𝐓𝐇𝐄 𝐈𝐍𝐃𝐄𝐗 🖤
জীবনের পয়ত্রিশ বছর পার হলো আমার। পার হলো পয়ত্রিশটা বসন্ত। জীবন থেমে থাকেনি আমার। বহমান নদীর স্রোতের মতো এগিয়ে গেল সামনে। জীবন বদলেছে। সময় রং পাল্টেছে। আদুরী অবুঝ মায়া হয়ে উঠেছে বুঝদার। ভীষণ বুঝদার ও আদর্শ হাইস্কুলের টিচার। আজ বৃহস্পতিবার। স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হলেও অফিসিয়াল কাজ সেরে বের হতে হতে প্রায় চারটা বেজে গেল আমার। আকাশটা মেঘলা। হয়তো বৃষ্টি হবে। গায়ে আমার চাপা রঙের শাড়ি। কাঁধে সাধারণ ব্যাগ। বাস্তব সংগ্রামী জীবনের লড়াই করা এক দুর্দান্ত নারী আজ আমি। জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে আজ এই জায়গায় আমি। আত্মসম্মান নিয়েই বেঁচে আছি নিজের পরিবারকে নিয়ে। স্কুল গেইট ধরে রাস্তায় বের হলাম। ঝঞ্ঝাট ব্যস্ত নগরী। শব্দ তুলে রিক্সা, সিএনজি, অটো চলাচল করছে। আমি রাস্তা ধরেই দাঁড়ালাম। রিক্সার প্রয়োজন। দিনটাও ভালো নেই। যেকোনো সময় তুমুল বৃষ্টি হতে পারে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাতঘড়ির সময়টা দেখে নিলাম। খালি রিক্সা পাচ্ছি না। এমন পরিস্থিতিটাও নতুন না আমার জন্য। তাই অধৈর্য হলাম না। বরং ধৈর্য ধরেই দাঁড়িয়ে রইলাম। অধৈর্য, রাগ, জেদ, চঞ্চলতা, দুঃখ প্রকাশ করা আরও আঠারো বছর আগে সেই কিশোরী বয়সেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার রাগ দেখানোর মানুষ নেই। তাই রাগটাও নেই। শান্তই থাকলাম। আমি ধৈর্য নিয়ে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করার মধ্যেই কারও উপস্থিতি টের পেলাম নিজের পাশে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল আসাদ সাহেবকে। আমাদের স্কুলের বর্তমান প্রিন্সিপাল। তবে বয়সটা হয়তো আমার থেকে দুই-তিন বছরের বেশি হবে। আমার একসাথে প্রায় দশ বছর ধরে কাজ করছি। সেই সুবাদে ভালো সখ্যতা উনার সাথে আমার। আমাদের পুরাতন হেডমাস্টারের জায়গাটা উনি পেয়েছেন বছর দুয়েক হলো। যাই হোক! আমি হালকা ইতস্তত বোধ করলাম উনার গাঢ় দৃষ্টিতে। নিজের ইতস্তত কাটাতে আলতো হেসে প্রথমে প্রশ্ন করলাম...
---" কি ব্যাপার স্যার? আজ রাস্তায় দাঁড়ালেন যে? গাড়ি কোথায় আপনার?
উনার হালকা নড়েচড়ে আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে তাকাল। মেঘের আচ্ছন্ন আকাশটা দেখে একটু করে বললেন...
---" আজ গাড়িতে চড়তে ইচ্ছা করছে না। আপনার সাথে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি বিলাশে ভিজতে মন চাচ্ছে। আপনার হাতটা ধরার সুযোগ তো দিলেন না আমায়। পাশে দাঁড়ানোর সুযোগটা তো পাবো মনে হয়?
আমি পুনরায় হাসলাম। উনার মনের অনুভূতি আমি সম্মান করি। কিন্তু সম্মতি দেই না। উনি আমাকে বিগত পাঁচ বছর ধরেই এসব বলে আসছেন। বাড়িতে বেশ কয়েকবার বিয়ের প্রস্তাবও পাঠিয়ে ছিলেন। বাবা-মা ভাই রাজি হয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি সবসময়ের মতো। কি করে হবো? আমি তো আজও কারও বউ। হোক সে আমায় চায় না। তারপরও তো আমি তার বউ। ডিভোর্স তো আজও আমাদের মধ্যে হয়নি। ডিভোর্স যদি হতো, তারপরও আমি দ্বিতীয় বিয়ে কখনোই করতাম না। আমার মনে একজনের বসবাস। তার সাথে সংসার করতে পারিনি। তো কি হয়েছে? বউ হয়েছি। আজও আছি। ব্যাস এটাই যথেষ্ট আমার জন্য। ভালোবাসলে যে পূর্ণতা পেতে হবে, এমন তো কথা নেই তাই না। আমার সংসার অপূর্ণতায় থাক। তারপরও অন্য কারও সাথে না জড়াক আমার জীবন। ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে হাতে নিলাম। বৃষ্টি নামবে যেকোনো সময়। উনার দিকে না তাকিয়ে ভরা গলায় বললাম...
---" আপনার ঠান্ডা লাগবে স্যার, বাসায় যান। আর দ্রুত বিয়ে করার চেষ্টা করবেন অবশ্যই। আমার আশায় থাকবেন না স্যার। এটা আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি। আমি বিবাহিত! আমি কারও বউ। আমার ডিভোর্স হয়নি।
পাশ থেকে কানে এলো উনার অধৈর্য গলায় সুর। উনি বললেন..
---" তাহলে কোথায় আপনার স্বামী? বিগত দশ বছরে একটা বারও তো দেখিনি তাকে আপনার পাশে? তাহলে আমি কেন মানব আপনার বিয়েটা? কিশোরী বয়সের একটা ছেলেখেলা বিয়েকে কেন এখনো মনে ধরে আছেন আপনি? আর কত অপেক্ষা করব? অনেক তো হলো অপেক্ষার খেলা। এবার চলুন না আমরা বিয়ে করে নেই। আমার সমস্যা নেই আমার আগে একটা বিয়ে হয়েছিল এতে।
---" কিন্তু আমার সমস্যা আছে আসাদ সাহেব। ভীষণ বাড়াবাড়ি রকমের সমস্যা আছে। তাই বলছি আপনি বিয়ে করে নিন। আমার ধৈর্য্য মাত্রা প্রখর। আমি এই জীবনের দ্বিতীয় পুরুষের সাথে নিজেকে জড়াবো না। কক্ষনোই না। বয়স অর্ধেক পার হলো। বাকিটা এমনই এমনই পার হয়ে যাবে। এখন শুধু মৃত্যুর অপেক্ষায় আছি শুধু। আমার কিশোরী বয়সটা যখন অপেক্ষায় গেল বাকিটাও চলে যাবে। তাকে আমার প্রয়োজন নেই যেমন, ঠিক তেমনই আমার দ্বিতীয় পুরুষেরও প্রয়োজন নেই। আশা করছি আপনি এবার অন্তত বুঝবেন। বৃষ্টিতে ভিজবেন না স্যার, বাসায় চলে যান। আসি।
উনাকে রেখেই ছাতা মাথায় এগোলাম সামনে। পিছনে ফিরলে হয়তো দেখতে পারবো উনার অসহায় মুখখানা। কিন্তু আমি ঘুরে দেখলাম না। পরপুরুষের উপর মায়া দেখানো হারাম। তাছাড়া উনার কষ্ট বুঝতে গেলে নিজের কষ্ট বেড়ে যাবে দ্বিগুণ। আমার কষ্ট বোঝানোর মতো মানুষ নেই। এই সংগ্রামী দুনিয়াতে লড়াই করতে করতে আজ আমি একা। সবাই থেকেও যেন আমার কেউ নেই। আমার চারপাশে চোখ বুলালে অনেকগুলো সুখী মানুষ দেখতে পাই আমি। তাই তাদের সুখটা নষ্ট করি না নিজের কষ্টভারাক্রান্ত কাহিনি শুনিয়ে। কি লাভ? চলুক না যেভাবে যেটা চলছে, সেই ভাবেই। ঝড়ঝাপটায় কাকভেজা হয়ে পৌঁছালাম বাসায়। পরপর কয়েকবার বাসার কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিল নিদ্রিতা। আরিফ ভাইয়ার ছোট মেয়ে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ভীষণ চঞ্চল হরিণী। অনেকটা আমার কিশোরী বয়সের চঞ্চলতা ওর মাঝে দেখতে পাই আমি। দেখতেও নাকি অনেকটা আমার মতোই হয়েছে সবাই বলে। আমারও তাই মনে হয়। কারণ আমাদের মাঝে দুটো জিনিসের বেশ মিল। আমাদের বংশগত চুল আর চোখ দুটো। আমি হাসলাম। নিদ্রিতা আমার পেট জড়িয়ে ধরতেই বাঁধা দিলাম আমি। কিন্তু শুনলো না ও আমার কথা। সে আমার ঝাঁপটে পেট জড়িয়ে ধরবেই। হলো তাই। আমার সাথে নিদ্রিতাও ভেজলো। আমি প্রসন্ন গলায় বললাম...
---" আমার নিদু মনটা আজ বেশ ফুরফুরে লাগছে। কি হয়েছে আম্মু?
আমার কথায় বেশ আদুরী হয়ে উঠল নিদ্রিতা। আমার পেট জড়িয়ে মাথা তুলে তাকাল আমার দিকে। ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে উৎফুল্ল গলায় বলল...
---" মেজো ফুপি আসবে সবাইকে নিয়ে কাল।
নিদ্রিতার কথায় আমিও ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলাম। ওর কপালের ছোট চুলগুলো গুছিয়ে টেনে দুপাশে দিতে দিতে বললাম...
---" বাহ! বেশ ভালো কথা। তা তুমি কিভাবে জানলে?
