𝐓𝐇𝐄 𝐈𝐍𝐃𝐄𝐗 🖤
🩶 পর্ব_১
এক বৃষ্টিস্নাত মধ্যাহ্নে অরণ্যের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। কোচিং ক্লাস শেষে বাইরে পা দিতেই আকাশ যেন আচমকাই রুদ্ধদ্বারে কান্না শুরু করল। মুষলধারে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে পাশের লাইব্রেরিতে চলে আসলাম।
বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত রিকশার দেখা মিলবে না আর যদি বা মেলে ভাড়া হবে আকাশছোঁয়া। তাই লাইব্রেরির ধুলোমাখা তাক থেকে শরৎচন্দ্রের কালজয়ী প্রিয় উপন্যাস “শ্রীকান্ত” বইটি নিয়ে ভেজা কাপড়ে কাঠের চেয়ার টেনে বসে বইয়ে মনোযোগ দিলাম।
বইয়ে নিমগ্ন ছিলাম হঠাৎ পাশের চেয়ারটা কর্কশ শব্দে টেনে বসে পড়লো এক ছেলে। বিরক্ত হয়ে তাকাতেই দেখি ছেলেটা এক কান ধরে হেসে ইশারায় বলল,
“দুঃখিত।”
ওর হাসিতে গালের একপাশে ছোট্ট টোল পড়ে, দাঁতগুলো কিছুটা এলোমেলো, তবু কী আশ্চর্য সেই এলোমেলো তেও যেন হাসির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিল। আমি কিছু না বলে আবার বইয়ের দিকে তাকালাম।
“আপনি পুরো ভিজে গেছেন দেখছি,জ্বর বাঁধাবেন নিশ্চিত।”
“হ্যাঁ, বাড়ি ফিরছিলাম হঠাৎ বৃষ্টি পড়ায় ভিজে গেলাম।”
“এজন্য বর্ষার সময়ে সবসময় ছাতা সঙ্গে রাখতে হয়।”
বিপরীতে কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। সে আমার বইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“শ্রীকান্ত পড়ছেন?”
আমি নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম,
“জ্বী।”
সে আগ্রহ নিয়ে আবারও বললো,
“এর আগেও পড়া হয়েছে না আজ নতুন পড়ছেন?”
আমি একটু হেসে বললাম,
“পড়েছি আগেও। তবে সময় কাটানোর জন্য প্রিয় বইটি আবারও পড়ছি।”
“প্রিয় চরিত্র?”
আমি বইটি বন্ধ করে বললাম,
“রাজলক্ষ্মী কেননা ও খুব সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী নারীচরিত্র।”
সে ঠোঁট চেপে আগ্রহের সঙ্গে আমার কথা শুনছে৷ খেয়াল করলাম সে সামান্য ঠোঁট চেপে রাখলেও গালে গর্ত পরে এতে যেন তাকে দ্বিগুণ মায়াময় লাগে।”
“আপনার কি মনে হয়, শ্রীকান্ত রাজলক্ষ্মীকে ভালোবেসেছিল?”
আমি ভাবুক দৃষ্টি শূণ্যে চেয়ে শুধালাম,
“হয়তো বেসেছিলো তবে রাজলক্ষ্মীর মতো হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে গভীরভাবে ভালোবাসতে পারেনি, তার ভালোবাসায় ছিল একরাশ দ্বিধা অথবা সংকোচ।”
দু'জনের মাঝে কথা বাড়ে,তার প্রতিটি কথা বিরক্তিহীন উপভোগ করছি। সময় নিজের খেয়ালে গড়িয়ে চলে বৃষ্টি থেমে মেঘলা আকাশে রোদ উঁকি দিলো।
কথার ফাঁকে বাহিরে রোদ দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। সে কথা থামিয়ে উৎসুক হয়ে তাকালো।
“বৃষ্টি থেমেছে,আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো, আজ আসি।”
সে আমার দিকে গভীর নেত্রে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কাল আসবেন?”
একটু অবাক হয়ে বললাম,
“ঠিক বলতে পারছি না।”
বইটি তাকে জায়গামতো রেখে চলে যেতে নিলে সে বলে উঠলো,
“নামটা বলে যান।”
তার উচ্চস্বরে ডাকে সবাই আমাদের দিকে তাকাতেই আমি খানিকটা লজ্জায় পড়ে গেলাম।
“রোহিনী”
সে বিস্তার হেঁসে বললো,
“আমি অরণ্য নওয়াজ, আশা করি আবারও দেখা হবে লাইব্রেরির কোনো প্রান্তে।”
বিপরীতে মন গহীনের কোথা থেকে ভেসে উঠলো,
“আবারও দেখা হোক।”
বাড়ি ফিরে স্নানের কাপড় মেলতে বারান্দায় আসতেই দেখা পেলাম নভীনদার সঙ্গে। যেন সে আমার জন্যই অপেক্ষায় ছিল। গম্ভীরমুখে বললো,
“এই বৃষ্টি বাঁদলের দিনে কোচিং না গেলে হতো না?”
“সামনে পরিক্ষা, ক্লাসে প্রয়োজনীয় নোট দিয়েছিল।”
সে আর কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি সংকোচে পড়ে রুমে চলে আসি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল শুকোতে নিলে দৃষ্টিপটে লাইব্রেরির সেই ছেলেটির মুখশ্রী ভেসে ওঠে।
“অরণ্য”
না চাইতেও আয়নার সম্মুখে মুচকি হেঁসে অরণ্যের প্রতিটি কথা বার বার হৃদয় কুটিরে আওড়িয়ে যাচ্ছি। বিছানায় শুইয়ে লাজে বালিশে মুখ চেপে রাখতেই পুরুষালি কন্ঠে গান ভেসে উঠলো,
সখী,ভাবনা কাহারে বলে। সখী, যাতনা কাহারে বলে।
তোমরা যে বলো দিবস-রজনী ‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’
সখী, ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময়।
সে কি কেবলই চোখের জল? সে কি কেবলই দুখের শ্বাস? লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ।
নভীনদা ভালো গান গাইতে পারে। তবে আজ পর্যন্ত তার কন্ঠে রবীন্দ্র সংগীত ছাড়া কোনো গান শুনিনি।
অরণ্যের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। জেগে উঠি সন্ধ্যায় মায়ের কাঁপা গলার ডাক শুনে। চোখ মেলে দেখি মা শিউরে বসে আছে। ভেজা জলপট্টি একটু পর পর আমার কপালে চেপে ধরছেন। উঠে বসতে গিয়েই বুঝলাম শরীরটা একেবারে নিস্তেজ যেন সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে গেছে। ক্লান্ত শরীরটা আবার বিছানায় ঢলে পড়ে।
তবু মায়ের বকুনির ধার শোনার মতো বোধটুকু বেঁচে ছিল।
“কতবার বলি বৃষ্টিতে ভিজিস না। মা'র কথা তোর কোনো কানে যায় না? দেখলি আজ ফল ভোগ করছিস!”
মায়ের সেই মমতার মোড়কে মোড়ানো রাগের মাঝে হঠাৎই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। তাহমিনা চাচি এসে আমার কপালে হাত রেখে ব্যাকুল স্বরে বললেন,
“ইসস শরীরটা তো পুড়ছে একেবারে। ভাইসাহেব কি বাড়িতে আছেন?”
মা ধীরে মাথা নাড়ালেন।
তাহমিনা চাচি বললেন,
“নভীনকে একবার কল দেই। মেয়েটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাক।”
মা তখনও কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন,
“ওকে শুধু শুধু কষ্ট দেবো না এখন। একটু দেখি, জ্বরটা কমে কি না।”
বাইরের সন্ধ্যা তখন ধীরে ধীরে কালো হয়ে আসছে। তাহমিনা চাচি বললেন,
“ও মা কষ্ট কিসের আর কিছুদিন পর তো রোহির সব দায়িত্ব নভীনই নিবে, এখন তো হবু স্ত্রীর প্রতি কিছু দায়িত্ব আছে না….কি। তুমি কি যে বলো না ভাবী।”
আমি জ্বরে তোপে অনেক আগেই জ্ঞান হারিয়েছি।
জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিস্কার করলাম। পাশে চেয়ারটায় বসে আছেন নভীনদা। উনি চেয়ারটা টেনে আরও কাছে এসে কপালে হাত ছুঁয়ে দেখলেন জ্বর। ঠান্ডা শীতল সেই স্পর্শে শরীরটা কেঁপে উঠল হঠাৎ।
নভীনদা মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
“বেশি খারাপ লাগছে তোর?”
আমি শব্দহীনভাবে মাথা নাড়ালাম। কিন্তু মুখের রক্তিম আভা দেখে উনি বুঝে গেলেন শরীরের অবস্থা ভয়ানক রকম খারাপ।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_২
টানা সপ্তাহখানেক জ্বরে ভোগে আজ যেন একটু স্বস্তি পেলাম। মস্তিষ্কে অরণ্য নামক ছেলেটি তখন একেবারে গেঁথে গিয়েছে।
সময় পেরিয়ে আজ অষ্টম দিন হলো। তার সাথে কি আবার দেখা হবে? লাইব্রেরির কোনো প্রান্তে সে কি আমার জন্য অপেক্ষা করবে তবুও একটুকরো আশা নিয়ে চোখে কাজল দিয়ে নিজেকে তৈরি করলাম। হঠাৎ নভীনদা পাশের বারান্দা থেকে ডেকে উঠলো,
“রোহি…”
“আসছি।”
বারান্দায় আসতেই আমায় দেখে তার কপালে গাঢ় ভাজ পড়ে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“কিছু বলবেন নভীনদা?”
সে সময় নিয়ে বললো,
“মা বললো তোকে নিয়ে ঘুরে আসতে। তুই কোথাও যাচ্ছিস?”
