১৪ই এপ্রিল। শুভ নববর্ষ।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের মেয়েদের মেসে সাজ সাজ রব। অর্পিতা, বৃষ্টি, রূপা অহনা —চার বান্ধবী ঠিক করেছে আজ শাড়ি পরে ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাবে। নববর্ষের দিন, মাঠে উৎসব উৎসব ভাব।
কলেজের দ্বিতীয় দিনে অহনার সাথে ওদের তিনজনের পরিচয় হয় বেশ ভালই ভাব জমেছে চারজনের। অহনার কাজিন সাজ্জাদও এই একই কলেজে পড়ে। সাজ্জাদ অহনাকে ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়ার কথা বলে আর অহনা বৃষ্টি,রুপা অর্পিতাকে। অহনা আলাদা বাসায় থাকে। তাই ওরা তিনজন রেডি হয়ে স্টেডিয়ামের ওখানে যাবে ওখানেই অহনা আর ওর কাজিন থাকবে। এগুলোই অর্পিতা বৃষ্টিকে বলছিল।
"এই অপি, আমার আঁচলটা ধর তো!" রূপা লাল-পেড়ে সাদা শাড়ি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
অর্পিতা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হলুদ জামদানিটা ঠিক করছে। কপালে লাল টিপ, হাতে রেশমি চুড়ি, খোঁপায় বেলি ফুল। কাল পর্যন্ত জীবন ছিল শুধু ক্লাস আর ফয়সালের হুমকি। আজ হঠাৎ সব রঙিন লাগছে।
বৃষ্টি ফোনে কথা বলে এসে লাফাতে লাফাতে বললো, "গাইস! অহনার কাজিন সাজ্জাদ ভাইয়া টিকিট ম্যানেজ করে ফেলছে! বলছে গেটের সামনে দাঁড়াতে। ম্যাচের পর ধর্মসাগর পাড়ে ঘুরতেও নিয়ে যাবে।"
এই সাজ্জাদ এটা আবার কে? রুপার প্রশ্নে বৃষ্টি বলা শুরু করল
"আরে অহনার ফুফাতো ভাই। কুমিল্লাতেই থাকে। সেইই আমাদের প্ল্যান করে দিছে,
কুমিল্লা স্টেডিয়াম গিজগিজ করছে। চারদিকে পয়লা বৈশাখের ব্যানার, ঢাকের আওয়াজ, বাচ্চাদের হাতে ঘুড়ি-নাটাই।
গেটের সামনে অহনা দাঁড়িয়ে। হাতে তিনটা টিকিট। "শুভ নববর্ষ! নে ধর। তাড়াতাড়ি ঢোক, খেলা শুরু হয়ে যাবে।"
ওরা গ্যালারিতে উঠে বসলো। মাঠে দুই টিম নামছে। ভিক্টোরিয়া কলেজ vs অন্য কলেজ।
হঠাৎ কমেন্টেটর মাইকে বললো, "আর ভিক্টোরিয়া কলেজের হয়ে স্ট্রাইকার পজিশনে নামছেন আমাদের সবার প্রিয়, আদিত্য রায় চৌধুরী।
অর্পিতা মাঠের দিকে তাকালো।
তৎক্ষণাৎ R15 বাইক থেকে একজন ছেলে নামলো। উচ্চতা ৬ ফুটের কাছাকাছি। ফর্সা গায়ের রঙ, রোদে চকচক করছে। চাপদাড়ি, চুলগুলো খুব সুন্দর করে স্টাইল করা, ঠোটের নিচে তিল। যে কোন মেয়ে দেখলেই ক্রাশ খাবে। হেলমেট খুলে চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে ভিতরের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল দেখে নায়কের থেকে কম লাগছিল না। একটা ছেলের যেমন বডি ফিটনেস হলে সুদর্শন বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে ঠিক তেমন। পরনে ছিল সাদা শার্ট, প্যান্ট আর হাতে অ্যাপেল ওয়াচ। সবকিছু মিলিয়ে জোস লাগছিল ছেলেটাকে দেখতে।