---" আম্মু বলেছে। মামা আসবে নাকি মেজো ফুপি আর আদ্র, রাতুল ভাইয়াকে নিয়ে কাল। কেন তুমি জানো না ফুপিমা?
---" না। আমাকে কেউ জানায়নি তো আম্মু।
---" তুমি তো স্কুলে ছিলে জানবে কিভাবে? আমি কিছুক্ষণ আগেই জেনেছি। তাই সবার আগে তোমাকে জানালাম।
আমি ঠোঁট ছুঁইয়ে আদর করলাম নিদ্রিতার কপালে।
আমার রংহীন জীবনে আলো মেললো আমার বাচ্চারা। নিজের নয়, আরিফ ভাইয়া আর ফিহা ভাবীর সন্তানদের কথা বলছি। তাদের দুটো ছেলে, একটায় মেয়ে। প্রহর, রাফাত, নিদ্রিতা। প্রহর সবেমাত্র কলেজ শেষ করলো। এখনো ভার্সিটিতে ভর্তি হয়নি। রেজাল্ট আউট হয়নি তাই। রাফাত ক্লাস টেনে পড়ছে। তিনজনই আমি বলতে পাগল। বর্তমানে তাদের ঘিরেই আমার একাকীত্বের গোছানো সংসার। যখন আমাকে আদুরে সহিত ফুপিমা বলে ডাকে তখন শুনতে চমৎকার লাগে। মনে হয় কোথায় আমি একা? এইতো আমি পূর্ণ নারী। একাকীত্ব নেই আমার। আমি আর কথা বাড়ালাম না। দরজা লাগিয়ে সোজা নিজের রুমে গেলাম। শাড়িটা পাল্টিয়ে চেঞ্জ করলাম। সাধারণ থ্রি-পিস পড়লাম। স্কুলে গেলে শাড়ি পড়া হয় আমার। নয়তো বাসায় থ্রি-পিসই পড়ে থাকি। আজ দুপুরে খাওয়া হয়নি আমার। পেট ক্ষুধা থাকলেও এই অসময়ে আর খেলাম না। একটু মায়ের রুমে যাওয়া প্রয়োজন। তাই ফ্রেশ হয়েই মায়ের রুমে গেলাম প্রথমে। বাবা মারা গেছে আর বছর তিনেক আগেই। সেই থেকে মাও বেশ অসুস্থ থাকে আজকাল। আমাদের বাড়িটাও আগের মতো নেই। আরিফ ভাই বেশ বড় করে পুনরায় বানিয়েছে। ভাইয়ের ব্যবসাও বড় করেছে। তিনি এখনো চট্টগ্রাম থাকেন। তবে সপ্তাহান্তে বাসায় ফিরে আসে। ফিহা ভাবীকে আজও ভাই নিজের কাছে নিয়ে যেতে পারলো না। ভাবীর এক কথা, সে এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না। তবে তাদের বড় ছেলে প্রহর বর্তমানে ভাইয়ের সাথেই থাকে। অবসর সময় হওয়ায় বাবার ব্যবসার কাজে হিসাব রাখে সে। আমি আলতো হাতে মায়ের রুমের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। মা আসরের নামাজ শেষ করে উঠছেন। আমাকে দেখেই তিনি দীর্ঘশ্বাস যেন ফেললেন। হয়তো অনুতাপের কারণে। আমি মনে নিলাম না বিষয়টি। মা আমাকে হাতে ইশারা নিজের কাছে ডাকলেন। আমি এগিয়ে গেলাম। পাশে দাঁড়াতেই বললেন বসতে। আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসতে বসতে আম্মুর কপাল চেক করলাম জ্বর আছে কিনা। না, নেই। আমি আম্মুর সামনে বিছানায় বসে বললাম...
---" দুপুরে খেয়েছিলে আম্মু?
---" হুমম। তুই খেয়েছিস?
সত্যিটা চেপে মিথ্যাটাই বললাম..
---" হুমমম।
---" মনে হয় না। তুই আবারও মিথ্যা বলছিস আমাকে। তোর মুখটা শুকনো লাগছে কেন? সত্যি করে বল খেয়েছিস কিছু?
রোজকার প্রশ্ন আম্মুর এইগুলো। মা মনে হয় এমনই হয়। আমার শত কষ্টের মাঝে একটু সুখ এনে দিতে চান মা। আমাকে হাসি খুশি দেখতে চান। আমার না বলা চাপা কষ্টটা কমাতে চান। আমি আম্মুর কথার উত্তর দিলাম না। বরং পাল্টা প্রশ্নে বললাম...
---" তুমি দুপুরের মেডিসিন খেয়েছিলে আম্মু?
আমার কথার উত্তর আমার আম্মুও দেয়নি। বরং নিজ ভাষায় বলল...
---" আমাদের একটা ভুলের শাস্তি আর কত নিজেকে দিবি তুই? তোর সংসার তোর বাবা দেখে যেতে পারলো না।
আমিও হয়তো যেকোনো দিন মারা যাব। তার আগে কি তোর একটা সংসার দেখে মরতে পারবো না রিক্তা? আর কত মরীচিকার পিছনে পড়ে থাকবি? এবার নাহয় বিয়ে করে নে না মা। আমরা তোকে সুখী সংসারী দেখতে চাই। এটা কি আমাদের অপরাধ? আর কত কষ্ট করে ধুঁকে ধুঁকে মরবি? এবার সবকিছুর শেষ কর না মা। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও বিয়েটা করে নে তুই।
আম্মুর চোখে কষ্টের অশ্রুকণা স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি। কিন্তু আমি কাঁদলাম না। কারণ আমি কাঁদলে বা কষ্ট পেলে সে আরও বেশি কাঁদবে। আজ আমি দুর্বল নই। কষ্টকে শক্ত পাথর নেয়া নারী আমি। সহজে কান্না কি আমায় মানায়। মা তো রোজই বলে আমাকে বিয়ে করতে। এটা আর নতুন কি? আমি আম্মুর দু'হাত টেনে নিজের হাতের ভাঁজে নিয়ে সূক্ষ্ম হেসে বললাম...
---" আমি কিন্তু বিবাহিত আম্মু। একজন বিবাহিত মেয়ের স্বামী থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিয়ে হারাম আমাদের ইসলামে। তুমি জানো না।
---" কিসের হারাম? তোর স্বামী আজ আঠারো বছর ধরে তোর খবর নেয় না। দেখা-সাক্ষাৎ, যোগাযোগ, কথা বলা কিচ্ছু নেই তোদের মাঝে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তিন মাসের বেশি যোগাযোগ বন্ধ বা আলাদা থাকলে তাদের সম্পর্ক বিছিন্ন হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী আর থাকে না। সেই সুবাদে তোদের সম্পর্কও নেই। তারপরও দরকার পড়লে আমরা তোর ডিভোর্সের ব্যবস্থা করবো। আইনকে দিয়ে ঐ বাড়ির ছেলের থেকে তোর ডিভোর্সের সই নিব। তুই শুধু বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যা।
মায়ের রোজকার পাগলামোতে সম্মতি দিলাম না। বরং কথা ঘুরিয়ে বললাম...
---" শুনলাম কাল নাকি জুঁই আসবে?
---" হুমমম। লন্ডন থেকে একদিন আগেই ফিরেছে ওরা। তাই কাল আসবে আমাদের সবাইকে দেখতে। আইন নাকি এবার বাংলাদেশেই সেটেল। ওদের দুই ছেলেকেও নাকি বাংলাদেশে সেটেল করবে। দুপুরে অনেকক্ষণ কথা হলো আমাদের সাথে। তোর খোঁজও করেছিল জুঁই। আমি বলেছি তুই স্কুলে আছিস। এবার ওরা আসলে কিছুদিন থাকবে। আমি কিন্তু এবার আইন আসলে তোর ডিভোর্সের বিষয়ে কথা বলবো। যেভাবেই হোক ঐ বাড়ির ছেলে থেকে এবার আমি তোর ডিভোর্স নিব। অনেক ছেলেখেলা হয়েছে আর না। আমি তোকে এবার সংসারী করবো।
মায়ের কথায় আমি হেসে ফেললাম। আম্মু আর আম্মুর পাগলামো। সত্যি পারেও বটে। আমি হেসে বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বললাম।
---" তোমার মেয়ে বুড়ি হয়ে গেছে আম্মু। তার এখন বিয়ের বয়স নেই। পার হয়ে গেছে। তোমার মেয়ে এখন পয়ত্রিশ বছরের বুড়ি। তোমার বুড়ি মেয়ের জন্য জামাই পাওয়া যাবে না আম্মু। কেউ বিয়ে করবে না। তাই বিয়ের চিন্তা বাদ দাও। আমি ভালো আছি তোমাদের সাথে। আর কি চাই আমার। আমি এখন ডিভোর্সের বিষয়টি নিয়ে ভাবছি না। তুমি শুয়ে পড়ো। আমি রুমে যাচ্ছি। কিছু ইংলিশ সিট তৈরি করতে হবে স্টুডেন্টের জন্য। তুমি রেস্ট নাও। আসি।
কথাগুলো বলেই দরজার দিকে পা বাড়ালাম। এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে কেঁদে উঠবো আমি। আমার অচেতন মনটাকে বোঝাতে পারবো না। এমনিই গলা ধরে আসছে কান্নায়। বারবার ঢোঁক গিলে কান্নাটা থামানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলাম। তখনই পিছন থেকে শোনা গেল আম্মুর কান্না ভেজা গলার স্বর...