“হ্যাঁ লাইব্রেরি যাচ্ছিলাম।”
তার কপালের ভাজ সরে গেল।
“তাহলে আজ যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি নিচে অপেক্ষা করছি নেমে আয়।”
সাথে সাথে বললাম,
“না নভীনদা, আজকে আমার যেতেই হবে।”
“কেন?”
আমার মন ছটফটিয়ে উঠছে, নিজেকে ধাতস্থ করে বললাম,
“লাইব্রেরিতে আমার নোট রেখে এসেছিলাম সে আট দিন হলো। আজই যেতে হবে যদি চুরি হয়ে যায়। প্লিজ নভীনদা আপনার সাথে অন্যদিন যাই?”
বিপরীতে সে আমার মুখশ্রীতে গাঢ় দৃষ্টি ফেলে মাথায় নাড়ায়।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_৩
ঠিক সেদিনের মতো একই সময়,একই জায়গায় গিয়ে বসলাম। হাতে সেদিনকার মতো “শ্রীকান্ত” বইটি। হৃদয় জুড়ে অদ্ভুত ধুকপুক করছে। সে আসবে তো? হঠাৎই পেছন থেকে ভেসে এলো কণ্ঠস্বর…
“অবশেষে নীরাবচ্ছন্ন প্রহরের অবসান ঘটিয়ে
ভুবনমোহিনী এলো আমার দ্বারপ্রান্তে।
অপেক্ষার অপেক্ষারা ছিল তাহার আশায়,
সে এসে ধন্য করিল শত অপেক্ষার ব্যথিত হৃদয়।”
তার অতুলনীয় কবিতায় বিমুগ্ধ হয়ে পড়লাম। হৃদয়ে দোলা দিলো,
“সে কি কবিতার প্রতিটি লাইন আমায় উৎসর্গ করলো?”
অরণ্য পাশের চেয়ারে বসে স্বভাবসুলভ সেই চমৎকার হাসিটি দিলো।
জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি আমার অপেক্ষা করছিলেন?”
“ যদি বলি হ্যাঁ?”
কিছু সময় নিশ্চুপ থেকে আবারও প্রশ্ন করলাম,
“প্রথম দেখায় হৃদয়ে আলোড়ন তুললে তাকে কি ভালোবাসা বলা যায়?”
আমার প্রশ্নে অরণ্য গভীর নেত্রে তাকিয়ে বললো,
"ভালোবাসা? প্রথম দেখায় ভালেবাসা যায় না। যাকে আমরা ‘ভালেবাসা’ বলে ভুল করি, তা কেবল ভালেবাসার অনুচ্চারিত এক সূচনা। আসল ভালোবাসা তো গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে
চেনা, বোঝা আর একসঙ্গে হৃদয় আকাশে হারিয়ে গিয়ে।”
উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইলাম,
“আপনি হারিয়েছেন কখনো?”
সে হেঁসে বললো, “আপনি চাইলে হারাবো।”
প্রতিউত্তরে খিলখিল করে হেঁসে ফেললাম। অরণ্য বলল,
“ এতদিন একই সময় ঠিক এখানেই আপনার তরে অপেক্ষা করেছি,আপনি আসলেন না কেন?”
“সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধিয়েছিলাম।”
সে উৎকন্ঠিত হয়ে বলল,
“এখন?এখন সুস্থ আছেন? জ্বর নেই তো?”
তার উৎকন্ঠা দেখে হেঁসে বললাম,
“আছে কিছুটা।”
“চা খাবেন?”
অবাক হয়ে বললাম, “এই অসময়ে চা?”
অরন্য হেঁসে বলল, “ লাইব্রেরির এক প্রান্তে, এক কাপ চায়ের সাথে আমরা। মন্দ কি?”
আমিও মুচকি হেঁসে বললাম, “মন্দ হয়না যদি সাথে থাকে শরৎচন্দ্রের বই।”
দু'জনের খিলখিলে হাসিতে কলরবমূখর হলো ছোট্ট লাইব্রেরিটা।
অরণ্য জানালার দিকে তাকিয়ে বললো,
“জানেন রোহিনী, আমার একান্ত বাসনা ছিল আমার প্রথম প্রেমটা যেন লাইব্রেরির কেনো প্রান্তে, গ্রন্থের পাতা উল্টোতে উল্টোতে হয়। এই নিয়ে এক কবিতাও লিখেছি।শুনবেন?”
আমি উৎসুকভাবে মাথা নাড়াতেই সে বললো,
“দিনটি হবে কোনো এক শুক্রবার।
তোমার ক্ষণে প্রহর গুনবো।
মেঘের গর্জন সাক্ষী হবে আমার অপেক্ষার।
এক বৃষ্টিস্নাত রাতে আমি থাকবো
কোনো কিণারায়,
লাইব্রেরির কোনো প্রান্তে
থাকবো আমি বসে।
নিরবাচ্ছন্ন প্রহরের অবসান ঘটবে।
কোনো এক শুক্রবারে,
আমাদের সাক্ষাৎ এর সাক্ষী হবে স্বয়ং হৃদয়। যে হৃদয়ে অনুভূতির আগমন ঘটে,
যে হৃদয় প্রণয়ে স্পর্শ হয়।
লাইব্রেরির সেই প্রান্তে থাকবে
এক জোড়া কপোত-কপোতী।
কোনো এক শুক্রবারে।
যারা ভালোবাসার মোহের
অতলে থাকবে ডুবে।
সেইদিন হবে কোনো এক শুক্রবার।
যাদের অক্ষিযুগলে থাকবে অজস্র প্রেম,
যার শিহরণে কেঁপে উঠবে
প্রাণপ্রিয় প্রিয়সীর হৃদয়।
সেই প্রিয়সীর শ্রীয় লাজুকতায়
কপোতের মনে বইবে প্রশান্তির ঝড়।
কোনো এক শুক্রবারে
সে আসবে আমার মনের গ্রহীনে।
লাইব্রেরির কোনো প্রান্তে
অজস্র ভালোবাসার দাবী নিয়ে
আসবে মোর নিকট।
আসবে না? আসবে।
দিনটি হবে কোনো এক শুক্রবার।”
অরণ্য আর আমার প্রেমের সূচনা হলো এক মধুর আবেশে। প্রেমে পড়ার মুহূর্ত যে এতটা সুমিষ্ট হতে পারে তা আগে কখনো কল্পনাও করিনি। এক নতুন অনুভূতি, হৃদয়ের তীব্র দোলাচলে প্রনয়ের সুর ভেসে এলো কর্ণকুহরে। যা অরণ্য-রোহিনীর প্রথম যাত্রা,এক গভীর প্রেমের আরম্ভ।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_৪
একাডেমিক বইয়ের শুষ্ক পাতার চেয়ে সাহিত্যের রঙিন জগতে আমার আকর্ষণ চিরকাল গভীর। সদ্য কিনে আনা শরৎচন্দ্রের “দেবদাস” উপন্যাসটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করে কিছুক্ষন অশ্রু বির্ষজন দিচ্ছিলাম তার মাঝেই রান্নাঘর থেকে ভেসে এলো মায়ের তাড়াহুড়োর কণ্ঠ,
“রোহি, শুনে যা তো!”
চোখ মুছে উদাস হয়ে গেলাম মায়ের ডাকে। রান্নাঘরে ভেসে এলো পায়েসের মিষ্টি সুবাস। মা হাতে এক বক্স পায়েস ধরিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি নিয়ে যা। নভীনের খুব পছন্দ পায়েসটা। ও এখন বাড়িতেই আছে। না জানি কখন আবার বেরিয়ে যায়! যা…যা।”
নভীনদার প্রতি মায়ের এক আলাদাই টান। মানুষ মেয়েজামাইকে নিয়েও এত আহ্লাদ দেখায় না যতটা না মা নভীনদাকে নিয়ে দেখায়।
নভীনদা’দের বাড়ির নাম - “কুঞ্জছায়া” নেমপ্লেটের চারপাশে কারুকার্য, দেখতে যা স্নিগ্ধ লাগে! এছাড়া উঠোনে কৃষ্ণচূড়া গাছ যেন বাড়ির সৌন্দর্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
নভীনদা আমাদের কোনো আত্মীয় নয় বরং প্রতিবেশী। তবে দু বাড়ির বন্ধন দৃঢ় অটুট। এছাড়াও তাহমিনা চাচি ও মা বাল্যসখী। সিড়ি বেয়ে উঠতে নিলে নভীনদার সঙ্গে দেখা হয়।
“কোথাও যাচ্ছেন?”
আমি নিজ থেকে কথা বলায় নভীনদা অবাক হলে ভীষণ।
“কিছু বলবি?”
“মা আপনার জন্য পায়েস পাঠিয়েছে।”
“ওহ রেখে যা।”
চলে যেতে উদ্যত হলে এক পা এগিয়ে মাঝপথে তাকে থামিয়ে বললাম,
“খেয়ে যান, মা জানলে আমায় খুব বকবে।”
নভীনদা থমকে দাঁড়াল।
“দে।”
“এখানে খাবেন? উপরে চলুন।”
নভীনদা কিছু ভেবে বলল,
“নাহ উপরে যাবো না। সময় কম।”
পায়েসের বক্সটা নভীনদার হাতে দিয়ে বললাম,
“চামচ তো নেই, অপেক্ষা করুন আমি উপর থেকে চামচ আনছি…”
নভীনদাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হন্তদন্ত হয়ে ওপরে উঠে এসে ধাক্কা খেলাম তাহমিনা চাচির সঙ্গে। তিনি একটু কপাল কুঁচকে বললেন,
“এই বুঝি তাড়াহুড়ি! কি হয়েছে?”
