মিষ্টি খুকু
গল্প:জীন বন্ধু
লেখিকা :আনজুম অনন্যা(অনু)
৯বছরের ছোট্ট মেয়ে মিষ্টি! সে তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ে। সে অনেক ভালো ছাএী অনেক ভালো পড়াশোনা করে তাছাড়াও সে অনেক সহজ সরল ও ভালো মেয়ে। এতো ভালো মেয়ে হওয়া সত্বেও তার একটা আফসোস ছিলো, সে আফসোসটা হলো তার বাবা মা কখনো তার সাথে ভালোভাবে কথা বলতো না, তারা তাকে অনেক মারধর করতো। মিষ্টির বাবা মায়ের মাঝে সবসময় ঝগড়া হতো এবং মিষ্টির দাদী সবসময় মিষ্টির মাকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে নির্যাতন করতো তাই তার মা সবসময় রাগান্বিত থাকতো, সে রাগগুলো সবসময় সে মিষ্টির উপর ঝাড়তো। একদিন সকালে মিষ্টির মা মিষ্টিকে বাসন মাঝতে বলে। মিষ্টিও তার মায়ের কথা মতো বাসন মাজতে লাগলো। কয়েকটা বাসন মাজার পর মিষ্টি বললো“মা আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাকে স্কুলে যেতে হবে, সব বাসন মাজলে স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে প্লিজ এ কয়টা বাসন তুমি মাজো।” এই কথা শুনে মিষ্টির মা রেগে গিয়ে মিষ্টির চুল ধরে একটা চর দিলো আর বললো “তোর যন্ত্রনা আমার আর ভালো লাগে না, তুই কেনো আমার পেটে জন্মেছিলি?তুই না জন্ম নিলে আমি কোনদিন এ সংসার ছেড়ে চলে যেতাম তোর কথা ভেবেই তো যেতে পারি না, আমি সাড়াদিন এতো কাজ করেও তোর বাবা আর দাদির মন জয় করতে পারি না আর তুই আমাকে সামান্য বাসন মেজে দিবি না, বের হ ঘর থেকে। ”এই কথাগুলো শুনে মিষ্টি অনেক কষ্ট পেলো সে কাঁদতে কাঁদতে স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডি হতে লাগলো, রেডি হওয়া শেষে সে যখন আয়নার সামনে গেলো তখন সে নিজের চেহারা দেখে নিজেই ভয় পেলো!কারন তার গালে পাঁচ আঙুলের দাগ, তার মা এতোটাই জোরে চরটা মেরেছিলো! মিষ্টি তার মুখের মারের দাগটা ঢাকার জন্য একটা কালো রংয়ের মাস্ক পরে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
ক্লাস রুমে শিক্ষিকা নীলা চৌধুরী ঢুকলো। সব ছাএ ছাএীরা ম্যাডাম নীলা চৌধুরীকে সালাম দিলো। নীলা চৌধুরী বললো “কি ব্যপার তোমারা সবাই এসেছো কিন্তুু মিষ্টি স্কুলে আসে নি কেনো?”তখন একজন ছাএী হাসতে হাসতে বললো “ম্যাডাম ওর মনে হয় পেট খারাপ হয়েছে। ” এই কথা শুনে ক্লাসের সবাই হাসতে লাগলো তখনই মিষ্টি এসে নীলা চৌধুরীকে বললো “আসসালামু আলাইকুম ম্যাডাম আসতে পারি? ” তখন নীলা চৌধুরী বললো কেনো আসলা স্কুলে? কোন জমিদারের মেয়ে তুমি? স্কুল কী তোমার বাপের তাই যখন ইচ্ছে আসবা? আজকে এতো দেরি হলো কেনো? যাও গিয়ে বসো।”মিষ্টি কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে নিজের জায়গায় বসে পরলো। ক্লাসের সবাই মিষ্টিকে দেখে হাসতে লাগলো কারন সে মুখে মাস্ক পরেছিলো। ক্লাস শেষে সে বাড়ি যেতেও ভয় পাচ্ছিলো কারন বাড়িতে গেলে তার মায়ের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হবে আর বাড়িতে না গেলে সে কোথায় যাবে? এসব ভাবতে লাগলো তখন সে ভাবলো সে তার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার সাথে এই বিষয়ে কথা বলবে। সে ভয়ে ভয়ে প্রধান শিক্ষিকা আয়শা ছিদ্দিকার রুমে