---" ঐ বাড়ির ছেলে নাকি বাংলাদেশেই থাকছে কয়েক বছর ধরে। তার দাদা-দাদি মারা যাওয়ার পর নাকি বাংলাদেশ চলে এসেছিল। শুনলাম! সেও নাকি এখনো বিয়ে করেনি। একাই আছে। জুঁই বলেছে। ফিহা নাকি বিষয়টি আগে থেকেই জানতো। তোকে বলতে ভয় পাচ্ছিল।
আমার পা থেমে গেল। স্থির হলাম। আর থামাতে পারলাম না নিজের নিষেধ কান্নাগুলোকে। ঝরঝর করে অবুঝের মতো বেয়ে পড়লো গাল গড়িয়ে। আমি ঠোঁট কামড়ে কান্নার শব্দ আটকালাম। মাকে শুনতে দিলাম না। শুধু ভেজা গলায় কোনো রকম বললাম...
---" হুমম।
আর দাঁড়ালাম না। দ্রুত পদে চলে আসলাম নিজের রুমে। দরজার লাগিয়ে সোজা চলে গেলাম ভেজা বারান্দায়। তেজী বৃষ্টিফোঁটা মুহূর্তেই আমার গা ছুঁয়ে দিল। আমি ভিজতে লাগলাম। চোখের পানির সাথে বৃষ্টির পানি মিশে গেল। আলাদা করা গেল না আর। তেজী বৃষ্টির সাথে সাথে আমার চেপে রাখা কান্নাটাও প্রকাশ পেল। কিশোরীর মতো ঝরঝরে করে শব্দ করে কেঁদে উঠলাম। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ভেজা ফ্লোরে বসে পড়লাম। আমার সংসারী জীবনের ইতি ঘটেছিল সেই সতেরো বছর বয়সেই। আমার সংসার করা হয়নি উনার (রিদের) সাথে। পাশাপাশি থাকার স্বপ্নটাও স্বপ্নই রয়ে গেল। এক কালবৈশাখী ঝড়ের মতো সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল আমার জীবনে। উনার সাথে ভুল বোঝাবুঝি হওয়ার পর আর ফেরা হয়নি আমার খান বাড়িতে। উনিও (রিদ) আমায় নিতে আসেনি। একটা বার দেখতেও আসেনি। যোগাযোগ করেনি। চোখের দেখাও পর্যন্ত আমি পাইনি উনার। তবে দাদা-দাদি বেশ কয়েকবার আমাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছিল, বাবা দেয়নি আমাকে। আমারও ফেরা হয়নি। এমনই এমনই বিগত আঠারো বছর পার হলো আমার উনাকে ছাড়া। প্রথম এক বছর আমি সুইসাইড পর্যন্ত করতে গিয়েছিলাম বেশ কয়েকবার উনার জন্য মানসিক চাপে। ছোট ছিলাম বলে উনাকে (রিদ) হারানোর ব্যথাটা নিতে পারিনি। আজও মেনে নিতে পারিনা। আজও আমার বালিশ ভিজে অশ্রুকণায়। আমার আশেপাশে সবাই সংসার করছে আমি ছাড়া। জুঁই আইন ভাইয়ার সাথে সংসারী হয় আমার খান বাড়ি থেকে ফিরে আসার এক বছর পরই। তারপর দুজনই পাড়ি জমায় লন্ডনে। এই যাবত লন্ডনেই কাটিয়েছে এতোগুলো বছর। তবে প্রতি বছর সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে এসে আমাদের দেখে যেত। বাবা অনেক চেয়েছিল আমাকে সংসারী করতে কিন্তু পারেনি। কারণ উনি বাংলাদেশে ছিলেন না বলে ডিভোর্স নিতে পারেনি আমার। কোথায় ছিল তাও কেউ সঠিক ঠিকানা জানতো না। ঠিকানা বিহীন হওয়ায় আমাদের ডিভোর্স হয়নি এখনো। আমিও খুব করে চাইতাম আমার ডিভোর্স না হোক। আমার নাম উনার নামের সাথে জড়িয়ে থাকুক আমৃত্যু পর্যন্ত। আমার স্বামী হয়ে। তাই হলো। অনেকটা বছর পর্যন্ত উনার খোঁজ ছিল না। আমার পড়াশোনা শেষ হলো। নিজের পায়ে দাঁড়াতে স্কুলের জবটা নিলাম। জীবনের অনেকটা সময় পার হলো। হঠাৎ একদিন কানে আসলো দাদাজান মারা গেছেন। কিন্তু দেখা হলো না আমার কারণ তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। দেশে কবে আনলো আমাকে কেউ জানালো না। আমি দাদাজানের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছিলাম একমাস পর। তারপর দাদীর মৃত্যুর সংবাদ পেলাম পাঁচ বছর আগে। ভাগ্য আমার, দাদীকেও শেষ দেখা হলো না। আমি দেখতে গিয়েছিলাম কিন্তু পথিমধ্যে আমার হঠাৎ এক্সিডেন্ট হওয়ায় আর দেখা হয়নি। প্রায় এক সপ্তাহ পা ভেঙে হসপিটালে ছিলাম। এমনই এমনই করে আমার আর খান বাড়িতে ফেরা হয়নি। উনার (রিদ) কথা কেউ ভুল করেও আমার সামনে বলে না। আমি কষ্ট পাবো বলেই সবাই উনাকে (রিদ) নিয়ে আলোচনা করে না আমার সামনে। তবে আজকে মার কথায় বুঝলাম, উনি বিগত পাঁচ বছর ধরেই একা একা থাকছেন খান বাড়িতে। আচ্ছা! উনার কি আমার কথা একটা বারের জন্যও মনে হয় না? উনি একটা কিশোরীর বউ রেখে গেছিল। সেটাও কি ভুলে গেছে সে? আমি নেই বলে কি উনি সুখে আছে নাকি কষ্ট পাচ্ছে আমার মতো করে? নাকি আমার থেকেও বেশি কষ্টে আছেন উনি? সত্যি কি আছে? নাকি আমার ভ্রম। কষ্ট থাকলে তো আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। সংসার করতো। আজকে সবার মতো করে আমাদের সংসারেও সন্তান থাকতো। আমি নিতাম। জোর করে হলেও নিতাম। কিন্তু কিছু হলো না আমার। আমি শূন্যে পড়ে রইলাম। আমার আত্মসম্মান আর উনার জেদ দুটোই বহাল থাকলো আমাদের জীবনে। যার ফলে ধ্বংস হলো আমাদের সুখটা। দিনশেষে উনিও একা থাকলো, আমাকেও রাখলো। জীবনের বাকিটা জীবন হয়তো এইভাবে কাটাতে হবে উনাকে ছাড়া। আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। উনাকে বলতে ইচ্ছা করছে, কেন আপনি আমাকে নিতে আসলেন না? কেন এতো জেদ ধরে রাখলেন? কেন আমার জীবন থেকে আঠারোটা রংহীন বসন্ত হারাতে দিলেন? কেন আমাকে নিলেন না? আমি তো আজও ভালোবাসি আপনাকে। ঠিক ততটাই ভালোবাসি যতটা কিশোরী বয়সে বাসতাম। আমি আজও কুমারীনি হয়ে আছি আপনার জন্য। আপনার অল্প স্পর্শ আজও লেগে আছে আমার শরীরে। বিলীন হতে দেয়নি। তাহলে কেন আপনি আমার ভালোবাসাকে দেখছেন না? কেন? আমার অপরাধ কি ক্ষমার অযোগ্য ছিল না মিস্টার ভিলেন? সত্যি ছিল না?
কান্না করতে করতে ভেজা ফ্লোরে ঘুমিয়ে পড়লাম। কয়টা বাজে সময়ের খেয়াল নেই। তীব্র ঠান্ডায় কেঁপে কেঁপে উঠে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। ফ্লোর থেকে উঠে বসলাম। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শরীরও টনটন করে ব্যথা লাগছে। আজ দুবার ভেজা হলো আমার। এই বয়সে এসে বাচ্চামোটা যেন নিজেরই খাপছাড়া লাগছে। ক্লান্ত শরীরে উঠে দাঁড়ালাম। ভেজা কাপড় পাল্টিয়ে পুনরায় তাতে কালো একটা শাড়ি পড়লাম। বৃষ্টির দিনে শাড়ি পড়তে ভালো লাগে তাই। হাত মুখ ধুয়ে আয়নার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। চোখ মুখ ভীষণ ফুলে আছে। যেকেউ বলে দিবে আমি অনেকটা কান্না করেছি। এই অবস্থায় বাহিরে যাওয়া যাবে না। সবাই বুঝে যাবে আমি কান্না করেছি। কিন্তু ক্ষুধাও পেয়েছে অনেক। তারপরও বের হলাম না। অসুস্থ শরীরটা নিয়ে বসলাম পড়ার টেবিলে বই খাতা মেলে, সিট তৈরি করতে হবে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমাটা পড়ে নিলাম। আজকাল চোখেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে হয়তো বাড়ন্ত বয়সের জন্য। আমার মনোযোগ সহকারে কাজের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটিয়ে তুমুল শব্দে বেজে উঠল আমার ফোন বেচারা। মনোযোগ নষ্ট হতেই কপাল কুঁচকে তাকালাম বইয়ের সামনে রাখা ফোনটির দিকে। আননোন নাম্বার। কপাল কুঁচকে আসে আমার এই অসময়ে আননোন নাম্বার দেখে। কে ফোন করবে আমাকে? প্রথমে ভাবলাম ধরবো না। পরে মনে হলো স্কুলের কাজে হয়তো কোনো ফোন হতে পারে। হাতে কলমটি রেখে ফোনটি রিসিভ করে কানে ধরতেই উদ্বিগ্ন কন্ঠের স্বরে থেমে গেলাম আমি। কন্ঠের স্বর কেঁপে উঠলো আমার পরিচিত গলা শুনে। ফোনের ওপাশ থেকে আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল...