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “একটা চামচ দাও চাচি, নিচে নভীনদা অপেক্ষা করছে।”
খবরের কাগজে মুখ গুঁজে ছিলেন সমরেশ চাচা। তিনি কাগজ নামিয়ে চশমা ঠিক করে বললেন, “আরে বউমা! কতদিন পর আপনাকে দেখছি!”
ছোট থেকেই চাচার মুখ থেকে “বউমা” ডাক শুনে আসছি, আগে রাগ হতো না এখন প্রচুর বিরক্ত হলাম বটে তবে তা পাশ কাটিয়ে হেঁসে বললাম,
“কেমন আছো চাচা?”
সে চশমা ঠিক করে বলে, “কেমন আর থাকবো কেউ তো এসে খোঁজ নেয়না।”
আমি মুখ বাকিয়ে চাচির হাত থেকে চামচ নিয়ে বললাম,
“বাড়ি থাকো যে খোঁজ নিবো? সারাদিন তো টই টই করে ঘুরে বেরাও।”
চাচি বললেন, “নভীন চামচ দিয়ে কি করবে?”
“নভীনদার জন্য মা পায়েস দিয়েছিলো ওইটাই বললাম উপরে এসে খেয়ে যেতে তার নাকি খুব তাড়া তাই সিড়িতে দাঁড়িয়েই খেয়ে যাবে। বাকি কথা পরে হবে। আসি।”
চাচি কি ভেবে মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“এই ছেলেটাকে নিয়ে পারিনা বাপু।”
নিচে এসে দেখি নভীনদা সিড়িতে বসে আছে৷
আমি চামচ এগিয়ে দিতেই সে বললো,
“বস।”
“নাহ বাড়ি যাব।”
সে শক্ত কন্ঠে বলল,
“বসতে বলেছি তো।”
তার কথামতো দূরত্ব নিয়ে বসে পড়লাম। সে তৃপ্তি নিয়ে পায়েস খেয়ে যাচ্ছে। আমার পূর্ণ মনোযোগ কৃষ্ণচূড়া ফুলের দিকে।
কিছুসময় পর সে হঠাৎ বলল,
“কেঁদেছিস কেন?”
আমি তাড়াতাড়ি চোখে হাত বুলিয়ে দেখলাম।না, জল নেই তো!
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি বুঝলেন কিভাবে?”
সে কড়া গলায় বলল,
“তা তোর না জানলেও চলবে। বল কেন কেঁদেছিস?”
মিহি স্বরে বললাম, “দেবদাস পড়ে।”
সে কিছুটা উচ্চস্বরে বলল, “কিহহ?”
আমি পাল্টা রাগে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললাম,
“আপনি এত ধমকে কথা বলেন কেন? ভালো করে কথা বলতে পারেন না?”
নভীনদার মুখের রেখা নরম হয়ে এলো। কন্ঠে কোমলতা এনে বলল,
“না পারিনা, এখন শিখিয়ে দে।”
আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম,
“পারব না বাপু। বিয়ে করে বউয়ের কাছে শিখে নিয়েন। আমার অত সময় নেই।”
নভীনদা হেঁসে বলল, “তা তো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তোর কাছ থেকেই শেখা হবে।”
তার কথায় অত গুরুত্ব দিলাম না। বাড়িতে ফোন রেখে এসেছি, অরণ্য কল দিবে যদি মা দেখে ফেলে তাই তাড়াহুড়ো করে খালি বক্সটা নিয়ে চলে আসলাম।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_৫
“ছুরিকাহত প্রেমিক হৃদয় কারো আশায় মুখিয়ে ছিল, ভুবনমোহিনীর তবু সময় কই!”
অরণ্যের অভিমানী কন্ঠে শব্দহীন হেঁসে বললাম,
“সে ভুবনমোহিনী প্রতিক্ষণে প্রেমমায়া অরণ্যে হারিয়ে থাকে, তা সেই প্রেমিক হৃদয় কি জানে?”
ওপাশ থেকে খিলখিল হাসির প্রতিধ্বনি শোনা গেল।
“কথার জালে ফাঁসিয়ে দেয়ার ছলচাতুরী ভালো রপ্ত করেছো দেখছি।”
“ ছলচাতুরী না জানলে কথায় জিতবো কেমন করে?
“লড়াইয়ে নামতে চাও?”
“নামবো নাহয়!”
"কিন্তু তুমি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নও ভুবনমোহিনী, তুমি আমার হৃদয়ের বা’পাশে বসানো মুকুটমণি। যেখানে শুধু তোমার রাজত্ব চলে।”
তার কথার মোহে আমি স্তব্ধ হয়ে পড়লাম। এমন টলমল ভালোবাসা কি সত্যিই আমার ভাগ্যে লেখা? এ হৃদয় কি তার ভার সইবে?”
“কি হলো বুঝলে?”
“ হুম?....হ্যাঁ বুঝলাম।”
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_৬
দিন পেরিয়ে রজনী, রজনী পেরিয়ে নবপ্রভাত। সময় তার আপন গতিতে পেরিয়ে যায়।
ঝুমঝুম বৃষ্টি পড়ছে। ক্যাফের ছায়াতলে অরণ্যের পাশে দাঁড়িয়ে আছি,দুজনের হাতে কাগজে মোড়া মুড়ির ঠোঙা। আমার খুব ভিজতে ইচ্ছে করছে বলে অরণ্যের শার্ট টান দিয়ে করুন স্বরে বললাম,
“ চলো না ভিজি।”
বিপরীতে অরণ্য চোখ রাঙাতেই মিইয়ে গেলাম। মন খারাপ করে মুড়িটা পাশের ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেই।
“ বাচ্চামো করো না আবারও জ্বর বাঁধাবে…”
“ এবার জ্বর বাঁধাবো না, আর হলেও ঔষধ খেলে ঠিক হয়ে যাবো,চলো না বৃষ্টিবিলাস করি।”
“এইযে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বৃষ্টি উপভোগ করছি তা কি বৃষ্টিবিলাস নয়?”
“ এ বৃষ্টিবিলাসে প্রাণ নেই।”
তবুও মানলো না পাষন্ড অরণ্য। গুমড়ো মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম৷ কিছুটা দূরে এক কপোত-কপোতী মাঝরাস্তায় বৃষ্টিবিলাসে মত্ত। কোনো যানবাহন নেই রাস্তা নিরব। হঠাৎ হাতে টান পড়তেই চমকে গেলাম। আরও চমকালাম যখন নিজেকে খোলা আকাশের নিচে আবিষ্কার করলাম। অরণ্য হাত শক্ত করে ধরে বলে,
“ভুবনমোহিনী! আমায় বড্ড পুড়াও তুমি, এবার খুশি হয়েছো তো?”
হেঁসে বললাম, “খুবউ।”
দু'জন ভিজে একাকার হয়ে যখন বৃষ্টিবিলাসে মত্ত ঠিক তখনই হঠাৎ কোথা থেকে যেন দু’টি বাইক ধেয়ে এসে থামলো আমাদের সামনে। তা দেখে অরণ্য আলগোছে আমায় তার বাহুতে জড়িয়ে ধরে। ভীত হয়ে তার শার্টের কোণা আঁকড়ে ধরি।
সে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, “কিছু হয়নি।”
বাইক দুটো থেকে তিনজন ছেলে নেমে আসে,আমি পিছন ফিরতেই ভয়ে হৃদয় মোচড় দিয়ে উঠলো।
“নভীনদা।”
আমার কথায় অরণ্যের প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো নভীনদার উপর।
নভীনদার চোখে তখন ক্রোধের আগুন জ্বলছে। আমি ভয়ে ভয়ে অরণ্যের বাহু থেকে সরে আসতেই চড় পড়লো আমার গালে।
গালে হাত রেখে অবিশ্বাস্য চাপাস্বরে বললাম,
“নভীনদা!”
অরণ্য এসে আমাকে তার পিছনে আড়াল করে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠে,
"এই হাত তোলার সাহস আপনি কোথায় পেলেন? কোন অধিকারে ওকে আঘাত করলেন?”
নভীনদার চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করে। মুহূর্তেই তিনি অরণ্যের কলার চেপে ধরে গর্জে ওঠেন,
"হবু স্বামী… হবু স্বামীর অধিকারে হাত তুলেছি! তুই কে আমাদের মাঝখানে প্রশ্ন তোলার?”
আমি নির্বাক হয়ে পড়ি, এতদিন যে আভাস পেয়েও তা হেয়ালি করেছি মনের ভুল ভাবনা ভেবে, তা সত্যিই! অরণ্য হতভম্ব হয়ে অবিশ্বাস্য নেত্রে আমার দিকে তাকায়।
“উনি কি বলছে রোহিনী?”
আমি কিছু বলার জন্য নভীনদার দিকে চাইতেই আমার দম ফুরিয়ে এলো, নভীনদার রাগ্বানিত দৃষ্টি আমার দিকে স্থির। কথারা কন্ঠে এসে আঁটকে রইলো।
আমার চুপ থাকাকে অরণ্য নিরব সম্মতি ভেবে নিলো। রেগে বললো,
“সে যদি তোমার হবু স্বামী হয় তাহলে আমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছো কেন?”
অরণ্যের শেষ কথায় নভীনদা রেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল অরণ্যের উপর। আচানক গালে ঘুষির আঘাতে অরণ্য পিছিয়ে যায়৷ বিস্ময় ও রাগে ফেটে পড়ে দাঁতে দাঁত চেপে পাল্টা আঘাত করতেই নভীনদার বন্ধু দুজন হামলে পড়ে অরণ্যের উপর। আমি চিৎকার করে অরণ্যের কাছে যেতে নিলে নভীনদা আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখে।
কান্নার বাঁধ ভাঙলো, তারা অরণ্যকে বেধরক পেটাচ্ছে। হাত ছুটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বললাম,
“ অরণ্যকে ছেড়ে দাও নভীনদা, ওর কোনো দোষ নেই। ওকে মেরো না।”
নভীনদার মন গলল না, উল্টো রাগ তিরতির করে বেড়ে উঠলো অন্য ছেলের প্রতি আমার আহাজারি দেখে।
অরণ্য রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে যখন নভীনদার এক বন্ধু পেটে লাথি মারলো, তা সইতে না পেরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। নভীনদা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। হাতের বাঁধন ঢিল হতেই ছুটে গেলাম অরণ্যের কাছে। ঢাল হয়ে আড়াল করে বলি,
“আর মারবেন না, দোহাই লাগে।”
অরণ্য আহত দৃষ্টিতে শুধু একটাই প্রশ্ন করলো,
“কেন করলে ভুবনমোহিনী?”