ঢুকলো। আয়শা ছিদ্দিকা মিষ্টিকে অনেক ভালোবাসতো কারন মিষ্টি অনেক ভালো ছাএী এবং অনেক ভালো মেয়ে ছিলো। আয়শা ছিদ্দিকা বললো “কি হয়েছে মিষ্টি? এতো ভয় পাচ্ছো কেনো? আমাকে সবকিছু সেয়ার করতে পারো। ” মিষ্টি ভয়ে ভয়ে বললো “ম্যাডাম আম্মু আমাকে খুব মারে খুব নির্যাতন করে তাই বাড়ি যেতে ভয় পাচ্ছি!” আয়শা ছিদ্দিকা মিষ্টির কথা শুনে বললো “ওহ এই ব্যপার! নো প্রবলেম আমি তোমার মাকে বুঝিয়ে তোমাকে বাসায় দিয়ে আসবো।” তারপর আয়শা ছিদ্দিকা মিষ্টিকে নিয়ে মিষ্টির বাড়িতে গেলো। তারপর মিষ্টির মাকে বললো “আপনার পেট থেকেই তো মেয়েটা হয়েছে কেনো মেয়েটার প্রতি এতো নির্যাতন করেন?” তখন মিষ্টির মা মিষ্টিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললো “আমার মেয়ে মিষ্টি, তাকে মারতে চাই না কিন্তুু মাঝেমধ্যে যখন আমার স্বামী শাশুড়ীর উপর রাগ ধরে তখন মিষ্টিকে আমি মারি” আয়শা ছিদ্দিকা বললো “আপনার সাথে তো অপরাধ মিষ্টি করে না, আপনার শাশুড়ী করে তাহলে সেই রাগ আপনি মিষ্টিকে কেনো দেখান? ওকে আর মারবেন না।”তখন মিষ্টির মা মিষ্টিকে জড়িয়ে ধরে বললো “আর কখনো মারবো না ম্যাডাম।” সবকিছু ঠিক আছে দেখে আয়শা ছিদ্দিকা চলে গেলো। আয়শা ছিদ্দিকা চলে যাওয়ার পর ওর মা ওকে অনেক মারলো। মারতে মারতে বলতে লাগলো “তুই মরতে পারোস না?তোর জন্য আমাকে কেনো কথা শুনতে হয়? তুই আবার আমাকে অপমান করার জন্য তোর ম্যাডামকে নিয়ে এসেছিস বদজাত ছেরি।” তার মায়ের এমন ব্যবহারে সে অনেক কষ্ট পেলো! তখন মিষ্টির দাদী মিষ্টির কাছে এসে বললো “জানিস মিষ্টি আজকে তোর ভাইয়া নয়ন আসবে।” এই কথা শুনে মিষ্টি অনেক খুশি হলো কারন তার কোনো খেলার সাথী নেই, তার মা তাকে বাড়ির বাহিরে বের হতে দেয় না, কারো সাথে খেলতে দেয় না। সে বাড়িতেই পুতুল দিয়ে খেলতো। তার পুতুল অনেক পছন্দের ছিলো। নয়ন ছিলো তার চাচাতো ভাই তার থেকে একবছরের বড়। বিকেলে নয়ন আসলো। নয়নের বাবা মা নয়নকে অনেক আদর করছিলো সেটা দেখে মিষ্টির অনেক কষ্ট লাগছিলো কারন তার বাবা মা কখনো তাকে এমন করে আদর করে নি। সে কান্না করে দিলো। নয়ন মিষ্টিকে ডেকে বললো “দেখ মিষ্টি তোর জন্য কি এনেছি তোর পছন্দের খেলনা পুতুল।” সেই পুতুলটা নয়ন যখন মিষ্টিকে দেখালো তখন মিষ্টি ভয় পেয়ে গেলো, মিষ্টি যদিও পুতুল অনেক পছন্দ করে তারপরও এই পুতুল টা তার কাছে অনেক ভয়ংকর লাগছিলো কিন্তুু নয়ন মজা করে ঐ পুতুল বার বার মিষ্টিকে দেখাচ্ছিলো তাকে ভয় পাওয়ানোর জন্য। মিষ্টি বললো “এই পুতুল তুমি কোথায় পেয়েছো ভাইয়া?” তখন নয়ন হেসে বললো“কোথায় আবার পাবো? কুড়িয়ে পেয়েছি!” এই কথা শুনে মিষ্টি অনেক অবাক হলো। মিষ্টি একদিন একলা ঘরে শুয়ে ছিলো তখন ঐ পুতুলটাও ওখানে ছিলো। মিষ্টি ঐ পুতুলটার দিকে যখন তাকালো তখন দেখতে পেলো পুতুলটা নিজে থেকে পেছন ফিরে তাকালো এবং দাত বের করলো মনে হয় এখন তাকে কামড়ে দেবে এমন করতেছিলো, এটা দেখার পর সে ভয়ে কান্না করে দেয়, সে তাড়াতাড়ি করে ওখান থেকে পালিয়ে যায় তারপর তার নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে যায়। ঘুমের ভেতর সে ফিল করতে পাচ্ছে তার মাথায় কেউ হাত বুলিয়ে দিচ্ছে