---" ভাবি! ভাবি প্লিজ আপনি ফিরে আসুন এবার। ভাই ভালো নেই আপনাকে ছাড়া। এতোটা বছর কেন অপেক্ষা করালেন ভাইকে? কেন ফিরছেন না আপনি খান বাড়িতে ভাইয়ের কাছে? ভাবি! ভাই প্রচুর অসুস্থ। আপনাকে খুঁজছে বেহুশ হয়েও। ডাক্তার, ওষুধ কোনো কিছুই কাজে দিচ্ছে না। অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। প্লিজ ভাবি আপনি এবার ফিরে আসুন। হ্যালো ভাবি! আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো?"
হৃদপিণ্ড চেপে থ মেরে বসে রইলাম। তৃষ্ণায় গলা ধুঁকছে। কথা বলার ভাষা যেন এক মুহূর্তেই লোপ পেল আমার। কিছু ভাবার বা করার অবকাশ পেলাম না। কথা বলারও জোর পাচ্ছিলাম না একটুও। বুকের সাথে গলাও কাঁপছে। আমি জমে যাচ্ছিলাম। মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে গাল ভিজে উঠল সাথে সাথেই। বুকটাও হু হু করে উঠল উনার জন্য। আমার চেপে রাখা কান্নাটা অবশেষে আর দমিয়ে রাখতে গিয়েও পারলাম না। শব্দ করেই কেঁদে উঠলাম। কাঁপা স্বরে বললাম...
' উনার... উনার কী হয়েছে ভাইয়া?
'রিদ ভাইয়ের টাইফয়েড জ্বর হয়েছে ভাবি' বিগত এক সপ্তাহ ধরে একই অবস্থা। দিন দিন জ্বরের মাত্রা আরও বাড়ছে। ডাক্তার, ঔষধ কিছু কাজ করছে না। এভাবে চললে ডাক্তার বলেছে ভাইয়ার অনেক বড়সড় ক্ষতি হতে পারে। এমনকি প্যারালাইজডও হতে পারে। প্লিজ ভাবি এবার অন্তত রাগ ছেড়ে চলে আসুন না ভাইয়ের কাছে। আর কত অপেক্ষা করবে ভাই আপনার জন্য? অনেক তো হলো, এবার নাহয় ফিরে আসুন। আমরা সবাই আপনার অপেক্ষায় আছি।'
বুক কেঁপে উঠল আমার উনার বেহাল দশার কথা শুনে। আমারও মন এই মুহূর্তে উনার কাছে ছুটতে চাইছে। এক মুহূর্তের জন্য দীর্ঘ বছরের দূরত্বের কথাটা আমার মাথায় এল না। শুধু এল আমার এই মুহূর্তে উনার কাছে যেতে হবে। আমার উনাকে দেখতে হবে। উনি ভালো নেই। আমার উনার পাশে থাকা চাই। তাই উদ্বিগ্নতায় বললাম...
' ভাইয়া আমি এক্ষুনি আসছি উনার কাছে। রাতের গাড়ি ধরেই চলে আসব। প্লিজ আপনি উনার খেয়াল রাখুন। আমি আসছি।
ব্যস্ত স্বর শুনতে পারলাম তৎক্ষণাৎ আসিফ ভাইয়ার ফোনের ওপাশ থেকে।
' ভাবি আমি আপনার বাসার নিচে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আপনাকে নিতে এসেই কল করেছিলাম। আপনি দ্রুত নেমে আসুন। তাড়াতাড়ি করে ভাইয়ের কাছে পৌঁছাতে হবে। ভাইকে আসার সময় ডক্টর নার্সদের হাতে রেখে এসেছি।
আর কিছু ভাবা হলো না আমার। আর না কোনো দিকে তাকালাম। কীভাবে যে দৌড়ে সবাইকে ডিঙিয়ে ঘর থেকে বের হলাম সেটা একমাত্র আমিই জানি। কারও ডাকে জবাবটা পর্যন্ত দেওয়ার হুশে ছিলাম না আমি। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে ঘর থেকে রাস্তায় বের হলাম। পাশেই দেখলাম সাদা একটি গাড়ি দাঁড়ানো। আসিফ ভাইয়া গাড়ির লাইট জ্বালিয়ে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টির মধ্যে। আমি দৌড়ে সেদিকে যেতেই তিনি গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দিলেন আমাকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে। আমি দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলাম। আসিফ ভাইয়া সামনে ড্রাইভারের পাশে বসতেই গাড়িটি চলতে শুরু করল। বৃষ্টির পানিতে শাড়ি অনেকটাই ভিজে ঝবঝব হয়ে গেছে। হিমশীতল ঠান্ডাও লাগছে। কিন্তু তারপরও আমি স্থির থাকতে পারছিলাম না। অস্থিরতার সহিত গাড়ির ভিতরে ছটফট করছিলাম চাতক পাখির ন্যায়। দুই ঠোঁট চেপে কান্না করছিলাম নিঃশব্দে উনার জন্য। আজ এত বছর পর হঠাৎ করে উনার জন্য এমন সংবাদ শুনব, আশা করিনি। বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে অনেকটা শব্দ করেই কেঁদে উঠলাম গাড়িতে। আরিফ ভাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমার দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকালেন। যেন উনি জানতেন আমি এই মুহূর্তে উনার (রিদ) জন্য কান্না করব। আসিফ ভাইয়া হতাশ গলায় বললেন...
' এতটা ভালোবেসেও ভাইয়াকে এত বছর নিজের থেকে কেন দূরে রেখেছিলেন ভাবি? কেন আরও আগে ফেরেননি? তাহলে আজ অন্তত এতটা বছর দুজনের জীবন থেকে হারাতো না।
আমি ডুকরে কেঁদে উঠে বলি...
' আমি কি ফিরতে চাইনি ভাইয়া? নাকি উনি আমাকে নিতে আসেননি? একটাবার যোগাযোগ পর্যন্ত করেননি আমার সাথে। তাহলে আমি কীভাবে ফিরে যেতাম উনার কাছে?
আসিফ ভাই বললেন,
' আপনি নিজেই তো রিদ ভাইকে সকল যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন ভাবি। সবকিছু জেদ তো শুধু আপনি করেছিলেন সেদিন। আপনি রিদ ভাইকে কসম দিয়ে সেদিন চলে গিয়েছিলেন বলে ভাই আপনার খোঁজ করেনি। পরিবার ছাড়া, আপনাকে ছাড়া এতটা বছর দূরে দূরে থেকেছে শুধু আপনার জন্য। আপনি ভাইকে বাধ্য করেছিলেন দূরে থাকতে। তাহলে ভাই আপনাকে কীভাবে ফিরে নিয়ে যেত ভাবি? ফিরে তো আপনার আসার কথা ছিল ভাবি।
আমি চমকে উঠলাম। আমার জন্য উনি এত বছর দূরে দূরে থেকেছেন! কিন্তু কেন? আমি স্মরণ করার চেষ্টা করলাম আমার আর উনার শেষ দেখার ঘটনাটিকে। সেদিন আমাদের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। শুরুটা উনি করেছিলেন। উনার রাগের শিকার আমি হয়েছিলাম। নরমাল সাধারণ একটি বিষয় নিয়েই প্রথমে আমাদের দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। আমার মুখে মুখে তর্ক করাটা উনার পছন্দ হয়নি বলে আমাকে থাপ্পড় মেরেছিলেন সেদিন। আমিও অপমান, আঘাত সহ্য করতে না পেরে সেদিন চলে এসেছিলাম আমাদের বাড়ি। আসার সময়ও উনাকে (রিদ) রাগের বশে অনেক কথা শুনিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু উনি আমার কোন কথাটা ধরে এতটা বছর অভিমান দেখিয়ে সবকিছু ছেড়ে দূরে থাকলেন? কী এমন কথা হতে পারে? না, আমি আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। তাই কম্পিত গলায় পুনরায় প্রশ্ন করলাম আসিফ ভাইয়াকে...
' আমি বাধ্য কীভাবে করব উনাকে? আমি নিজেই তো উনার অপেক্ষায় বসে ছিলাম। তাহলে?
সামনে থেকে আসিফ ভাইয়ার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কানে এল আমার। তিনি আবারও হতাশ গলায় বললেন...
' আঠারো বছর আগে না হয় আপনি ছোট ছিলেন, বুঝতে না বিষয়গুলো। কিন্তু বড় হওয়ার পর কেন বিষয়গুলো বুঝলেন না ভাবি? সেদিনের হওয়া ঝামেলা, কথাগুলো কেন পুনরায় ভাবার চেষ্টা করলেন না? তাহলে উত্তর আপনি নিজেই পেয়ে যেতেন।
' মানে?