কান্না আটকানোর চেষ্টা করে তার গালে হাত রেখে বললাম,
“আমি সত্যিই জানতাম না অরণ্য, আমায় ক্ষমা করো।”
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_৭
বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশের চাদর ছেঁড়ে ধরনীর বুকে একফালি মিষ্টি রোদ উঁকি দিয়েছে। নভীনদা আমায় টেনে হিঁচড়ে বাড়ির দরজায় এনে ফেললেন। মা ঘাবড়ে গিয়ে ছুটে এলেন,তার চোখ-মুখে বিস্ময়ের ছায়া। পুরোপুরি ভিজে যাওয়ায় মা আমার গায়ের আঁচলে মুড়িয়ে নভীনদা’কে বলে,
“কি হয়েছে বাবা,ও কোনো ভুল করেছে?”
আমার কান্নার শব্দে বাবা রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি একবার আমার দিকে তো একবার নভীনদার রাগে ফুঁসতে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,
“কি করেছে ও?”
নভীনদার চোখ তখনও আমার দিকেই স্থির, সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে গেলেন,
“আমি বাবা-মাকে আজই পাঠাবো চাচা। যত তাড়াতাড়ি পারেন বিয়ের তারিখ পাকা করবেন।”
নভীনদা চলে যেতেই মা আমাকে শক্ত করে বুকে টেনে নেয়। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কি করেছিস তুই? নভীনের মতো শান্ত ছেলে হঠাৎ এত রেগে উঠলো কেন রে?”
মায়ের বুকের সেই চেনা আশ্রয়ে মাথা রাখতেই অশ্রুর বাঁধ আর আটকানো গেল না। ভিতরে জমে থাকা কষ্টগুলো যেন হু-হু করে বেরিয়ে এলো।
বাবা ধমকে উঠে অধৈর্য কন্ঠে বললেন,
“কান্নাকাটি থামাও। সোজা করে বলো, কী হয়েছে?”
বাবার দিকে ফিরে ভেজা কন্ঠে বললাম,
“বাবা আমি এই বিয়ে করবো না।”
মা আশ্চর্য হয়ে বলল,
“কি বলছিস তুই?”
“হ্যাঁ মা আমি নভীনদা কে বিয়ে করবো না। তোমরা কিভাবে পারলে আমায় না জানিয়ে বিয়ে ঠিক করতে।”
বাবা রুক্ষ স্বরে বললেন,
“ আমরা তোমার বাবা-মা, কোনো সিদ্ধান্ত নিতে তোমার অনুমতির প্রয়োজন নেই। আর কোথায় ছিলে এতক্ষন? ভিজেছো কিভাবে?
শেষ কথা এড়িয়ে বললাম,
“ বিয়ে ভেঙে দাও তোমরা, আমি বিয়ে করবো না মানে করবো না।”
বলে জেদ দেখিয়ে নিজের রুমে চলে আসতেই বাহির থেকে বাবার কন্ঠ ভেসে আসে,
“ মেয়েকে বুঝিয়ে দিও অনুরিমা, ওর বিয়ে নভীনের সাথেই হবে।”
ভেজা শরীর নিয়ে নিঃশব্দে মেঝেতে বসে পড়লাম। কাঁধের ভিজে ব্যাগ হাতড়ে বের করলাম মোবাইলটা। আঙুলের স্পর্শে ভেসে উঠল "অরণ্য" নামটি, কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়াল করতেই ওপাশে ভেসে এলো এক পরিচিত নারী কণ্ঠ,
“আপনি যে নাম্বারে কল করছেন সে নাম্বারে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে………”
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_৮
“২৩শের কৌটায় পা দিয়ে অবুঝপানা করলে চলে? নভীনের মত ছেলে আজকাল পাওয়া মুশকিল। বাবার কথা মেনে নে, অযথা তর্কে জড়াস না।”
কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। মায়ের কথায় কোনো প্রতিউত্তর না করে খোলা জানালায় আকাশ দেখে যাচ্ছি।
মা আমায় খায়িয়ে হাতে ঔষধ দিয়ে বলে,
“জ্বর বাঁধার আগে খেয়ে নে।”
মা চলে যেতেই হাতের ঔষধ জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলাম। ফোন তুলে আর একবার ডায়াল করতেই ফোন রিসিভ হলো। আমি তড়িঘড়ি করে বললাম,
“অরণ্য! তুমি ঠিক আছো? অরণ্য! ”
ওপাশ থেকে কোনো শব্দ এলো না, শুধু নিঃস্তব্ধতা।
আবারও বললাম,
“অরণ্য!”
“ঠিক আছি।”
ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বললাম,
"আমায় ভুল বুঝো না অরণ্য। বিশ্বাস করো আমি এসব জানতাম না।”
“তখন চুপ ছিলে কেন?”
“ভয় পেয়ে ভুল করেছিলাম জানি কিন্তু এ ভুল আর করবো না। অরণ্য আমি সত্যি ভালোবাসি তোমায়।”
“তোমার কান্না আমায় যন্ত্রণা দেয় ভুবনমোহিনী৷ কেঁদো না তুমি,এ চোখে যেন আর এক বিন্দুও অশ্রু না ঝরে।”
কথাটি শুনে আরও ভেঙে পড়লাম। এই দীর্ঘদিনের সম্পর্কে অরণ্য কখনো মুখে বলেনি 'ভালোবাসি' তবুও তার প্রতিটি ব্যবহারে, ছোট ছোট যত্নে, নিঃশব্দ উপস্থিতিতে সেই ভালোবাসাকে প্রতিদিন অনুভব করেছি। এমন মানুষকে ভালো না বেসে থাকা যায়?
অরণ্য আমার ফুঁপানো শব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“আমায় পুড়িয়ে তোমার বড্ড আনন্দ হয় বুঝি!”
“মোটেও না।”
“তাহলে কাদঁছো কেন?”
বাড়ি ফেরার পর সকল ঘটনা খুলে বলতেই অরণ্য বলল,
“তোমার বাবা মাকে আমার কথা জানিয়ে দ…”
অরণ্যের পুরো কথা শোনার আগেই বাবা ফোন কেড়ে নিলো৷ বাবা অনেক আগেই রুমে এসেছিলো,আমাদের সব কথা শুনেছে। আমি ভয়ে পিছিয়ে যেতেই বাবা গালে চড় বসিয়ে দিলো।
“অরুনিমা! অরুনিমা! তোমার মেয়ের কান্ড দেখে যাও।”
বাবার চিৎকারে আঁচলে হাত মুছে মা ছুটে এসে বলল,
“কি হয়েছে? ও আবার কি করলো?”
বাবা দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“কি করেছে মানে? তোমার মেয়ে প্রেম করছে প্রেম।”
“বলছো কি?”
ফোন বেজে ওঠে, হঠাৎ কল কেটে দেয়ায় অরণ্য আবার কল দিয়েছে। বাবা আমার দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে কল কেটে দিয়ে ধমকের স্বরে বললেন,
“তোমার এত বড় স্পর্ধা হলো কিভাবে? বাবা-মায়ের সম্মান ধূলোয় মেশানোর পায়তারা করছো? আজকের পর থেকে তোমার বাইরে যাওয়া বন্ধ আর এই ফোন….নভীনের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর পাবে।”
“বাবা এমন করো না.. আমি নভীনদাকে বিয়ে করতে পারবো না। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি।”
বাবা মায়ের দিকে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে বলে,
“তোমার মেয়ের বেহায়াপনা দেখেছো?”
মা এখনও ঘোর থেকে বেরোতে পারছে না। অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
বাবার হাত ধরে বললাম,
“বাবা ও ভদ্র পরিবারের ছেলে, নেশা করে না, মেয়েবাজি করে না অনেক মেধাবীও। তুমি একবার ওর সাথে কথা বলে দেখো।”
বাবার রাগ দেখে মা ভয়ে তার কাছ থেকে আমায় সরিয়ে বলল,
“পাগল হয়ে গেছিস তুই। ওই ছেলেকে ভুলে যা।”
“ভুলে যাবো কেন মা? ভুলে যেতে ভালোবাসি নি তো, তোমরা কেন ব্যাপারটাকে জটিল করছো। আমি নভীনদাকে ভালোবাসি না কিভাবে তাকে বিয়ে করবো? বুঝার চেষ্টা করো মা অরণ্যকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে পারবো না।”
বাবা গম্ভীরমুখে বললেন, “ছেলের নাম কি?”
চোখ মুছে বললাম, “অরণ্য নওয়াজ।”
বাবা আমার দিকে ফোন এগিয়ে বলে,
“ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আজই আসতে বলবে।”
ছলছল দৃষ্টিতে ফোন নিয়ে কল দিতেই অরণ্য ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
“কল কেটে দিলে কেন? কিছু হয়েছে?”
“বাবা তোমায় আজই আমাদের বাড়িতে আসতে বলেছে।”
“তুমি আমার ব্যাপারে কথা বলেছো?”
“হুম”
“ঠিক আছে আমি বিকেলেই আসছি আমার….”
