প্রজেক্ট জিরো: শেষ উত্তরাধিকারী

প্রজেক্ট জিরো: শেষ উত্তরাধিকারী

ধূসর আলোয় একটি চুক্তি (সংশোধিত সংস্করণ)

অধ্যায় ১: ধূসর আলোয় একটি চুক্তি (সংশোধিত সংস্করণ)

২৬ জুন, ২০২৬। দুপুর ২:৫০:১৪। কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

দুপুরের নিস্তব্ধতা ছেদ করে কালো মার্সিডিজটি যখন বিশাল দরজার সামনে থামল, আদনানের ভেতরটা তখন শূন্য এক গহ্বরের মতো অনুভূতি হচ্ছিল। এক মাস আগেও এই মার্সিডিজ তাদের পারিবারিক গাড়ির বহরের সামান্য অংশ ছিল, আর আজ এই গাড়িটিই যেন তার হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের শেষ চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। ১৬ বছরের আদনানের পরনে ছিল একটি ছাই রঙের টি-শার্ট আর জিন্স, যা তার ভেতরের ঝড়কে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। তার চোখ দুটো ছিল লালচে, যেন ঘুমহীন রাত আর দীর্ঘশ্বাস দিয়ে আঁকা। গাড়ির পেছনের সিটে বসা আদনান তার কপালে ভাঁজ ফেলে জানালা দিয়ে বাইরের জগতটাকে দেখছিল। সূর্যের তীব্র আলোয় পিচের রাস্তা চিকচিক করছে, আর দূরে, আকাশচুম্বী দালানগুলোর সারি যেন তাকে বিদ্রূপ করছিল।

তার পাশে বসেছিলেন নওয়াব আলী, আদনানের পারিবারিক বাটলার, প্রায় ৬০ বছর বয়সী এক প্রবীণ। তার সাদা চুলগুলো সুবিন্যস্তভাবে আঁচড়ানো, পরনে ধোপদুরস্ত স্যুট। নওয়াব আলী দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আদনানের পরিবারের প্রতিটি উত্থান-পতনের সাক্ষী। তার স্থির, চিন্তিত দৃষ্টি আদনানের দিকে ছিল, যেন তিনি প্রতি মুহূর্তে আদনানের ভেতরের সংগ্রামকে অনুভব করতে পারছিলেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল শান্ত ও ধীর, "আদনান সাহেব, আমরা পৌঁছে গেছি।"

আদনান মাথা নাড়ল। "শেষটুকুও আজ চলে যাবে, নওয়াব চাচা।" তার গলায় ছিল এক অদ্ভুত কাঠিন্য, যা তার বয়সের সাথে বেমানান।

"যা গেছে, তার চেয়ে বেশি ফিরে আসবে, সাহেব," নওয়াব আলী দৃঢ় কণ্ঠে বললেন। "আপনার মেধা আর বুদ্ধি, কোনো দলিলের কাছে বাঁধা পড়ে না।"

তারা একটি পুরনো কিন্তু বিশাল বাণিজ্যিক ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল, যার প্রবেশদ্বারে ধুলো জমেছিল। এটি আদনানের বাবার পুরনো বন্ধুদের একটি ফার্ম, যেখানে আজকের চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার কথা। আদনানের যে ১০% ব্যবসা অবশিষ্ট ছিল, যার মধ্যে ছিল কিছু ছোটখাটো সফটওয়্যার কোম্পানি এবং রিয়েল এস্টেট প্রপার্টি, সেগুলো বিক্রি করে দেওয়ার জন্যই তারা এসেছে। এসব দেখাশোনার মতো কেউ নেই, এবং আদনান চায় না তার বাকি সব সম্পদও বেহাত হয়ে যাক। অন্তত যা আছে, তা দিয়ে সে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করতে পারবে।

তারা যখন লবি দিয়ে হাঁটছিল, আদনানের চোখ আটকে গেল পাশের একটি গাড়ির শো-রুমের দিকে। সেখানে এক তরুণীকে দেখা যাচ্ছে, সে একটি উজ্জ্বল লাল স্পোর্টস কারের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। সে আর কেউ নয়, আদনানের কাজিন রিফাত জাহান রিয়া। বছর দুয়েক আগেও রিয়া তাদের বাড়িতে কাজিনের পরিচয়েই থাকত, আদনানের বাবার কাছে নানা রকম আবদার করত। আদনানের পরিবার তাকে যথেষ্ট সাহায্য করত, কিন্তু তাদের মৃত্যুর পর রিয়াকে দেখা যায়নি।

রিয়া এখন সেখানে একটি দামী মডেলের গাড়ির দাম নিয়ে দর কষাকষি করছে। তার পরনে ছিল একটি ঝলমলে পোশাক, আর হাতে ছিল একটি আধুনিক হ্যান্ডব্যাগ। তার মুখে এক আত্মবিশ্বাসের হাসি, যেন সে জগতের সব সম্পদ নিয়ে বসে আছে। আদনান থমকে দাঁড়াল। তার মনে পড়ল, রিয়া সবসময়ই সস্তায় জিনিস কিনত, শপিং মলের সবচেয়ে কম দামের পোশাকগুলোই তার পছন্দ ছিল। আর আজ সে এমন দামী একটি গাড়ি কেনার সামর্থ্য দেখাচ্ছে?

"আদনান সাহেব, কী দেখছেন?" নওয়াব আলীর প্রশ্নে আদনান সম্বিত ফিরে পেল।

"কিছু না, নওয়াব চাচা," আদনান ফিসফিস করে বলল। তার চোখে ছিল এক মিশ্র অনুভূতি – বিস্ময়, সন্দেহ এবং এক চিমটি বিদ্রূপ। সে মনে মনে ভাবল, ‘রিয়া বোধহয় তার পকেটমানি আর ছোটখাটো পারিবারিক সঞ্চয় দিয়ে এমন কিছু কিনছে। যদি আমি আমার ল্যাব আর বেস না বানাতাম, তাহলে হয়তো আমিও এমন শখের জিনিসপত্র কিনতাম।’ আদনানের স্মৃতির গভীরে ভেসে উঠল তার গত কয়েক বছরের গোপন কাজ, ল্যাব আর বেস তৈরির জন্য পরিবারের অজান্তেই অর্থ সংগ্রহের দিনগুলো। সেসব দিনের কথা মনে হতেই তার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। ‘রিয়া যদি জানত আমার আসল শখ কী ছিল, আর তার জন্য কত টাকা খরচ হয়েছে...’

তাদের সময় নষ্ট করার মতো সময় ছিল না। নওয়াব আলী আদনানের হাতে হালকা চাপ দিলেন। "চলুন সাহেব, কাজটা সেরে ফেলি।"

আদনান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং রিয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল। রিয়া তখনো শো-রুমের কর্মীর সাথে হাসি-ঠাট্টা করছিল, সম্পূর্ণ বেখবর যে মাত্র কয়েক ফুট দূরে তার এক সময়ের ধনী কাজিন তার শেষ অবলম্বন বিক্রি করতে এসেছে।

প্রথম অধ্যায় শেষ হলো।

Download

Like this story? Download the app to keep your reading history.
Download

Bonus

New users downloading the APP can read 10 episodes for free

Receive
NovelToon
Step Into A Different WORLD!
Download NovelToon APP on App Store and Google Play