দ্বিতীয় অধ্যায়: গোপন টান

ঢাকার সকালগুলো অদ্ভুত রকমের শব্দে ভরা।

কোথাও ভ্যাপসা গরম চা বিক্রি হচ্ছে,

কোথাও বাসের হর্নে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে,

আবার কোথাও হকারের ডাকে জেগে উঠছে ভিড়ভাট্টার রাস্তা।

ফারহান এই শব্দের ভেতরেই বড় হয়েছে।

কিন্তু আজকাল সকালগুলো তার কাছে অন্য রকম।

কারণ ঘুম ভাঙতেই সে জানে,

এই বাড়ির ভেতরে এখন একজন নতুন মানুষ এসেছে—

নীলা।

---

সকালের অপ্রস্তুত মুহূর্ত

এক সকালে ফারহান রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ ভেতর থেকে ভেসে এলো হাসির শব্দ।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনলো।

মায়ের সাথে নীলা গল্প করছে।

নীলার কণ্ঠে এক ধরনের মিষ্টি সুর আছে—

যেটা ফারহানকে অদ্ভুতভাবে টানে।

মা হেসে বলছিলেন,

“তুমি তো একদম ঢাকা শহরের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছো, নীলা।”

নীলা উত্তর দিলো,

“না খালা, আমি তো আসলে ভয়ই পাচ্ছি।

এখানে সবাই এত ব্যস্ত, এত দ্রুত চলে…

আমার মনে হয় আমি হারিয়ে যাবো।”

ফারহান তখন ভেতরে ঢুকতে পারলো না।

কেন জানি হঠাৎ অপ্রস্তুত লাগছিল।

সে চলে গেলো বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলো।

নিজের মনে বললো,

“আমি কেন ওর কণ্ঠ শুনলেই এভাবে চুপ হয়ে যাই?”

---

বিশ্ববিদ্যালয় আর ছুটে আসা

সেদিন ফারহানের ক্লাসে মন বসলো না।

লেকচারার বোর্ডে সমীকরণ লিখছিলেন,

কিন্তু তার চোখ ভেসে যাচ্ছিল অন্য কোথাও।

হঠাৎ মনে হলো—

নীলা এখন হয়তো বই পড়ছে,

হয়তো মায়ের সাথে গল্প করছে,

অথবা হয়তো ছাদে উঠে আকাশ দেখছে।

ক্লাস শেষ হতেই সে তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে পড়লো।

বাসে ওঠার পর চারপাশে মানুষের কোলাহল শোনা গেলো,

কিন্তু তার ভেতরে শুধু একটা প্রশ্ন—

“আমি কি তাড়াহুড়ো করছি নীলাকে দেখার জন্য?”

---

ছাদে প্রথম বিকেল

ফারহান যখন বাড়ি ফিরলো,

নীলা তখন ছাদে দাঁড়িয়ে।

হালকা বাতাসে তার চুল উড়ছিল,

আকাশে ডুবতে থাকা সূর্যের আলোয়

তার চোখে যেন অন্য রকম ঝিলিক ফুটে উঠেছিল।

“তুমি এলেই যেন ছাদটা জমে ওঠে।” — নীলা হেসে বললো।

ফারহান একটু থমকালো, তারপর বললো,

“তুমি থাকলেই তো ছাদটা আলোয় ভরে যায়।”

নীলা চমকে তার দিকে তাকালো।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো।

তারপর দুজনেই হেসে ফেললো—

যেন কথাটা মজা করেই বলা হয়েছিল।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুজনেই জানতো—

কথাটার ভেতর লুকিয়ে আছে অন্য মানে।

---

বই আর গানের সেতুবন্ধন

নীলা সাথে করে এনেছিল একটা কবিতার বই।

“তুমি পড়বে?” — সে এগিয়ে দিলো।

ফারহান বই হাতে নিয়ে কয়েক লাইন পড়লো,

তারপর গিটার তুলে সেই লাইনগুলো দিয়ে সুর বানাতে লাগলো।

নীলা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো।

“তুমি কি সব শব্দকেই গানে পরিণত করতে পারো?”

ফারহান হেসে উত্তর দিলো,

“হয়তো পারি না, কিন্তু তোমার পড়া শব্দগুলোতে সুর লুকানো থাকে।”

নীলা আর কিছু বললো না।

শুধু চোখের দৃষ্টিতে একটা নীরব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,

যেটার উত্তর ফারহানও দিতে পারলো না।

প্রথম বেড়ানো

শীতকাল।

শহরের ভিড় থেকে খানিকটা দূরে,

ঢাকার অদূরে এক পার্কে গেলো তারা দুজন—

মা আর খালার সাথে।

মা-খালা ব্যস্ত বাজারের জিনিসপত্র নিয়ে গল্প করছিলেন,

ফারহান আর নীলা ধীরে ধীরে হাঁটছিলো পাথরের পথ ধরে।

নীলা ছোট্ট গাছপালা দেখে খুশি হয়ে উঠলো।

“এগুলো দেখে মনে হচ্ছে গ্রামের উঠান।

কেমন শান্ত… শহরে তো এমন শান্তি পাওয়া যায় না।”

ফারহান তাকিয়ে বললো,

“তাহলে তুমি শহর পছন্দ করো না?”