বাবা ফোন ছিনিয়ে নিয়ে কেটে দিলো। মা ইতস্তত ভঙ্গিতে বললো,
“কিন্তু আজ তো নভীন…”
বাবা কথার মাঝে থামিয়ে বলল,
“ওর সাথে আমি কথা বলে নিব।”
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_৯
বিকেল গড়াতে আর কিছুসময় বাকি। অরণ্যের অপেক্ষায় বারান্দায় বসে প্রধান ফটকে চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে আছি।
অরণ্য এসেছে সঙ্গে মধ্যবয়সী ভদ্রলোক কে দেখে আন্দাজ করলাম, উনি অরণ্যের বাবা।
অরণ্যের মুখশ্রীতে এক রাজ্য আনন্দ। সাদা পাঞ্জাবিতে বেশ স্নিগ্ধ লাগছে৷ সে বেখেয়ালিতে বারান্দায় তাকাতেই দুটো খাদযুক্ত দৃষ্টি মিলে যায়। আমায় দেখে সে বিস্তার হাসলো, এ হাসিতে ছিল একরাশ মুগ্ধতা,অনুরাগ ও উল্লাস।
তারা যাওয়ার পরপর হঠাৎ করেই ফটকের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করলো নভীনদা। নভীনদা কেন এসেছে? সে ঝামেলা পাকাবে না তো?
নভীনদা আমাকে দেখে মাঝপথে থমকে দাঁড়াল। চোখে চোখ পড়তেই আমি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম। কিছুক্ষন পর সে চলে যেতেই কিছু আটকানোর শব্দ পেলাম। পিছু ফিরে দেখি আমার দরজা বন্ধ। উঠে গিয়ে দরজা খুলতে নিলে বুঝতে পারি বাইরে দিয়ে আটকানো।
“মা! মা!”
কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে হৃদয়ে ভয় জন্মালো। নভীনদা এসেছে সাথে বাহির থেকে দরজা বন্ধ। দরজা খোলার জন্য চেঁচামেচি করলে অরণ্যের বাবার কাছে দৃষ্টিকটু লাগতে পারে।
রুমে অস্থির হয়ে পাইচারী করছি। বাহিরে কি কথা হচ্ছে জানি না। মনে প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে,
আধোও নভীনদা এ বিয়ে হতে দিবে? বাবা মেনে নিবে অরণ্যের সঙ্গে আমার সম্পর্ক? না মানার কথা নয়, অরণ্যকে প্রত্যাখান করার মতো উপযুক্ত কারণ নেই। অরণ্যের পারিবারিক ব্যবসায় আছে। শিক্ষিত সচ্ছল পরিবার।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১০
বাহির থেকে হঠাৎ অরণ্যের বাবার উচ্চস্বরে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে গেলাম। দরজার সামনে দাঁড়াতেই উনার কণ্ঠস্বর সুস্পষ্ট ভেসে এলো,
“তাহলে যেচে পড়ে ডেকে এনে অপমান করার মানে কি?”
“অপমান করছি না। আপনার ছেলেকে সাবধান করছি মাত্র, সে যেন আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকে৷ এই যে এতক্ষন ধরে যাকে আমার পাশে দেখছেন, সে আমার মেয়ের হবু স্বামী।”
অরণ্য অধৈর্য কন্ঠে বলল,
“আপনারা রোহিনীকে জোড় করে বিয়ে দিতে চাইছেন। এটা অন্যায়।”
নভীনদা রেগে বলে,
“এটা আমরা বুঝবো”
“থামো নভীন, আমি কথা বলছি। হায়দার বংশের ক্ষমতার সম্পর্কে আশা করি আপনাদের ধারণা আছে, না থাকলেও মহল্লার কারোর থেকে জেনে নিবেন। আমাদের সাথে অযথা ঝামেলায় জড়াবেন না নাহলে এই আজহার হায়দার কি করতে পারে তা আপনারা ভাবতেও পারবেন না। চলুন এগিয়ে দেই।”
অরণ্যের বাবা গম্ভীর স্বরে বলল, “প্রয়োজন নেই।”
শেষ কথাটা শুনে সর্বশক্তিতে দরজায় করাঘাত করে বললাম,
“বাবা! ও বাবা এমন করো না বাবা। দোহাই লাগে…. অরণ্য! অরণ্য যেয়ো না তুমি, ও আঙ্কেল ও মা তোমরা বাবাকে বুঝাও, আমি অরণ্যকে ভালেবাসি।”
হয়তো অরণ্য চলে যেতে নিয়েছিলো, আমার চিৎকার শুনে দরজার নিকট ছুটে এসে বলে,
“ভুবনমোহিনী, চিন্তা করো না। তুমি আমারই হবে, আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। কেউ না।আমি তোমায় নিয়ে যাবো।”
নভীনদা তেড়ে এসে বলে,
“নিয়ে যাবি মানে কলিজা ছিঁড়ে হাতে ধরিয়ে দিবো।”
“কিচ্ছু করতে পারবেন না আমাকে। ছাড়ো বাবা বলতে দাও, আপনারা ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন একবার বাড়ির মেয়ের মনের অবস্থা ভেবে দেখেছেন? আমি চলে যাচ্ছি তবে আবারও আসবো আমার রোহিনীকে নিতে। তখন আপনারা কিচ্ছু করতে পারবেন না।”
নভীনদা হেঁসে বলল, “সেগুরে বালি।”
বিপরীতে অরণ্য তাচ্ছিল্য হেঁসে নভীনদাকে বলল,
“বুঝলেন নভীন চৌধুরী, জোড় করে সংসার করা গেলেও সুখে থাকা যায়না। সেখানে আপনি অন্যের ভালোবাসা কেড়ে নিয়ে সুখে থাকতে চাইছেন। হাস্যকর ব্যাপার!”
বাবা বললেন, “আপনারা আসতে পারেন।”
মা বলল,
“একবার মেয়ের দিকটা ভেবে দেখো, মেয়েটা যখন পছন্দ করেই ফেলেছে। ছেলেও তো মন্দ নয়।”
“তুমি চুপ থাকো, বেশি বুঝো না।”
অরণ্যের বাবা আর অপমান নিতে পারছেন না। তিনি অরণ্যকে ধমকে বললেন,
“অনেক হয়েছে, চলো অরণ্য।”
“বাবা… ও বাবা..দোহাই লাগে এমন করো না, তাদের যেতে দিও না বাবা..বাবা”
কিছুক্ষণ গলা ফাটিয়ে ডেকেও দরজা খুললো না কেউ। আমি ছুটে গেলাম বারান্দায়, অরণ্যে বারান্দার পাণে চেয়ে চেয়ে যাচ্ছে। লোহার শিক ধরে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লাম।
“এমন হওয়ার তো কথা ছিল না।”
দরজার কপাট খুলে যাবার মৃদু শব্দ শোনা গেল, কিন্তু আমি পেছনে ফিরে তাকাইনি। নভীনদা নীরবে এসে আমার পাশে বসে পড়ল। ক্লান্তির শ্বাস ফেলে বলল,
“এ ছেলের মাঝে এমন কি আছে যা আমার মধ্যে নেই? আমাকে একবার ভালোবেসে দেখ। তোর সব চাওয়া পূরণ করবো,যা চাইবি সবকিছু!”
“অরণ্যকে চাই আমি। ওকে ভালোবাসি আমি। জানিনা ওর মাঝে এমন কি আছে কিন্তু এটুকু জানি আমার সকল ভালো থাকার মূল উৎস অরণ্য।”
আমার পাণে নভীনদা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। হাত ধরতে নিলে সরিয়ে ফেললাম।
“ছুঁবেন না আমায়।”
“তাহলে কে ছুঁবে? সেই অরণ্য?”
কঠোর দৃষ্টিতে তাকাতেই সে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলো। কিছুসময় নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরলো।
“রোহি…?”
প্রতিউত্তর করলাম না। সে তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,
“আমি খুব খারাপ তাই না? খুব খারাপ আমি! কি করবো বল, যে আমি বুঝ আসার পর থেকে তোকে ভালোবেসে যাচ্ছি সে আমি তোকে অন্য কারোর সঙ্গে কিভাবে সহ্য করবো? এর থেকে তো মৃত্যুও ভালো!”
আমার অবাক দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে নভীনদা চলে গেলেন।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১১
রাতে তাহমিনা চাচি ও সমরেশ চাচা এলেন, বাবা মন খোলে বাজার করে এনে বলেছিলেন, “কোনো কিছুর যেন কমতি না থাকে।” মা সে কথা অনুযায়ী পদে পদে রান্না করেছে।
“কিছু বাবা-মায়েরা সন্তানের মঙ্গল চান ঠিকই কিন্তু কিসে মঙ্গল থাকবে তা বুঝে উঠতে পারে না।”
মা এসে দেখে আমি এখনো তৈরি হয়নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেগুনি রঙা শাড়ি এনে পড়িয়ে দিতে থাকে। আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম না।
“তাদের সামনে অভদ্র আচরণ করবে না। শান্ত থাকবে।”
ধীর কন্ঠে বললাম,
“অভদ্রতামী করবো না তবে যা করার ভদ্রভাবেই করবো।”
মা কপাল কুঁচকে বললো, “কি করবে তুমি? অযথা বাবাকে রাগিয়ে নিজের সর্বনাশ ডেকে এনো না রোহি। মায়ের কথা শুনো ভুলে যাও ছেলেটাকে।”
বিপরীতে অধর কোণে তাচ্ছিল্যতার হাসি ফুটে উঠে।
নভীনদা বেশি অপেক্ষা করতে চান না। আজই বাগদান করে সম্পর্কটাকে সমাজে স্বীকৃতি দিতে চান। বাবার মুখশ্রী দেখে বুঝলাম এ নভীনদা ও বাবার পূর্বপরিকল্পিত।
বাবা বললেন,
“আজ ঘরোয়া বাগদান করে সামনের শুক্রবার এলাহি আয়োজনে আমাদের মেয়ে আপনাদের হাতে তুলে দিতে চাই। আপনারা কি বলেন?