' আপনার মনে আছে ভাবি, সেদিন আসার সময় আপনি রাগে কী বলে এসেছিলেন ভাইকে? আপনি ভাইকে কসম দিয়ে এসেছিলেন। যেন ভাই আপনার কাছে কখনো না যায়, যোগাযোগ না করে। যদি ভাই আপনার সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে তাহলে আপনার মরা মুখ দেখবে। আপনি সুইসাইড করবেন। আপনার এই কথাকে ধরে ভাই আপনার সাথে এত বছর যোগাযোগ করেনি। ভেবেছিল হয়তো আপনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবেন, কিন্তু আপনি আসেননি। ভাইও আপনার কসম ভেঙে যোগাযোগ করত না। দাদা-দাদিকেও আপনাদের বাসায় পাঠানো হলো। আপনি এলেন না। বরং আপনার বাবা ডিভোর্স দেবে বললেন। এই জেদে ভাইয়াও আর বাংলাদেশ ফিরল না। শুধু অপেক্ষা করছিল আপনার একটা বার খান বাড়িতে আসার। আপনি যদি স্বেচ্ছায় একটা বার খান বাড়িতে আসতেন তাহলে আপনার দেওয়া কসমও ভেঙে যেত, ভাইও ফিরে আসত আপনার কাছে। আপনি কখনোই এলেন না। ভাই ভাবল হয়তো আপনি বড় হয়ে বিষয়টি বুঝবেন এবং চলে আসবেন, তখনও আপনি এলেন না। দাদা-দাদির মৃত্যুর সংবাদ পেয়েও এলেন না। তারপর থেকে ভাইও জেদ ধরে আপনার অপেক্ষা ছেড়ে দেয়। আমরা সবাই ভেবেছিলাম ভাই হয়তো আপনাকে ভুলে গেছে। কিন্তু বিগত এক সপ্তাহ বুঝলাম ভাই আপনাকে কখনোই ভুলতে পারেননি। জ্বরের ঘোরে বারবার শুধু আপনার নামই নিচ্ছে সে। তাই ডক্টর বলেছে যে করেই হোক উনাকে ভাইয়ের কাছে নিতে। এতে যদি ভাই ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। এজন্য আজ আমি এখানে। আপনি জানতেন ভাই রাগী মানুষ, তারপরও কেন সামান্য মেনে নিতে পারলেন না তাকে? ভাই তো অকারণে কিছু করে না। সেদিনও আপনার ভালো চিন্তা করেই আপনাকে থামাতে চেয়েছিল। আপনি বুঝতে না পারায় থাপ্পড় মেরেছিল। কিন্তু আপনি ভুল বুঝলেন, চলে গেলেন। ভাবি, নিজের ভুল হয়তো একটা সময় বুঝতে পারবেন! তবে জীবনে অনেক বড় একটা আফসোস থাকবে আপনার, কেন আপনি সামান্য কথা ধরে জীবনের আঠারোটা বছর হারালেন।
আসিফ ভাইয়ের কথায় মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। সত্যি আমি আফসোস সাগরে তলিয়ে যাচ্ছি। সামান্য একটু ভুল থেকে হারিয়ে গেল আমাদের জীবনের দীর্ঘ আঠারো বছরের গল্প। অনুতাপে অনুতাপে কলিজা জ্বলে উঠল আমার। হা হা করে করছে বুক। আর কত? আর কতটা জ্বললে আমার অনুতাপের গভীরতা কমবে? ভুল করেও আমার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে, তাহলে উনি? উনার কতটা কষ্ট হয়েছে এত বছর পার করতে? কষ্ট, যন্ত্রণাদের চিৎকার করতে মন চাইছে। সিটে হেলান দিয়ে ডুকরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠি, যতক্ষণ না খান বাড়িতে পৌঁছাই। রাতের কটা বাজে আমার খেয়াল নেই। প্রাণপণে দৌড়ে পৌঁছালাম উনার (রিদ) রুমে। থমকানো ভঙ্গিতে জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লাম উনার অবস্থা দেখে। হাতের ক্যানুলা লাগানো। নিস্তেজ ভঙ্গিতে বিছানায় শুয়ে আছেন সটান হয়ে। রুমে দুজন নার্স রয়েছে উনার তদারকির জন্য। আমি ধীর পায়ে উনার দিকে এগোলাম। উনার পাশের ফ্লোরে ধুপ করে বসে উনার হাতটা চেপে ধরে সশব্দে কেঁদে ফেলি। আমার কান্না শুনে চমকে উঠল দুজন নার্স। আমার দিকে উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এসে নিষেধ করে বললেন...
' কে আপনি? উনার কী হন? এভাবে পেশেন্টের কাছে বসে কাঁদবেন না। উনাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। কাল সকালের আগে উঠবেন না। আপনি বাহিরে যান, পেশেন্টের কাছ থেকে প্লিজ।
আমার ভাবান্তর হলো না। উনার হাতে কপাল ঠেকিয়ে অনুতাপে আরও ডুকরে কেঁদে উঠলাম। কারও কথা ভালো লাগছে না আমার। তখনই শোনা গেল আসিফ ভাইয়ের কথা। তিনি রুমে ঢুকে নার্সকে নিষেধ করলেন আমাকে কিছু বলতে। অল্প কিছু সময়ের মধ্যে তিনি নার্স দুটোকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন আমাদের দুজনকে একা রেখে। আমি নিস্তেজ ভঙ্গিতে বসে রইলাম বেশ অনেকক্ষণ। হঠাৎ কানে উনার মৃদু গোঙানির শব্দ শুনে চমকে উঠে দ্রুত বিছানায় উনার সম্মুখে বসলাম। উনি হালকা স্বরে কিছু একটা বলছেন। আমি প্রথমে বুঝতে না পেরে আমার কান উনার মুখের সামনে নিলাম। জ্বরে তৃষ্ণার্তের কাতর হয়ে পানি চাচ্ছেন। আমি দ্রুত উঠে পাশের জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে উনাকে ধরে বসাতে চাইলাম। উনার প্রশস্ত শরীর টেনে বসাতে বসাতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। দুর্বলতায় উনি মাথা ছেড়ে বারবার ঢলে পড়ছিলেন। শরীরও প্রচণ্ড রকমের গরম। জ্বরের ঘোরে চোখ দুটো পর্যন্ত খুলছে না। আমি এবার এগোলাম। উনার (রিদ) পাশে বসে খাটে হেলান দিয়ে দুহাতে টেনে উনার মাথাটা আমার কাঁধের ওপর রাখলাম। পাশ থেকে গ্লাস উঠিয়ে একটু একটু করে পানি খাওয়াতে লাগলাম উনাকে। উনার বেহাল দশা দেখে আমি ঠোঁট কামড়ে নাক টানছিলাম কান্নায়। উনার যত্ন দরকার আপাতত। নিজের করা ভুলটা জীবনে হয়তো কখনো পূরণ করতে পারব না। তবে এবার বাকিটা জীবন আমি উনার সাথে থাকতে চাই। উনি রাখতে না চাইলেও আমি জোরপূর্বকই থাকব তার সাথে। যেহেতু অপরাধটা বড়, তাই ক্ষমাটা সহজে আশা করাও যাবে না। যতকিছু হোক না কেন, এবার জীবন দ্বিতীয়বার উনাকে ছাড়ছি না আমি। আর না তাঁকে ছাড়াতে দেব। জানি রাগ দেখাবে, কিন্তু আমাকেও শক্ত থাকতে হবে। হার মানা যাবে না। অর্ধবয়সে এসে যদি বাচ্চামো করতে হয় করব। তারপরও উনাকে আঁচলে বাঁধব আমি। হাতে গ্লাসটা রাখতে মনে হলো উনি আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চাচ্ছেন কিছু বিড়বিড় করতে করতে। আমি চমকে উঠলাম। পিঠের ওপর গরম স্পর্শ অনুভব করলাম। আমি থমকে তাকাতেই দেখলাম, উনার দুর্বল হাত দুটো দিয়ে আমাকে ধরার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছেন না। আমার গলায় মুখ ডুবিয়ে গরম উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে অস্পষ্ট স্বরে বলে...
---" ত তুমি... এসেছ রিত? তোমার গায়ের ঘ্রাণ আমি পাচ্ছি কেন? সত্যি আছো নাকি নেই?
চেপে রাখা কান্নাটা বেরিয়ে আসতে চাইছে বাঁধ ভেঙে। গাল বেয়ে ঝরঝর করে নোনাজল গড়াচ্ছে। উনি এখনো আমার গায়ের ঘ্রাণ চেনেন? এত বছর পরও ভোলেননি? এতটা ভালোবাসেন সে আমাকে? আর আমি? কান্না ভেজা গলায় কোনো রকমে বললাম...
' হুম।
গরম দুটো হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম পিঠে আর পেটে। উনার মুখ আমার গলাতে। হয়তো আমাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছেন। আমি বিষয়টি বুঝতেই তিনি পুনরায় অস্পষ্ট স্বরে আওড়ান...
' আমার কাছে ফিরতে এতটা দেরি করলে কেন রিত? আমি অপেক্ষা করেছি তো তোমার।
উনার জ্বরের ঘোরের প্রতিটা কথা আমার কলিজায় বিষাক্ত তীরের মতো আঘাত করছে। আমি জানি উনি এই মুহূর্তে যা বলছেন সবকিছু জ্বরের ঘোরে বলছেন। সজ্ঞানে থাকলে কখনোই বলতেন না। উল্টো আমাকে রুম থেকে এতক্ষণে বের করে দিতেন। নিজের ভালোবাসাটা প্রকাশ করা তো দূর থাক। আজ অনেকটা দিন! অনেক বছর পর! তার স্পর্শ পাচ্ছি, তাকে দেখছি, তার গলার স্বর শুনতে পারছি। আমি অনুতাপে শিহরিত হয়ে ঝরঝর করে কেঁদে বললাম...
' আমি সরি। আমি সত্যিই সরি। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিন। ক্ষমা চাওয়ার ভাষাও আমার কাছে নেই। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি।
' তোমার একটু করে বুঝতে এতটা বছর লেগে গেল রিত?'
ফুঁপিয়ে কেঁদে চলছি আমি।
' সরি! সরি! সরি!
উনার আর কোনো কথা শুনলাম না আমি। আমার গলায় উনার ফেলা ঘন ঘন নিশ্বাসে বুঝলাম উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। উনার কষ্ট হচ্ছে ভেবে আমি উনাকে ধরে কোনো রকমে টেনে বিছানায় শুয়াতে সক্ষম হলাম। উনার বয়স হলেও শরীরের ওজন কমেনি বিন্দু মাত্র। সেই প্রশস্ত জিম করা ফিটফাট শরীর এখনো আছে। মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে, কিন্তু সৌন্দর্য কমেনি। জ্বরের কারণে মুখটা মলিন হয়ে আছে। দুর্বলতা মুখে স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে। আমার টানাটানি করে উনাকে বালিশে শুয়াতে উনি পুনরায় উঠে গেলেন। আমার দিকে তাকান। আমাকে নিজের মুখের সামনে দেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকলেন। ক্যানোলার দুর্বল হাতটা উঠিয়ে আমার গাল আলতো স্পর্শ করে বললেন...
