যদি আমি তোমাকে কখনো ভালো না বাসতাম
অভি আমার হাত ছাড়ো! কি হয়েছে তোমার? উফফ, ব্যাথা পাচ্ছিতো হাতে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? আজব, কি সমস্যা তোমার?
প্রচন্ড জোড়ে হাত চেপে ধরে হেচকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অভি সাজিয়া কে। সিড়ি বেয়ে দোতলায় ডান পাশের কর্নারে যে রুমটাতে সাজিয়ে থাকে তার সামনে নিয়ে অভি সাজিয়ার হাত ছেড়ে দিলে যেন নিস্তার পেল সাজিয়া।
অভি কি ব্যাপার, আমাকে বলবে তো! সাজিয়া কথা শেষ করার আগেই অভি এবার তার মুখ দু হাত দিয়ে চেপে ধরে বললো কয়জন পুরুষ লাগে তোর? কি করছিলি তুই গার্ডেনে অসীমের সাথে? প্রচন্ড ঘৃনায় সাজিয়া বলে উঠলঃ ছিঃ ছিঃ কি বলো তুমি এসব, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ও তো আমার কাছে রাইদা সম্পর্কে জানতে চাইছিলো। আমি যেহেতু রাইদার নার্স আমার কাছে জানতে চাওয়া টা কি স্বাভাবিক নয়? আর শুধু অসীম কেন অন্তর, তোমার মা বাবা এমন কি তুমিও তো আমার কাছে জিজ্ঞেস করো তাই না? আর নিজের ভাই সম্পর্কে এত নিকৃষ্ট কথা বলতে লজ্জা লাগলো না তোমার?
অভি সাজিয়ার মুখ ছেড়ে দিয়ে কোন কথা না বলে দ্রুত হেটে বেরিয়ে গেলো বাসা থেকে।
সাজিয়া কিছুই বুঝতে পারলো না, আজ যেন অভি কে প্রচন্ড অচেনা লাগছে। অবশ্য বেশি দিনের পরিচয় না তার অভির সাথে। মাস তিনেক আগেই তার অভি নামের ছেলেটার সাথে পরিচয় হয়। দেখতে সে শ্যাম বর্নের, গুলুগুলু শরীর আর মাঝারি উচ্চতা হলেও তার কালো চোখে প্রচন্ড গভীরতা অনুভব করে সাজিয়া। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়েছে তা নয়।
সাজিয়া ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরেই মা মারা যায়, ছোট বোন সাদিয়ার সব দায়িত্ব যেন তার হাতে এসে পড়ে। তাদের মা বাবার ডিভোর্স হয়েছিল তাদের বুঝ হবার আগেই। তাদের মা একজন স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। সিঙ্গেল প্যারেন্ট হিসেবে দুই মেয়েকে মানুষ করেন তিনি। কখনো বাবার ছবি পর্যন্ত দেখায় নি তাদের। তাদের মনেও আগ্রহ ছিলনা কখনো। কিন্তু মা মারা যাবার পরে দু'বোনের জীবন যেন থমকে দাঁড়ায়। শহরের এক ফ্ল্যাট ভাড়া থাকে তারা।
মা মারা যাবার পর পরই সাজিয়ার পড়াশোনা করা সম্ভব হয় না। তার মায়ের এক কলিগ তাকে ছোট খাট এক প্রাইভেট হসপিটাল এ ইন্টার্ন হিসেবে নার্সের চাকুরী নিয়ে দেন। সেই থেকে প্রায় দশ বছর ধরে সে নার্সের চাকুরী করে আসছে আর ছোট বোন সাদিয়ার সব পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে। সাদিয়া তার থেকে দেড় বছরের ছোট।
তিন মাস আগের কথা, সাদিয়া পড়াশোনা শেষ করে ছোট খাট এক টা জব করে। কিন্তু স্যালারি খুবই কম। সাজিয়া দিন রাত খেটে তাকে পড়াশোনা করিয়েছে। সাজিয়া হসপিটালের ডিউটির পাশাপাশি প্রাইভেট নার্সিং এর কাজ করে। এতে করে নানা হেনেস্তার শিকার হতে হয় তাকে। এতদিন সাজিয়া জেনেও না জানার ভান করে ছিল। কিন্তু এখন আর নয়। এবার সে ভালো একটা জব করে সাজিয়া কে বলবে আপু তোর আর জব করতে হবে না। ভাবতেই চোখ ছলছল করে উঠলো তার। এর মধ্যে ফোনে ম্যাসেজ আসলো,,,,
আপু, এই আপু!
কি হয়েছে এত খুশি কেন হুম?
আপু আমি যে কোম্পানি তে জব এর জন্য এপ্লাই করেছিলাম সেখানে চুজ করেছে আমাকে। আগামী সোমবার ইন্টারভিউ, খুবই এক্সাইটেড লাগছে আপু।
আরে দাড়া দাড়া পাগলী টা, এই বলে বুকে জড়িয়ে নিল সাদিয়া কে। আজ যেন স্বপ্ন পূরনের শিরদ্বারে পৌছাতে পেরেছে। অসম্ভব আত্মতৃপ্তি অনুভব করছে সাজিয়া।
আপা,
হুম বল!