সমরেশ চাচা বললেন, “নভীন আমাদের একমাত্র ছেলে, আমরাও চাচ্ছিলাম বিরাট আয়োজন করে বিয়ে দিতে। তবে বিয়ের ব্যাপারটায় এত তাড়াহুড়ো না করলে ভালো হয় না?”
তাহমিনা চাচি হেঁসে বললেন, “কিন্তু আমার কোনো আপত্তি নেই বরং বাড়ির বউ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়িতে আনতে পারবো তত ভালো। কি বল ভাবী?”
মা হেঁসে সম্মতি জানালো।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,
“আমি এই বিয়ে করবো না চাচি, বাবা নভীনদার সঙ্গে আমায় জোড় করে বিয়ে দিতে চাইছেন।”
নভীনদার বাবা- মা আমার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।
“রোহি!”
নভীনদার ধমকের বিপরীতে রেগে বললাম,
“আপনিও আমাকে জোড় করে বিয়ে করতে চাইছেন তা জেনেও যে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি।”
বাবা হুংকার ছেড়ে বললেন,
“আরেকবার এই ভালোবাসার কথা বললে জ্বীভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। এখনও সময় আছে ওই ছেলেকে ভুলে যাও নইলে তোমায় বিষ খায়িয়ে মেরে নিজেও মরে যাবো।”
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১২
রাত গভীর। চন্দ্রের আলোয় হাতে আংটি জ্বলজ্বল করছে। নভীনদার বাবা-মাকে সব জানিয়েও কোনো লাভ হলো না। তারা সত্য শুনে অখুশি হয়েছিল ভীষণ, নভীনদার সাথে কথা বললেও নভীনদা তার জেদে অনড়। বাগদানের মুহুর্ত অক্ষিপটে ভেসে আসতেই হৃদয় চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হলো৷ আংটি টা খুলে হাতের মুঠোয় নিলাম। শুনেছি বাগদানের পর সমরেশ চাচা ও বাবা মিলে খুশিতে পুরো মহল্লায় মিষ্টি বিলিয়েছে। হঠাৎ দেয়ালের ক্যালেন্ডারে চোখ পড়তেই কলিজা মোচড় দিয়ে উঠলো৷ শুক্রবার আসতে মাত্র তিন দিন বাকি সেখানে অরণ্যের সাথে যোগাযোগের সকল রাস্তা বন্ধ। মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডে কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে।
মা গরম দুধ নিয়ে এসে শিউরে বসতেই আমি দুধভরা গ্লাসটি ছুঁড়ে ফেললাম মেঝেতে। কাচের রিনঝিন আওয়াজে গুমোট পরিবেশটা যেন এক দণ্ড কেঁপে উঠল। বাবা গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন
হওয়ায় টের পেলো না।
মা চিন্তিত স্বরে বলল,
“এসব পাগলামো করে নিজেও শান্তি পাবে না, আমাকেও শান্তিতে থাকতে দেবে না।”
ভাঙাস্বরে বললাম, “অন্তত তুমি আমাকে বোঝার চেষ্টা করো মা। একটু বাবাকে বোঝাও।”
“তোমার কি মনে হয় আমি বুঝাইনি তোমার বাবাকে? বুঝিয়েছি তবে সে তার সিদ্ধান্তে অনড়। আর যাইহোক প্রেমের বিয়ে সে মানবে না৷ তার থেকেও বড় কথা সমরেশদা কে সে কথা দিয়েছে। আমার হাত বাঁধা মা, আমি আর কি করবো।”
একটুকরো আশা নিয়ে বললাম,
“অরণ্যের সাথে কথা বলিয়ে দাও। আমি অরণ্যের সাথে অনেক দূর চলে যাবো৷”
মা অবাক নয়নে বলল, “অসম্ভব রোহি, তোর বাবা মেরে ফেলবে তোকে। তুই চিনিস না তোর বাবাকে।”
.....
নিস্তব্ধ রজনী। কালো আকাশে জোৎস্নার আলো ছড়িয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ পরিবেশ ভুতুড়ে করে তুলে।
“ইসলামি শরিয়তে মেয়েদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে বৈধ নয়।”
“তোর বাবা এসব মানবে না।”
মায়ের পা ধরে আহাজারি করে বললাম,
“আমি কিচ্ছু জানি না মা, সাহায্য করো আমায়।”
“সমাজে তোর বাবার সম্মান ধূলোয় মেশাতে চাচ্ছিস? জানিস তোর বাবা কত অপমানিত হবে?”
“মেয়ের জীবন কি সমাজের চাইতেও বড়? আমাদের সম্পর্কটাকে মেনে নিলে পালানোর মতো জঘন্য,নিকৃষ্ট কাজ করতাম না মা। এই সমাজ আজ আমাদের পিছনে পড়বে আবার তা ভুলে কাল অন্যের পিছনে পড়বে।”
“মা আমার গোটা জীবনের প্রশ্ন। অরণ্য আমায় সুখে রাখবে মা। ওর সঙ্গে আমার সকল সুখ জড়িয়ে।”
মায়ের মন গলল। ফোন নিয়ে আসতেই কল লাগালাম অরণ্যের নাম্বারে৷ ফোন রিসিভ হতেই কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বললাম,
“অরণ্য!”
“রোহিনী! তুমি কাদঁছো কেন? ফোন পেলে কিভাবে?”
“মা দিয়েছে, আজ জোড় করে বাবা আমার বাগদান করিয়েছে অরণ্য। সামনের শুক্রবারে বিয়ে।”
ওপাশ থেকে নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরলো৷
অসহায় কন্ঠে বললাম,
“অরণ্য! তোমাকে আমি হারাতে চাই না। বাবা কিছুতেই আমাদের সম্পর্ক মেনে নিচ্ছে না। কিছু তো বলো।”
“ভুবনমোহিনী আমায় ভরসা করো তো?”
“করি।”
“ কাল এক কাপড়ে সমাজকে উপেক্ষা করে পালিয়ে আসতে পারবে?”
করুণ চোখে মায়ের দিকে তাকাতেই বুক ধ্বক করে উঠলো। মা মাথায় হাত রাখতেই চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
“পারবো।”
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১৩
আকাশজুড়ে জমে আছে ঘন কালো মেঘের ছায়া। দিনের মুখে যেন এক অনাহুত রাত নেমে এসেছে।সূর্যের সোনালি ছোঁয়া নেই কোথাও, বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে একরাশ উদাসীনতা। হঠাৎ হঠাৎ গর্জন করে বলছে,
“আজ আকাশের মন খারাপ।”
বাবা চায়ে চুমুক বসিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে বললেন,
“কিছু বলবে?”
“বাবা আমি..”
কথা না শেষ করতেই তিনি পুনরায় রাশভারী গলায় বললেন,
“ওই ছেলের প্রসঙ্গে কোনো কথা শুনতে চাই না।”
তাচ্ছিল্য হেঁসে বললাম, “জানি বাবা।”
বিপরীতে বাবা কিছু না বলে হাতে চা নিয়ে ম্যাগাজিন পড়ে যাচ্ছে। সাহস করে তার পাশে বসে ধরাশায়ী গলায় বললাম,
“তোমায় ভালোবাসি বাবা।”
বাবা অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। ফের কপাল কুঁচকে বললেন,
“লাভ নেই এসব বলে। বিয়ে তোমায় নভীনের সঙ্গেই করতে হবে।”
মায়ের মুখে একরাশ দ্বিধা, ভয় ও মায়া। রুমে এসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দায় দাঁড়ালাম৷ নভীনদার বারান্দার দরজা বন্ধ। অজানা কারণে মন ভারী হয়ে আছে। কান্নারা কেমন দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ সম্পর্কে অজ্ঞাত। অরণ্য মেসেজ পাঠিয়েছে, অনেক বড় লেখা। সেখান থেকে একটা জায়গায় চোখ আঁটকে গেল।
“সেদিনের ঘটনার পর বাবা অপমানিত হয়েছে ভীষণ, মতও বদলে গেছে, পরিবারের সবাই নারাজ। তবে ভুবনমোহিনী, চিন্তা করো না তুমি। আমি সব ব্যবস্থা করেছি। আমাদের জন্য একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে ফেলেছি,বিয়ের পর সেখানে উঠবো। একবার বিয়ে হয়ে গেলে দেখবে বাবা-মায়েরা আমাদের মেনে নিবে। তোমার বাবারও মন নরম হবে, লিখে নিও। জানো ভাবতেই ভীষণ আনন্দ হচ্ছে তোমার আমার বিয়ে হবে ভুবনমোহিনী। অরণ্য নওয়াজের অর্ধাঙ্গিনী হবে তুমি। সবশেষে তুমি আমার হবে,আমার!”
“অরণ্য নওয়াজের অর্ধাঙ্গিনী” এ কথায় কি মাধুর্যতা মিশে আছে তা ভাবা দায়! ওষ্ঠপুটে হাসি রেখা ফুটে উঠলো,
“সবশেষে আমি তোমার হবো অরণ্য। অরণ্য নওয়াজের অর্ধাঙ্গিনী!”