' আমাকে ঘুম পাড়িয়ে আবারও চলে যাবে তুমি?
আঁজলে দুহাতে উনার (রিদ) মুখ চেপে ধরে পাগলের মতো ঠোঁট ছোঁয়ালাম উনার সারা মুখে। কপাল কপাল ঠেকিয়ে বললাম, 'যাব না উনাকে ছেড়ে। আর কখনোই যাব না। সবসময় উনার পাশে থাকব' এমনটাও আশ্বস্ত করলাম। দুর্বল চিত্রে উনি পুনরায় ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি উনার মাথার পাশে বসে খাটে হেলান দিয়ে সারাটা রাত পার করলাম। সকাল সাতটার দিকে ঘুম ভাঙল আমার, তাও নার্সের ডাকে। আমি হতভম্ব হয়ে বসে প্রথমেই খোঁজ করলাম উনার। পাশে তাকিয়ে দেখলাম উনি এখনো ঘুমিয়ে আছেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। হাত বাড়িয়ে জ্বরটা চেক করলাম, না তখনও বেশ জ্বরই আছে। আমি এবার ভয় পেলাম উনার জ্বর কমছে না দেখে। নার্স মেয়েটি উনার জ্বর মেপে একটা ইনজেকশন পুশ করল ক্যানোলা দিয়ে। উনাকে (রিদ) ডেকে তুলতে নিষেধ করল নার্স। বলল আরও কিছুক্ষণ ঘুমালে উনার জন্য নাকি ভালো হবে। আমি উনার মাথায় হাত বুলিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। প্রায় নয়টার দিকে মনে হলো আমার বাসায় ফোন করে সবাইকে আমার অবস্থার কথা বলার দরকার। আস্তে করে উনার পাশ থেকে উঠে বারান্দায় গেলাম। উনার ফোন থেকে ফোন করে বাসার সবার সাথে অনেকক্ষণ কথা বললাম। সবাইকে জানালাম আমি স্বামী ঘরে ফিরে এসেছি। এবার থেকে আমি এখানেই থাকব। আমার কথায় সবাই খুশি হলো, বিশেষ করে ফিহা আপু আর মা বেশি।
ফোনের কথা শেষ করে মনে হলো এবার গায়ের কাপড়গুলো চেঞ্জ করার দরকার। চেঞ্জ করলামও। পুনরায় শাড়ি পড়লাম। কাপড়গুলো পেলাম আমার রুমে। সেই আঠারো বছর আগে আমি যেমনটা রেখে গিয়েছিলাম ঠিক তেমনটাই আছে সবকিছু। কবাটে কাপড় জায়গায়ই পেলাম। একটু নড়চড় পেলাম না। আমার আগের কাপড়ও শরীরে ফিট হয়েছে, কারণ আগের থেকে মোটা নই, শুকিয়ে গেছি। কিশোরী বয়সে আমি বেশ নাদুসনুদুস গোলগাল স্বাস্থ্যবান ছিলাম, যেটা এখন নেই। আমার বয়স হয়েছে, তবে মোটা হইনি, কারণ টেনশনে টেনশনে অনেকটা শুকিয়ে গেছি। সবসময় ঠিকঠাক না খেতে খেতে। রাতের ভেজা কাপড় ছেড়ে গোসল করে কাবাট থেকে জলপাই রঙের একটা জামদানি শাড়ি পড়ে নিলাম, কারণ কবাটে নরমাল কোনো শাড়ি না থাকায় জামদানি শাড়িটাই পড়তে হলো। তাছাড়া এই বয়সে সবার সামনে থ্রি পিস পড়ে হাঁটতে ইতস্তত বোধ করছিলাম। সারাটা দিন গেল বেহালতায়। উনার জ্বরের তেমন পরিবর্তন দেখা গেল না। আমি সারাক্ষণ উনার পাশেই বসে ছিলাম। ডক্টর, নার্স, আসিফ ভাইও ছিল। বিষয়টি নিয়ে সবাই চিন্তিত। আমার তো দম বন্ধ হয়ে আসছে। তবে যেটা নতুন ঘটেছে সেটা হলো উনি সারাদিন আমার দিকে দুর্বল চোখে চেয়ে দেখে গেছেন। যতক্ষণ হুশে ছিলেন ততক্ষণ শুধু আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন এক দৃষ্টিতে। হয়তো জ্বরের ঘোরে আমার উপস্থিতিটাকে স্বপ্ন বা কল্পনা ভাবছেন। উনার দৃষ্টি বলছে উনি আমাকে এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না। বিছানায় উনার পাশেই বসে ছিলাম। দিনে দুই বেলা করে স্যুপ বা উনার ঔষধ আমিই খাইয়ে দিতাম। কোনো কিছু আর নার্স বা ডক্টরের হাতে দিতাম না। আমার স্বামীর যত্ন এবার থেকে আমিই করব। উনাকে বিছানায় বসিয়ে স্যুপ খাওয়ানোর সময় তখনও তিনি আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিলেন। স্যুপ পুরোটাই খেলেন! মেডিসিনও খেলেন। পুনরায় শুইয়ে দিলাম ঘুমানোর জন্য, কারণ জ্বরের তাপ অনেক বেশি ছিল। হাঁটাচলা করা মুশকিল। দুপুরের দিকের ঘুম ভাঙে সন্ধ্যা সাতটায়। উনার শরীর ঘামে ওঠায় বুঝলাম জ্বর ছেড়েছে। দ্রুত ঘুম থেকে উনাকে তুলে খাটে হেলান দিয়ে শুয়ালাম। দুর্বলতায় কোনো রকমে আমার দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে ছিলেন। উনার গায়ের টি-শার্ট খুলে ভেজানো কাপড় দিয়ে উনার গা মুছে দিচ্ছিলাম, কিন্তু উনার থেকে বেশি আমার হাত দুটো কাঁপছিল। আমার কম্পিত হাতের দিকে উনার দৃষ্টি গেল, হালকা কপাল কুঁচকে। হয়তো আমার কেঁপে ওঠার কারণটা বোঝার চেষ্টা করছেন। আচ্ছা উনি কি এখনো আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না নাকি? আমার উনার দিকে চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। আমি দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে উনার গা মোছায় মনোযোগী হলাম। আজ এত বছর পর উনার উন্মুক্ত বুক-পিঠ দেখলাম, ছুঁয়ে দিলাম। বয়স উনার পয়তাল্লিশ হলেও সৌন্দর্যের ঘাটতি নেই। বয়সের ছাপটাও বেশি বোঝা যাচ্ছে না। স্ট্রং পার্সোনালিটি ব্যক্তি যাকে বলে। ফিট এন্ড ফাইন। আচ্ছা উনাকে তো বুড়ো লাগছে না। তাহলে কি আমি বুড়ি হয়ে গেলাম? পঁয়ত্রিশ বছরের কি মানুষ বুড়ি হয়ে যায়? উনার কাছে তো এখন আমাকেই বুড়ি লাগছে। আচ্ছা একবার বুড়ো বলে ডাকব উনাকে? দেখব কী রিঅ্যাকশন দেয়? ভাবনা অনুযায়ী বললাম...
' বুড়ো বয়সে এত জ্বর বাঁধালেন কীভাবে?
আমার কথায় উনার উত্তর না পেয়ে কৌতুহলবশত আড়চোখে তাকালাম উনার দিকে। সাথে সাথে চোখ মিলল দুজনের। উনার চোখে মুখে বিরক্তির রাগ। হয়তো আমার বুড়ো বলাটা উনার পছন্দ হয়নি। আমার বেশ ভালো লাগল এত বছর পর উনার রাগ দেখে। আমি মজা না করে এবার বেশ সিরিয়াস হয়ে বলি...
' আপনার জ্বর ভালো হচ্ছে না কেন?
আমার সোজা কথার উত্তর উনি সোজাভাবে দিলেন না। বরং পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন...
' তুমি জড়িয়ে ধরছ না কেন?
আমি থতমত খেয়ে বললাম...
' আমার জড়িয়ে ধরাতে আপনি ভালো হবেন?'
উনি রাগী গলায় বললেন...
' বের হও আমার রুম থেকে। যাও!