চাকরি পেলে আমরা এই বাসাটা ছেড়ে দিব। বড় একটা ফ্ল্যাট কিনবো,,,
সাদিয়া কে থামিয়ে দিয়ে সাজিয়া বললো, হইছে চুপ থাকেন। আগে চাকরি টা হোক। আমাকে ডিউটি তে যেতে হবে আজ নাইট আছে। আমি গোসলে ঢুকবো, দেখি ছাড় এবার। আর ন্যাকামি করতে হবে না।
সকাল থেকেই সাদিয়া প্রস্তুতি নিচ্ছে ইন্টারভিউ এর জন্য। সব ঠিকঠাক হলে ইনশাআল্লাহ জব টা হয়ে গেলে আর টেনশন থাকবে না।
ইয়ামিন, এই ইয়ামিন! অন্তর কোথায়? আজ না ওর সেক্রেটারি পদের জন্য ইন্টারভিউ নেয়ার কথা।
স্যা,,,স্যার! অন্তত স্যার আসে নি এখনো। কথাটা বলতে গিয়ে দু'বার ঢোকর গিললো ইয়ামিন।
অন্তত কে এক্ষুনি ফোন দে।
আইচ্ছা স্যার!
স্যার, ইয়ামিন স্যার ফোন দরেনা। আপনি একটা ফোন দেন। তাইলে না দইরা পারবেনা।
আচ্ছা তুই যা। রাগে ফোসফাস করছে অভি। অন্তুর প্লেবয় টাইপের ছেলে। সপ্তাহ পাল্টাতে দেরি হয় কিন্তু গার্লফ্রেন্ড পাল্টাতে দেরি হয় না অন্তরের। অনেকক্ষন রিং বাজার পরে ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করলো অন্তর।
হ্যালো, ভাইয়া
তুই কোথায় আছিস? অফিসের কথা কি মাথায় আছে? আর আজ তো সেক্রেটারি চুজ করার ইন্টারভিউ আছে। তুই ইতো বলেছিলি নিজে চুজ করবি তুই তোর সেক্রেটারি কে।
আচ্ছা ভাইয়া আমি জ্যামে আছি। তুই একটু ইন্টারভিউ নিয়ে আমার জন্য সেরা ক্যান্ডিডেট কেই চুজ করিস। আর হ্যাঁ শোন, না মানে সুন্দরী আর ইয়াং না হলে চুজ করিস না।
কথা শেষ করার আগেই অভি ফোন কেটে দিল। অন্তর দ্রুত ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে গেলো। রেডি হয়ে বের হবে এমন সময় বিছানায় শুয়ে থাকা এক রুপসি মেয়ে জিজ্ঞেস করলো চলে যাচ্ছো বেবি?
হ্যাঁ বেবি আমাকে এখন অফিসে যেতে হবে।তুমি চলে যাবার সময় চাবি টা দাড়োয়ানের কাছে দিয়ে যেও।
ঘুম চোখে মেয়েটি জবাব দিল ওকে বেবি!
একের পর এক ক্যান্ডিডেট আসছে ঠিকই, তাদের যোগ্যতাও আছে শুধু সুন্দরী না বলে চুজ করতে পারছে না অভি। অন্তরের জিদ সম্পর্কে সে জানে। যদি সেক্রেটারি তার মন মত না হয় সে ঠিক মত কাজেই আসবে না।
স্যার আসি। ভয়ার্ত কন্ঠে বললো সাদিয়া।
জ্বি অবশ্যই। সি.ভি. চেক করতে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিল অভি। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেলো সাদিয়ার নামের দিকে। না কোন সমস্যা নেই নামে তবে পুরো নাম পড়ে থ হয়ে গেলো অভি। কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ছে।
স্যার, আপনি ঠিকাছেন?
হঠাৎ যেন হুশ ফিরে আসলো অভির। একটু কেশে গলা ক্লিয়ার করে সাদিয়া কে জিজ্ঞেস করলো তোমার পুরো নাম বলো।
-রাশমিয়া আনজুম সাদিয়া।
এবার আরো বেশি ঘামতে শুরু করলো অভি। নিজেকে কন্ট্রোল করে জিজ্ঞেস করলো তোমার গার্ডিয়ান কে বর্তমানে?
-আমার বড় আপু স্যার।
তার নাম কি? সাদিয়ার কপালে ভাজ পরতে দেখে অভি মুখে জোড় করে হাসি এনে বল্লো তোমার গার্ডিয়ান তোমার বড় আপু তাই দেখে অবাক হলাম আরকি।
-সাদিয়া হেসে বললো, জ্বি স্যার আমার মা সিঙ্গেল মাদার ছিলেন। তিনি মারা যাবার পরে আপু ই আমাকে পড়াশোনা করায়। আপু আমার থেকে মাত্র দেড় বছরের বড়। হ্যাঁ, আপুর নাম রুমাইশা আনজুম সাজিয়া।
***Download NovelToon to enjoy a better reading experience!***
Comments