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১৪
মধ্যাহ্নের শেষ প্রহরে বাবা ঘুমিয়ে যেতেই গায়ে লাল বেনারসি জড়িয়ে চোখে মোটা কাজল এঁকে তৈরি হলাম। মা জড়িয়ে ধরতেই মন বিষন্নতায় ঘিরে ধরল,একটা মেয়ের জন্য সবচেয়ে জটিল সিদ্ধান্ত বুঝি পালিয়ে যাওয়া হয়? এমন মুহূর্ত কারোর জীবনে না আসুক আর না তাদের এ সিদ্ধান্ত নেয়া লাগুক। মা হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ যে সুখের জন্য সব ছেড়ে যাচ্ছো সে সুখ তোমার জীবনে স্থায়ী হোক। শুনেছি মায়ের প্রার্থনা খোদার নিকট কবুল হয়, সন্তান যাই করুক না কেন বাবা মা কখনো সন্তানের মন্দ চায় না। আমরা খুব বড় ভুল করেছি ছোটবেলায় তোমাদের বিয়ে ঠিক করে। আমাদের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য আজ এত জটিলতা। অরণ্যের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করো বাবার উপর অভিমান করো না।”
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১৫
লাইব্রেরীর সামনে দাঁড়িয়ে চাতক পাখির ন্যায় অরণ্যের জন্য সময় গুনছি। তার এখনও আসার নাম গন্ধ নেই। কল দিতেই নাম্বার বন্ধ আসে। অরণ্য কখনও এত দেরী করে না, আজ এত দেরী হওয়ার কারণ বুঝতে পারলাম না সময় যত গড়ায়, ভয় তত বেড়ে যায়। অরণ্য আসছে না কেন? এতক্ষণে বুঝি আমার পালানোর খবর বাবা জেনে গেছে। আকাশের দিকে প্রার্থনা করছি অরণ্য এসে পড়ুক। বার বার আকাশ গর্জে ওঠছে,বৃষ্টি নামতে পারে। তৃষ্ণায় বারংবার ঢোক গিলছি। পাশ থেকে কেউ পানির বোতল বাড়িয়ে দেয়ায় দৃষ্টি ফেরাতেই কলিজা মোচড় দিয়ে উঠলো।
“নভীনদা”
ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম, তবে অন্যদিনের মতো নভীনদার চোখে রাগ,ক্ষোভ বা জেদ কোনো কিছু ছিল না। সে গম্ভীরমুখে বললেন,
“ভয় নেই, বাঁধা দেব না।”
আশ্চর্য হয়ে বললাম, “কেন?”
নভীনদা তাচ্ছিল্য হেঁসে বললেন,
“তুই তো অনেক আগেই পালিয়েছিস, এ শুধু নামমাত্র পালানো তবুও তোকে আটকানোর সর্বোচ্চ ব্যর্থ চেষ্টা করেছি এতে লাভ কি হলো?”
নভীনদার চোখের কার্নিশে তরল পদার্থ জ্বলজ্বল করছে। হঠাৎ তীব্র গর্জন করে আকাশ চিড়ে তুমুল বৃষ্টি ভেঙে পড়লো। একপাশে একাধারে দুটো কুকুর ঘেউঘেউ করছে৷
“মনে হয়না ও আসবে,সন্ধ্যা নামার আগে বাড়ি চল।”
দৃঢ় কন্ঠে বললাম, “ও আসবে৷ আমায় কথা দিয়েছে।”
নভীনদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “সন্ধ্যা নামবে,দুপুর থেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিস। ও আসবে না।”
কপাল কুঁচকে বললাম, “তুমি কিভাবে জানলে, আমি দুপুর থেকে অপেক্ষা করছি?”
“বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোকে যেতে দেখেছি।
যে ছেলের জন্য আমার ভালোবাসা উপেক্ষা করলি,বাবার সম্মানকে পড়ুয়া করলি না, সেই ছেলে তোকে ধোঁকা দিয়েছে তা মেনে নে। ওর তোকে বিয়ে করার হলে অনেক আগেই চলে আসত৷”
নভীনদার কথায় হৃদয় নিংড়ে উঠলো। কান্নারা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। মন বারবার বলছে,
“অরণ্য কোথায় তুমি? এসে দেখিয়ে দাও নভীনদাকে, তুমি আমায় ধোঁকা দিতে পারো না।”
আফসোস অরণ্য এলো না। আরও একবার কল দিলাম কিন্তু নাম্বার বন্ধ। ধরনীর বুকে তখন সন্ধ্যার রাজত্ব চলছে। বৃষ্টি কমার বদলে দ্বিগুন বেড়ে উঠেছে। নভীনদা এবার জোড় করে নিয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু মন যেন দু'পা সামনে বাড়াতেই নারাজ। মন অজানা শঙ্কায় বিষিয়ে আছে৷ এক মন দৃঢ় কন্ঠে বলতে চাইছে,
“অরণ্য এমন ছেলে নয়,ও ধোঁকা দিতে পারে না।” অন্যদিকে মস্তিষ্ক জবাবদিহিতা চাইছে,
“কেন করলে অরণ্য? ভরসা করতে বলে মাঝপথে ফিরিয়ে দিলে?”
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১৬
ইতিমধ্যে পুরো মহল্লা রটে গেছে আজ হায়দারের কন্যা পালিয়েছে। আমার জন্য সবাই ছি ছি করছে হায়দার পরিবারের উপর, চৌধুরীদেরও বাদ রাখেনি। কেননা তাদের বাড়ির হবু বউ ছিলাম আমি। বাড়ি ফিরতেই দেখি বাবার মুখশ্রী রক্তিম, স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। তার থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে মা কি যেন বিরবির করছে। আমাকে দেখেই আতঙ্কে সিটিয়ে গেল,চেহারা প্রশ্নের ঝাঁক হয়তো ভাবছে, “নভীন রোহিনীকে কিভাবে পেল?”
অনুভূতিশূণ্য হয়ে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লাম। মাথাভর্তি প্রশ্নরা নিজেকেই দোষারোপ করছে। ভালোবাসায় এত জটিলতা কেন? কেন এত যন্ত্রণাদায়ক। তুমি এলে না কেন অরণ্য?
বাবা আমায় দেখেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। মা ভয়ে ভয়ে আমার সামনে দাঁড়াতেই নভীনদা ধীরসুস্থে বলল,
“আসেনি ছেলেটা। ধোঁকা দিয়েছে ওকে।”
এ কথার চাইতে হৃদয়ে ছুরিঘাতও কম দুঃসহ।
পুনরায় নভীনদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“রোহিকে কিছু বলো না,ওর বিশ্রাম প্রয়োজন।”
বলে বাবার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলল,
“চাচা শান্ত থাকুন, রোহিকে যা বলার বলেছি আমি, ওকে কিছু বলবেন না।”
বলে চলে গেলো৷ আমার শূন্য দৃষ্টি তখন মেঝেতে তাক করা। মা উঠিয়ে রুমে নিয়ে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠে। তার বুকের সাথে পাথর বনে লেপ্টে রইলাম। ধরাশায়ী কন্ঠে বললাম,
“তৃষ্ণা পেয়েছে।”
মা পানি আনতে চলে গেলো। হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। অস্ফুটস্বরে কেঁদে ওঠলাম।
“কেন করলে অরণ্য? আমার ভালোবাসায় তো কোন খাদ ছিল না,অরণ্য নওয়াজের অর্ধাঙ্গিনী বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে ঝলনা করলে কেন?”
দরজা আটকানোর শব্দ শুনে ভেজা নয়নে তাকিয়ে দেখি বাবা হাতে বেল্ট পেঁচিয়ে যাচ্ছে।
“তোকে জন্মের সময় বিষ খায়িয়ে মেরে ফেললে আজ আমায় এমন দিন দেখতে হতো না। যেই জা”নোয়া”রের জন্য সমাজে আমার মুখে চুনকা”লি মাখালি কোথায় সে বল?”
আঁচানক চামড়ার ঠান্ডা লিকলিকে ফিতা নরম মাংসপেশীতে ছুঁতেই হৃদয় কুঁকড়ে উঠে। মুহূর্তের মাঝে একের পর এক আঘাত সইতে না পেরে ঠোঁটের কোণ থেকে আর্তনাদ বেড়িয়ে আসলো। মা চিৎকার করে দরজায় কড়াঘাত করে আহাজারি করে যাচ্ছে। সময়ের সাথে দেহে আঘাতের জোরও ভারী হচ্ছে, তবুও বাবার ক্ষোভ কমছে না আর না গলা চিড়ে আর্তনাদ বাবার কর্ণে পৌঁছাতে পারছে।
মা হাউমাউ করে কাদঁতে কাঁদতে বলল,
“ছেড়ে দাও মেয়েটাকে আর মেরো না দোহাই লাগে। ও মরে যাবে।”
“মরে যাক। জা” নোয়ারের বাঁচার কোন অধিকার নেই।”
শরীর জ্বলসে যাচ্ছে। একেক আঘাত যেন মৃত্যু সমান। মা হাউমাউ করে কাদঁতে কাদঁতে নভীনদার নিকট ছুটে গেলো। নভীনদাকে বাড়িতে পেলো না। তাহমিনা চাচিকে সব খুলে বলতেই তিনি ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলল,
‘'এমন চরি’ত্রহী’ন মেয়েদের মরে যাওয়াই উচিত।”
মা অসহায় দৃষ্টিতে সমরেশ চাচার দিকে চাইতেই সে মুখ ফিরিয়ে নিলো। মা আবারও ছুটে আসতে নিলে বাড়ির সম্মুখে নভীনদাকে দেখতে পেলো। তার হাত ধরে আকুতি মিনতি করে বলল,
“নভীন বাবা,আমার মেয়েটাকে বাঁচাও। ওর বাবা ওকে মেরে ফেলবে দয়া কর।”
মায়ের পুরো কথা না শুনেই নভীনদা ছুটে এলো বাড়িতে। সর্বশক্তি দরজায় করাঘাত, লাথি মেরে হুংকার ছুড়ে বলল,
“থামুন চাচা, ওর গায়ে আর একফোটাও আঘাত করবেন না। দরজা খুলুন, নাহয় খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
অসম ব্যাথায় গলা কাটা মুরগীর মতো শরীর ছটফটিয়ে উঠছে। আর চিৎকার আসছে না। শ্বাস নিতেও তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। নভীনদার কন্ঠ শুনে বাবা দরজা খুলতেই সে ছুটে এলো আমার নিকট। সারা দেহ নীলবর্ণ ধারণ করেছে। নভীনদা বাবার নিকট একপলক রক্তিম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমায় পাজকোলে তুলে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে দৌড় লাগালো। তার পিছু পিছু মা নগ্ন পায়ে উন্মাদের মতো ছুটে আসছে।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১৭
নভীনদা আমাকে হাসপাতালে এনে স্ট্রেচারে শুইয়ে দেয়। ঝাপসা নয়নে দেখতে পেলাম মায়ের আহাজারি ও নভীনদার রক্তিম টলটলে চাহনি। হাসপাতাল কোলাহলপূর্ণ, অদূরেই এক পরিবার উন্মাদের মতো কাঁদছে। স্ট্রেচারে এক হাত ঝুলে রয়েছে। তাদের কান্না কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই হৃদয় কেঁপে ওঠে। দুটো নার্স স্ট্রেচার তাদের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে, দূরত্ব যত কমছে কাঁপনি তত বাড়ছে। তাদের সম্মুখে আসতেই হৃদয় চিঁড়ে চিৎকার বের হলো,
“অরণ্য!”