নীলা একটু ভেবে উত্তর দিলো,

“শহর খারাপ না, কিন্তু কখনো কখনো একা করে দেয়।

মানুষ থাকে হাজারো, তবুও মনে হয়—

আমি একাই।”

ফারহান মৃদু হেসে বললো,

“কিন্তু তুমি তো একা নও।”

নীলা প্রশ্ন করলো,

“তাহলে আমি কী?”

ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।

তারপর হেসে এড়িয়ে গেলো।

---

হঠাৎ থেমে যাওয়া

ফেরার পথে তারা লেকের ধারে দাঁড়ালো।

নীলা পানির দিকে তাকিয়ে বললো,

“তুমি কি কখনো ভেবেছো,

আমাদের দুজনের জীবন যদি একদম ভিন্ন হতো?”

ফারহান উত্তর দিলো না।

শুধু নীলার দিকে তাকিয়ে রইলো।

তার চোখে ডুবে থাকা আলো যেন বলছিল,

“হ্যাঁ, আমি ভেবেছি।”

কিন্তু মুখে সে বললো,

“আমাদের জীবন ভিন্ন হলেও,

কিছু মুহূর্ত একই হয়ে যায়।

যেমন আজ।”

নীলার ঠোঁটে এক ঝিলিক হাসি ফুটলো।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে অনুভব করলো—

এই কথার ভেতর লুকিয়ে আছে এক অঘোষিত গোপন।

---

পারিবারিক আড্ডা

সেদিন রাতে খাওয়ার টেবিলে সবাই একসাথে বসেছিল।

আড্ডা চলছিল, গল্পে হাসাহাসি।

মা বলছিলেন,

“ফারহান, তুমি নীলাকে ভালো করে শহরের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে।”

ফারহান হেসে উত্তর দিলো,

“ও তো এখনই শহরের মানুষ হয়ে গেছে।”

নীলা মুচকি হেসে বললো,

“না খালা, এখনো অনেক কিছু শিখতে হবে।”

টেবিল ভরে উঠলো হাসিতে।

কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও ফারহান টের পেলো—

তার দৃষ্টি বারবার নীলার দিকেই চলে যাচ্ছে।

---

ডায়েরির পাতা

রাত গভীর হলে নীলা নিজের ডায়েরি খুললো।

পাতার ওপর লিখলো—

> “আজকের দিনটা অদ্ভুত সুন্দর ছিল।

ফারহানের সাথে লেকের ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লেগেছিল।

কেন যেন মনে হলো,

ওর ভেতরেও কিছু লুকানো আছে।

আমি কি ভুল ভাবছি?

নাকি সত্যিই কোনো টান আছে আমাদের মধ্যে?”

অন্যদিকে,

ফারহান নিজের খাতায় লিখছিল গান—

> “কেউ কি জানে,

দুটো অচেনা পথ কখন একসাথে মিশে যায়?

কেউ কি জানে,

পরিচয়ের আড়ালে লুকানো টানকে কী বলে?”

---

হঠাৎ পাওয়া মুহূর্ত

একদিন সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে গেলো।

পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে গেল।

মোমবাতির আলোয় বসেছিল সবাই।

নীলা ভয় পেয়ে ফারহানের কাছাকাছি বসে গেল।

ফারহান মৃদু হেসে বললো,

“ভয় পেও না, আমি আছি।”

নীলার মনে হলো—

এই তিনটা শব্দ তার হৃদয়ের ভেতরে বাজতে লাগলো।

“আমি আছি…”

কেন যেন মনে হলো,

এই কথাটা শুধুই কাজিনের আশ্বাস না,

বরং ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গভীর প্রতিশ্রুতি।

---

রাতের নিস্তব্ধতা

ঘুমানোর আগে নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল।

শহরের আলো ঝলমল করছে,

দূরে গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে।

ফারহান পাশেই এসে দাঁড়ালো।

“ঢাকা তোমার কেমন লাগছে এখন?”

নীলা উত্তর দিলো,

“ভালো লাগছে।

কারণ শহরটা হঠাৎ অপরিচিত লাগছে না।”

ফারহান চমকে তাকালো।

“মানে?”

নীলা শুধু মুচকি হাসলো।

কোনো উত্তর দিলো না।

কিন্তু সেই মুচকি হাসিই যেন হাজারো উত্তর দিয়ে গেল।

Download

Like this story? Download the app to keep your reading history.
Download

Bonus

New users downloading the APP can read 10 episodes for free

Receive
NovelToon
Step Into A Different WORLD!
Download NovelToon APP on App Store and Google Play