ঢাকা শহর—আলো আর শব্দে মোড়া এক ব্যস্ত নগরী।
দিন-রাতের পার্থক্য এখানে অনেক সময় বোঝাই যায় না,
কারণ রাতেও সড়কে ভিড় থাকে, দোকানের সাইনবোর্ডে ঝলমল করে নীল-লাল বাতি,
রাস্তায় শোনা যায় গাড়ির হর্নের শব্দ আর মানুষের হাঁকডাক।
এই ভিড়ের শহরের ভেতরেই বাস করতো ফারহান।
ধানমন্ডির এক পুরোনো কিন্তু আরামদায়ক ফ্ল্যাটে তার পরিবার বহু বছর ধরে বসবাস করছে।
তাদের ফ্ল্যাটের ছাদটা ছিল ফারহানের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।
ওখানেই সে গিটার বাজায়, গান গায়, আর আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের স্বপ্নগুলোকে উড়িয়ে দেয়।
সেদিনও ছিলো শীতকালের বিকেল।
ঢাকার শীত খুব বেশি কড়া না হলেও, জানুয়ারির হাওয়ায় একধরনের নরম শীতলতা লেগে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে ফারহান বাড়ি ফিরলো ক্লান্ত গলায়,
কিন্তু চোখেমুখে ছিল একটা অদৃশ্য উজ্জ্বলতা।
কারণ গান শেখার নতুন একটা আইডিয়া মাথায় ঘুরছিল।
দরজার বেল চাপতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো মায়ের কণ্ঠস্বর,
“এসো বাবা, আজকে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
ফারহান একটু অবাক হলো।
তার মা হঠাৎ সারপ্রাইজের কথা বলবে—এটা বিরল।
জুতো খোলার আগেই ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে এলো অপরিচিত হাসির শব্দ।
সে থমকে গেলো।
ঘরের ভেতরে ঢুকতেই মায়ের ডাকে আরেকটা কণ্ঠ জড়িয়ে গেল,
“এই নীলা, এসো তো, ফারহানের সাথে দেখা করো।”
“নীলা?”
নামটা শুনেই ফারহানের মনে যেন একটা পুরোনো অ্যালবামের পাতা উল্টে গেল।
ছোটবেলায় দেখা সেই মেয়েটা, খালাতো বোন, যে সবসময় তার সাথে ঝগড়া করতো।
কিন্তু তারপর কত বছর কেটে গেছে—
সম্ভবত দশ বছর?
সে কি আদৌ চিনতে পারবে?
মুহূর্তের মধ্যেই ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক তরুণী।
নীলা।
ফারহান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো।
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একেবারে ভিন্ন রূপে বদলে যাওয়া মানুষ।
নীলা পরেছে গাঢ় নীল শাড়ি, চুল খোলা, চোখে সাদামাটা গোল ফ্রেমের চশমা।
তার মুখে লাজুক অথচ দৃঢ় এক হাসি—
যেন পুরোনো দিনের সাথে নতুন দিনের ফারাকটা মিলিয়ে দিচ্ছে।
“চিনতে পারছো না, তাই না?” — নীলা মৃদু হেসে বললো।
ফারহান একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
“চিনেছি তো… তবে পুরোপুরি নতুন হয়ে গেছো তুমি।”
নীলার ঠোঁটের কোণে ঝিলিক খেলে গেলো।
সে শান্ত স্বরে বললো,
“অনেকদিন পর দেখা হলো, ফারহান ভাই।”
এই “ভাই” শব্দটা ফারহানের কানে কেমন অদ্ভুত লাগলো।
হৃদয়ের গভীরে একটা হালকা ধাক্কা খেলো—
কেন যেন শব্দটা তার ভালো লাগলো না।
কাজিন—হ্যাঁ, সেটা ঠিক।
কিন্তু চোখে চোখ রাখতেই বুঝলো,
এই মেয়ে আর আগের ছোট্ট নীলা নেই।
ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
তার মনে হচ্ছিল, যেন সময় হঠাৎ থেমে গেছে।
দশ বছরের ব্যবধান এক মুহূর্তে ভেঙে গিয়ে দুজনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে একই জায়গায়।
মা হাসিমুখে বললেন,
“নীলার বাবা অফিসের কাজে কয়েক মাস ঢাকায় থাকবে। তাই ওরা আমাদের কাছেই থাকবে এই সময়টা।”
ফারহান শুনে অবাক হলো।
মানে কয়েক মাস ধরে নীলা থাকবে এই বাড়িতেই?