এবং তার নাম ধরে কেউ একজন ডাকছে। সে যখন চোখ খোলে তখন তার সামনে তার বয়সের একটা মেয়েকে দেখতে পায়। মেয়েটাকে মিষ্টি জিজ্ঞেস করে “কে তুমি?” “মেয়েটা বললো আমার নাম খাদিজা, আমি কোনো মানুষ না আমি একজন জীন কিন্তুু তোমার কোনো খতি করবো না আমি তোমার সাথে খেলবো,তুমি কি আমার সাথে খেলবে? খেলতে খেলতে আমার পুতুল টা রাস্তায় পরে গিয়েছিলো তোমাদের বাসায় এসে আমার পুতুল টা খুঁজে পাই। আমি চাইলেই পুতুল টা নিয়ে চলে যেতে পারতাম কিন্তুু গেলাম না কারন তোমার উপর আমার খুব মায়া হলো। আমি শুধু সবসময় তোমার সাথে থাকতে চাই এবং তোমার সাথে খেলতে চাই, তুমি কি আমার সাথে খেলবে?” মিষ্টি হেসে বললো “হ্যা অবশ্যই।” খাদিজা অবাক হয়ে বললো “তোমার আমাকে দেখে ভয় লাগে না?” তখন মিষ্টি হেসে বললো “আমার মা বাবার নির্যাতন তো তোমার থেকেও ভয়ানক! আমি সেটা সহ্য করি আর তোমাকে দেখে ভয় করার তো কোনো প্রশ্নই আসে না।” এরপর থেকে খাদিজা তার সাথেই থাকতো, তার সাথে গল্প করতো, তার সাথে খেলতো এবং জীনের দেশ থেকে মজার মজার খাবার এনে খাওয়াতো। মিষ্টি ছাড়া খাদিজাকে আর কেউ দেখতে পেতো না। মিষ্টির মা মিষ্টির এসব অদ্ভুত আচরণ দেখে বুঝতে বাকি থাকে না মিষ্টি একটা জীনের বসে আছে। কারন মিষ্টি সবসময় কার সাথে জানি গল্প করতো, খেলতো আরও অনেক অদ্ভুত আচরণ করতো। তাই মিষ্টির মা এসব তার বাবাকে জানালো। তারপর মিষ্টির বাবা মা মিষ্টিকে একটা কবিরাজের কাছে নিয়ে গেলো। কবিরাজ অনেক চেষ্টা করেও মিষ্টির ভেতর থেকে জীনটাকে সড়াতে পারলো না। মিষ্টির ভিতর থাকা খাদিজা ভয়ংকর কন্ঠে বলছে “কিচ্ছু করতে পারবি না তোরা, আমি মিষ্টিকে নিয়ে যাবো।”মিষ্টির মা বাবা অনুরোধ করে খাদিজাকে বললো “প্লিজ আমার মেয়েকে নিয়ে যাবেন না।” তখন খাদিজা জোরে জোরে হাসতে হাসতে বললো “মিষ্টিকে তো আমি জোর করে নিয়ে যাচ্ছি না, সে আমার সাথে যেতে চাচ্ছে আমাকে না বুঝিয়ে মিষ্টিকে বোঝা, মিষ্টি একবার না বললে কখনো আমি তাকে নিয়ে যাবো না।” মিষ্টির মা বাবা মিষ্টিকে অনুরোধ করে বললো “মা আমাদের ছেড়ে যাস না, আমাদেরকে এতো বড় শাস্তি দিস না।” তখন মিষ্টি স্বাভাবিক কন্ঠে বললো “না মা তোমরা দেরি করে ফেলেছো, আমি খাদিজার সাথে চলে যাবো, খাদিজা এখন আমার শরীরের ভিতরেই আছে।” তখন মিষ্টির মা বললো “জীন দেখে তোর ভয় লাগে না?” তখন মিষ্টি হেসে বললো “তোমাদের দেখেই এখন আমার আর ভয় লাগে না, জীন দেখে ভয় লাগবে কি করে?” মিষ্টির বাবা বললো “তুই জিনের দেশে থাকবি কি করে?” তখন মিষ্টি বললো এই নিষ্ঠুর দুনিয়াতে যদি আমি ৯বছর থাকতে পারি তাহলে তো জীনের দেশে থাকতে না পারার প্রশ্নই আসে না, বিদায় মা আমি চলে যাচ্ছি এ কথা বলে সে তার বাবা মায়ের চোখের সামনে ধোঁয়া হয়ে উড়ে গেলো। এই দৃশ্যটা তার মা বাবার পক্ষে সহ্য করার মতো ছিলো না। তারা কাঁদতে লাগলো এবং নিজেকেই দোষী করতে লাগলো কারন তাদের ভুলের কারনেই তারা তাদের মেয়েকে হারিয়েছে, তারা বাকি জীবনটা মেয়ের শোকে কাটিয়ে দিলো! মিষ্টি জীনের দেশে গিয়ে খাদিজা ও অন্যান্য জীনদের সাথে সুখে শান্তিতে থাকতে লাগলো।
***Download NovelToon to enjoy a better reading experience!***
Comments