আমি আমলে নিলাম না বিষয়টি। মাত্র তো শুরু হয়েছে। বাকিটা জীবন এটাই শুনতে হবে। নতুন কিছু না এসব। আমি কথা না বাড়িয়ে মনোযোগ সহকারে আগে উনার শরীর মুছে দিলাম৷ হাত পা মুছলাম৷ তখনো উনি বিরক্তি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। হয়তো আমার জড়িয়ে না ধরার জন্য অথবা আমাকে রুম থেকে বের হতে না দেখে। রাগ হচ্ছে। আমি আগে নিজের কাজ শেষ করলাম। উনার জ্বর নিয়ে ছেলেখেলা নয়। উনাকে পরিপাটি করে তারপর এসে জড়িয়ে ধরলাম তাকে। আলতো করে উনার বুকে মাথা রাখলাম। এই বুকটা এতো বছর আমার জন্য খালি ছিল। আমি আমার জায়গায় ফিরতে দেরি করে ফেললাম। উনাকে(রিদ) অনেক বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললাম নিজের অজান্তে। অপরাধ বোধে পুনরায় কেঁদে উঠলাম আমি। উনার বুকে মাথা রেখেই ফুপিয়ে উঠলাম। আমার শরীরও মৃদু কাঁপছে কান্নায়। উনি সেটা বুঝতে পারছে তাই আমাকে নিজের দু'হাতে আঁজলে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে। দূর্বলতায় উনার হাতও কাপছিল। কতটা সময় একে অপরের সাথে আলিঙ্গন করে বসে ছিলাম জানা নেই। হয়তো ঘন্টা দুয়েক। পুনরায় উনার শরীর গরম হতেই আমার হুশ ফিরে। দ্রুত উনার বুক থেকে উঠতে চাইলে 'উহুম' বলে উনি বাধা দেয়। উঠতে নিষেধ করে। কিন্তু আমি মানলাম না। জোর করে উঠে জ্বরটা চেক করলাম। সবর্নাশ পুনরায় গা কাপিয়ে জ্বর এসেছে তার। আমি দ্রুত কাবাট থেকে টি-শার্ট এনে উনাকে পড়িয়ে দিলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাতেই সময় সাড়ে দশটার কাটায়। আমি চমকে উঠলাম নিজের বেখেয়ালতায় এতোটা সময় উনাকো খালি গায়ে রাখার জন্য পুনরায় জ্বর এসেছে। শিট! উনাকে শুয়ে গেলাম কিচেনে। কিচেনটা দেখেও কেঁপে উঠল অন্তর। এইতো সেই কিচেন। যেখানে দাদী আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি। পুরাতন স্মৃতি মনে হতেই আমার চোখে অশ্রু তইতই করে ভরে উঠল। আমি ঠোঁট কামড়িয়ে কান্না আটকিয়ে নিজের হাতে সুপ বানালাম। উনাকে খাইয়ে দিয়ে মেডিসিন খাওয়ালাম। বিছানা শুইয়ে দিয়ে রাতভর মাথায় জলপট্টি দিলাম। একটা সময় আমিও খাটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম উনার মাথায় হাত রেখে। শেষ রাতে বুঝতে পারলাম কেউ আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। আমি চমকে উঠে বাঁধা দিতে চাইলে আমার নিশ্বাস আঁটকে আসার জোগাড় হয়। আমার ঠোঁট কারও দখলে। ঘুমের রেশ তখনো আমার কাটেনি পুরোপুরি। মুচড়া মুচড়ি করতেই বুঝলাম উনার ব্ল্যাঙ্কেট এর নিচে আমি। উনি আমার উপর। আমার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্হাপন করতে চাইছে। আমি আঁতকে উঠে উনাকে বাঁধা দিচ্ছিলাম। এইভাবে কোনো কিছু চাইনা আমি। উনি সজ্ঞানে নেই। জ্বরে ঘোরে আমাকে কাছে টেনে সকালেই মনে থাকবে না। সবকিছু ভুলে যাবে। আমি বাঁধা দিতেই উনি আমার হাতদুটো বিছানায় চেপে ধরে। আমার ঠোঁট ছেড়ে গলায় নেমে গেল। উনার হাতের ছুঁয়া ও তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছিল। অনেকটা বছরের তৃষ্ণার্ত সেটা উনার প্রতিটা ছুঁয়াই প্রকাশ পাচ্ছিল। আমি দাঁতে দাঁত খিঁচে সহ্য করছিলাম সবটা। আর বাঁধা দিলাম না উনাকে। বেঠিক কোনো কিছুই হচ্ছে না আমদের মধ্যে। তাছাড়া উনার সাথে এখন জোড়াজুড়ি করলেও উনাকে থামাতে পারবো না উল্টো উনার আরও ক্ষতি হবে। দূর্বল শরীরে জ্বরটা আরও বাড়বে। তাই মেনে নিলাম উনাকে। উনার স্পর্শকে।
শেষ রাতের পর আমি আর ঘুমাই নি। সকাল হয়ে গিয়ে ছিল বলে। নিজের রুমে চলে আসলাম। গোসল করে লাল রঙ্গে একটা জামদানী শাড়ি পড়ে নিলাম। নিজেরই প্রচুর লজ্জা লাগছে। এই বয়সে এসে সবকিছু আবার নতুন লাগছে। উফ! নতুন বউ বউ ফিলিং আসছে। সত্যি কি তাই? উহুম! মোটেও না। বউ আমি পুরাতনই। শুধু ছুঁয়াটা নতুন। এজন্য হয়তো সবকিছু নতুন নতুন লাগছে। কিচেনে গেলাম উনার জন্য চিকেন সুপ করলাম। আর বাকি সাভেন্টেদের তাদের জন্য খাবার বানাতে বললাম। সুপ নিয়ে বের হতেই দেখলাম উনি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। আমি কপাল কুঁচকে তাকাতেই উনি এসে সোজা ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসল। হালকা চেচিয়ে সাভেন্টের উদ্দেশ্য বলল 'ব্ল্যাক কফি' জন্য। কাল রাতেও এতো জ্বর ছিল আজ সকাল সকাল সুস্থ হয়ে গেল? সত্যিই সুস্থ হয়েছে নাকি জ্বর নিয়েই উঠে এসেছে? আমি এগিয়ে উনার সামনে সুপের বাটি রাখলাম। উনার কপালে হাত রেখে বুঝলাম উনিও গোসল করেছেন। অসময়ে গোসল করাটা ঠিক ছিল না উনার শরীরে জন্য তারপরও আমি কিছু বললাম না। কারণ গোসল করাটা ফরজ ছিল তাই। আমার কপালে হাত রাখতে বিরক্তি চোখে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাতেই অনেকটা ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো উনি। নিজের পাশে আমাকে দেখে। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। আমি বুঝালাম বিগত দুই দিনের কথা উনার এখন মনে নেই। তাই হয়তো আমাকে এই মূহূর্তে দেখে চমকে উঠছেন। আমি সুপের বাটি উনার সামনে রাখলাম। নিজের জন্য কিচেন থেকে পাউরুটি আর জেল নিয়ে আসলাম। সাথে গরম কফিও। উনার পাশাপাশিই বসলাম। উনি তখনো আমার দিকে ভূত দেখার মতো করে অবিশ্বাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি রুটি মুখে তুলে বলে উঠলাম...
' আপনার এই ভাবে তাকানোতে আমি সত্য থেকে মিথ্যা হয়ে যাব না। আপনি চোখে ঠিকঠাকই দেখছেন। তাই আমার খাওয়ার দিকে নজর না দিয়ে নিজেরটা খান।
আমার সত্যিকার উপস্থিত বুঝতেই স্বামী আমার রেগে গেল মনে হয়। তাই কটমট করেই বললেন...
' কেন এসেছো তুমি এখানে?
একটু মজা করে বললাম....
' বুড়ো বয়সে আপনাকে বাবা বানাতে।
দ্বিগুণ রাগে কটমট করে বলল উনি(রিদ)..
' তোমাকে বাসায় কে ঢুকতে দিয়েছে?
কপাল কুঁচকে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম...
' নিজের বাড়ি! নিজের ঘর! নিজের স্বামী! আমার আবার কার পারমিশন লাগবে আজব। দুই দিন ধরে তো আপনি আমার সাথেই থাকছেন। এখন ভুলে বসে আছেন কেন?
চমকানো গলায় তৎক্ষনাৎ বলে...
' মানে?
' মানেটা এখন না এক দেড়মাস পরে বলতে পারবো। এখন শিওরিটি দিয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না মনে হয়।
আমার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন উনি। আমার কথার সারমর্ম বুঝতে পেরে চমকে উঠার মতোন করে বললো...
' রাতে আমাদের মধ্যে কিছু..?
লজ্জায় বামে তাকিয়ে মুখ লুকালাম আমি। উনাকে শেষ করতে না দিয়ে বললাম..
' জ্বি অনেক কিছু।
স্তব্ধের নেয় তব্দা খেয়ে বসে থেকে হঠাৎ চেতে উঠে উনি বলেন।
' তুমি আমার অসুস্থতার ফায়দা উঠিয়েছ?
আমি অবাক হয়ে বললাম...
' আস্তাগফিরুল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! ছিঃ ছিঃ। আমি আর আপনার অসুস্থতার ফায়দা। তওবা! তওবা! ফায়দা তো আপনি আমার উঠিয়েছেন। বুড়ো হয়েও শরীরের তেজ কমেনি। সোজা জোড়াজুড়ি করলেন আমার সাথে। আমি নাহয় নার্স সেজে আপনার সেবা-যত্ন করতে চাইলাম। কিন্তু আপনি কি করলেন স্বামী হয়ে আপন করে নিলেন আমাকে। আচ্ছা তাও বুঝলাম! বউ বলে মাফ করলাম। কিন্তু এখন মিথ্যা অপবাদ রটাচ্ছেন আমার নামে। কি প্রমাণ আছে আমি আপনার ফায়দা উঠিয়েছি সেটা নিয়ে? বরং আমার কাছে প্রমাণ আছে আপনি আমার সাথে জোড়াজুড়ি করেছেন সেটা নিয়ে? বুড়ো বয়সেও তেজ কমেনি, দেখাব আপনার করা দাগ গুলো? আপনার থেকে আমি এখনো পযন্ত যোয়ান আছি। বুড়ো হয় নাই।
আমার মজা করা কথায় হঠাৎ রেগে উঠে গেলেন উনি। আমাকে কিছু না বলে চলে যেতে নিলে আমি পুনরায় পিছনে থেকে খুঁচা মেরে উনাকে বললাম...
' দেখুন এই বয়সে এসে এখন আমি আপনার সাথে বাচ্চামো করতে পারব না। তবে চাইলে আপনাকে বাচ্চার বাবা বানিয়ে দিতে পারব। আমি কিন্তু রাজি আছি আপনাকে এই বুড়ো বয়সেও বাবা বানাতে।
রাগী চোখে কটমট করে ঘুরে তাকালেন আমার দিকে। আমার বার বার বুড়ো বলাতে রেগে গেলেন উনি। চেতে উঠে বললেন...