হৃদয়ের ভেতরে অচেনা এক কাঁপুনি বয়ে গেলো।
নীলা তখন সোফায় বসে মায়ের সাথে গল্প করছে।
তার ভঙ্গিতে এক ধরনের পরিণত ভাব আছে, কিন্তু চোখে লেগে আছে পুরোনো দিনের চঞ্চলতা।
ফারহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে রইলো।
নীলা হঠাৎ চোখ তুলে তার দিকে তাকালো।
চোখাচোখি হতেই সে মুচকি হেসে বললো,
“কি ব্যাপার? এতক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছো কেন?”
ফারহান একটু লজ্জা পেয়ে উত্তর দিলো,
“না, আসলে… অনেকদিন পর তোমাকে দেখলাম, তাই।”
নীলা হেসে মাথা নেড়ে বললো,
“তুমি মোটেও বদলাওনি। সেই একইভাবে হকচকানো ফারহান।”
সন্ধ্যার পর ছাদে গিয়ে দাঁড়ালো ফারহান।
ঢাকার আকাশে তখন হালকা শীতের কুয়াশা।
দূরে লাইটপোস্টের আলো ঝাপসা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই ছাদই ছিল তার নির্জন জায়গা—
কিন্তু আজ সে জানে, হয়তো আর নির্জন থাকবে না।
“ছাদে এলে গিটার ছাড়া মানায় না তোমার।” — পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর।
ফারহান ঘুরে তাকালো।
নীলা দাঁড়িয়ে আছে, পরনে হালকা সোয়েটার, হাতে গরম চায়ের কাপ।
তার চোখে খেলে যাচ্ছে দুষ্টু ঝিলিক।
“তুমি এখানে?” — ফারহান অবাক হলো।
“হ্যাঁ, ভাবলাম শহরের ছাদটা একসাথে দেখা যাক। সিলেটে তো এমন ছাদে দাঁড়ানো যায় না।”
দুজনেই রেলিংয়ের পাশে দাঁড়ালো।
নীলা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো,
“শহরটা আমার কাছে অচেনা। সবাই ব্যস্ত, সবাই ছুটছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি এখানে একা।”
ফারহান হেসে বললো,
“তাহলে ঠিক হলো, শহরের একাকীত্ব ভাঙার দায়িত্ব আমার।”
নীলা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে দিলো।
হাসিটা যেন শীতের আকাশে হঠাৎ উড়ে যাওয়া একটা উল্কা—
ছোট্ট, কিন্তু মন কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো।
দুজন অনেকক্ষণ গল্প করলো।
বই, সিনেমা, গান—সব বিষয় নিয়েই কথা হলো।
কথার ফাঁকে ফাঁকে ফারহান বুঝতে পারলো,
নীলার ভেতরে এক ধরনের গভীরতা আছে।
যেটা সে ছোটবেলায় কখনো দেখেনি।
নীলাও অবাক হলো।
ছোটবেলার সেই দুষ্টু ফারহান এখন অনেক শান্ত, অনেক ভেবেচিন্তে কথা বলে।
তবে তার চোখে আজও সেই একই উজ্জ্বলতা,
যেটা একসময় তাকে বিরক্ত করতো,
এখন অজান্তেই টেনে নিচ্ছে।
রাত যত গভীর হলো, আকাশে তারা তত জ্বলজ্বল করতে লাগলো।
কিন্তু তাদের দুজনের চোখে যে আলো জ্বলছিল,
তা যেন আকাশকেও ম্লান করে দিচ্ছিল।
***Download NovelToon to enjoy a better reading experience!***
Updated 3 Episodes
Comments