকাতে পারিনি।"

অনিমা অবাক হয়ে বলল

---- " এক রাতেই এতো টান।"

আদ্রিয়ান সামনে তাকিয়ে বলল

---- " আমি নিজেও তো জানিনা কেনো? কিন্তু বর্ষণের সেই রাতটা যে আমি চাইলেও ভূলতে পারিনা আর না পারবো"

---- " কখনো ভূলে যাবেন নাতো আমাকে?"

আদ্রিয়ান অনিমার হাত ধরে বলল

---- " মানুষ নিজেকে ভূলে যেতে পারে কিন্তু নিজের অস্তিত্বকে না।"

অনিমা আদ্রিয়ানের কথা না বুঝলেও এক প্রশান্তি বয়ে গেলো ওর হৃদয়ে, আলতো করে আদ্রিয়ানের কাধে মাথা দিয়ে মনে মনে ভাবছে কীকরে থাকবে এই লোকটাকে ছাড়া ও? ও তো ভীষণভাবে জরিয়ে গেছে আদ্রিয়ানের সাথে, বর্ষণের সেই রাতে ওর জীবণের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে এসেছিলো আদ্রিয়ান।

আর আদ্রিয়ান ভাবছে এতো খুজেও কোনো খোজ পাইনি তোমার। কিন্তু নিজের অজান্তেই পেয়ে গেছি তোমাকে, কীকরে ভূলবো ? তুমিতো আমার অস্তিত্ব,আমার আত্না, আমার হার্টের প্রতিটা বিট, আমার প্রতিটা নিশ্বাস। এগুলো ভূলে কোনো মানুষ বাচতে পারে?

____________

এভাবেই অনেকগুলো দিন কেটে গেলো। এরমধ্যে অনিমা সম্পূর্ণ আগের মতো হয়ে গেছে। চঞ্চলতা, দুষ্টুমি সব আবার ভর করেছে ওর ওপর। এর সম্পূর্ণ ক্রেডিট আদ্রিয়ানের ওই ওকে বিভিন্ন ভাবে খুশি রেখে, আনন্দে রেখে বদলে দিয়েছে একেবারে। তবে একবারো ওর অতীত জানতে চায়নি অনিমার কাছে, কারণ ও চায় অনিমা নিজে ওকে বলুক সব বলুক। আর অনিমাকে নিজের মনের অনুভূতির কথাও বলেনি। আর এদিকে অনিমাও ভালোবেসে ফেলেছে আদ্রিয়ানকে তবে বলতে পারেনি। কিন্তু ওদের মধ্যকার বন্ডিং এখন আরো গভীর হয়েছে, একে ওপরকে না দেখে একদিনো থাকতে পারেনা। আদ্রিয়ান অনিমাকে সবসময় বিভিন্নভাবে আনন্দে রাখে। রাতে লং ড্রাইডে নিয়ে গিয়ে, ছুটির দিনে ঘুরতে নিয়ে গিয়ে, ফুচকা আইসক্রীম খাইয়ে, প্রতিদিন চকলেট গিফ্ট করে, ছোট ছোট সারপ্রাইজেস, গিফটস দিয়ে। তীব্র আর অরুমিতা মুগ্ধ হয়ে দেখে এগুলো আর সৃষ্টিকর্তার কে বারবার শুকরিয়া জানায় আদ্রিয়ানকে অনিমার জীবণে পাঠানোর জন্যে। তবে অনিমার ভয় হয় ভীষণ ভয় হয় ওরতো সুখ নামক জিনিসটা সহ্য হয়না। আবার কোনো বিপদ ঘনিয়ে আসবেনা তো ওর জীবণে?

___________

নিজের ফার্মহাউজে বসে ড্রিংক করতে করতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল রিক। বন্ধুরা চলে যেতেই কালো পোশাক পরা একটা লোক এসে বলল

---- "ভাই, মেয়েটার খোজ পেয়ে গেছি। কী করে কোথায় আছে সব।"

রিক মুখ থেকে ড্রিংকের গ্লাস নামিয়ে একটা বাকা হাসি দিলো তারপর হাত বারাতেই একটা কাগজ দিলো লোকটা ওর হাতে। কাগজটা নিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করতেই লোকটা বেরিয়ে গেলো। রিক কাগজটার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো, পরক্ষণেই মুখটা হিংস্র হয়ে গেলো, চোখ লাল হয়ে উঠল রাগে। দাতে দাত চেপে বলল

---- "এবার কোথায় পালাবে বেবি? তোমার হাইড এন্ড সিক খেলার সময় এবার শেষ। এবার এই রিক চৌধুরী তোমাকে বোঝাবে সে কতোটা ভয়ংকর। তোমার এমন হাল করবো যে রিক চৌধুরীর খাচা থেকে পালানোর চিন্তা করলেও তুমি কেপে উঠবে। বি রেডি সুইটহার্ট। আমি আসছি।"

.

#চলবে...

Download

Like this story? Download the app to keep your reading history.
Download

Bonus

New users downloading the APP can read 10 episodes for free

Receive
NovelToon
Step Into A Different WORLD!
Download NovelToon APP on App Store and Google Play