'বুড়ো হবে তোমার বাপ। একদম বিটলামি করবা না আমার সাথে বলে দিলাম।
' আমার বাবা বুড়ো ছিল এখন তিনি নেই। সে মৃত। তাই এখন আপনি বুড়ো। তাছাড়া আপনার সাথে আমার পূব থেকে বিটলামির সম্পর্ক। বিয়াই বিয়াইন হিসাবে এতটুকু বিটলামি করা আমার প্রাপ্য। আপনি রাগ করবেন, করতে পারেন। বাঁধা দিব না। তবে আমি একা কেন আপনার রাগ সহ্য করবো? আমার সাথে চার-পাঁচটা সন্তান নিয়ে তারপর সবাই মিলে আপনার রাগ দেখবো ঝুট বেঁধে। বেশি না চারটা ছেলে একটা মেয়ে নিব শুধু কেমন?
আমার কথা চেতে গেলেন তিনি। আমার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকাতেই আমি দুই ঠোঁট চেপে হাসি আটকালাম। উনি আমার সাথে কথায় না পেরে রাগে ফুস ফুস করতে করতে চলে গেল রুমের দিকে। আমি পুনরায় পিছন থেকে চেচিয়ে বললাম।
' আরে শুনে যান না। পাঁচটা বাচ্চা, আগামী পাঁচ বছরে। দেরি করা চলবে না কিন্তু বলে দিলাম।
বিগত এক সাপ্তাহ ধরে উনার পিছনে পড়ে আছি। উঠতে বসতে ক্ষমা চাচ্ছি। কিন্তু তিনি আমাকে ক্ষমা করা তো দূর থাক। সোজা মুখে কথাটা পযন্ত বলছে না। উনি এখন সুস্থ। শরীর দূর্বলতা আছে কিন্তু জ্বর নেই। আমাকে উনার রুমে ঢুকতে দিচ্ছে না। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। অপরাধটাও বড় তাই ক্ষমাটা সহজে আশা করা যায় না। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, জীবনে যে কটা বছর হারিয়ে ফেলেছি সেটা আমি চাইলেও ফিরিয়ে দিতে পারবো না। আমার সেই ক্ষমতা নেই। কিন্তু এখন জীবনের বাকি দিন গুলো একসঙ্গে সুখে থাকতে চাই। একটা দিনও নষ্ট করতে চাই না। মান অভিমানে একে অপরকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই না। আমাকে শাস্তি অন্য ভাবে দিক। তারপরও আমাকে উনার আশেপাশে ভিড়তে দিক। হাল্কা পাতলা কথা অন্তত বলুক আমার সাথে। যেটা উনি কিছু করছে না। আমি হতাশ হলাম না। উনাকে মানিয়ে দম নিব তার আগে না। আমার চেষ্টা চালিয়ে যাব। সেজন্য আবারও গেলাম উনার রুমে। দেখলাম রুমের বাতি নিভিয়ে খাটে হেলান দিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। আমি দরজা লক করে উনার পায়ে কাছে গিয়ে বসলাম। ধীর হাতে উনার পা দুটো ধরলাম। উনি নড়াচড়া করলো না। বুঝলাম উনি সজাগ আছে। কিন্তু আমার সাথে কথা বলতে চাই না বলে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে আছে। দু'হাতে উনার পা দুটো ধরে কান্না ভেজা গলায় বলতে শুরু করলাম...
' আপনার হারিয়ে ফেলে দিন গুলোর ক্ষতি পূরণ আমি করতে পারবো না। সেই ক্ষমতা আমার নেই। সবকিছু ভুল বুঝাবুঝি থেকে হয়েছে। আপনি আমার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন আর আমি আপনার যাওয়ার। আপনাকে ছেড়ে আমি এক মূহূর্তের জন্য ভালো ছিলাম না। সারাক্ষণ আপনার অপেক্ষায় থাকতাম। কখন আপনি যাবেন সেই আশায় দিন পার হতো। আপনাকে ডিভোর্স আমি কখনোই দিতে চাই নি। দিতামও না। বাবা বললেও না। আমার আপনাকে কসম দেওয়ার কথা গুলোও ভুলে গেছিলাম। ছোট ছিলাম। সাথে রাগের মাথায় কি বলেছিলাম আপনাকে সেটা আমি পরদিনই ভুলে গেছিলাম। এখন আপনি বলুন যেটা মনে নেই সেখানে কিভাবে নিজের ভুল বুঝে ফিরে আসতাম আপনার কাছে। আপনার জন্য রোজ কাঁদেছি। একাকিত্বে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়েছি। আপনাকে নিরবে ভালোবেসে গেছি। কাউকে বলতে পারিনি আমার আপনাকে চাই। খুব করে চাই। সত্যি আমি বুঝতে পারিনি আপনি দাদা-দাদিকে পাঠাতেন আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। আমি আপনার অপেক্ষায় বসে ছিলাম শুধু। দাদাজানের মৃত্যু সংবাদ আমি একমাস পর পেয়েছিলাম। আর দাদী মৃত্যু সংবাদ শুনে আসার সময় গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছিলাম। এক সাপ্তাহ হসপিটালের ছিলাম। তারপর আমি জানতাম না আপনি বাংলাদেশে থাকছেন বিগত পাঁচ বছর ধরে। যেদিন এখানে আসি সেদিনই জানতে পারলাম। তার আগে আমাকে কেউ কিছু বলেনি। আপনি ছাড়া সত্যি জীবন অচল। আমার প্রতিটা নামাজের মোনাজাতে থাকতেন আপনি। দোয়া করতাম আপনাকে ফিরে পাওয়ার। সংসার করার। প্লিজ আমাকে একটা সুযোগ দিন নিজের ভুলটা শুধরে নেওয়ার জন্য। আমি আপনার অপরাধী তারপরও একটা সুযোগ চাচ্ছি। কথা দিচ্ছে জীবনের কখনো একটা মূহূর্তের জন্যও আপনাকে ছেড়ে যাব না আমি। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিন। সত্যি আমি আর এই দূরত্ব মেনে নিতে পারছিনা। অন্তত একটা সুযোগ চাই জীবনের বাকি দিন গুলো আমি আপনার সাথে কাটাতে। প্লিজ। আমাকে ক্ষমা করে দিন। প্লিজ।
কথা গুলো বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে উঠলাম আমি। সত্যি অপরাধ বোধ আমি নৃশংস হয়ে যাচ্ছি। উনার ক্ষমা না পেলে মরেও শান্তি পাবো না। মন ছটফটে উনার পা ধরে কেঁদে চলছি৷ কিন্তু উনার কোনো ভাবাবেগে নেই। কষ্টটা আরও বাড়লো আমার। আমি উনার দুপা আরও খানিকটা জোরে চেপে ধরে কাদতে কাঁদতে বললাম...
' নিজের অপরাধ বোধে ধুঁকে ধুঁকে মরে যাব আমি। সত্যি বুঝতে পারিনি বিষয় গুলো এতটা জটিল হয়ে যাবে। যদি জানতাম মরে গেলে...
আমার কথা গুলো শেষ করার আগেই আচমকাই উনি আমাকে টেনে উনার বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে ধরতে বলেন...
' উফ! তোমার এই প্যাচপ্যাচ করে কান্নায় আমার মাথা ব্যথা করছে। কান্না বন্ধ করো। নয়তো রুম থেকে বের করে দিব কিন্তু।
উনার জড়িয়ে ধরাতে বুঝলাম। উনার রাগ কমে এসেছে। হয়তো ক্ষমাও করে দিবেন এক সময়। বুকের মধ্যে শান্তি অনুভব করলাম। বহুদিন, বহুবছর পর। আমিও ঝাপটে দু'হাতে উনাকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে উঠে বললাম....
' আপনাকে সত্যিই এতো গুলা ভালোবসি আমি। অনেক ভালোবাসি।
' আমি কোনো ভালোবাসি টাসি না তোমাকে। বাসতে পারবোও না। নিঘার্ত ফেসে গেছি। এই বয়সে বউ পাবো না বলে এজন্য মেনে নিলাম তোমাকে। নয়তো কখনোই মানতাম না।
আমি হাসলাম। এই বয়সে বউ পাবে না তাহলে যোয়ান বয়সে বিয়ে করলেন না কেন? তাছাড়া উনি এই বয়সেও যথেষ্ট হ্যান্ডসাম। ফিট এন্ড ফাইন। যেকোনো মেয়েই বিয়ে করতে চাইবে উনাকে। মোট কথা আমার জন্য তার এতো বছরের অপেক্ষাটা কখনোই মানবে না সে। যাকে বলে ত্যাড়া লোক।
আমি সম্মিত দিয়ে বললাম..
'আচ্ছা।
উনি পুনরায় ত্যাড়া কথায় বলল...
' শুনো মেয়ে, এই বয়সে আমি বাবা হতে পারবো না। মানুষ কি বলবে? আমার লজ্জা লাগে।
উনার কথায় ভিষণ লজ্জা পেলাম আমিও। লজ্জায় মরি মরি হয়ে উনার বুকে মুখ লুকিয়ে একটু করে বললাম...
' লজ্জা লাগলে লাগুক। আমি মা হবো।
উনার গলা তৎক্ষনাৎ শুনলাম না কিছু। প্রায় খানিক ক্ষণ পড়ে শুনলাম। উনি খুব ভেবে বললেন...
---" আচ্ছা তাহলে পাঁচটা না। দুটো সন্তান নিব কেমন? পাঁচটা নিলে মানুষ ভাববে আমি বুড়ো বয়সে পাগল হয়ে গেছি। সুন্দরী বউ পেয়ে হুশ নাই আমার। দুটো নিলে ভাববে! না আমি হুশেই আছি। তাই দুটো সন্তানই নিব কেমন।
আমি লজ্জায় নাক মুখ খিঁচে পড়ে রইলাম উনার বুকে। একটু করে বললাম...
' আচ্ছা।
........................
𝐓𝐇𝐄 𝐂𝐎𝐍𝐂𝐋𝐔𝐒𝐈𝐎𝐍 🖤
***Download NovelToon to enjoy a better reading experience!***
Comments