অর্পিতা চোখ ফেরাতে পারলো না। কাল পর্যন্ত যে ছেলেটা তার কলার ধরে 'পার্সোনাল বার্ড' বলেছিল, সে ছিল আগুন। আর এই ছেলেটা? এই ছেলেটা যেন মাঠের সবুজ ঘাস। স্নিগ্ধ, কিন্তু শক্তিশালী।
কিন্তু তার চেয়ে প্রেম করা মানায় না।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে চেঞ্জ করে খেলায় নামল।
প্রথম গোলটা সেই সুদর্শন ছেলেটাই দিলো। বল জালে জড়াতেই পুরা গ্যালারি চিৎকার করে উঠলো। শুধু একটাই নাম শোনা যাচ্ছে আদিত্য। গোল দিয়ে কোনো লাফালাফি করলো না। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বুকে হাত রাখলো, তারপর গ্যালারির দিকে হালকা মাথা ঝোঁকালো।
সেই মুহূর্তে এক সেকেন্ডের জন্য অর্পিতার মনে হলো
আদিত্যকে সে চিনে। ওদের ক্লাসে পড়তো কত মেয়ে যে ক্রাশ খেয়েছিল ওর উপরে। শুধু এগুলো শুনত কিন্তু কখনো ছেলেটাকে ঠিক ভালোভাবে দেখা হয়নি তাই চিনতে হয়তো একটু অসুবিধাই হল।
খেলা শেষ। ভিক্টোরিয়া কলেজ ২-০ তে জিতেছে। দুই গোলই আদিত্যর।
মেসে ফিরে সবাই ক্লান্ত কিন্তু খুশি। রুপা ঠান্ডা লাচ্ছি বানিয়ে এনেছে।
বৃষ্টি বললো, আদিত্যকে কেমন লেগেছে রে তোদের? ওকে তো আমি সেই প্রথম দেখায় চিনেছি। যতটুকু শুনেছি ও আমাদের কলেজেরই ছাত্র।
তাহলে তো ভালই হইছে। রুপার মুখ আনন্দে চিকচিক করছে।
আর অর্পিতা তাই তাকিয়ে দেখছে।
অর্পিতা চুপচাপ শুনছে। তার কানে বাজছে মাঠের সেই চিৎকার, আদিত্যর গোল দেওয়ার পর শান্ত ভঙ্গিটা। ফয়সালের চোখে যে আগুন থাকে, এই ছেলের চোখে সেটা নেই। এর চোখে আছে গভীর দিঘি।
রুপা বললো, "তাহলে কাল সকাল ১০টায় ধর্মসাগর পাক্কা?"
সবাই রাজি।
সবার অলক্ষ্যে অর্পিতা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। কৃষ্ণচূড়া গাছে নতুন পাতা। বাতাসে বেলি ফুলের গন্ধ।
গতকাল পর্যন্ত তার পৃথিবীতে শুধু একজনই ছিল—ফয়সাল। যে ঝড়ের মতো আসে, সব ভেঙেচুরে দিয়ে যায়।
আজ ১৪ই এপ্রিল। শুভ নববর্ষ। আজ প্রথমবার সে দেখলো অন্যরকম একটা ছেলেকে। যে গোল করে লাফায় না, মাথা নিচু করে। যে হুমকি দেয় না, চোখ নামিয়ে হাসে।
ফয়সাল যদি হয় কালবৈশাখী ঝড়,
তবে আদিত্য কি নববর্ষের প্রথম বৃষ্টি?
*[চলবে...]*
পরবর্তী পর্ব চাইলে কমেন্ট করেন।
-
***Download NovelToon to enjoy a better reading experience!***
Updated 4 Episodes
Comments
SOHAN SOHAN
onik sunder apu🥰
2026-04-24
0