ঝাপসা চোখেও অরণ্যকে চিনতে তার ভুবনমোহিনী ভুল করতে পারে না। বোধশক্তিহীন হয়ে চিৎকার করে উঠলাম। নভীনদা অরণ্যকে দেখেও থামালেন না। ছটফটের মাত্রা দ্বিগুণ হলো। অরণ্যের সারা মুখশ্রী, দেহ রক্তে জুবুথুবু।
নিজ শরীরের যন্ত্রণা ভুলে অরণ্যের নিকট যাওয়া জন্য হৃদয় ছটফটিয়ে উঠছে। ওর এমন অবস্থা কেন? কি হয়েছে? হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার ছেয়ে গেলো।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১৮
জ্ঞান ফিরতেই অরণ্যের মুখশ্রী ভেসে উঠে। অরণ্য আমার হাত নিজের মুঠোয় ধরে চুমু খেতেই বললাম,
“তুমি ঠিক আছো?”
সে ভেজা কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ। তুই ঠিক থাকলেই আমি ঠিক।”
বোধশক্তি ফিরে পেতেই হাত ছাড়িয়ে নিলাম। নভীনদা হকচকিয়ে বলল,
“কি হলো?”
নভীনদাকে অরণ্য ভেবেছি বুঝতেই বিছানা থেকে উঠতে চাইলে শক্তিতে কূলোয় নি। সারা শরীর বিষিয়ে আছে ব্যাথায়। দু হাত চেপে ধরাশায়ী কন্ঠে নভীনদাকে বললাম,
“অরণ্যের কাছে নিয়ে চলো আমায়, দোহাই লাগে মানা করো না। নিয়ে চলো না নভীনদা।”
নভীনদার মুখশ্রী ফ্যাকাসে হয়ে আছে।
“সুস্থ হয়ে নে। কথা দিচ্ছি নিয়ে যাবো।”
চিৎকার করে কেঁদে বললাম,
“না আমায় এখনি নিয়ো চলো। আমার মন বলছে ও ঠিক নেই।”
নভীনদা ধমকে বলল,
“ঠিক আছে ও। বললাম তো নিয়ে যাবো।”
অপরপাশে মা একাধারে কেঁদে চলছে।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_১৯
দুদিন হয়ে গেলেও শরীরের অবস্থার উন্নতি না হয়ে অবনতি ঘটছে। এ দুদিনে মা ও নভীনদাকে কতবার বলেছি একবার অরণ্যের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে; নাহয় কথা বলিয়ে দিতে, ততবার তারা এড়িয়ে গেছে, শুনেনি আমার কথা। আজ ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙলো। মা বাড়িতে আছে, দুপুরের খাবার নিয়ে আসবে। নভীনদা বের হয়েছে ঔষধ কেনার জন্য। ১০২° জ্বরের তোপে শরীর পুড়ে যাচ্ছে তবুও সব উপেক্ষা করে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আসতেই প্রতিমধ্যে নভীনদার সঙ্গে দেখা হলো৷ তবে আমার জেদের উপর বাধ্য হয়ে সে নিজ থেকেই আমায় নিয়ে যায়।
সারা রাস্তায় একবার নভীনদা অরণ্যের ঠিকানা জানতে চাইলো না বলে অবাক হলাম ভীষণ। তবুও অরণ্যের চিন্তায় বিভোর থাকায় কোন প্রশ্ন করলাম না।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_২০
গাড়ি থামলো কবরস্থানের নিকট। নভীনদার দিকে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি ফেলে বললাম,
“এখানে থামালে কেন নভীনদা?”
নভীনদা ফ্যাকাসে মুখে গাড়ি থেকে নেমে ধীর কন্ঠে বলল,
“নাম…”
গাড়ি থেকে নেমে অস্থির কন্ঠে বললাম,
“কিন্তু আমি অরণ্যের কাছে যাবো, কবরস্থানে কি কাজ… “
“অরণ্য এখানেই আছে।”
“মানে ক..”
কথার মাঝে হঠাৎ থমকে গেলাম, নভীনদার কথা বোধগম্য হতেই নভীনদার কলার চেপে রেগে বললাম,
“তোমার সাহস কি করে হলো এত বাজে কথা বলার।”
বিপরীতে হাত ছাড়িয়ে ভাঙা কন্ঠে বলল,
“শান্ত হো, নাহলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বি।”
নভীনদার মুখশ্রী দেখে হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। কান্নারা দলা পাকিয়ে কন্ঠরোধ করছে।
“মি..থ্যে বলছো… তাই না?”
নভীনদা কিছু না বলে আমায় এক কবরের সম্মুখে নিয়ে গেল। কবরস্থানের নেমপ্লটে বড় অক্ষরে লেখা,
بسم الله الرحمن الرحيم
মৃত অরণ্য নওয়াজ
পিতা: সোলায়মান নওয়াজ
মাতা: করবী হোসেন।
ধপ করে ভেজা স্যাতস্যাতে মাটিতে বসে পড়লাম। শরীর অস্বাভাবিক কাঁপছে। অবিশ্বাস্য নেত্রে আবারও নামটা পড়লাম। মানতে কষ্ট হচ্ছে। কাঁপা হাতে মাটি ছুতেই শরীর কাটা দিয়ে উঠলো।
“অরণ্য তোকে ধোঁকা দেয়নি। সেদিন ও তোর নিকট আসতে চেয়েছিল কিন্তু….কিন্তু ভাগ্য সহায় করেনি। মাঝরাস্তায় গাড়ি সংঘর্ষ হয়। রাস্তায় কিছু লোকেরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। বিকেলে অরণ্যের বাড়িতে খবর যেতেই পরিবারের লোকেরা ছুটে আসে হাসপাতালে। কিন্তু এর পূর্বেই ও…”
“আর কিছু শুনতে চাই না।”
আর কিছু শোনার শক্তি নেই৷ অরণ্য আমায় ধোঁকা দেয়নি, আমি কিভাবে অরণ্যকে অবিশ্বাস করতে পারলাম? ও ভুবনমোহিনীকে নিজের প্রাণের চাইতেও অধিক ভালোবাসে, অরণ্যের ভালোবাসার নিকট আমার ভালোবাসা ঠুনকো। অরণয়ের বলা সকালের কথাটি কর্ণকুহরে ভেসে এলো,
“জানো ভাবতেই ভীষণ আনন্দ হচ্ছে তোমার আমার বিয়ে হবে ভুবনমোহিনী। অরণ্য নওয়াজের অর্ধাঙ্গিনী হবে তুমি। সবশেষে তুমি আমার হবে,আমার!”
জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস হয়ে রইবে, আমি অরণ্য নওয়াজের অর্ধাঙ্গিনী হতে পারলাম না। পারলাম না আমাদের ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে।
■■■■■■■■■■■■■■ 🤍
🩶 পর্ব_২১
ডায়েরিতে আর কিছু লেখা নেই। অনিল ডায়েরিটা বন্ধ করে ফেললো। তার মনে একটাই প্রশ্ন,
“অরণ্য নওয়াজের মৃত্যুর পর মায়ের সাথে বাবার বিয়ে হলো কিভাবে? বিয়েতে কি আধোও মায়ের মত ছিল? তাদের বিয়ের পর মুহূর্তের কিছু মা লিখেনি কেন? মা কি বাবাকে ভালোবাসতে পেরেছিল?”
এত এত প্রশ্নের জবাব জানতে অনিল মরিয়া হয়ে উঠে। কাকে জিজ্ঞেস করবে অনিল? বাবার সঙ্গে তার অত সখ্যতাপূর্ন সম্পর্ক নেই। মা বেঁচে থাকলে অনিল নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করতো, “মা তুমি কি বাবাকে ভালোবাসতে পেরেছিল? বাবার সাথে সুখে ছিলে তো?”
অনিলের বয়স ২০ এর ঘরে। তার জন্মের সময় রোহিনী মারা যায়। এরপর আর নভীন চৌধুরী বিয়ে করেনি। তাহমিনা বেগম হাজার বলে -কয়ে দিব্যি দিলেও সে তার সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছে। তার জীবনে রোহিনী ছাড়া কোন দ্বিতীয় নারীর জায়গা নেই। এ বিষয়ে নভীন চৌধুরী ভীষণ পাষাণ!
..............................
𝐓𝐇𝐄 𝐂𝐎𝐍𝐂𝐋𝐔𝐒𝐈𝐎𝐍 🖤
***Download NovelToon to enjoy a better reading experience!***
Comments